22/12/2025
বিয়ের সময় হযরত আয়েশার (রাঃ)বয়স ছিল ১৯ বছর
হযরত আয়েশার (রা.) বিয়ের বয়স একটি বিতর্কিত বিষয়। অনেকে এ বিষয়ে গবেষণা করছেন। বুখারীর ২৩৬ নম্বর হাদিস অনুযায়ী সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে যে, রসূলের (সা.) সঙ্গে বিয়ের সময় হযরত আয়েশার বয়স ছিল ৬ বছর এবং রসূলের ৫৩ বছর। কিন্তু হাদিসের এ ভাষ্য সঠিক নয়। রসূলের একান্ত জীবন নিয়ে সীমাহীন নোংরামী করা হয়েছে। বুখারীর হাদিসে বলা হয়েছে, রসূল ৬ বছর বয়সে হযরত আয়েশাকে বিয়ে করেছেন। এখানে বয়সের কথা যা—ই বলা হোক, পরবর্তী বর্ণনা আরো জঘন্য। বলা হয়েছে, ৯ বছর বয়সে হযরত আয়েশার সঙ্গে রসূল ঘর সংসার শুরু করেন। কোনো স্বামী কিংবা স্ত্রী কি তাদের দাম্পত্য জীবন শুরু করার কথা বাইরে প্রকাশ করে? রসূল অথবা হযরত আয়েশা তাদের দাম্পত্য জীবনের একান্ত কথা বাইরে প্রকাশ করতে যাবেন কেন?
মানব রচিত হাদিস প্রচার করে রসূলের মর্যাদাকে পৃথিবীর মানুষের সামনে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে। আল্লাহ ও তার রসূলের শত্রুরা রসূলের নামে মিথ্যা প্রচার করেছে। হাদিস রচয়িতা বুখারী না ছিলেন আল্লাহর রসূল, না ছিলেন নবীজির সাহাবী, না ছিলেন আরবের অধিবাসী। বুখারীর জন্ম হয়েছিল নবীজির মৃত্যুর প্রায় দুই শো বছর পর। এ সময় হাদিসের সত্যতা যাচাইয়ে কোনো সাহাবীই জীবিত ছিলেন না। এমন নয় যে, রসূলের সঙ্গে আয়েশার প্রথম বিয়ে হয়েছিল। প্রথমবার বাগদান হয়েছিল জুবায়েরের সঙ্গে। রসূলের সঙ্গে বিয়ের সময় আয়েশার বয়স ৬ বছর হলে জুবায়েরের সঙ্গে বাগদানের সময় তার বয়স ছিল কত? নিশ্চয়ই ৬ বছরের কম। এত কম বয়সে কি কোথাও কোনো মেয়ের বিয়ে হয়? ইসলাম একটি বিশ্বজনীন আদর্শের নাম। প্রশ্ন উঠতে পারে যে, ইসলাম শ্রেষ্ঠ ধর্ম হলে এ ধর্মের প্রচারক মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ৬ বছরের নাবালিকা শিশু কন্যাকে বিয়ে করেন কিভাবে? ইসলামে শিশু বা নাবালিকা বিয়ে নিষিদ্ধ। সূরা নিসার ৬ নম্বর আয়াত, ২১ নম্বর আয়াত ছাড়াও সূরা রোমের ২১ নম্বর আয়াত তার প্রমাণ। আসলে বুখারীতে এ মর্মে প্রচারিত হাদিসের উদ্দেশ্য রসূলের সর্বজনীন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বকে হেয় করা।
রসূলের সঙ্গে হযরত আয়েশার বিয়ে সংক্রান্ত বুখারীর ২৩৬ নম্বর হাদিসে বলা হয়: ‘হিশামের পিতা থেকে বর্ণিত। মহানবী (সা.) মদিনায় হিযরত করার তিন বছর আগে হযরত খাদিজা (রা.) ইন্তেকাল করেন। মহানবী সেখানে প্রায় দুই বছর অবস্থান করেন এবং তারপর তিনি ৬ বছর বয়স্ক হযরত আয়েশাকে (রা.) বিয়ে করেন এবং ৯ বছর বয়সে তিনি তার সঙ্গে ঘর সংসার শুরু করেন।’
