10/07/2026
বিষয়ঃ সৃষ্টির আদিতে ঘোর শব্দ ওম্ উচ্চািরত হয়ে, অব্যক্ত থেকে ব্যক্ত'—এই অসীম মহাবিশ্বের মহতত্বের বিস্তার এক পরম বিস্ময়।
জাগতিক প্রলয়ের পর প্রকৃতি যখন সুষুপ্তিতে (গভীর ঘুম বা লয়) থাকে, তখন দৃশ্যমান বা ব্যক্ত জগতের সবকিছু বিলীন হয়ে যায়। এ সময় কোনো নাম, রূপ বা বৈচিত্র্য থাকে না। দৃশ্যমান না থাকলেও মূলত নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বা অবস্থাগুলো বিদ্যমান থাকে:-
১). মূলতত্ত্ব বা প্রকৃতি বা মায়াঃ জাগতিক রূপ ধ্বংস হলেও প্রকৃতির মূল উপাদান বা অব্যক্ত অবস্থা (যা থেকে সবকিছু সৃষ্টি হয়) টিকে থাকে। একে 'অব্যক্ত' বলা হয় এবং এটি কারণে লীন থাকে।
ঋগবেদ এর নাসাদিয়া সুক্তে সেই অব্যক্ত বলা হয়েছে-
নাসাদীয় সুক্ত
ন মৃত্যুরাসীদমৃতং ন তর্হি ন রাত্র্যা অহ্ন আসীৎ প্রকেতঃ। আনীদবাতং স্বধয়া তদেকং তস্মাদ্ধন্যন্নঃ পরঃ কিং চনাস।। ঋগ্বেদ১০/১২৯/২
ভাবার্থ- অর্থাৎ সৃষ্টির রচনার পূর্বে কোন জীবন,মৃত্যু, দিন, রাত্রি, চন্দ্র, সূর্য এমন কি সৃষ্টি, বিসৃষ্টিও কিছু জানার যোগ্য ছিল না শুধূ অবিচল স্থিতি ছিল। সেই সময় শক্তি (Energy) অবশ্যই ছিল। শক্তি দুই প্রকার সুপ্ত শক্তি(Protentiol Energy) ও গতিসঞ্জাত শক্তি(Kinetic energy) এ শক্তি গুলি তখন ক্রিয়াশীল ছিল না।
এই সুক্তই ঈশ্বর অব্যক্ত তার প্রমানঃ
ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ১২৯তম সূক্ত বা নাসাদীয় সূক্ত-এর মূল দার্শনিক ভাবনার একটি চমৎকার ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন ব্যাখ্যা। এই সূক্তটিকে বৈদিক দর্শনের অন্যতম আদিম ও সর্বোচ্চ সৃষ্টিতত্ত্ব বিষয়ক রচনা বলে মনে করা হয়।
উদ্ধৃত সুক্তের বিস্তারিত দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলোঃ
ক). সৃষ্টির পূর্বে কোনকিছুর অস্তিত্বহীনতাঃ সূক্তের শুরুতেই বলা হয়েছে, সৃষ্টির পূর্বে (অব্যক্ত অবস্থায়) না ছিল 'সৎ' (অস্তিত্ব) না ছিল 'অসৎ' (অনস্তিত্ব)। অর্থাৎ, আজকের পরিচিত মহাবিশ্বের কোনো বস্তু, গ্রহ, নক্ষত্র, চন্দ্র বা সূর্য কিছুই ছিল না। জীবন ও মৃত্যু, এমনকি দিন ও রাত্রির ধারণাও তখন সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল। সবমিলিয়ে মহাবিশ্বের পুরো স্থান ও কাল তখনও পরম অব্যক্ত শূন্যতায় লীন ছিল।
খ). অবিচল স্থিতি ও সুপ্ত শক্তিঃ সেই প্রারম্ভিক সময়ে কোনো রূপ বা ক্রিয়াশীলতা ছিল না, কেবল ছিল এক "অবিচল স্থিতি"। বৈদিক দর্শনে একে 'তৎ একম্' বা অখণ্ড পরম সত্তা বলা হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে যাকে সুপ্ত শক্তি এর সাথে তুলনা করা যায়। অর্থাৎ, মহাবিশ্ব সৃষ্টির সমস্ত উপাদান ও শক্তি তখন সুপ্ত বা অবিকশিত অবস্থায় মহাশূন্যে স্থিতিশীল ছিল।
