15/04/2020
অবকাশ যাতনা ও ধৈর্য্যঃ
অবকাশ বা ছুটি কে না চায়? চাকুরী জীবনে একটু কম পরিশ্রম করে সবাই বেশী আয় করতে চায়। কলিকদের কাছ থেকে বা অন্য গার্মেন্টস শ্রমিকদের কাছেও বলতে শুনেছি, যদি একটু বেশী ছুটি পেতাম! বিশ্ময়ের সাথে এই কথাগুলো হর হামেশাই শুনতে হয়। কিন্তু ঈদের ছুটি ও সপ্তাহে শুক্রবার ব্যতীত তাদের কপালে আর কোন ছুটি জোটে না। আর এই ছুটি পেয়ে গ্রামের বাড়ীতে যাতায়াত করতেই চার থেকে পাঁচ দিন লেগে যায়। বাড়ীতে পৌঁছা মাত্রই অফিসে ফেরার প্রস্তুতি। গার্মেন্টস মালিকরা বা অন্য কোম্পানীর মালিকরা মনে করে, শুক্রবারও যদি তাদের কাজে লাগাতে পারতাম! এমনকি দেখা যায়, শুক্রবারেও অনেক অফিস খোলা থাকে। এই হলো বে-সরকারী প্রতিষ্ঠানের চিত্র। আমি বলতে চাই, এখন কেমন লাগছে? শ্রমিক দের সুযোগ- সুবিধা না দিয়ে নিজের আখের গোছানোই কি মূলে উদ্দেশ্য?
আমার জন্মের পর থেকে এই প্রথম ঘরে একা থাকা বা (কোয়ারেন্টাইন)। করোনা নামের এই ভাইরাস মানুষকে শিখিয়েছে কোয়ারেন্টাইন, লক ডাউন, আইসোলেশন ইত্যাদি শব্দের অর্থ। গত ২৬ শে মার্চ ২০২০ ইং থেকে আগামী ২৫ শে এপ্রিল ২০২০ ইং পর্যন্ত ঘরে থাকতে হবে। আরও কতোদিন থাকবে এই করোনা ভাইরাস তা আল্লাহ তায়ালাই ভাল জানেন।
এই ভাইরাসের কারণে পৃথিবীর প্রায় সব দেশের আকাশে আর বিমান উঠা- নামা করছে না। যে কারনে আকাশ বিষাক্ত ধোঁয়া মুক্ত হযেছে। বিশ্ব রোড সমূহে চলছে না কোন গাড়ী, পরিবেশ হয়ে উঠেছে বিষাক্ত ধোঁয়া মুক্ত। নিরব নিস্তব্ধ মহা সড়ক গুলো ফিরে পেয়েছে তার নিজস্ব স্বাধীণতা। নেই কোন হাইড্রোলিক হর্ণের শব্দ। আর সাগরে নেই কোন মানুষের কোলাহল। সুতরাং, সাগরের জলজ প্রানি গুলো অনেক দিন পর নিজের প্রাণ ফিরে পেয়েছে। আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে কক্সবাজারের সমূদ্র সৈকতের কাঁকড়া গুলো বালুকণায় এসে ভীড় করছে। সমূদ্র সৈকতে মানুষের পরিতর্তে এখন হাতি এসে সাগরের ঢেউয়ের সাথে খেলছে।
সারা পৃথিবী জুড়ে বড় বড় শক্তি সম্পন্ন দেশগুলো আজ এই ভাইরাসের কাছে হার মেনেছে। সমস্ত পৃথিবীর অসংখ্য মুসলমান ইসলাম থেকে সরে গিয়ে দেব- দেবীর পূজা, মাজার পূজা, ধর্ষন, খুন, জিনা, ব্যভিচার ইত্যাদি অপকর্মের দরুন আজ মানব জীবনে নেমে এসেছে, এই বিপর্সয়। কিন্তু আজ বাঘে মহিষে একঘাটে জল খায়। ফিলিপাইনে প্রকাশ্যে আজান দেয়া নিষেধ ছিল কিন্তু এখন সেখানকার কতৃপক্ষ মসজিদ মিনারে প্রকাশ্যে আযান দিতে বলেছে। চীনের প্রধান মন্ত্রী মসজিদে গিয়ে প্রার্থনা করছে। ভারতে শত শত বছরের বাবরী মসজিদ আজ ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছে ভারতীয় হিন্দুরা। তার মুসলমানদের উপর চালিয়েছে নির্যাতন। ইটালীতে মসজিতে মূর্তী বসিয়েছে ইহুদীরা। চীনে উইঘোর সম্প্রদায়ের মুসলমানের উপর চলছে শারিরীক ও মানষিক নির্যাতন। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। কিন্তু সেটা আমরা বুঝেও না বোঝার ভান করি। সারা পৃথিবী জুড়ে চলছে সামাজিক বেহায়াপনা, মদ, নারী, জুয়া। আল্লাহ সজজেই মানুষকে পাকড়াও কনের না। আর পাকড়াও করলে সহজে ছেড়ে দেন না।
