19/02/2026
উপদেষ্টা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ
শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে বহু মতভেদ আছে। কেউ তাঁকে স্বয়ং পরমব্রহ্ম বলেন, কেউ পরমব্রহ্মের অবতার আবার কেউ তাঁকে কেবল এক মহান যোগীপুরুষ বা ঐতিহাসিক নেতা মনে করেন। এমনকি শ্রীকৃষ্ণ নামে আদৌ কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তি ছিলেন কি না, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। উপনিষদ ও বেদে 'কৃষ্ণ' নামে ব্যক্তির উল্লেখ পাওয়া যায়, যেমন ছান্দোগ্য উপনিষদে দেবকীপুত্র কৃষ্ণের কথা বলা হয়েছে এবং ঋগ্বেদে কৃষ্ণ নামের এক ঋষির উল্লেখ আছে। কিন্তু মহাভারতের কৃষ্ণ ও এসব প্রাচীন উল্লেখ একই ব্যক্তি কি না, তা নিয়ে মতভেদ আছে। একদল মনে করেন, মহাভারতের দেবকীনন্দন কৃষ্ণই সেই প্রাচীন ঋষি ও উপনিষদের কৃষ্ণ। অন্যদল বলেন, বেদ অনেক প্রাচীন, তাই মহাভারতের কৃষ্ণ বেদের মন্ত্রদ্রষ্টা হতে পারেন না। ঐতিহাসিক সূত্রেও কৃষ্ণ বা বাসুদেব উপাসনার প্রমাণ পাওয়া যায়। গ্রিক দূত Megasthenes (মেগাস্থিনিস) সৌরসেনীদের দেশে হেরাক্লিস পূজার কথা বলেছেন, যা অনেক গবেষকের মতে কৃষ্ণ পূজাই ছিল। আধুনিক গবেষক Edwin Francis Bryant (এডউইন ফ্রান্সিস ব্রায়ান্ট) তাঁর গ্রন্থ Krishna: A Sourcebook এ এই মত সমর্থন করেছেন। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, কৃষ্ণ ঐতিহাসিক (ইতিহাসে প্রমাণ পাওয়া যায় এমন ব্যক্তি বা ঘটনা) ব্যক্তি হিসেবেও পূজিত ছিলেন। মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণকে একদিকে ঐতিহাসিক নায়ক, অন্যদিকে ঈশ্বররূপে দেখানো হয়েছে। ভগবদ্গীতাতে তিনি যে জ্ঞান দেন, তা বৈদিক সনাতন ধর্মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে ভক্তরা মনে করেন। এজন্যই সেখানে 'শ্রীভগবান উবাচ' বলা হয়েছে। কিন্তু মহাভারতের আশ্বমেধিক পর্বে দেখা যায়, যুদ্ধের পর অর্জুন সেই জ্ঞান ভুলে গেলে কৃষ্ণ বলেন যে, তখন তিনি বিশেষ যোগস্থিত অবস্থায় সেই তত্ত্ব বলেছিলেন এবং এখন তা পুনরায় বলা সম্ভব নয়। এতে বোঝানো হয়েছে যে, তিনি গভীর যোগসমাধির মাধ্যমে পরমতত্ত্ব (চূড়ান্ত সত্য) উপলব্ধ করে কথা বলেছিলেন। যোগের মাধ্যমে মন পুরোপুরি স্থির হলে সমাধি হয়। সেই সময় আত্মা ও পরমাত্মা এক হয়ে যায়। কৃষ্ণ কখনও মানবসত্তা হিসেবে, কখনও পরমাত্মাস্বরূপে অবস্থান করে 'আমি' বলে উপদেশ দিয়েছেন। তাই গীতায় তাঁর 'আমি' কথাটি কখনও ব্যক্তিগত কৃষ্ণ, কখনও সর্বব্যাপী পরমাত্মাকে নির্দেশ করতে পারে। বেদ ও উপনিষদের বহু ঋষিও তাঁদের উপলব্ধিতে "আমিই সর্বত্র", "আমিই সৃষ্টির উৎস"- এমন কথা বলেছেন। এতে একাধিক সৃষ্টিকর্তা বোঝানো হয় না বরং গভীর আধ্যাত্মিক (জীবনের গভীর সত্য সম্পর্কিত) অভিজ্ঞতায় আত্মা ও পরমাত্মার ঐক্যবোধ প্রকাশ পায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে কৃষ্ণকে ঐতিহাসিক ব্যক্তি ও পরমেশ্বররূপ- উভয়ভাবেই ব্যাখ্যা করা হয়।