গ). গতিসঞ্জাত শক্তি ও সৃষ্টির সূচনাঃ সেই সময়ে সুপ্ত শক্তি থাকলেও কোনো গতি বা ক্রিয়াশীলতা ছিল না। এরপর সেই অব্যক্ত অসীম সত্তা বা পরমাত্মায় এক গভীর একাগ্রতা বা ইচ্ছাশক্তি জাগ্রত হয়। বেদে এই ইচ্ছাশক্তি বা মহাজাগতিক তাপকে বলা হয়েছে 'তপস্'। এই মহাজাগতিক তাপ বা উত্তাপের ফলেই সুপ্ত শক্তি ক্রিয়াশীল গতিশক্তিতে রূপান্তরিত হয় এবং সৃষ্টির চাকা ঘুরতে শুরু করে।
ঘ). অব্যক্ত ঈশ্বরতত্ত্বঃ নাসাদীয় সূক্তে ঈশ্বরকে কোনো সাকার বা নির্দিষ্ট চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি, বরং তাঁকে 'অব্যক্ত' বা এক পরম অদ্বিতীয় শক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বেদের ঋষিরা ধ্যানের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, সৃষ্টির আদিতে কেবল এক অদ্বিতীয় শক্তিই স্বমহিমায় বিরাজমান ছিল, যাকে জাগতিক শব্দে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা অসম্ভব কারণ সব কিছুই অব্যক্ত ছিল।
২). গুণত্রয়ের সাম্যাবস্থাঃ প্রকৃতির তিনটি গুণ—সত্ত্ব, রজস ও তমঃ—কোনোটিই অন্যটির ওপর প্রাধান্য বিস্তার না করে সম্পূর্ণ সাম্যাবস্থায় বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় অবস্থান করে।
এর প্রমান ঋগ্বেদের নিম্নের সুক্তে প্রমাণ করে--
অসি যমো অস্যাদিত্যো অর্বন্নসি ত্রিতো গূহ্যেন ব্রতেন। অসি সোমেন সময়া বিপূক্ত আহূস্তে ত্রীণি দিবি বন্ধনানি। ঋগবেদ (১/১৬৩/৩)
ভাবার্থঃ- হে নিয়ন্ত্রনকারী পরমাত্মা! তুমি আদিত্য অর্থাৎ চমকদার প্রকাশমান্, তুমি " অর্বন" অর্থাৎ তেজের তীব্র প্রভাব ভীতর থেকে গুপ্তরূপে গঠিত ছিলে যাহা প্রথমে সাম্য অবস্থায় ছিলে, তখন পরমাণু সমীপ সমীপ ছিল কিন্তু পৃথক ছিলেন। কিন্তু অর্বন নামক পরমাত্মার তেজ দ্বারা তাহার সাম্য আবস্থা ভঙ্গ হল তাহা দ্বারা তিন দিব্য গুণ, ইলেক্সট্রন, প্রোটন, নিউটন, অর্থাৎ সত্ব, রজ, তম গুণ মুক্ত হয়ে গেল। এবং পরমাণুর কার্য হতে অহংকারাদি সৃষ্টি হল।।
উদ্ধৃত সুক্তের বিস্তারিত আধ্যাত্মিক, বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক ব্যাখ্যার সারসংক্ষেপ। এতে ঈশ্বরের ত্রিগুণাত্মক মহাশক্তি ভঙ্গ ও পরমাণুর বিকাশের মাধ্যমে বিশ্ব সৃষ্টির চমৎকার রূপক তুলে ধরা হয়েছেঃ-
