07/04/2026
মাঝে মাঝে কাছে একদম টাকা থাকেনা। একদমই। সেদিন ছিলো ২০৫ টাকা। সারদা থেকে রাজশাহী আসবো। ৫০ টাকা হলেই চলবে। সুতরাং কোন সমস্যা নেই। রাস্তায় এক বৃদ্ধ মানুষ এসে গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন। তাকে চিনি বলে মনে হলো না।
বললেন, "বাবা, আজ চাল কেনা হয়নি।"
কথাগুলো বলার সময় তার চোখ ছলছল করে উঠলো। দু'এক ফোঁটা পানি গড়াতেই পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে মুছে ফেললেন।
আমি আগামাথা না ভেবে ১০০ টাকা দিয়ে, সেখান থেকে সরে আসলাম। মানুষের চোখের পানি সহ্য করা কঠিন।
মাগরিবের নামাজ শেষ করে বের হয়েছি। একজন বৃদ্ধা সালাম দিলেন। তিনি মাসজিদ গেটে ভিক্ষাবৃত্তি করেন। সালামের উত্তর দিয়ে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সরে আসলাম। আমার পকেটে মাত্র ১০৫ টাকা আছে।
আধাঘন্টা মতো বাজারে লোকজনের সাথে সাক্ষাৎ করে বাসস্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছি। খেয়াল করেছি আধাঘন্টাই বৃদ্ধাটি একটু দূরে থেকে আমার আশেপাশেই ঘুরছেন। বাসস্ট্যান্ডে যেতেই তিনি সামনে এসে বললেন, "বাবা জুয়েল, একটা কথা ছিলো।"
দীর্ঘদিন এই মানুষগুলো আমাকে চেনেন। মায়ের মতো করে কথা বলেন।
বললাম, "বলেন বিটি।"
- বাবা, একটা ভীষণ বিপদে পড়েছি। একশ টাকা খুব জরুরী দরকার।"
বললাম, "বিটি, আমার কাছে ১০৫ টাকা আছে। আপনাকে দিলে রাজশাহী যাওয়ার ভাড়া থাকবেনা।"
বৃদ্ধা তাড়াতাড়ি বললেন, "ঠিক আছে বাবা। থাক থাক। রোজই তো দাও। আজ তুমি আর দিও না। আমি ব্যবস্থা করে নিবো।"
আমি কিছুক্ষণ ভাবলাম। তারপর মনে হলো এইটাই উপযুক্ত সময়। আমি আল্লাহ তায়ালার উপর ভরসা করে ১০০ টাকার নোটটা ঐ বৃদ্ধার হাতে ধরিয়ে দিলাম। বললাম, "আপনি নেন। আল্লাহ তায়ালা আমার জন্য কী ব্যবস্থা করেন দেখি।"
বৃদ্ধা বারবার ফিরিয়ে দিলেও আমি জোর করে দিলাম।
পকেটে ৫ টাকা নিয়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি। বাস চলে এলে সমস্যা। পকেটে ভাড়া নেই। মনে মনে দোয়া করছি, আল্লাহ যেন কোন পরিচিত মানুষের সাথে দেখা করিয়ে দেন। তার থেকে ৫০ টাকা কর্জ নিয়ে বাসে উঠবো।
কয়েক মিনিট হলো। পরিচিত কাউকে পেলাম না। অথচ অন্যদিন বিদায়ের সময়ও কয়েকজন সাথে থাকেন।
হঠাৎ সামনে একটি প্রাইভেট কার এসে দাঁড়ালো। জানালা খুলে বললেন "আরে জুয়েল ভাই নাহ!"
আমি চিনলাম না।
বললেন, "রাজশাহীতে আপনার অংশুতে কফি খেতে যাই মাঝে মাঝে। "
আমি "ও আচ্ছা " বলে বিনয়ের হাসি হাসলাম।
জিজ্ঞেস করলেন, "কোথায় যাবেন?"
বললাম, "রাজশাহী। "
-উঠে আসেন ভাই। গল্প করতে করতে যাওয়া হবে।
আমি উঠে বসলাম। সারা রাস্তা ভদ্রলোক কী গল্প করলেন, কিচ্ছু মনে নাই। আমি বারবার চোখ মুছতে ব্যস্ত। কী অপরিসীম প্রতিদান দেওয়ার মালিক রহমানির রহিম! তিনি চাননি, তার কোন এক পাপী বান্দা অন্যের জন্য নিঃস্বার্থভাবে সবটুকু বিলিয়ে দেওয়ার পর কষ্ট পাক।
৪৫ মিনিটে বাসার সামনে এসে নামিয়ে দিয়ে গেলেন ভদ্রলোক। আমি তাকে সত্যিই আগে দেখেছি বলে মনে হলো না। কফির দাওয়াত দিলাম। মোবাইল নম্বর চাইলাম।
মুচকি হেসে বললেন, "আজ নয়। আগামীতে যেদিন অংশুতে কফি খেতে যাবো, সেদিন মোবাইল নম্বর দিবো।"
আমার সামনে দিয়ে গাড়িটি চলে গেল। ঝাপসা চোখে আমি তার চলে যাওয়া দেখলাম। নম্বর প্লেটে নম্বরগুলো অস্পষ্ট। চোখে সবকিছু অস্পষ্ট ঝাপসা দেখাচ্ছে। আকাশের দিকে তাকালাম। স্পষ্ট দেখলাম, রহমানুর রহিমের দয়া বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে পৃথিবীর বুকে।
[Ashaduzzaman Jewel]