23/06/2026
আমি একসময় ভাবতাম, তাহাজ্জুদ হলো এমন একটি দরজা, যার সামনে গিয়ে আমি আমার প্রয়োজনের তালিকা পেশ করব, আর তারপর অপেক্ষা করব সেগুলো পূরণ হওয়ার।
তাই রাতের শেষ প্রহরে ঘুম ভেঙে উঠতাম, অজু করতাম, নামাজে দাঁড়াতাম, সিজদায় যেতাম, আর একই কথাগুলো বারবার বলতাম
হে আল্লাহ, আমার কাজ সহজ করে দিন। আমার রিজিক বৃদ্ধি করুন। আমার সমস্যাগুলো দূর করে দিন। আমার জন্য উত্তম ফয়সালা নির্ধারণ করুন...
আমি আন্তরিক ছিলাম। আমি কাঁদতামও। আমি বিশ্বাসও করতাম।
কিন্তু আমার ইবাদতের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলাম আমি নিজেই।
আমার প্রয়োজন। আমার পরিকল্পনা। আমার কষ্ট। আমার চাওয়া।
আল্লাহ ছিলেন আমার দোয়ার গন্তব্য, কিন্তু আমার হৃদয়ের কেন্দ্র তখনো আমার নিজের জীবনই ছিল।
দিন গড়ালো। মাস গড়ালো।
আমি তাহাজ্জুদ পড়তাম, দোয়া করতাম, আবার উঠে যেতাম।
কিন্তু একসময় আমার ভেতরে একটি নীরব প্রশ্ন জন্ম নিতে শুরু করল, আমি কি সত্যিই আল্লাহকে খুঁজছি, নাকি শুধু আল্লাহর কাছ থেকে কিছু জিনিস পাওয়ার চেষ্টা করছি?
কারণ আমি লক্ষ্য করলাম, আমার অধিকাংশ মুনাজাতের শুরু আমি দিয়ে, শেষও আমি দিয়ে।
আমি আল্লাহকে ডাকতাম, কিন্তু হয়তো আল্লাহকে পাওয়ার জন্য নয় বরং আমার চাওয়া জিনিসগুলো পাওয়ার জন্য।
তারপর একদিন রাসূল এর সিজদার বর্ণনা পড়ছিলাম। ভাবছিলাম,
যাঁর সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে, যাঁকে জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে, যাঁর দোয়া সবচেয়ে বেশি কবুল হতো
তিনি কেন এত দীর্ঘ সিজদা করতেন?
কেন রাতের পর রাত কাঁদতেন?
কেন তাঁর পা ফুলে যেত?
তিনি আর কী চাইছিলেন?
সেদিন আমার হৃদয়ে যেন একটি পর্দা সরে গেল।
হয়তো তিনি শুধু কিছু চাইছিলেন না।
হয়তো তিনি তাঁর রবকে ভালোবাসতেন।
হয়তো তিনি সেই নৈকট্যের স্বাদ পেয়েছিলেন, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
হয়তো সিজদা তাঁর কাছে কোনো আবেদনপত্র জমা দেওয়ার জায়গা ছিল না বরং ছিল ফিরে আসার জায়গা।
নিজ রবের কাছে ফিরে আসা।
নিজেকে ভুলে যাওয়া।
নিজেকে সমর্পণ করা।
সেদিন প্রথমবার আমি উপলব্ধি করলাম
আমি অনেক দোয়া করেছি, কিন্তু খুব কম সময় আল্লাহর সামনে থেকেছি।
আমি অনেক কথা বলেছি, কিন্তু খুব কম সময় শুনেছি আমার হৃদয় আল্লাহর সামনে কী অবস্থায় আছে।
আমি অনেক কিছু চেয়েছি, কিন্তু খুব কম সময় আল্লাহকেই চেয়েছি।
তারপর থেকে আমি সিজদা দীর্ঘ করতে শুরু করলাম।
শুধু এই জন্য নয় যে দীর্ঘ সিজদা করলে দোয়া দ্রুত কবুল হবে।
বরং এই জন্য যে আমি আর তাড়াহুড়ো করে উঠে যেতে চাইতাম না।
আমি তাঁর সামনে একটু বেশি থাকতে চাইতাম।
কখনো বলতাম
ইয়া কারীব...