ক). গুণের সাম্যাবস্থা বা অব্যক্ত অবস্থাঃ সৃষ্টির পূর্বে মহাবিশ্ব এক পরম শান্ত ও সাম্য অবস্থায় ছিল। বৈদিক ও সাংখ্য দর্শন অনুযায়ী, এই অবস্থায় প্রকৃতির তিনটি গুণ (সত্ত্ব, রজ ও তম) পুরোপুরি ভারসাম্যপূর্ণ ও সুপ্ত ছিল। অণু বা পরমাণুগুলি কাছাকাছি থাকলেও পৃথক এবং নিশ্চল ছিল—যেহেতু তখন কোনো কার্য বা রূপ প্রকাশিত হয়নি।
খ). আদি শক্তির প্রকাশ তথা আদিত্য ও অর্বনঃ এই সুপ্ত অবস্থার কেন্দ্রে ছিলেন পরমাত্মা, যিনি আদিত্য (স্বয়ংপ্রকাশমান) এবং অর্বন (যার মধ্যে অনন্ত তেজ গুপ্তরূপে বিদ্যমান ছিল)। অর্বন বলতে সেই আদিম মহাজাগতিক স্পন্দন, তাপ বা শক্তিকে বোঝানো হয়েছে যা সৃষ্টির সূচনা করে।
গ). সাম্যাবস্থা ভঙ্গ ও মূল কণিকার উৎপত্তিঃ পরমাত্মার সেই অসীম তেজের প্রভাবে গুণের সাম্যাবস্থা বা ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। এই বিচ্ছেদের ফলে তিনটি দিব্য গুণ বা কণার উদ্ভব ঘটেঃ-
¤ তমঃ গুণ হলো নিষ্ক্রিয়তা, যা পরমাণুর কেন্দ্রে অবস্থিত ভর বা নিউট্রন (Neutron)-এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
¤ রজঃ গুণ হলো গতি ও আধান, যা প্রোটন (Proton)-এর ধনাত্মক শক্তির প্রকাশক।
¤ সত্ত্ব গুণ হলো প্রকাশ ও ভারসাম্য, যা বিদ্যুৎধর্মী ও গতিশীল ইলেকট্রন (Electron)-এর প্রতীক।
ঘ). অহংকার ও স্থূল সৃষ্টির উৎপত্তিএই তিনটি মূল কণার মিথস্ক্রিয়া বা কার্যকারিতার ফলেই মহাবিশ্ব সৃষ্টির পরবর্তী ধাপ 'অহংকার'
(individualized cosmic ego) এবং অন্যান্য সূক্ষ্ম ও স্থূল উপাদানের সৃষ্টি হয়।
৩). পরমাত্মা বা কারণ-পুরুষঃ প্রলয়ের সময় এই দৃশ্যমান প্রকৃতি স্বয়ং সম্পূর্ণ পরমাণুতে বিলীন হলেও এর স্রষ্টা বা পরমাত্মা কারণে থাকেন। ঋগবেদের নিম্নের উল্লেখিত সুক্তে এর প্রমাণঃ-
যদক্রন্দঃ প্রথমং জায়মান উদ্যন্ৎসমুদ্রাদুত বা পুরীষাত্। শয়েনস্য পক্ষা হরিণস্য বাহু উপস্তুত্যং মহি জাতং তে অর্বন্।।
(ঋগ্বেদ- ১/১৬৩/১)।।
ভাবার্থঃ সৃষ্টির প্রথম অবস্থায় তীব্র বেগযুক্ত পংখ তথা হিরণের ন্যায় শ্বেত জ্যোতি[ যাহা পরমাত্মার তেজ বলা হয়] তাহা অন্তরিক্ষ নামক বিশাল সমুদ্রে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল।[ বিজ্ঞানের ভাষায় যাহাকে cosmic ray এর স্ফূরণ বলা হয়] তখন ঘোর শব্দ ওম্ উচ্চািরত হচ্ছিল। এই তেজ হতে মহতত্ব জাত হইল। মহতত্ব মানে বুদ্ধিতত্ব।। এই মহতত্ব হতে পরমানু সমুহের মধ্যে সত্ব তম রজ গুনের ধারা প্রবাহিত হয়ে সাম্য অবস্থা ভঙ্গ করল এবং তীব্র আকর্ষ বিকর্ষণ আরম্ভ হল। অর্থাৎ ইলেক্সট্রন, প্রোটণ, নিউটন এই তিনের কার্য পরমানুকে অতিষ্ঠ করে তুলল। এভাবে হে" অর্বন" (জ্ঞানস্বরূপ পরমাত্মা) পূর্ব সৃষ্টিতে তিন পদার্থের কার্য দাতা আপনিই স্তুতি পাইবার যোগ্য ছিলেন।।
