28/09/2024
বর্তমানে আমরা যে যুগে বসবাস করছি তাকে ফিতনার যুগ বললে ভুল হবে না। যদিও সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে যুগে যুগে সর্বকালেই ফিতনা ছিল তবে নববী যুগের সময়সীমা বর্তমান যুগ থেকে যত বাড়ছে ফিতনার অন্ধকারাচ্ছন্নতা ততই গাঢ় হচ্ছে। ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য প্রথমত ফিতনা কি সেটার সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখতে হবে এবং তা চিহ্নিতকরন করতে হবে। নিজেদের ইলম ও আমল সমৃদ্ধ করতে হবে।
◾ফিতনা একটি আরবী শব্দ। যার অর্থ বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, বিপর্যয়, নৈরাজ্য, পরীক্ষা। সামগ্রিকভাবে ফিতনার অর্থ দাঁড়ায় পরীক্ষা - নিরীক্ষা।
বর্তমানে গাছের শিকড়ের মতো ফিতনা আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। পাপকে এখন আর আমাদের পাপ মনে হয় না। আল্লাহর অবাধ্যতায় কে কাকে ছাড়িয়ে যেতে পারি সেই প্রতিযোগিতায় আমরা মত্ত ( নাউযুবিল্লাহ )। সুদ, ঘুষ, বাদ্যযন্ত্র, হ*ত্যা, যি*না, ব্যভি*চার থেকে শুরু করে সেক্যুলারিজম, জাতীয়তাবাদ, পাশ্চাত্যবাদ, সম কামীতা , ফেমিনিজম, ফিরকাবাজীসহ নানা ধরনের ফিতনায় আমরা জর্জরিত। যার ফাঁদে পড়ে ধীরে ধীরে মানুষের জ্ঞান লোপ পাচ্ছে, ক্বলব মরে যাচ্ছে। ইমাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “কথায় আছে ফিতনা যখন শুরু হয়ে যায়, জ্ঞানীরাও তার আগুন নিভাতে অক্ষম হয়ে যায়।” [মিনহাজুস সুন্নাহ : ২/২২৪]
◾ পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের ফিতনার ব্যাপারে সতর্ক করতে ইরশাদ করেন, ‘মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না?’ অথচ তাদের পূর্বে যারা গত হয়েছে তাদেরকেও আমি পরীক্ষা করেছি। সুতরাং আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন কারা সত্যনিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছে এবং তিনি অবশ্যই জেনে নেবেন কারা মিথ্যাবাদী। (সূরা আনকাবুত : আয়াত ২-৩)
এই আয়াতদ্বয় দ্বারা বুঝা যায় যে কিয়ামতের আগ পর্যন্ত আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সবাইকে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই বাছাই করবেন যে কারা হকের পক্ষে আর কারা বাতিলের দলে।
◾রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
"এমন এক সময় আসবে যখন মুসলমানদের জন্য ঈমান ধরে রাখা, জ্বলন্ত কয়লা হাতের মধ্যে রাখার ন্যায় কঠিন হবে।" (তিরমিযি - ২২৬০)
বেশক আমরা এখন সেই সময়ে উপনিত হয়েছি যেখানে এতো এতো ফিতনার মাঝে আমাদের ঈমান ধরা রাখা কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমরা জানি প্রত্যেক মুমিনের জন্য ইলম অর্জন করা ফরজ। তবে এই ফিতনা থেকে বাঁচতে ব্যাপকভাবে অনেকের ধারণা ইলম অর্জনের লক্ষ্যে আপনাকে অনেক বড় আলেম হতে হবে। ব্যাপারটা আসলে এমন নয়। মাওলানা মামুনুর রশীদ (হাফিঃ) বলেন ফিতনা থেকে বাঁচতে আপনার অন্তরে মূলত নূর থাকতে হবে, ঈমানের নূর। যার দ্বারা আপনি হক ও বাতিলের মানদণ্ড নির্ধারণ করতে পারবেন। আর এই নূর তখনই আপনার মধ্যে আসবে যখন আপনি আখিরাতমুখী হবেন, দুনিয়াবিমুখী হবেন এবং সর্বদা মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন। এই তিন বৈশিষ্ট্য যার মধ্যে থাকবে সে ঘোর অন্ধকার ফিতনার মধ্যেও তার নূরের আলো দ্বারা সিরাতুল মুস্তাকিমের পথ খুঁজে পাবে ইন শা আল্লাহ্। এর পাশাপাশি হক্কানী আলেমদের সহবতে থাকলে ফিতনা চিহ্নিতকরণ আরো সহজ হয়ে যাবে ইন শা আল্লাহ্।
◾এখন প্রশ্ন দাঁড়ায় যখন আমরা ফিতনার মুখোমুখি হবো তখন এর থেকে বাঁচতে আমাদের করনীয় কি হবে?