যুগে যুগে বিভিন্ন সময় বান্দাদের কৃতকর্মের ফল অনুযায়ী আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন বালা মুসিবত, গজব নাযিল করে থাকেন।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আল্লাহর অনুমোদন ছাড়া কখনো কোন মুসিবত আসে না৷ যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণ করে আল্লাহ তার দিলকে হিদায়াত দান করেন৷ আল্লাহ সব কিছু জানেন৷ (সুরা- আত তাগাবুন, আয়াত-১১)
অর্থাৎ বিপদ-আপদের ঘনঘটার মধ্যেও যে জিনিস মানুষকে সঠিক পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখে এবং কঠিন থেকে কঠিনতর পরিস্থিতিতে পদস্খলন হতে দেয় না সেই একমাত্র জিনিসটি হচ্ছে আল্লাহ প্রতি ঈমান । যার আন্তরে আল্লাহর প্রতি ঈমান নেই সে এসব বিপদ -আপদকে হয় আকস্মিক দুর্ঘটনার ফল মনে করে অথবা এসব বিপদ-আপদ দেয়ার ও দূর করার ব্যাপারে পার্থিব শক্তিসমূহকে কার্যকর বলে বিশ্বাস করে কিংবা সেসবকে এমন কাল্পনিক শক্তিসমূহের কাজ বলে মনে করে যাদেরকে মানুষের কুসংস্কারজনিত বিশ্বাস ক্ষতি ও কল্যাণ করতে সক্ষম বলে ধরে নিয়েছে অথবা তারা আল্লাহকে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী বলে নিখাদ ও নির্ভেজাল ঈমানের সাথে মানে না । ভিন্ন ভিন্ন এসব ক্ষেত্র ও পরিস্থিতিতে মানুষ নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেয় । একটি বিশেষ সীমা পর্যন্ত সে বিপদ-আপদ বরদাশত করে বটে কিন্তু তার পরই সে পরাজয় স্বীকার করে নেয় । তখন সেসব আস্তানায়ই মাথা নত করে, সব রকম আপমান ও লাঞ্ছনা স্বীকার করে নেয় । এ সময় সে যে কোন হীন কাজ ও আচরণ করতে পারে । সব রকম ভ্রান্ত কাজ করতে প্রস্তুত হয়ে যায় । আল্লাহকে গালি দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেনা । এমনকি আত্মহত্যা পর্যন্ত করে বসে । অপরদিকে যে ব্যক্তি একথা জানে এবং আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তা'আলার হাতেই সবকিছু । তিনিই এই বিশ্ব-জাহানের মালিক ও শাসক । তাঁর অনুমোদনক্রমেই বিপদ-মসিবত আসতে এবং দূরীভূত হতে পারে । এই ব্যক্তির মনকে আল্লাহ তা'আলা ধৈর্য ও আনুগত্য এবং তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকার 'তাওফীক' দান করেন । তাকে সাহস ও দৃঢ় মনোবল নিয়ে সব রকম পরিস্থিতিতে মোকাবিলা করার শক্তি দান করেন । অন্ধকার থেকে অন্ধকারতর পরিস্থিতিতেও তার সামনে আল্লাহর দয়া ও সাহসহারা করতে পারে না যে, সে সত্য ও সঠিক পথ থেকে সরে যাবে বা বাতিলের সামনে মাথা নত করবে কিংবা