29/05/2026
বেদ এ বৈজ্ঞানিক তত্ত্বঃ
ন মৃত্যুরাসীদমৃতং ন তর্হি ন রাত্র্যা অহ্ন আসীৎ প্রকেতঃ। আনীদবাতং স্বধয়া তদেকং তস্মাদ্ধন্যন্নঃ পরঃ কিং চনাস।। ঋগ্বেদ১০/১২৯/২
ভাবার্থ- অর্থাৎ সৃষ্টির রচনার পূর্বে কোন জীবন,মৃত্যু, দিন, রাত্রি, চন্দ্র, সূর্য এমন কি সৃষ্টি, বিসৃষ্টিও কিছু জানার যোগ্য ছিল না শুধূ অবিচল স্থিতি ছিল। সেই সময় শক্তি (Energy) অবশ্যই ছিল। শক্তি দুই প্রকার সুপ্ত শক্তি(Protentiol Energy) ও গতিসঞ্জাত শক্তি(Kinetic energy) এ শক্তি গুলি তখন ক্রিয়াশীল ছিল না।
যদক্রন্দঃ প্রথমং জায়মান উদ্যন্ৎসমুদ্রাদুত বা পুরীষাত্। শয়েনস্য পক্ষা হরিণস্য বাহু উপস্তুত্যং মহি জাতং তে অর্বন্।।
(ঋগ্বেদ- ১/১৬৩/১)।।
পদার্থঃ-- (যত) যে কারণ ( অক্রন্দঃ) শব্দ করে ( প্রথমম্) আদিতে ( জায়মানঃ) উৎপন্ন হয় ( উদ্যন্) উদিত হয়ে যায় ( সমুদ্রাত্) অন্তিরক্ষে ( উত) ও ( বা) পক্ষান্তরে ( পুরীষাত্) পূর্ণকারণে ( শয়েনস্য পক্ষা) অতি তীব্র গতিযুক্ত পঙ্গ সমান ( হরিণস্য বাহু) শুভ্র হিরণের ন্যায় শ্বেত জ্যোতি[ যাহাকে কসমিক রে বলা হয়] এমন বাহু[ যাহাকে পরমাত্মার দুই পক্ষ রূপ লাগাম বলা হয়েছে] ( উপস্তুত্যম্) সমীপে প্রশংসা করিবার যোগ্য ( মহি, জাতম্) মহ তত্ব জাত হইল ( তে) তখন ( অর্বন) বিজ্ঞান রূপ পরমাত্মা।।
ভাবার্থঃ সৃষ্টির প্রথম অবস্থায় তীব্র বেগযুক্ত পংখ তথা হিরণের ন্যায় শ্বেত জ্যোতি[ যাহা পরমাত্মার তেজ বলা হয়] তাহা অন্তরিক্ষ নামক বিশাল সমুদ্রে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল।[ বিজ্ঞানের ভাষায় যাহাকে cosmic ray এর স্ফূরণ বলা হয়] তখন ঘোর শব্দ ওম্ উচ্চািরত হচ্ছিল। এই তেজ হতে মহতত্ব জাত হইল। মহতত্ব মানে বুদ্ধিতত্ব।। এই মহতত্ব হতে পরমানু সমুহের মধ্যে সত্ব তম রজ গুনের ধারা প্রবাহিত হয়ে সাম্য অবস্থা ভঙ্গ করল এবং তীব্র আকর্ষ বিকর্ষণ আরম্ভ হল। অর্থাৎ ইলেক্সট্রন, প্রোটণ, নিউটন এই তিনের কার্য পরমানুকে অতিষ্ঠ করে তুলল। এভাবে হে "অর্বন" ( জ্ঞানস্বরূপ পরমাত্মা) পূর্ব সৃষ্টিতে তিন পদার্থের কার্য দাতা আপনিই স্তুতি পাবার যোগ্য ছিলেন।।
যমেন দত্তং ত্রিত্ত এনমাষুনগিন্দ্র এণং প্রথমো অধাতিষ্ঠৎ।
গন্ধর্বো অস্য রশনামগূভ্ণাৎ সূরাদশ্বং বসবো নিরতষ্ট।। ঋগবেদ (১/১৬৩/২)
ভাবার্থঃ- পরমাত্মা কতৃক প্রদত্ত শক্তিকে ত্রিগুনাত্ম শক্তি অধিষ্ঠিত হল। প্রথম ইন্দ্র অর্থাৎ বিদ্যুৎ জ্যোতি এই শক্তিকে অধিষ্ঠিত করেছিল। অর্থাৎ পরমাত্মা সেই ত্রিগুনাত্মক প্রকৃতিতে অধিষ্ঠিত হয়ে গেল। সাম্যঅবস্থায় পরমাণু সেই পরমাত্মার সামান্য লাগামরূপ জ্যোতিকে গ্রহন করেছিল অর্থাৎ cosmic ray এর একটা অংশ মূল প্রকৃতির উপর ঝাটকে পড়ে এবং তাহা পরমাত্মার লাগাম স্বরূপ সৃষ্টিকার্য আরম্ভ করে দেয়।।