কুরআন বা অন্য কোনো হাদিসে হযরত আয়েশাকে ৬ বছর বয়সে রসূলের বিয়ে করার আর কোনো বর্ণনা নেই। বিয়ের সময় হযরত আয়েশার বয়স সংক্রান্ত নবী করিম বা কোনো সাহাবীর দেয়া তথ্যও পাওয়া যায় না। এই হাদিস বর্ণনাকারীদের শেষ ব্যক্তি হলেন হিশাম বিন উরওয়ার। তিনি তার পিতার কাছ থেকে এ হাদিস শুনেছিলেন। হিশাম তার জীবনের ৭১ বছর মদিনায় কাটালেও মদিনার কেউ এ হাদিসটি শোনেননি। হিশামের শেষ জীবন কাটে ইরাকে। এ কারণে এ হাদিসের বাদবাকি বর্ণনাকারীদের সবাই ইরাকের। ইয়াকুব ইবনে শায়বাহ বলেছেন: ‘শুধুমাত্র ইরাকিরা যেসব হাদিস বর্ণনা করেছে সেগুলো ছাড়া হিশামের সব হাদিস বিশ্বাসযোগ্য। হিশামের ছাত্র মালেক বিন আনাস ইরাকিদের বর্ণিত হাদিসগুলো বাতিল করে দিয়েছেন। এমন বিবরণ পাওয়া যায় যে, হিশাম বিন উরওয়া শেষ বয়সে স্মৃতিশক্তির দুর্বলতায় ভুগছিলেন। এ কারণে তার শেষ বয়সে অর্থাৎ ইরাকে বসবাসকালে বর্ণিত হাদিসগুলো বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাই এ হাদিসটি ভুল প্রমাণিত হয়। ইমাম বুখারীর আরেকটি হাদিস প্রমাণ করে যে, হযরত আয়েশার বিয়ের বয়স সংক্রান্ত হাদিসটি ভুল। কেননা পরবতীর্ হাদিসে বলা হয়, সূরা কামারের ৪৬ নম্বর আয়াত নাজিল হওয়ার সময় হযরত আয়েশা ছিলেন কিশোরী (‘জারিয়াহ।’) মক্কায় ৬১২ সালের দিকে সূরা কামার নাজিল হয়। এ হিসাবে হযরত আয়েশার বয়স তখন কমপক্ষে ৫ বছর হলেও ৬২৩—৬২৪ সালে তার বয়স কোনোভাবেই ১৫/১৬ বছরের নিচে নয়। রসূলের সঙ্গে হযরত আয়েশার দাম্পত্য জীবন শুরু হয় আরো দুই বছর পর। সার্বিক বিচারে দেখা যায়, হিশাম বিন উরওয়ার বর্ণিত হাদিসটি ভুল।
আল—তাবারি তার ইতিহাসে উল্লেখ করেছেন যে, আবু বকরের ৪ সন্তানের সবাই ইসলাম—পূর্ব ৬১০ সালের আগেই জন্মগ্রহণ করেন। হযরত আয়েশার বিয়ে হয় ৬২৪ সালে বা দ্বিতীয় হিজরিতে। তার মানে দাঁড়ায় বিয়ের সময় হযরত আয়েশার বয়স ন্যূনতম ১৪ বছর ছিল। (সূত্র: তারিখুল—উম্মাম ওয়াল—মামলুক আল—তাবারি, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা—৫০) ইতিহাসবিদ ইবনে হিশামের বর্ণনা মতে, হযরত আয়েশা উমর ইবনে খাত্তাবের বেশ আগে ইসলাম গ্রহণ করেন। তার অর্থ দাঁড়ায় হযরত আয়েশা ৬১০ সালের কাছাকাছি সময় ইসলাম গ্রহণ করেন। যদি ধরে নেয়া যায়, তিনি বুঝে শুনে ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাহলে তখন তার বয়স ছিল ৭—৮ বছর। এই হিসাবে হযরত আয়েশার বয়স বিয়ের সময় ২০ বছরের উপরে হয়। (সূত্র: আল—সিরাহ আল—নাবিয়াহ, ইবনে হিশাম, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা—২২৭—২৩৪)
হযরত খাদিজার ইন্তেকালের তিন বছর পর নবুুওয়াতের ত্রয়োদশ বছরে রসূল হযরত আয়েশাকে বিয়ে করেন। ‘গায়াতুস সাউল ফি খাসায়িসির রাসূল’ গ্রন্থের লেখক আবু হাফস উমর লিখেছেন, রসূল দ্বিতীয় হিজরির শাওয়াল মাসে হযরত আয়েশাকে ঘরে তুলে এনেছিলেন। অন্যদিকে ‘আনসাবুল আশরাফ’ কিতাবে বলা হয়, রসূল চতুর্থ হিজরিতে হযরত আয়েশাকে বিয়ে করেন। তাহলে প্রথম মত অনুসারে দেখা যাচ্ছে, নবুুওয়াত প্রাপ্তির ১৩তম বছরে রসূল হযরত আয়েশাকে বিয়ে করেন। রসূলের নবুুওয়াত প্রাপ্তির ১৩তম বছরে আসমা বিনতে আবু বকরের বয়স ছিল ২৭ বছর। অতএব রসূলের নবুুওয়াত প্রাপ্তির ১৩তম বছরে আসমার ছোট বোন আয়েশার বয়স ২৭—১০=১৭ বছর। দ্বিতীয় হিজরিতে হযরত আয়েশার বয়স ১৭+২= ১৯ বছর। দ্বিতীয় মত অনুসারে দেখা যাচ্ছে, চতুর্থ হিজরিতে হযরত আয়েশার বয়স ১৭+৪= ২১ বছর।