আল্লাহ ছাড়া আর কারো দরবারে তার দুঃখ -বেদনার প্রতিকার তালাশ করবে । এভাবে প্রতিটি বিপদ মসিবতই তার জন্য অধিক কল্যাণের দরজা উন্মুক্ত করে দেয় । প্রকৃতপক্ষে কোন মসিবতই তার মসিবত থাকে না বরং পরিণামের দিক থেকে সরাসরি রহমতে পরিণত হয় । কেননা সে এই মসিবতে নিঃশেষ হয়ে যাক বা সফলভাবে উৎরিয়ে যাক-উভয় অবস্থায়ই সে তার প্রভুর দেয়া পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়ে যায় । এ বিষয়টিই বুখারী ও মুসলিমের বর্ণিত একটি হাদীসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ
"মু'মিনের ব্যাপারটিই বড় অদ্ভুত । আল্লাহ তার জন্য যে ফায়সালাই করুন না কেন তা সর্বাবস্থায় তার জন্য কল্যাণকর হয়ে থাকে । বিপদ-আপদে সে ধৈর্য অবলম্বন করে । এটা তার জন্য কল্যাণকর । সুখ-শান্তি ও সচ্ছলতা আসলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে । এটাও তার জন্য কল্যাণকর । মু'মিন ছাড়া আর কারো ভাগ্যেই এরূপ হয় না" ।
আল্লাহ তায়ালা অন্য আয়াতে বলেন, পৃথিবীতে এবং তোমাদের নিজেদের ওপর যেসব মুসিবত আসে তার একটিও এমন নয় যে, তাকে আমি সৃষ্টি করার পূর্বে একটি গ্রন্থে লিখে রাখিনি৷ এমনটি করা আল্লাহর জন্য খুবই সহজ কাজ৷
(সূরা- আল হাদীদ, আয়াত-২২)
ইয়াহ্ইয়া ইব্ন বুকায়র (র)…… আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: কোন ব্যভিচারী ব্যভিচার করার সময় মু’মিন থাকে না। কোন শরাব পারকারী শরাব পান করার সময় মু’মিন থাকে না। কোন চোর চুরি করার সময় মু’মিন থাকে না এবং কোন ছিনতাইকারী এমনভাবে ছিনতাই করে যে, মানুষ তা দেখার জন্য তাদের চোখ সেদিকে উত্তোলিত করে; তখন সে মু’মিন থাকে না। (সহিহ বুখারী :: খন্ড ৮ :: অধ্যায় ৮১ :: হাদিস ৭৬৩)
আল্লাহ তায়ালা অন্য আয়াতে বলেন,
হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রসুল (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ওপর ঈমান আনো। তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে দ্বিগুণ রহমত দান করবেন, তোমাদেরকে সেই জ্যোতি দান করবেন যার সাহায্যে তোমরা পথ চলবে এবং তোমাদের ত্রুটি -বিচ্যুতি মাফ করে দেবেন। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু৷
(সূরা- আল হাদীদ, আয়াত-২৮)
যখন কোনো মানুষের জীবনে বিপর্যয় এসে হাজির হয়, তখন সেটা হয় একটা পরীক্ষা, নয়তো সেটা একটা শাস্তি। শাস্তি হলে এ সম্পর্কে সূরা হুদ- এ আল্লাহ তায়ালা বলেন,
তারপর যখন আমার ফায়সালার সময় এসে গেলো, আমি গোটা জনপদটি উল্টে দিলাম এবং তার ওপর পাকা মাটির পাথর অবিরামভাবে বর্ষণ করলাম, যার মধ্য থেকে প্রত্যেকটি পাথর তোমার রবের কাছে চিহ্নিত ছিল৷ আর জালেমদের থেকে এ শাস্তি মোটেই দূরে নয়৷ (সূরা হুদ, আয়াত- ৮২-৮৩)
কারণ এটা ছিল শাস্তি।
