26/08/2024
মহাভারতে তাঁর ঐতিহাসিক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বকে বর্ণনা করতে গিয়ে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন-
যতো হি নিম্নং ভবতি নয়ন্তি হি ততো জলম্।
যতশ্চিন্দ্রং ততশ্চাপি নয়ন্তে ধীবরা জলম্ ॥
ভূমি যত নিম্নে ধাবিত হয় জলধারাও সেদিকে প্রবাহিত হয়। যেখানে ছিদ্র থাকে জল সেপথেই অনুবর্তন করে। ঠিক তেমনি আজও আমরা জগৎ নন্দিত শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করছি, অনুসরণ করছি কিনা সে প্রসঙ্গ নাহয় তোলা থাকুক।
যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের জীবনের মূলমন্ত্র কর্ম। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত স্মৃতি বিশ্বশ্রুত দর্শনশাস্ত্র শ্রীমদভগবদগীতায় তিনি বারেবারে সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আমরা যতই সফল হইনা কেন বা যতই অলাভজনক হোক না কেন, সর্বদা সঠিক কর্মটি করে যেতে হবে, ধর্মরক্ষার কাজে কদাপি কখনও বিরত থাকা যাবেনা। সেই অতি প্রাচীনকালে তৈত্তিরীয় উপনিষদ মানবজাতিকে শিক্ষা দিয়েছিল দেবপিতৃকার্যাভ্যাং ন প্রমদিতব্যম্, কখনও দেব ও পিতৃকার্য হতে কখনও বিচ্যুত হবেনা ঠিক তারই যেন প্রতিফলন দেখতে পাই শ্রীকৃষ্ণের কথায়-
কুর্য়াদ্ বিদ্বাংস্তথাসক্তয়্চিকীর্ষুর্লোকসংগ্রহম্
মানুষের কল্যাণের কথা ভেবে নিজ প্রয়োজন না থাকলেও অনাসক্তভাবে কর্ম করে যাবে।
জীবনেও তিনি সে কাজটিই করে গেছেন অবিরত। একদম অল্প বয়সে প্রতাপশালী রাজা কংসের সাথে যুদ্ধের পর তিনি নিজে রাজা হতে পারতেন। কিন্তু তাঁর ইচ্ছে অধর্মের বিনাশের, রাজ্যলাভের নয়। কংসের পিতাকে উগ্রসেনকেই তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন। সে সময়ে ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় রাজ্যের রাজা অত্যাচারী জরাসন্ধ তখন ভূভারতের প্রায় এক চতুর্থাংশ অংশের ভূপতি। নিরীহ রাজাদের প্রাণরক্ষার্থে জরাসন্ধকে বধ করে তিনি চাইলে পারতেন মগধের অধিপতি হতে। কিন্তু আবারও তিনি জরাসন্ধের পুত্র সহদেবকেই ক্ষমতা অর্পণ করে ফিরে আসলেন, কারণ ধর্মের স্থাপনা চান তিনি, ক্ষমতার নয়। এজন্যেই তখন তিনি বলেছিলেন-
অস্মাংস্তদেনোপগচ্ছেৎকৃতং বার্হদ্রথ ৎবয়া।
বয়ং হিং শক্তা ধর্মস্য রক্ষণে ধর্মচারিণঃ॥
প্রতিটি অসৎ কর্মের পাপ আমাদেরও স্পর্শ করে, আমার সেই সামর্থ্য আছে সেই অসৎ কর্মকে, পাপকে প্রতিরোধ করার, তাই আমি সেই ধর্মরক্ষায় ধর্মচারী।
প্রতিটি মানুষের ই রয়েছে সামর্থ্য, কেবল পার্থক্য তা আবিস্কার করয়, তাকে প্রয়োগ করতে পারার কৌশল নির্ণয়ে। শ্রীকৃষ্ণও সেই কথা ই বললেন-
অস্তি বীর্য্যং নরে নরে
প্রতিটি মনুষ্যেই রয়েছে সামর্থ্য।
আর তাই কোনভাবেই কর্মকে ত্যাগ করা যাবেনা এই কথা বারবার স্মরণ করিয়েছেন তিনি-
কর্ম ব্রহ্মোদ্ভবং বিদ্ধি ব্রহ্মাক্ষরসমুদ্ভবম্।
তস্মাৎ সর্বগতং ব্রহ্ম নিত্যং যজ্ঞে প্রতিষ্ঠিতম্।।
এবং প্রবর্তিতং চক্রং নানুবর্তয়তীহ যঃ।
অঘায়ুরিন্দ্রিয়ারামো মোঘং পার্থ স জীবতি।।
এই কর্মচক্র ব্রহ্মরূপ বেদ হতে উদ্ভূত হয়েছে। অক্ষর পরমাত্মা হতে সমুদ্ভূত বেদ নিত্যযজ্ঞে প্রতিষ্ঠিত। হে পার্থ, যে বেদের নির্দেশিত লোককল্যাণহেতু কর্মময়তার অনুবর্তন করেনা সেই স্বার্থপর পাপায়ু ব্যক্তির জীবন ধারণ বৃথা। তাই-
লোকসংগ্রমপবাপি সংপশ্যন কর্তুমর্হসি
মানুষের কল্যাণের জন্য কর্ম করো।
কোন মহৎ কর্মই ক্ষুদ্র নয়, মনে করিয়ে দিলেন-
পর্যস্তাং পৃথিবীং সর্বাং সাশ্বাং সরথকুঞ্জরাম্ ।
যোমোচয়েন্মৃত্যুপাশাৎপ্রাপ্নুয়াদ্ধর্মমুত্তমম্ ॥
ভাবানুবাদ- যে ব্যক্তি কাউকে প্রাণে রক্ষা করে, এমনকি কোন পশুপাখির প্রাণও রক্ষা করে, সে যেন সমগ্র পৃথিবীকে মৃত্যুপাশ থেকে মুক্ত করে উত্তম মর্যাদা লাভ করে।
এও বললেন-
ধর্মকার্যং যতন শক্ত্যা নো চেৎ প্রাপ্নোতে মানবঃ
এমনকি মানুষের,জগতের কল্যাণে কার্য করার চিন্তা করলেও পূণ্য প্রাপ্তি হয় হে পার্থ!