এই কথার অভিপ্রায় এই যে, পরমাত্মার তেজ পরামাণুর উপর অধিষ্ঠিত হয়ে গেল এবং তাহাকে লাগাম মানিয়া পরমাণু তাহা গ্রহন করিল। যে ভাবে ঘোড়ার মুখে লাগাম পড়ানো হয় এবং এই লাগামই ঘোড়াকে মার্গ দর্শন করায় ঠিক তদ্রুপ পরামাণুদের ক্ষেত্রে ও তেমন ঘটল। সেই পরমানুতে সত্ব, রজ, তম গুণ নিজেদের বদলাতে লাগিল। এই সত্ব নাম ইলেক্সট্রন, রজ নাম প্রোটণ, এবং তম নাম নিউটন পরমাণুর অভ্যান্তরীন শক্তি থেকে বহির্মূখ হয়ে সৃষ্টি কার্য আরম্ভ করল।।
অসি যমো অস্যাদিত্যো অর্বন্নসি ত্রিতো গূহ্যেন ব্রতেন। অসি সোমেন সময়া বিপূক্ত আহূস্তে ত্রীণি দিবি বন্ধনানি। ঋগবেদ (১/১৬৩/৩)
ভাবার্থঃ- হে নিয়ন্ত্রনকারী পরমাত্মা! তুমি অাদিত্য অর্থাৎ চমকদার প্রকাশমান্, তুমি " অর্বন" অর্থাৎ তেজ ভাগনেবালা ভীতর থেকে গুপ্তরূপে গঠিত ছিলে যাহা প্রথমে সাম্য অবস্থায় ছিলে, তখন পরমাণু সমীপ সমীপ ছিল কিন্তু পৃথক ছিলেন। কিন্তু অর্বন নামক পরমাত্মার তেজ দ্বারা তাহার সাম্য অাবস্থা ভঙ্গ হল তাহা দ্বারা তিন দিব্য গুণ, ইলেক্সট্রন, প্রোটন, নিউটন, অর্থাৎ সত্ব, রজ, তম গুণ মুক্ত হয়ে গেল। এবং পরমাণুর কার্য হতে অহংকারাদি সৃষ্টি হল।।
পুমাং এনং তনুতউৎ কৃণত্তি পুমান্ বি তত্নে অধি নাকে অস্মিন্।
ইমে ময়ুখা উপ সেদুরুঃ সদঃ সামানি চক্রুস্তসরাণ্যেতবে।। ঋগ্বেদ ১০/১৩০/২
ভাবার্থ- এখানে বলা হয়েছে যে, শক্তি( Energy) তরঙ্গরপে প্রকট হয় এবং প্রকৃতিতে নির্মাণ কার্য শুরু হয়ে যায়। তরঙ্গ তির্যক গতিতে চলে। সেই সব তরঙ্গ প্রকৃতির সাম্যাবস্হায় পরমাণু সহ সঙ্ঘৃষ্ট হয় এবং তার সাম্যাবস্হা ভঙ্গ করে দেয়।।
য়ুঞ্জন্তিং ব্রধ্নমরুষং চরন্তং পরিতস্হূষঃ।
রোচন্তে রোচন্তে দিবি।।
ঋগ্বেদ- মন্ডল-১/সুক্ত-৬/মন্ত্র-১।।
ভাবার্থঃ-চতুর্দিকে ব্যাপক, স্থির(পরমাণু) যখন ব্যাপক শক্তি( প্রাণ) সহযুক্ত হয়। প্রকাশমান অন্তরিক্ষে প্রকাশিত হতে হতে থাকে। অভিপ্রায় এই যে, সর্বত্র বিদ্যমান সাম্যবস্থায় পরমাণু যখন পরমাত্মার শক্তি (প্রাণ) সহ সংযুক্ত হয়ে যায় তখন তারা জাগ্রত হয়ে যায়। এই জাগ্রতাবস্থা ইন্দ্রের শক্তির বাহিরে উঁকি মারার ফলে উৎপন্ন হয়।
সপ্ত য়ুঞ্জন্তি রথমেক চক্রমেকো অশ্বো বসতি সপ্তনামা।
ত্রিপাভি চক্রমজরমনর্বং য়ত্রেমা বিশ্বা ভুবনাধি তস্হূঃ।। ঋগ্বেদ- ১/১৬৪/২