যদি এটা শাস্তি হয়, তা হলে আমাদের উচিত আল্লাহ তায়ালার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং তওবা করা। মানুষ খারাপ কাজ করা বন্ধ করবে, পাপ থেকে বিরত থাকবে এবং প্রতিজ্ঞা করবে যে আর কখনো এমন কাজ করবে না। আর যদি মানুষ সেই ক্ষতিটা পূরণ করার সুযোগ পায়, তাহলে সেটা পূরণ করার চেষ্টা করবে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে।
আর যদি এটা হয় আমাদের জন্য একটা পরীক্ষা, আল্লাহ সুবহানুতায়ালা সে সম্পর্কে সূরা বাকারায় বলেন,
আর নিশ্চয়ই আমি ভীতি, অনাহার, প্রাণ ও সম্পদের ক্ষতির মাধ্যমে এবং উপার্জন ও আমদানী হ্রাস করে তোমাদের পরীক্ষা করবো ৷ (সূরা- বাকারাহ, আয়াত- ১৫৫)
যেমন ধরুন, একজন লোক হয়তো মারা গেল অথবা সে অসুস্থ হয়ে পড়ল, তখন আমরা বলব, ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন।’ আল্লাহ তায়ালা বলেন,
তাদের বলে দাও, “আল্লাহ আমাদের জন্য যা লিখে দিয়েছেন, তা ছাড়া আর কোন (ভাল বা মন্দ )কিছুই আমাদের হয় না৷ আল্লাহই আমাদের অভিভাবক ও কার্যনির্বাহক এবং ঈমানদরদের তাঁর ওপরই ভরসা করা উচিত”৷
(সূরা- আত তওবা, আয়াত- ৫১)
এখানে দুনিয়াপূজারী ও আল্লাহ বিশ্বাসী মানসিকতার পার্থক্য সুস্পষ্ট করে তূলে ধারা হয়েছে। দুনিয়া পূজারী নিজের প্রবৃত্তির আকাংখা পূর্ণ করার জন্য সবকিছু করে। কোন বৈষয়িক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার ওপরই তার প্রবৃত্তির সুখ ও আনন্দ নির্ভর করে। এ উদ্দেশ্য লাভে সক্ষম হলেই সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে। আর উদ্দেশ্য লাভে ব্যার্থ হলে সে ম্রিয়মান হয়ে পড়ে। তারপর বস্তুগত কার্যকারণই প্রায় তার সমস্ত সহায় অবলম্বনের কাজ করে। সেগুলো অনুকূল হলে তা মনোবল বেড়ে যেতে থাকে। আর প্রতিকূল হলে সে হিম্মত হারাতে থাকে। অন্যদিকে আল্লাহে বিশ্বাসী মানুষ আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্যই সবকিছু করে। এ কাজে সে নিজের শক্তি বা বস্তুগত উপায়-উপকরণের ওপর ভরসা করে না বরং সে পুরোপুরি নির্ভর করে আল্লাহর সত্তার ওপর। সত্যের পথে কাজ করতে গিয়ে সে বিপদ -আপদের সম্মুখীন হলে অথবা সাফল্যের বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করলে, উভয় অবস্থায় সে মনে করে আল্লাহর ইচ্ছাই পূর্ণ হচ্ছে। বিপদ আপদ তার মনোবল ভাংতে পারে না। আবার সাফল্যও তাকে অহংকারে লিপ্ত করতে পারে না। কারণ, প্রথমত সে উভয়কে আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত বলে মনে করে। সব অবস্থায় সে আল্লাহর সৃষ্ট এ পরীক্ষায় নিরাপদে উত্তীর্ণ হতে চায়।
সূরা বাকারাহ এ আল্লাহ তায়লা বলেন, ‘হে মোমিনগণ আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো, ধৈর্য, অধ্যবসায় ও নামাজের মাধ্যমে। নিশ্চয়ই আল্লাহ আছেন তাদের সাথে যারা ধৈর্যশীল ও অধ্যবসায়ী।’ (সূরা- বাকারাহ, আয়াত- ১৫৩)