মিশকাতের বিখ্যাত লেখক ওয়ালিউদ্দিন মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল—খতিব আল—আমরি তাব্রিজি তার আসমা উর রিজালে লিখেছেন যে, হযরত আসমা ৭৩ হিজরিতে ১০০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন অর্থাৎ তার পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়েরের শাহাদাতের ১০ বা ১২ দিন পর। ৬৯২ সালে দ্বিতীয় ফিতনার শেষ প্রান্তে উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের সৈন্যরা তার প্রতিদ্বন্দ্বী খলিফা সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে আল—জুবায়েরকে তার ক্ষমতার কেন্দ্র ইসলামের পবিত্র নগরী মক্কায় অবরোধ করে এবং তাকে পরাজিত করে। ইবনে জুবায়ের হাজ্জাজের কাছে আত্মসমর্পণ করবেন কিনা সে ব্যাপারে শতায়ু মা আসমা বিনতে আবু বকরের পরামর্শ চান। তিনি ইবনে জুবায়েরের বার্ধক্য এবং তার জন্য যেসব লোক জীবন দিয়েছে তাদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানাতে তাকে লড়াই অব্যাহত রাখার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, চামড়া ছিলে নিলেও কুরবানীর বকরি ব্যথা পায় না। আসমা তাকে শহীদ হওয়ার পরামর্শ দেন। আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের মায়ের কপালে চুমো দিয়ে বললেন, ‘আল্লাহর কসম এটাই আমার মত। মা ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন। জড়িয়ে ধরে তিনি বুঝতে পারেন যে, তার পোশাকের নিচে বর্ম। আসমা বললেন: ‘শহীদ হতে ইচ্ছুক কেউ তো বর্ম পরে না? খুলে ফেল। সাহসের সঙ্গে লড়াই করবে। মনে রাখবে, তুমি জুবায়েরের পুত্র, আবু বকরের নাতি, সাফিয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিব তোমার দাদী।’
ইবনে জুবায়েরের মৃত্যুর তারিখ ৬৯২ সালের ৪ অক্টোবর অথবা ৩ নভেম্বর। অতএব ১০০ বছরে হযরত আসমার মৃত্যুর বয়স থেকে ৭৩ বছর বাদ দিলে আমরা সহজেই এই সিদ্ধান্তে পেঁৗছাতে পারি যে, হিজরি সাল গণনা শুরু করার সময় তার বয়স ছিল ২৭ বছর। একই সময় হযরত আয়েশার বয়স ছিল ১৭ বছর। মহানবীর সকল জীবনীকার একমত যে, তিনি দ্বিতীয় হিজরিতে হযরত আয়েশার সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাই একান্তভাবে বলা যেতে পারে যে, তখন তার বয়স ছিল ১৯ বছর, বুখারীতে বর্ণিত ৯ বছর নয়। সৌদি বিচারক আরেকটি হাদিসের অপব্যাখ্যা করেছেন। এ হাদিসের আলোকে তিনি রায় দেন যে, নাবালিকা মেয়ের বয়ঃসন্ধিকালে পেঁৗছানোর পরই বিয়ে বিচ্ছেদ চাওয়ার অধিকার থাকবে। তাকে ‘খিয়ার—আল—বুলুঘ’ বা বয়ঃসন্ধির বিকল্প বলা হয় এবং আবু দাউদের সংকলনে ইবনে আব্বাসের বর্ণনার উপর ভিত্তি করে এ হাদিস রচনা করা হয়। এ হাদিস অনুসারে রসূল একজন নাবালিকা মেয়েকে তার বিয়ে প্রত্যাখ্যান করার বিকল্প দিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। নাবালিকা মেয়েটি রসূলকে জানিয়েছিল যে, তার বাবা তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এই হাদিসটি পাঠ করলে দেখা যায় যে, প্রশ্নবিদ্ধ মেয়েটি নাবালিকা ছিল না। সে ছিল ‘বিকরাণ।’ বিকরাণ অর্থ প্রাপ্তবয়স্ক, অবিবাহিত মেয়ে। এছাড়াও প্রতিবেদনে বয়ঃসন্ধির কোনো উল্লেখ নেই। অতএব খিয়ার—আল—বুলুঘ ধারণাটি আইনের দৃষ্টিতে খারাপ। কারণ এটি একটি মিথ্যা ধারণার উপর ভিত্তি করে তৈরি। সংক্ষেপে রসূলের বাল্য বিয়েকে ন্যায্যতা দেয়ার কোনো নির্ভরযোগ্য বিবরণ নেই। তাই কোনো নাবালিকাকে বিয়ে বিচ্ছেদের অধিকার প্রয়োগের জন্য বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দেয়ার প্রশ্নই উঠে না। বর্তমান ইসলামী আইনের সমস্যা হলো বেশিরভাগই কুরআনের মূল কথার উপর ভিত্তি করে নয়। কারণ হলো মুসলিম ধর্মতত্ত্ববিদদের বিশেষ করে সাধারণত ওয়াহাবী নামে পরিচিত সালাফি মতাদর্শীরা বিশ্বাস করে যে, হাদিস কুরআনের আয়াত বাতিল করতে পারে। এরকম একজন ধর্মপ্রচারক আবু আম্মার ইয়াসির কাজী তার ‘অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য সায়েন্সেস অব দ্য কুরআন’—এ লিখেছেন যে, রসূলের সুন্নাহ কুরআনকে বাতিল করতে পারে।
৬২৪ সালে বদরের যুদ্ধ এবং ৬২৫ সালে উহুদের যুদ্ধ উভয় যুদ্ধের সময় হযরত আয়েশা অন্য মহিলাদের সঙ্গে তাঁবুতে অবস্থান করছিলেন। যুদ্ধের সময় রসূলের (সা.) সঙ্গে যারা অংশ নিতো তাদের বয়স ১৫ বছরের বেশি ছিল। কম বয়স্ক কেউ যুদ্ধে অংশ নিতে চাইলে তাদেরকে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হতো। মুতাইম ইবনে আদির পুত্র জুবায়ের ইবনে মুতাইমের সঙ্গে ৬২০ সালে আবু বকরের কন্যা আয়েশার প্রাথমিক বাগদান সম্পন্ন হয়। কিন্তু যখন মুতাইম জানতে পারেন যে, আবু বকর ইসলাম গ্রহণ করেছেন তখন পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে এই বাগদান বাতিল করা হয়। আয়েশার মা উম্মে রুমান বিনতে আমেরের কাছে খাওলা বিনতে হাকিম জুবায়েরের বিয়ের প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। (সূত্র: তারিখ আল—রসূল ওয়াল—মুলুক, কিতাব আল—তাবাকাত আল—কবীর, উম্মাহাতুল মু’মিনীন, আস—সুনান আল—কুবরা।)
২০০৯ সালের ৯ মে হিন্দুস্তান টাইমসে ‘হযরত আয়েশা ওয়াজ নাইনটিন নট নাইন’ শিরোনামে ভারতীয় ইসলামী বিশেষজ্ঞ ফয়েজুর রহমানের একটি গবেষণাধমীর্ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। আলোচ্য নিবন্ধে বলা হয়, ২০০৯ সালের এপ্রিলে বিশ্ব গণমাধ্যমে সৌদি আরবের একজন বিচারকের একটি চমকপ্রদ রায়ের সংবাদ প্রকাশিত হয়। রায়ে বিচারক ৪৭ বছর বয়সের এক ব্যক্তির সঙ্গে আট বছর বয়সের একটি মেয়ের বিয়ে বাতিল করতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু সৌদি আরবের ইসলামী আইনের সঙ্গে পরিচিতদের কাছে এই রায় ছিল শরীয়তের নামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের একাধিক ঘটনার ধারাবাহিকতার সর্বশেষ ঘটনা। প্রশ্ন হচ্ছে ইসলামী আইন কি আসলেই বাল্যবিয়েকে সমর্থন করে? কুরআন পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, ইসলামে বিয়ে একটি নাগরিক চুক্তি বা ‘মেসাক।’ মেসাক কেবলমাত্র সেসব ব্যক্তিদের মধ্যেই চূড়ান্ত হতে পারে যারা বুদ্ধিবৃত্তিক ও শারীরিকভাবে যথেষ্ট পরিপক্ক। যারা এই ধরনের চুক্তির দায়িত্বগুলো বুঝতে এবং পালন করতে পারে।
