28/04/2026
বনী ইসরায়েলের এক প্রতাপশালী ও ধার্মিক রাজা ছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে দীর্ঘায়ু, অগাধ সম্পদ এবং অসংখ্য সন্তান-সন্ততি দান করেছিলেন। কিন্তু রাজার অন্তরে এক গভীর দুঃখ লুকিয়ে ছিল। তাঁর সকল পুত্রই বড় হয়ে দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে সন্ন্যাস জীবন গ্রহণ করতেন। তারা রাজকীয় বিলাসী পোশাক ছেড়ে রুক্ষ পশমের কাপড় পরিধান করতেন এবং পাহাড়-জঙ্গলে গিয়ে আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন হয়ে যেতেন। রাজা বারবার এ দুঃখে ভুগতেন যে, তাঁর রাজত্বের উত্তরাধিকারী কে হবে?
অবশেষে বৃদ্ধ বয়সে তাঁর কোলে একটি পুত্রসন্তান এলো। রাজা ভাবলেন, “এবার এ সন্তানকে যেন অন্যদের মতো না হারাই। যেন সে দুনিয়ার বাস্তবতা না জেনে বিলাসিতায় মগ্ন থাকে।” তাই তিনি রাজপুত্রের জন্য চারদিকে উঁচু দেয়াল ঘেরা এক বিশাল, বিলাসবহুল প্রাসাদ নির্মাণ করলেন। প্রাসাদের ভেতরে ছিল সব ধরনের আরাম-আয়েশ, দামি খাবার, সুন্দর উদ্যান—কিন্তু বাইরের জগতের কোনো দুঃখ-কষ্ট, রোগ-শোক বা মৃত্যুর ছায়া যেন তার চোখে না পড়ে। রাজপুত্র সেখানেই বড় হতে লাগলেন, দুনিয়ার কঠিন সত্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।
যখন রাজপুত্র যুবক হয়ে উঠলেন, তাঁর মনে বাইরের জগত দেখার প্রবল ইচ্ছা জাগ্রত হলো। রাজা অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দিলেন, তবে সুসজ্জিত রথ, অসংখ্য পাহারাদার ও সঙ্গী দিয়ে।
প্রথমবার বাইরে যাওয়া:
পথে রাজপুত্র এক অসুস্থ, দুর্বল ও বিপর্যস্ত মানুষ দেখলেন। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এ কী অবস্থা?” সঙ্গীরা বললেন, “এটি রোগ।”
রাজপুত্র প্রশ্ন করলেন, “এ কি শুধু এই ব্যক্তির হয়, নাকি সবার হতে পারে?”
উত্তর এল, “যে কোনো মানুষই রোগে আক্রান্ত হতে পারে—রাজা হোক বা প্রজা।”
রাজপুত্রের মন বিষণ্ণ হয়ে উঠল। তিনি ভাবলেন, “যদি এই বিলাসিতাও একদিন রোগে নষ্ট হয়ে যায়, তবে এর কোনো মূল্যই নেই।” বিমর্ষ মনে প্রাসাদে ফিরে এলেন।
দ্বিতীয়বার বাইরে যাওয়া:
কিছুদিন পর আবার বের হলেন। এবার দেখলেন এক অতি বৃদ্ধ মানুষ—মুখ থেকে লালা ঝরছে, শরীর কাঁপছে, চলতে পারছে না।
রাজপুত্র জিজ্ঞেস করলেন, “এর এই দশা কেন?”
সঙ্গীরা বললেন, “এটি বার্ধক্য। যে দীর্ঘজীবী হয়, তাকেই এই অবস্থা পোহাতে হয়।”
রাজপুত্র আঁতকে উঠলেন এবং বললেন, “তাহলে তো এ দুনিয়ার জীবন কেবল এক ধোঁকা! যা শেষ পর্যন্ত এমন দুর্বলতায় পরিণত হয়।”
তৃতীয়বার বাইরে যাওয়া:
তৃতীয়বার বের হলে দেখলেন কয়েকজন মানুষ কাঁধে একটি খাটিয়া বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। খাটিয়ায় শুয়ে আছে এক নিথর দেহ।
রাজপুত্র প্রশ্ন করলেন, “এ কী? এ লোকটিকে কি বসানো যাবে না? সে কি কথা বলবে না?”
সঙ্গীরা বললেন, “এটি মৃত্যু। এই ব্যক্তির জীবন শেষ হয়ে গেছে। এখন তাকে মাটির নিচে দাফন করা হবে।”
রাজপুত্র আরও জিজ্ঞেস করলেন, “এরপর কী হবে?”
উত্তর এল, “এরপর হাশরের দিন আসবে। কিয়ামত হবে। সেদিন দুনিয়ার প্রতিটি ভালো-মন্দের হিসাব দিতে হবে।”
মৃত্যু ও পরকালের এই ভয়ংকর সত্য শুনে রাজপুত্রের হৃদয়ে বিদ্যুৎ খেলে গেল। তিনি ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নেমে পড়লেন, ধুলায় মুখ ঘষতে লাগলেন এবং কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন:
“হায়! আমি এতদিন এই ভয়ানক সত্য না জেনে বিলাসিতায় ডুবে ছিলাম!”
প্রাসাদে ফিরে পিতাকে বললেন, “আমি আর এ রাজপ্রাসাদে থাকব না। যেখানে হিসাব দিতে হবে, সেখানে বিলাসিতা করা যায় না।” রাজা অনেক বোঝালেন, কান্নাকাটি করলেন, কিন্তু রাজপুত্রকে ফেরাতে পারলেন না।
মাঝরাতে তিনি সাধারণ পোশাক পরে গোপনে প্রাসাদ ত্যাগ করলেন। বের হওয়ার সময় আল্লাহর দরবারে ক্রন্দনরত অবস্থায় দো‘আ করতে লাগলেন:
“হে আল্লাহ! আমি দুনিয়ার মোহে পড়ে আমার জীবন নষ্ট করতে চাই না। আমি আপনার কাছে তওবা করছি। আপনি আমার তওবা কবুল করুন।”
বিখ্যাত তাবি‘ঈ হযরত বকর বিন আব্দুল্লাহ আল-মুযানী (রহ.) এই হৃদয়স্পর্শী ঘটনা বর্ণনা করে বলেছিলেন:
“এই যুবকটি মাত্র একটি গোনাহ—দুনিয়ার মোহ—থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই এমন আন্তরিক তওবা করে সব ত্যাগ করেছিলেন। অথচ আমরা যারা জেনে-শুনে প্রতিদিন অগণিত গোনাহ করি, আমাদের অন্তরে কেন অনুশোচনা জাগে না? কেন আমরা তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসি না?”
সূত্র: কিতাব আত-তাওয়াবীন (ইমাম ইবনে কুদামা আল-মাকদিসী রহ.)
এ কাহিনী আমাদের শিক্ষা দেয় যে, দুনিয়ার বিলাসিতা ক্ষণস্থায়ী। রোগ, বার্ধক্য ও মৃত্যু অনিবার্য। সত্যিকারের সুখ আল্লাহর স্মরণে ও তাঁর পথে। আসুন আমরাও তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরি—যেন পরকালে লাঞ্ছিত না হই।