১. সকল ধরনের ফিতনা - ফাসাদ থেকে বাঁচতে প্রথমত আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছে আমাদের সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে , বেশি বেশি দুআ করতে হবে। কেননা রাসূল ﷺ বলেছেন, ' দুআ ইবাদতের মগজ (মূল)।' - (সুনানু তিরমীযি : ৩৩৭১)।
ফিতনা থেকে বেঁচে থাকতে এবং ফিতনায় পড়ে গেলেও তা থেকে উত্তরণের জন্য ক্রমাগত দুআ চালিয়ে যেতে হবে। এর জন্য আমরা রাসূল ﷺ এর শিখিয়ে দেয়া দুআ আওড়াতে পারি।
ফিতনা থেকে মুক্ত থাকার জন্য প্রিয় নবী ﷺ আমাদেরকে এই দু‘আ শিক্ষা দিয়েছেন,
اَللَٰهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْفِتَنِ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ
‘হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল ফিতনা থেকে পরিত্রাণ চাচ্ছি’। (সহীহ মুসলিম -২৮৬৭)
২. আল্লাহ সুবাহানাহু তায়ালা যেহেতু বিভিন্ন ফিতনার মাধ্যমে আমাদের পরীক্ষা নিয়ে থাকেন তাই ফিতনা যত ভয়ংকর আকার ধারণ করুক না কেন আমাদের ঈমানের উপর অটল থাকতে প্রানপণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
এক্ষেত্রেও আমরা রাসূল ﷺ এর শিখিয়ে দেয়া দোয়া পাঠ করতে পারি।
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوْبِ ثَبِّتْ قَلْبِىْ عَلَىْ دِيْنِكَ
‘হে অন্তরের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর স্থির রাখুন।' - (সহীহ তিরমিজি : ৩৫২২)
৩. আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেন,
"অন্ধকার রাতের মত ফিতনা আসার আগেই তোমরা নেক আমলের প্রতি অগ্রসর হও। সে সময় সকালে একজন মুমিন হলে বিকালে কা ফির হয়ে যাবে। বিকালে মুমিন হলে সকালে কা ফির হয়ে যাবে। দুনিয়ার সামগ্রীর বিনিময়ে সে তার দ্বীন বিক্রি করে বসবে।" (সহীহ মুসলিম ২১৪)
এই হাদিস থেকে বুঝা যায় যে ফিতনার সময় মানুষ মানসিকভাবে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় থাকবে এবং অস্থিরতা বিরাজমান হবে। তাই অন্তরকে প্রশান্ত করতে আমাদের আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করতে হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়। (সূরা রাদ -২৮)
কাজেই ফরজ সালাতের পাশাপাশি সুন্নাত ও নফলের প্রতিও যত্নবান হতে হবে। বেশি বেশি জিকির, দুরুদ, ইস্তেগফার ,দান সাদাকাহ জারি রাখতে হবে। কুরআন তিলাওয়াত ও তাদাব্বুরের পাশাপাশি সিয়াম কিয়াম পালনে সচেষ্ট হতে হবে।
৪. ফিতনা থেকে বাঁচতে আমাদের আরেকটি করনীয় হলো ঐক্যবদ্ধ থাকা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কুরআনে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন,
"আল্লাহর রশিকে (অর্থাৎ তার দ্বীন ও কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখ এবং পরস্পরে বিভেদ করো না। আল্লাহ তোমাদের প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন তা স্মরণ রাখ। একটা সময় ছিল, যখন তোমরা একে অন্যের শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের অন্তরসমূহকে জুড়ে দিলেন। ফলে তার অনুগ্রহে তোমরা ভাই ভাই হয়ে গেলে।"
- (সূরা আলে ইমরান : ১০৩)
ফিতনার সময় মুসলমানদের জামাআতের সাথে সংঘবদ্ধ ও তাদের (মাজহাবের) ইমামকে অনুসরণ করতে হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুযায়ফা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে এই উপদেশই দিয়েছেন। হুযায়ফা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ফিতনার সময় করণীয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘‘তুমি মুসলমানদের জামাআত ও তাদের ইমামের অনুসরণ করবে। হুযায়ফা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি আরজ করলাম তখন যদি মুসলমানদের কোন জামাআ’ত ও ইমাম না থাকে?
তিনি বললেন, তাহলে তুমি ফিতনা সৃষ্টিকারী সকল ফির্কা পরিত্যাগ করবে। যদিও তোমাকে গাছের শিকড়ের আশ্রয় নিতে হয় এবং তুমি এই নির্জন অবস্থায় থাকবে যতক্ষণ তোমার মৃত্যু উপস্থিত না হয়।’’ (সহীহ বুখারী -৩৬০৬)
৫. ফিতনার দিকে দৃষ্টি বা উঁকি না দেওয়া এবং ফিতনার দিকে না যাওয়া। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ফিতনার দিকে তাকাবে, ফিতনা তাকে ঘিরে ধরবে। তখন কেউ যদি কোন আশ্রয়ের জায়গা কিংবা নিরাপদ জায়গা পায়, তাহলে সে যেন আত্মরক্ষা করে। [সহিহ বুখারি, হাদীস:৭০৮১]
৬. মুমিনদের সাথে বন্ধুত্ব রাখা।
সুরা হুজরাত, আয়াত ২৯ এ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন, মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই ভাইয়ের প্রতি ভাই সহানুভূতিশীল হবে, এটাই স্বাভাবিক। ফিতনার সময় একজন মুমিনের জন্য করণীয় হল মুমিনদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা এবং শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে কা ফিরদের সাথে সকল প্রকার সম্পর্ক ত্যাগ করা। শিরকের অবসান না হওয়া পর্যন্ত তাদেরকে ঘৃণা করা এবং তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করা এবং যুদ্ধের ঘোষণা করা। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَ قَاتِلُوۡہُمۡ حَتّٰی لَا تَکُوۡنَ فِتۡنَۃٌ وَّ یَکُوۡنَ الدِّیۡنُ کُلُّہٗ لِلّٰہِ
‘তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর ফিতনার (শিরক) অবসান না হওয়া পর্যন্ত এবং দ্বীন পরিপূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট না হওয়া পর্যন্ত।’ (সূরা আল-আনফাল : ৩৯)
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সবাইকে নিকষ কালো এই ফিতনার থাবা থেকে রক্ষা করুন, আমীন।
- ই'তিকাদ দাওয়াত সিরিজ