24/07/2023
ছোট বেলা থেকেই আব্বা আম্মার কাছ থেকে শিক্ষা পেয়েছি যে ভবিষ্যতে কোনো কিছু করব বললে যেন ইনশাআল্লাহ বলে তারপর কমিটমেন্ট করি।
তো, একদিন এক বিজনেস মিটিংয়ে একটি বিজনেস কেইস উপস্থাপন শেষে প্রশ্নকর্তার উত্তরে বললাম ইনশাআল্লাহ এটা তিনমাসে হয়ে যাবে।
তিনি আমার দিকে ভ্রু কুচকে বললেন, এই যে ইনশাআল্লাহ!
আরে ভাই পারলে কনফিডেন্টলি বলেন যে তিনমাসে কাজ শেষ করে দেবেন।
আমি আবারো স্মিত হেসে বললাম, ইনশাআল্লাহ, শেষ করে দেব।
তিনি যে বিরক্ত হলেন সেটা আমি বুঝতে পারলাম।
মিটিং শেষে আমি তার সাথে ৫ মিনিট একান্তে কথা বলতে চাইলাম। তিনি সময় দিলেন।
এসি রুমের মধ্যে স্মোক করলে যারা ধুমপান করেননা তাদের জন্য খুব অসুবিধা হয়। আমি যেহেতু নিকোটিনে অভ্যস্ত নই, আমার অসুবিধা হচ্ছিল। তবু ধৈর্য ধরে তাকে বললাম, বস, ইনশাআল্লাহ বলার মানে এই না যে আমি তিন মাসে কাজ না বুঝিয়ে দেয়ার কোনো অবলম্বন খুঁজছি। বরং আমি আল্লাহর উপর ভরসা করে বলছি যে আমি পারব কাজটা তিন মাসে শেষ করতে।
তিনি আমার কথা খুব একটা মনযোগ দিয়ে শুনছেন বলে মনে হলোনা। তারপরও আমি তাকে বললাম, বস, আপনি কি সুরা কাহফ পড়েছেন?
তিনি আমতা আমতা করলেন।
না পড়লে সমস্যা নেই বস, আপনি ইংরেজী কিংবা বাংলা অনুবাদও পড়তে পারেন।
ওই সুরাটার অর্থ আর ব্যাখ্যা পড়লে আপনি বুঝবেন যে ইনশাআল্লাহ বলাটা কেন জরুরি। এই সুরার ২৩-২৪ নাম্বার আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যেকোনো ভবিষ্যতের কথা বলার সময় যেন আমরা ইনশাল্লাহ (আল্লাহ চাইলে) বলে প্রতিশ্রুতি দিই।
এবার তিনি সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে ফেলে দিয়ে আমাকে বললেন, চা দিতে বলি?
-হ্যাঁ, খেতে পারি। গ্রিন টি।
বেল বাজাতেই একজন এসিসটেন্ট আসলেন। তাকে গ্রিন টি দিতে বলা হলো।
এর মাঝে তিনি বললেন, রিমন সাহেব, ক্যান ইউ ন্যারেট মি দিজ সুরা। কেনো এই ইনশাআল্লাহ বলতে বলা হলো?