ভাবার্থঃ- কার্য জগতের পালক এক অতি তেজোময় ব্যক্তিত্ব তার সাত পুত্রকে আমরা দেখি। এখানে পুত্রের অভিপ্রায় প্রাণ। সেই সাত প্রাণ এক চক্রের সহিত সংযুক্ত। সে চক্র ভগ্ন বা শিথিল হয় না। চক্র অশ্ব দ্বারা চালিত। চক্রের তিন নাভি অর্থাৎ আশ্রয় স্হল। অশ্ব বলতে পরমাত্মা, তিন আশ্রয় প্রকৃতি, আত্মা, পরমাত্মা বুঝায়। জগতে এক অশ্বই সমস্ত ভুবন পরিচালনা করছে। সাতচল্লিশ প্রাণ তাঁর সাতটি সামর্থ। এই সামর্থগুলিকে বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রকারে বলা যেতে পারে-(এক) পরমাণু মধ্যে ইলেক্ট্রোনের ঘুর্ণন শক্তি (Inter atomic energy), (দুই) রাসায়নিক শক্তি (Chemical energy), (তিন) অনুদের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখার শক্তি(lnter molecular dynamics), অথবা সংগঠন শক্তি, এর দ্বারা শক্ত,তরল ও বায়ব্য ( Solids Liquids, Gasses) অবস্থা উৎপন্ন হয়। ( চার) ভূ-আকর্ষণ (Gravity), (পাঁচ) চুম্বকীয় শক্তি (Magnetism) ( ছয়) আকাশ ও শব্দ( Light and sound) (সাত) বায়ু।
ত্রীণি ত আহুর্দিবি বন্ধনানি তীন্যপ্সু ত্রীন্যন্ত সমদ্রে।
উতেব মেরুণশ্ছনৎ স্যর্বন্যত্রা ত আহুঃ পরমং জনিত্রম্।।
ঋগ্বেদ- ১/১৬৩/৪
ভাবার্থঃ- দ্যুলোকে এই তিন প্রকার বন্ধনই আপঃ হয়ে যায়। হে অর্নব! আমার ছন্দ বরুন বলে। এই তিনটি পদার্থ মিলিত হয়ে সম্পূর্ণ জগৎ নির্মান করে।
বর্তমান বিজ্ঞানে তিনটি অ্যাটমিক্ পাটিকেলস্ জগতের সৃষ্টি করে। এই তিন বন্ধনকেই অ্যাটমিক্ পাটিকেলস্ বলা হয়। বেদে এই তিন বন্ধনের নাম মিত্র, বরুন ও অর্যমা। মিত্র ঋণ(-) বিদ্যুতের আবেশ, একে 'ইলেক্ট্রন' বলা হয়। বরুণ ধন(+) বিদ্যুতের আবেশ, একে 'প্রোটন' বলা হয়। আবেশরহিত অর্যমা কে বর্তমান বিজ্ঞানে নিউট্রন বলা হয়।
তিস্রো মাতৃস্ত্রীন্ পিতৃন্ বিভ্রদেক ঊর্ধ্বস্তস্হৌ নেমব গ্লাপয়ন্তি।
মন্ত্রয়ন্তে দিয়ো অমুষ্য পৃষ্ঠে বিশ্ববিদং বাচমবিশ্বমিন্বাম্।। ঋগ্বেদ-১/১৬৪/১০।
ভাবার্থ :- মাতা পৃথিবী, পিতা সূর্য। প্রাণীর শরীরে তিন অংশ মাতার (পৃথিবী) থেকে আসে এবং তিন অংশ পিতা(সূর্য) থেকে আসে। মাতার দিক থেকে আসে মাটি, জল, বায়ু( তিনই পঞ্চভৌতিক) এবং সূর্যের দিক থেকে আসে অগ্নি ও আকাশ( এই দুটিও পঞ্চভৌতিক) পিতা অর্থাত্ সূর্য থেকে তৃতীয় যে অংশটি আসে সেটা হলো প্রাণ। অগ্নিও প্রাণে পার্থক্য আছে। অগ্নি যা পিতার অংশ থেকে আসে প্রাণীর শরীর নির্মাণ হেতু উপলব্ধ, তা রাসায়নিক শক্তি এবং অন্তকরণ ও দশ ইন্দ্রিয় কার্য শক্তি। প্রাণ চেতনার প্রতীক। এই ভাবে প্রাণীর শরীর ছয়টি অংশ মাতার(পৃথিবী) দিক থেকে তিনটি এবং পিতার(সূর্যের) দিক থেকে তিনটি আসে তখন এর মধ্যে নিবাস করার জন্য জীবাত্মার আগমন হয়।
অহস্তা যদপদী বর্ধত ক্ষাঃ শচীভির্বেদ্যানাম্। শূষ্ণং পরি প্রদাক্ষিণিদদ্বিশ্বায়বে নি শিশ্নথঃ।।
ঋগ্বেদ- মন্ডল-১০/সুক্ত-২৩/মন্ত্র-১৪
ভাবার্থ :- পৃথিবী যদিও হস্তপদহীন তথাপি ইহা চলিতেছে, অবশ্য জ্ঞাতব্য পরমাণুর শক্তির দ্বারা সূর্যের চারিদিকে ইহা প্রদক্ষিণ করিতেছে। হে পরমাত্মন! সমগ্র মানবের মধ্যে আস্তিক্য বোধ জানাইবার জন্যেই তুমি এরূপ রচনা করিয়াছ।