ঈশ্বরই যে সৃষ্টির মূল নিয়ত কারণ, তা নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলোঃ
ক). মহাজাগতিক আলোর উৎসঃ সৃষ্টির আদিতে পরমাত্মার তেজ বা শ্বেত জ্যোতি (যা বিজ্ঞানে Cosmic Ray বা মহাজাগতিক রশ্মির স্ফূরণ) মহাকাশে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং 'ওম্' ধ্বনি সৃষ্টি হয়েছিল।
খ). মহতত্ব বা বুদ্ধিতত্বঃ সেই ঐশ্বরিক তেজ থেকেই মহতত্ব বা বুদ্ধিতত্বের জন্ম হয়।
গ). প্রকৃতির ভারসাম্যহীনতা ও সৃষ্টিঃ এই মহতত্ব ত্রিগুণাত্মক (সত্ত্ব, তমঃ ও রজঃ) প্রকৃতির সাম্য অবস্থা ভঙ্গ করে পরমাণুসমূহের মধ্যে তীব্র আকর্ষণ ও বিকর্ষণ (ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রনের ক্রিয়া) শুরু করে, যা দৃশ্যমান জগতের ভিত্তি।
ঘ). নিয়ন্ত্রণ ও স্তুতিঃ জ্ঞানস্বরূপ পরমাত্মা (অর্বন) এই ত্রিগুণাত্মক শক্তিতে অধিষ্ঠিত থেকে সম্পূর্ণ সৃষ্টি প্রক্রিয়া ও কার্য পরিচালনা করেন।সুতরাং, বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক সমন্বয়ে ঈশ্বরই একমাত্র মহাশক্তি, যাঁর প্রেরণায় প্রকৃতির সমস্ত কার্য পরিচালিত হয় এবং তিনি সকল স্তুতির যোগ্য, কারণ তিনিই এই অসীম মহাবিশ্বের নিয়ত কারণ।
৪). কর্ম ও সৃষ্টির বীজঃ পরবর্তী সৃষ্টির জন্য সমস্ত জীবের কর্মফল এবং সম্ভাব্য সৃষ্টিজগৎ বীজ আকারে এই সুপ্ত প্রকৃতির উপাদান পরমাণুর মাঝেই নিহিত থাকে, এর থেকেই এই অসীম মহাবিশ্বের সমস্ত সৃষ্টি।
এর প্রমান ঋগ্বেদের নিম্নের সুক্তে প্রমাণ করে--
যমেন দত্তং ত্রিত্ত এনমাষুনগিন্দ্র এণং প্রথমো অধাতিষ্ঠৎ।
গন্ধর্বো অস্য রশনামগূভ্ণাৎ সূরাদশ্বং বসবো নিরতষ্ট।। ঋগবেদ (১/১৬৩/২)
ভাবার্থঃ- পরমাত্মা কর্তৃক প্রদত্ত শক্তিকে ত্রিগুনাত্ম শক্তি অধিষ্ঠিত হল। প্রথম ইন্দ্র অর্থাৎ বিদ্যুৎ জ্যোতি এই শক্তিকে অধিষ্ঠিত করেছিল। অর্থাৎ পরমাত্মা সেই ত্রিগুনাত্মক প্রকৃতিতে অধিষ্ঠিত হয়ে গেল। সাম্যঅবস্থায় পরমাণু সেই পরমাত্মার সামান্য লাগামরূপ জ্যোতিকে গ্রহন করেছিল অর্থাৎ cosmic ray এর একটা অংশ মূল প্রকৃতির উপর ঝাটকে পড়ে এবং তাহা পরমাত্মার লাগাম স্বরূপ সৃষ্টিকার্য আরম্ভ করে দেয়।।
এই কথার অভিপ্রায় এই যে, পরমাত্মার তেজ পরামাণুর উপর অধিষ্ঠিত হয়ে গেল এবং তাহাকে লাগাম মানিয়া পরমাণু তাহা গ্রহন করিল। যে ভাবে ঘোড়ার মুখে লাগাম পড়ানো হয় এবং এই লাগামই ঘোড়াকে মার্গ দর্শন করায় ঠিক তদ্রুপ পরামাণুদের ক্ষেত্রে ও তেমন ঘটল। সেই পরমানুতে সত্ব, রজ, তম গুণ নিজেদের বদলাতে লাগিল। এই সত্ব নাম ইলেক্সট্রন, রজ নাম প্রোটণ, এবং তম নাম নিউটন পরমাণুর অভ্যান্তরীন শক্তি থেকে বহির্মূখ হয়ে সৃষ্টি কার্য আরম্ভ করল।।