আমি এই সুযোগটা চাচ্ছিলাম। ততক্ষণে গ্রিন টি চলে এসেছে।
আমি চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম, এই সুরার পটভূমি রাসুল (সাঃ) এর নবুয়াতের শুরুর দিকে। তখন কুরাইশরা তার নবু্য়তে বিশ্বাস করছিলনা। তাঁকে নানা ভাবে মিথ্যা প্রমাণ করার চেষ্টা করছিল। তারা জানত যে মদীনায় তখন জুইস (ই *হু *দী) পন্ডিতরা বসবাস করতেন। তখন দুজন কুরাইশ প্রতিনিধি মদীনায় গিয়ে জুইস রাবাই কে জিজ্ঞেস করলেন যে মুহাম্মদ (সাঃ) নিজেকে নবী দাবী করছে। তার কাছে নাকি ওহি আসে। আমাদের কিছু প্রশ্ন ঠিক করে দিন যা দিয়ে তাঁকে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারবে।
পন্ডিত তাদেরকে বললেন যে সেটা প্রমান করা খুব সহজ। তাকে তিনটি প্রশ্ন করুন। তিনি যদি এর সঠিক উত্তর দিতে পারেন তাহলে বুঝবেন যে তিনি সত্য নবী, আর না দিতে পারলে বুঝবেন যে তিনি সত্য নবী নন। পন্ডিত যে প্রশ্ন গুলো ঠিক করে দিলেন সেই ৩টি প্রশ্ন হল-
১) কাহাফ (গুহাবাসি) বাসিন্দা কারা ছিল?
২) জুলাকারনাইন কে ছিলেন?
৩) রহু কি?
যথারীতি কুরাইশ প্রতিনিধিরা তাদের পরিকল্পনা মতো ফিরে এসে এই ৩টি প্রশ্ন রাসুল (সা.)কে জিজ্ঞেস করল।
তিনি বললেন আমি আগামী কাল তোমাদেরকে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিব। তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন জিব্রাইল (আ.) উত্তর নিয়ে আসবেন। পরের দিন কুরাইশরা সমবেত হলো উত্তর শুনতে। কিন্তু রাসুল (সাঃ) সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেন না। বরং বললেন, আগামীকাল এসো, তোমাদেরকে উত্তর জানাব। এভাবে প্রায় ২ সপ্তাহ চলে গেল এবং রাসুল (সাঃ) উদ্বেগ বাড়তে থাকল। তিনি ভেতরে ভেতরে অস্থিরতা অনুভব করতে শুরু করলেন।
এরমধ্যে কুরাইশরা ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করতে লাগলো। অবশেষে উত্তর এলো, নাজিল হলো সুরা কাহাফ এবং সুরা বনি ইসরাইল। এই দেরির কারন সম্পর্কে সুরার ২৩-২৪ নাম্বার আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, আপনি কোন কাজের বিষয়ে বলবেন না যে, সেটি আমি আগামী কাল করব, আল্লাহ ইচ্ছা করলে বলা ব্যতিরেকে।
তারপর একে একে আল্লাহর রাসুল (সাঃ)কে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর শিক্ষা দেয়া হয়। এই সুরার ৯-২৬ নাম্বার আয়াতে প্রথম প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়েছে। একই সুরার ৮৩-১০১ নাম্বার আয়াতে জুলকারনাইন বাদশার কাহিনী বলা হয়েছে। তৃতীয় প্রশ্ন রুহ কি? এর উত্তর দেয়া হয়েছে সুরা বনি ইসরাইল এর ৮৫ নং আয়াতে।
আমি চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে বললাম, বস, যেখানে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রাসুলকে ‘‘ইনশাআল্লাহ” না বলার জন্য পরীক্ষা দিতে হয়েছে সেখানে আমরা তো তাঁর তুলনায় কীট পতঙ্গের সমতুল্যও নয়। আমরা কী করে মহান আল্লাহর উপর ভরসা না করে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বসব?
প্রসঙ্গত বলে নিই, তার ওই কাজটি আমরা পোনে তিন মাসে শেষ করে দিয়েছিলাম।
তার কাজ শেষ করার পর তিনি তার নতুন একটি কাজের ওয়ার্ক অর্ডার নিয়ে কথা বলতে একদিন আমার অফিসে আসলেন। আলাপ শেষে বললাম, বস ওয়ার্ক অর্ডার টা কবে পাব?
-ইনশআল্লাহ, এই সপ্তাহেই পাবেন, তিনি চেহারা উজ্জ্বল করে বললেন।
- তাণভীর শাহরিয়ার রিমন
সিইও, র্যানকন