সহিহ মুসলিমের খণ্ড নাম্বার ৪, হাদিস নাম্বার ৭১৩৮তে বলা হয়েছে : ‘নবী মোহাম্মদ সা: বলেছেন, বিশ্বাসীদের কাজগুলো বেশ অদ্ভুত। যদি তার জীবনে ভালো কিছু ঘটে, সে আল্লাহ তায়ালাকে কৃতজ্ঞতা জানায়। আর যদি সে বিপদে পড়ে, তখন সে ধৈর্যশীল ও অধ্যবসায়ী হয়। তার জন্য পরকালে ভালো জিনিস অপেক্ষা করছে।’ তাহলে যদি আমাদের মাঝে কোনো রকমের বিপর্যয় আসে, যদি আমাদের কোনো ভুল থাকে, আমরা তা শুধরে নেবো এবং ধৈর্যের সাথে এবং অধ্যবসায়ের সাথে তা মোকাবেলা করব। কারণ, আল্লাহ বলেছেন, তোমরা আল্লাহ সুবহানুতায়ালার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো ধৈর্য, অধ্যবসায় ও নামাজের মাধ্যমে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাথে আছেন, যারা ধৈর্যশীল ও অধ্যবসায়ী।
সূরা বাকারাহ এ আল্লাহ তায়লা বলেন,
তোমাদের উপর যুদ্ধ ফরয করা হয়েছে, অথচ তা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয়। পক্ষান্তরে তোমাদের কাছে হয়তো কোন একটা বিষয় পছন্দসই নয়, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হয়তোবা কোন একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয় অথচ তোমাদের জন্যে অকল্যাণকর। বস্তুতঃ আল্লাহই জানেন, তোমরা জান না।
(সূরা- বাকারাহ, আয়াত- ২১৬)
যেমন ধরুণ, একজন খুবই ধার্মিক লোক আল্লাহ সুবহানুতায়ালার কাছে দোয়া করল তাকে যেন আল্লাহ একটা মোটরসাইকেল কেনার তৌফিক দেন। তাতে তার যাতায়াতে সুবিধা হবে। আর আল্লাহ সেই দোয়া কবুল করলেন না। আপনি হয়তো বলবেন, সে খুব ধার্মিক লোক। তার দোয়া কেন আল্লাহ কবুল করলেন না। আসলে আল্লাহ সুবহানুতায়ালা জানেন, যদি লোকটার মোটরসাইকেল থাকে, সে অ্যাকসিডেন্ট করতে পারে এবং আর পঙ্গু হয়ে যেতে পারে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, বস্তুতঃ আল্লাহই জানেন, তোমরা জান না।
একবার খুব ধনী একজন ব্যবসায়ী লন্ডনের ফ্লাইট ধরার জন্য এয়ারপোর্টে যাচ্ছিলেন। একটি ব্যবসায়িক চুক্তি করার জন্য। যে চুক্তিটা করলে তার লাভ হবে একশ’ কোটি রুপি। যখন তিনি এয়ারপোর্টের দিকে যাচ্ছিলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাস্তায় খুব বড় একটা ট্রাফিক জ্যাম ছিল। আর তিনি সময়মতো এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে পারলেন না। তিনি যখন এয়ারপোর্টে পৌঁছালেন, ততক্ষণে সেই ফ্লাইটটা রওনা দিয়ে দিয়েছে। তিনি ফ্লাইট মিস করলেন। তিনি তখন মন খারাপ করে বললেন, এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বাজে একটা ঘটনা। বাড়ি ফিরে যাওয়ার সময় গাড়িতে যে রেডিওটা ছিল, তাতে তিনি লেটেস্ট খবরটা শুনলেন। যে ফ্লাইটটি তিনি ধরতে যাচ্ছিলেন, সেটি ক্রাস করেছে। আর সেই ফ্লাইটে যতজন যাত্রী ছিল, তারা সবাই