উদ্ধৃত সুক্তের বিস্তারিত সৃষ্টির কর্মবীজ ও উপাদানের সংক্ষিপ্তসার নিচে দেওয়া হলোঃ-
ক). সৃষ্টির কর্মবীজ তথা মূল প্রকৃতিঃ বিশ্ব সৃষ্টির আদি কারণ হলো ত্রিগুণাত্মক (সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ) মূল প্রকৃতি। সৃষ্টির পূর্বে এই তিনটি গুণ সাম্যাবস্থায় থাকে। একে 'অব্যক্ত' বলা হয়।
খ). উপাদান কারণঃ সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ-এর সাম্যাবস্থাই হলো প্রকৃতির মূল রূপ, যা থেকে স্থূল ও সূক্ষ্ম জগৎ, অর্থাৎ পঞ্চ মহাভূত (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম) ও ইন্দ্রিয়সমূহ উৎপন্ন হয়।
গ). সৃষ্টির সূচনা তথা কারণ ও প্রভাবঃ পরমাত্মার উপস্থিতি বা মহাজাগতিক স্পন্দনে (কসমিক রে) প্রকৃতির এই সাম্যাবস্থা বিঘ্নিত হয়। এর ফলে তিনটি গুণের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং পরমাত্মার পরিচালনায় সৃষ্টিকার্যের বিকাশ শুরু হয়।
সাংখ্য, বৈশেষিক বেদান্ত দর্শনের এই সৃষ্টিতত্ত্ব অনুযায়ী, প্রকৃতি জড় উপাদান হলেও পরমাত্মার বা পুরুষের চেতনাসত্তা ছাড়া এর বিবর্তন বা বিকাশ অসম্ভব। এটি শূন্য থেকে সৃষ্টি নয়, বরং অব্যক্ত বীজ থেকে ব্যক্তরূপে সৃষ্টির প্রকাশ।
উপরোক্ত আলোচনায় প্রমাণিত হয় যে
সৃষ্টি অনাদিকাল থেকেই বহমান, এইসৃষ্টির সন্ধিকাল হলো অব্যক্ত কাল।
ঋগ্বেদের মন্ত্র দিয়ে ব্যক্ত অব্যক্ত ধারণার আজকের আর্টিকেলটি ইতি টানতেছি--
তম অসিৎ তমস… তপসস্তন্মহিনাজায়াতৈকম”
(ঋগবেদ ১০/১২৯/৩)
“সমস্ত ছিল কেবল অন্ধকার। সমস্ত কিছু ছিল জানার অতীত ধোঁয়াশাময়। সেই রহস্য অস্তিত্ব তার চেয়েও রহস্যময়তায় ছিল আবৃত আর তা স্বতস্ফুর্তভাবে প্রচন্ড তাপ ও ক্ষমতা নিয়ে বিদ্যমান হল।”
ভেবে দেখুন, বেদের হিরণ্যগর্ভ হতে বিস্ফোরণের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিলিয়ন বিলিয়ন উত্তপ্ত গ্যাসীয় তরল বিন্দুকণা তথা মেঘপুঞ্জের মাত্র একটির অংশ থেকে তৈরী হয়েছে আমাদের এই সম্পূর্ণ সৌরজগত।
ব্রহ্মণস্পতিরেতা সং কর্মার ইবাধমৎ।
দেবানাং পূর্ব্যে যুগেঽসতঃ সদজায়ত।
ঋগবেদ-১০/৭২/২
“তারপর সেখানে বিস্ফোরন হল ,ব্রহ্ম বিন্দু থেকে যেন সবকিছুকে গতিময় প্রসারিত করলেন ,অব্যক্ত হতে সব হতে লাগল ব্যক্ত।”
এই সুক্তই প্রমান করে অব্যক্ত আর ব্যক্ত এর রূপক অর্থ কি?