মেসাক সম্পর্কে সূরা নিসার ২১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: ‘তোমরা কিরূপে তা গ্রহণ করতে পার অথচ তোমাদের একজন অন্য জনের কাছে গমন এবং নারীরা তোমাদের কাছ থেকে সুদৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করেছে?’ সূরা নিসার ৬ নম্বর আয়াতে বিষয়টি আরো পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে: ‘এতিমদের যাচাই করবে যে পর্যন্ত না তারা নিকাহ (বিয়ে) করার বয়সে পেঁৗছায় এবং তাদের মধ্যে বুদ্ধির পরিপক্কতা দেখতে পেলে তাদের সম্পত্তি তাদের হাতে তুলে দাও।’ কুরআনে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্কতাকে বিয়ের বয়সে পেঁৗছানোর ভিত্তি হিসেবে বুঝানো হয়েছে। সবসময় বয়ঃসন্ধিকালের পর বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্কতা আসে।
বিয়ের মেসাক কুরআনের বর্ণনার সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ। বিয়ে হচ্ছে দুটি পারস্পরিক সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যক্তির মধ্যে মানসিক বন্ধন। এ মানসিক বন্ধনের মাধ্যমে তারা একে অন্যের সাহচর্যে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে চায়। স্বামী কিংবা স্ত্রী কেউ মানসিকভাবে বিকশিত না হলে একে অন্যের সাহচর্যে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে না। সূরা আরাফের ১৮৯ নম্বর আয়াত এবং সূরা রুমের ২১ নম্বর আয়াতে অনুরূপ বর্ণনা দেয়া হয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত, মুসলিম আইনবিদরা কুরআনের শিক্ষাগুলো বুঝতে পারেননি বলে মনে হয়। সৌদি আরবের গ্রান্ড মুফতি শেখ আবদুল আজিজ আল—শেখ ১০ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে বৈধ বলে ফতোয়া জারি করেন। এমনকি ভারতেও দেওবন্দ এবং অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডসহ মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলো বাল্য বিয়ে নিষিদ্ধ করেনি। এটা আশ্চর্যের বিষয় যে, যারা শরিয়াহকে ইসলামী আইনের ভিত্তি দাবি করে তারাও ইসলামী আইনের মূল উৎস কুরআনকে উপেক্ষা করেন। এমনকি জাল হাদিসের মাধ্যমে কুরআনের আইনকে বাতিল করে দেন। উদাহরণস্বরূপ, ইসলামে বাল্য বিয়েকে বুখারীর একটি হাদিসের ভিত্তিতে ন্যায্যতা দেয়া হয়েছে। আয়েশা থেকে বর্ণিত বুখারীর ৫১৩৪ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে: ‘তার (আয়েশা) বয়স যখন ৬ বছর তখন নবী তাকে বিয়ে করেন এবং ৯ বছর বয়সে তার সঙ্গে বাসর করেন।’ বিয়ের সময় হযরত আয়েশার বয়স কত ছিল? বুখারীর এই হাদিস বেশ কয়েকটি কারণে গ্রহণযোগ্য নয়। প্রথমত: নবী শারীরিক ও মানসিকভাবে অপরিণত শিশুকে বিয়ে করার জন্য কুরআনের বিরুদ্ধে যেতে পারেন না। দ্বিতীয়ত: হযরত আয়েশার বয়স সহজেই তার বড় বোন হযরত আসমার বয়স থেকে গণনা করা যেতে পারে। হযরত আসমা ছিলেন হযরত আয়েশার চেয়ে ১০ বছরের বড়। রসূলের মক্কা থেকে মদিনায় হিযরতের বছর থেকে ইসলামিক ক্যালেন্ডার বা হিজরি সাল গণনা শুরু হয়।
[সংগৃহীত ]