মারা গেছেন। তখন সেই ব্যবসায়ীই বললেন, এ ঘটনাটাই হলো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ একটা ঘটনা। কিছুক্ষণ আগে তিনি ট্রাফিক জ্যামকে দোষারোপ করে বলছিলেন, এর কারণে তার একশ’ কোটি রূপি ক্ষতি হয়ে গেল। আর সেই ঘটনাই কিছুক্ষণ পরে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ ঘটনা হয়ে গেল। তিনি ট্রাফিক জ্যামকে তখন ধন্যবাদ জানালেন। কারণ, এর কারণেই তার জীবনটা বেঁচে গেছে। পবিত্র কুরআনের কথা হলো, ‘আল্লাহ জানেন, আর তোমরা জানো না।’ একশ’ কোটি রুপির চেয়ে ওই ব্যবসায়ীর জীবন অনেক বেশি মূল্যবান।
অনেক সময় মোমিন যে দোয়া করে, আল্লাহ সে দোয়া কবুল করেন না। আল্লাহ তায়লা বলেন,
‘আল্লাহ তায়ালা যদি তার সব বান্দাহকে জীবনের সব উপকরণ ও প্রাচুর্য্য দিতেন, তা হলে তারা অবশ্যই পৃথিবীতে বিপর্যয়ের সৃষ্টি করতো।’ কিন্তু আল্লাহ তার ইচ্ছেমতো পরিমাণেই উপকরণ দেন। কারণ তিনি জানেন, তিনি কী দিয়েছেন। (সূরা- আশ শূরা, আয়াত- ২৭)
সূরা বাকারাহ এ আল্লাহ তায়লা বলেন,
আর হে নবী! আমার বান্দা যদি তোমার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তাহলে তাদেরকে বলে দাও , আমি তাদের কাছেই আছি ৷ যে আমাকে ডাকে আমি তার ডাক শুনি এবং জবাব দেই, কাজেই তাদের আমার আহবানে সাড়া দেয়া এবং আমার ওপর ঈমান আনা উচিত একথা তুমি তাদের শুনিয়ে দাও, হয়তো সত্য-সরল পথের সন্ধান পাবে ৷
(সূরা- বাকারাহ, আয়াত- ২১৬)
সূরা আল মুমিন এ আল্লাহ তায়লা বলেন,
তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব। যারা আমার এবাদতে অহংকার করে তারা সত্বরই জাহান্নামে দাখিল হবে লাঞ্ছিত হয়ে। (সূরা- আল মুমিন, আয়াত-৬০)
অনেক সময় অধার্মিক বা বিধর্মীরা নকল ঈশ্বরের কাছে অনেক কিছু প্রার্থনা করে এবং সেটা পেয়ে যায়। কারণ আল্লাহ তাদের বস্তুগত চাহিদা পূরণ করে থাকেন। কারণ, তিনি জানেন তারা যেটা প্রার্থনা করছে এতে তারা ভবিষ্যতে আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পরকালের জীবনে এসবের কারণে তারা শুধু ক্ষতিগ্রস্তই হবে। সত্যিকারের বিশ্বাসীদের ক্ষেত্রে এসব চাওয়া কোনো ব্যাপারই নয়। সে ধনী না গরিব এটা বিশ্বাসীদের কাছে কোনো বিষয় নয়। এটা সুসময় না দুঃসময় এটা মোমিনের কাছে ধর্তব্য নয়। কারণ তারা আল্লাহ সুবাহানুতায়ালাকে বিশ্বাস করে। সত্যিকারের বিশ্বাসী সব সময়ই বলে, আলহামদুলিল্লাহ। যে ঘটনাই ঘটে থাকুক, আলহামদুলিল্লাহ। বিশ্বাসীরা বলেন, সব প্রশংসাই আল্লাহর। এমনকি যদি তার ক্ষতিও হয়, সে বলবে আলহামদুলিল্লাহ। কারণ সে আল্লাহকে বিশ্বাস করে এবং এটাও বিশ্বাস করে যে, ভবিষ্যতে তার জন্য কল্যাণকর কিছুই অপেক্ষা করছে। ইহকালে, না হয় পরকালে। এক কথায় সত্যিকারের বিশ্বাসী বিশ্বাস করে যে, যা কিছু হয়েছে তা আল্লাহর তরফ থেকেই হয়েছে।
সমাপ্ত