এই মন্ত্রে সৃষ্টি সৃষ্টির শুরুর দিককার একটি চমৎকার রূপক ব্যবহার করা হয়েছে।
অর্থাৎ কর্মকার বা কামার যেমন হাপর টেনে আগুন জ্বালিয়ে লোহা বা ধাতু গলিয়ে নতুন আকার দেয়, তেমনি 'ব্রহ্মণস্পতি' (সৃষ্টিকর্তা) এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নিজ শক্তিতে নিপুণভাবে সৃষ্টি করেছেন। এই মন্ত্রের মাধ্যমে মহাশূন্যের আদিম অবস্থা থেকে বিশ্বের এবং অসীম মহাবিশ্বের সৃষ্টির দার্শনিক তত্ত্ব তুলে ধরা হয়েছে।এই মন্ত্রের মূল ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলোঃ-
ক) সৃষ্টির কারিগর হিসেবে ব্রহ্মণস্পতিঃ এখানে ব্রহ্মণস্পতি বলতে বিশ্বজগতের আদি স্রষ্টা বা পরমেশ্বরকে বোঝানো হয়েছে,।
সৃষ্টির আদি যুগে যখন দৃশ্যমান মহাবিশ্বের কোনো অস্তিত্ব ছিল না, তখন ঈশ্বর বা ব্রহ্মণস্পতি তাঁর অসীম শক্তিবলে এই বিশ্বজগৎকে গঠন করেন। তিনিই এই অসীম মহাবিশ্বের অধীশ্বর।
খ) কামারের রূপকঃ এখানে সৃষ্টিকর্তাকে একজন দক্ষ কর্মকার বা কামারের সাথে তুলনা করা হয়েছে। কামার যেমন লোহা পিটিয়ে বা হাপর চালিয়ে আগুন জ্বালিয়ে কঠিন ধাতুকে গলিয়ে নতুন আকার দান করে, ঠিক তেমনই ব্রহ্মণস্পতি নিখিল বিশ্বের অব্যক্ত ও অণু-পরমাণুর উপাদান গুলোকে একত্রিত ও প্রজ্জ্বলিত করে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন।
গ) অসৎ থেকে সৎঃ- বৈদিক সৃষ্টিতত্ত্বের এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লাইন। এর অর্থ হলো—সৃষ্টির আদিতে কোনো আকার বা নাম ছিল না, শূন্য বা অস্তিত্বহীন অবস্থা ছিল, সেই অস্তিত্বহীন বা অব্যক্ত অবস্থা থেকেই দৃশ্যমান ও ব্যক্ত জগতের সৃষ্টি হয়েছে।
উপরের বিস্তারিত আধ্যাত্মিক, বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক উদ্ধৃতির মাধ্যমে ব্যক্ত আর অব্যক্তের ধারনা উপস্থাপন এখানে শেষ করলাম, জানি না পাঠকের মনে সনাতন ধর্মের বাস্তব ধারনা কতটুকু আনতে পারছি।
জয় সনাতন ধর্মের জয়
জয় বেদ মাতা।
সুবীর কান্তি সাহা, বেদান্ত তীর্থ।