আর এই একটি নামের মধ্যেই হারিয়ে যেতাম।
হে সেই রব, যিনি আমার গলার শিরার চেয়েও নিকটবর্তী।
কখনো বলতাম
ইয়া মুজীব...
হে সেই রব, যিনি আমার ঠোঁটে আসার আগেই আমার হৃদয়ের কথা জানেন।
কখনো কোনো চাওয়া থাকত না।
কখনো শুধু বলতাম
আলহামদুলিল্লাহ।
কখনো শুধু নিজের গুনাহগুলো মনে পড়ত।
কখনো শুধু কাঁদতাম।
কখনো কোনো শব্দই খুঁজে পেতাম না।
শুধু মনে হতো
এই মাটির ওপর পড়ে থাকাটাই যেন আমার জন্য যথেষ্ট।
কারণ আমি তাঁর সামনে আছি।
তখন আমি বুঝতে শুরু করলাম, ইবাদতের সবচেয়ে বড় ফল সবসময় সমস্যার সমাধান নয়।
কখনো কখনো ইবাদতের সবচেয়ে বড় ফল হলো হৃদয়ের পরিবর্তন।
আগে আমি চাইতাম আল্লাহ আমার পরিস্থিতি বদলে দিন।
পরে আমি চাইতে শুরু করলাম, আল্লাহ আমার হৃদয় বদলে দিন।
আগে আমি চাইতাম আমার বোঝা হালকা হোক।
পরে আমি চাইতে শুরু করলাম, আল্লাহ আমাকে সেই বোঝা বহনের শক্তি দিন।
আগে আমি চাইতাম পথ সহজ হোক।
পরে আমি চাইতে শুরু করলাম, পথ কঠিন হলেও যেন আমি আল্লাহকে না হারাই।
আর আশ্চর্যের বিষয় হলো
যখন আমি আল্লাহর কাছ থেকে শুধু জিনিসপত্র চাওয়া কমিয়ে আল্লাহকেই খুঁজতে শুরু করলাম, তখন আমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেল।
সমস্যা সব একদিনে শেষ হয়ে যায়নি।
কিন্তু আমি আর আগের মানুষটি ছিলাম না।
কারণ আমার হৃদয় বদলাতে শুরু করেছিল।
আমি তখন বুঝলাম, অনেক সময় আল্লাহ আমাদের দোয়ার উত্তর শুধু "দেওয়ার" মাধ্যমে দেন না।
কখনো তিনি উত্তর দেন আমাদেরকে নিজের আরও কাছে টেনে নিয়ে।
কখনো তিনি আমাদের চাওয়া জিনিসটি বিলম্বিত করেন, যাতে আমরা তাঁর দরজায় আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি।
কখনো তিনি আমাদের প্রয়োজন পূরণের আগে আমাদের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করেন।
আর সেই পরিশুদ্ধির সবচেয়ে সুন্দর জায়গাগুলোর একটি হলো সিজদা।
আজও আমি দোয়া করি।
আজও আমি চাই।
আজও আমার প্রয়োজন আছে।
কিন্তু এখন আমি জানি
সিজদা শুধু আমার প্রয়োজনের জায়গা নয়।
সিজদা আমার পরিচয়ের জায়গা।
এখানেই আমি বুঝতে পারি আমি কে
আমি একজন অসহায় বান্দা।
আর তিনি আমার রব।
আমার জীবনের পরিবর্তন সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল, যেদিন আমি শুধু দোয়া করতে নয়, আল্লাহর সামনে অবস্থান করতে শিখেছিলাম।
Collected