মানুষই বেছে নেয় সে কী চায়, পাপ না পূণ্য, লালসা নাকি গরিমা। আর সে অনুসারেই সে ফল লাভ করে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শুরু হবার কিছুদিন আগে দ্বারকায় একদিন তিনি নিদ্রারত ছিলেন। ঠিক এমন সময়ে দূর্যোধন দ্বারকায় আগমন করলেন শ্রীকৃষ্ণের কাছে যুদ্ধে সমর্থন কামনার উদ্দেশ্যে। তার কিছুক্ষণ পরেই বিপক্ষ দলের অর্জুনও আসলেন ঠিক একই উদ্দেশ্যে। দুইজনই নিদ্রারত শ্রীকৃষ্ণের কক্ষে প্রবেশ করলেন। দূর্যোধন ছিলেন অহংকারী, তিনি শ্রীকৃষ্ণের মাথার পাশে একটি আসন নিয়ে বসলেন। অর্জুন ছিলেন বিনয়ী, নম্র। তিনি শ্রীকৃষ্ণের পায়ের কাছে একটি আসন নিয়ে বসলেন। ঘুম ভেঙে চোখ খুলে স্বাভাবিকভাবেই শ্রীকৃষ্ণের চোখ প্রথমে পড়ল পায়ের দিকে বসা অর্জুনের নিকট। দুজনেই শ্রীকৃষ্ণকে যুদ্ধ সমর্থনের জন্য শ্রীকৃষ্ণের নিকট প্রার্থনা করলে শ্রীকৃষ্ণ বললেন তাঁর কাছে দুটো জিনিস আছে দেবার। এক তিনি নিজে নিরস্ত্র হয়ে কেবল পরামর্শদাতারূপে পক্ষে থাকবেন এবং দুই তাঁর গড়ে তোলা যুদ্ধে অপরাজেয় সেনাবাহিনী নারায়ণী সেনা। দুজনকে অপশন দিলেন কে কোনটা বেছে নেবেন। কিন্তু দূর্যোধন আগে এলেও তিনি ঘুম থেকে চোখ খুলে প্রথমে দেখেছেন অর্জুনকে যিনি আবার বয়সেও কনিষ্ঠ। তাই প্রথমে বেছে নেয়ার সুযোগ দিলেন অর্জুনকেই। সতর্ক করে দিলেন-
এতদ্বিদিত্বা কৌন্তেয় বিচার্য্য চ পুনঃ পুনঃ।
তান্ বা বরয়ে সাহায্যে মাং সাচিব্যেহথবা পুনঃ।।
(উদ্যোগ, ৭.২২)
হয় আমি পরামর্শদাতা হিসেবে অথবা আমার নারায়ণী সেনাদল। বারবার চিন্তা করো হে কুন্তীপুত্র অর্জুন, তারপর সিদ্ধান্ত নাও।
বিনয়ী অর্জুন বেছে নিয়েছেলেন নিরস্ত্র শ্রীকৃষ্ণকেই। উদ্ধত দূর্যোধন মনে মনে খুব খুশি হলেন। যাক বাবা এই একটা অস্ত্রহীন লোককে নিতে হলে কতই না লস হতো, বোকা অর্জুন নারায়ণী সেনা বেছে নিলে একদম মাঠে মারা যেতাম!
কৃষ্ণঞ্চাপহৃতাং মত্বা সংপ্রাপ পরমং মুদম্
দূর্যোধন শ্রীকৃষ্ণের সহস্র সহস্র সৈন্য পেয়ে শ্রীকৃষ্ণকেও পেলেন এই ভেবে মনে পরম আনন্দ অনুভব করলেন।
কিন্তু যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন শেষপর্যন্ত অর্জুনই। জীবনে সর্বদা নির্বাচনে সতর্ক হতে হয়। খালি চোখে সবসময় সবকিছু দেখা যায়না। যেখানে যোগেশ্বর কৃষ্ণ ও পার্থ ধনুর্ধরের ব্রহ্ম ও ক্ষত্রিয় শক্তির সহাবস্থান ঘটে সেখানেই শ্রী, অভ্যুদয় ও বিজয়। পাপযুক্ত মন তা বুঝতে পারেনা, পারেননি দূর্যোধনও।
যিনি সর্বদা দৃষ্টিচক্ষু সীমানার বহু বাইরেও দেখতে পেতেন জ্ঞানচক্ষু দিয়ে, ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ কৌশলপ্রয়োগ পুরুষ, আহুককূলোলোচন, সাত্ত্বতবংশের শিরোমণি, বৃষ্ণিকূলজাত অরিন্দম, যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পূণ্য আবির্ভাব তিথিতে তাঁর চরণকমলের পূণ্যস্মৃতিতে প্রণাম। কততম আবির্ভাব তিথি সে কথা বলা হয়তো অর্থ রাখবেনা, তিনি যে বহু আগেই কালোত্তীর্ণ!
শুভ জন্মাষ্টমী