যখন একজন মহান যোগী গভীর ধ্যান করেন, তখন তার নিজস্ব সত্তা আর বিশ্বাত্মা (সবকিছুর মধ্যে থাকা ঈশ্বর বা চেতনাশক্তি) আলাদা থাকে না। তিনি সবকিছুর সঙ্গে এক হয়ে থাকেন। উপনিষদ ও বেদে এমন বহু স্থানে দেখা যায়, ঋষিরা উপলব্ধির পর "আমিই সর্বত্র", "আমিই কর্তা"- এইভাবে কথা বলেছেন। এর অর্থ এই নয় যে, তাঁরা আলাদা সৃষ্টিকর্তা হয়ে গেছেন বরং তাঁরা পরমাত্মার সঙ্গে একাত্ম অনুভব করেছিলেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে গীতায় শ্রীকৃষ্ণ যখন 'আমি' বলে কথা বলেন, তখন অনেক ব্যাখ্যাকার মনে করেন- তিনি সেই একাত্ম অভিজ্ঞতার অবস্থান থেকে বলছেন। তিনি নিজেকে জন্মরহিত, অবিনাশী ও সকল প্রাণীর ঈশ্বর বলেছেন। প্রশ্ন ওঠে, এতে কি প্রমাণ হয় যে, ঈশ্বর সত্যিই অবতার হয়ে জন্ম নেন? অন্যদিকে বেদ ও উপনিষদে ঈশ্বরকে সর্বব্যাপক, শরীররহিত ও জন্মমৃত্যুর অতীত বলা হয়েছে। যদি ঈশ্বর সত্যিই শরীর ধারণ করেন, তাহলে তাঁর সর্বব্যাপকতা ও নিরাকার স্বরূপ প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই কিছু চিন্তাবিদ বলেন, ঈশ্বর নিজের স্বরূপ নষ্ট করে অবতার নেন- এ ধারণা যুক্তিসঙ্গত নয়।
ব্রহ্মসূত্রে বলা হয়েছে, মুক্ত আত্মার ওপর কোনো কর্তৃত্ব নেই এবং সে পরমাত্মার সঙ্গে অনেক বিষয়ে সমান থাকে। তাই এমন মুক্ত ব্যক্তি নিজেকে 'ঈশ্বর' বলতে পারেন। এখানে 'ঈশ্বর' মানে সবসময় সৃষ্টিকর্তা নয় বরং 'শ্রেষ্ঠ', 'স্বাধীন' বা 'অধিপতি' বোঝাতেও ব্যবহার হয়েছে।
তবে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে জগতের উৎপত্তি স্থিতি লয়ের অধিকার একমাত্র পরমাত্মারই।
ব্রহ্মসূত্রে আরও বলা হয়েছে, মুক্ত পুরুষ শুধু নিজের ইচ্ছা পূরণ করতে পারেন এবং শারীরিক দেহ নিয়ে বা দেহবিহীন- উভয়ভাবে থাকতে পারেন। তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীন, প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণে থাকেন না। তাই যখন গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেন যে, ধর্মের অবনতি হলে তিনি জন্মগ্রহণ করেন, কেউ এটা ভগবান বা অবতার হিসেবে না দেখে, মুক্ত পুরুষের স্বাধীনভাবে জন্ম নেওয়া বা আবির্ভাব হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
গীতা পড়লে মনে হয় শ্রীকৃষ্ণের কথা কখনও কিছুটা ভিন্ন মনে হতে পারে, কিন্তু এটা বাধ্যতামূলক ভাবে অবতারবাদ মানার প্রমাণ নয়। এগুলোকে অন্যভাবে বোঝাও সম্ভব: আত্মা ও পরমাত্মার একাত্মতা, মুক্তপুরুষের স্বাধীনতা এবং 'ঈশ্বর' শব্দের ভিন্ন অর্থ বিবেচনা করলে শ্রীকৃষ্ণের কথা সহজে বোঝা যায়।
মুক্তাত্মা বা জীবন্মুক্ত (জীবিত অবস্থায় মুক্ত ব্যক্তি)
পুরুষের মোক্ষলাভের পর দেহ বা ইন্দ্রিয় আর প্রয়োজন হয় না। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, মোক্ষলাভের সময় আত্মা 'অশরীর'। মুক্তাত্মা যদি দেহ ধারণ করেন, তাও তা সাধারণ শরীর নয়। তার ঈশ্বরের অনুভূতি বা ক্ষমতা কেবল তার ইচ্ছা অনুযায়ী ঘটে।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে, শ্রীকৃষ্ণ কীভাবে জন্মগ্রহণ করলেন? উত্তর হলো, তিনি জীবন্মুক্ত ছিলেন- অর্থাৎ জীবিত অবস্থায়ই মুক্ত। তাই তিনি চাইলে নিজের স্বাধীন সংকল্পে বিশেষ উদ্দেশ্যে আবার দেহ ধারণ করতে পারেন। শ্রীকৃষ্ণ জন্ম নিয়েছিলেন ধর্ম এবং মানুষের কল্যাণের জন্য। তিনি প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণে ছিলেন না, সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিলেন। এখানে 'ঈশ্বর' শব্দ মানে সর্বশ্রেষ্ঠ বা অধিপতি। গীতায় কখনও বলা হয়েছে, "ঈশ্বরের শরণ নাও" আবার কোথাও বলা হয়েছে, "আমার শরণ নাও।" কোথাও বলা হয়েছে, "অব্যক্ত অক্ষরই পরম গতি" আবার কোথাও "কৃষ্ণপ্রাপ্তিই চূড়ান্ত।" এগুলোকে বিরোধ বলে দেখার দরকার নেই। কারণ গীতা শুধু তত্ত্ব নয়, জীবন যাপনের জন্য প্রয়োগযোগ্য শিক্ষা। শ্রীকৃষ্ণ কখনও মানবস্বরূপে, কখনও পরমাত্মাস্বরূপে কথা বলেছেন।