13/01/2024
Hefz Journey 2
দেখতে দেখতে প্রথম বর্ষ শেষ করে দ্বিতীয় বর্ষে উত্তীর্ণ হলাম।আর হলের গণরুম ছেড়ে মেয়েদের ফ্লাটে উঠলাম মেসে।যতজন ছিলাম একসাথে মোটামুটি সবাই দ্বীনদার আলহামদুলিল্লাহ।সুতরাং দ্বীন পালনটাও সহজতার মধ্য আসলো কিছুটা। একসাথে দ্বীন শেখা, টুকটাক দাওয়াতি কাজ করা,একসঙ্গে নফল ইবাদতে একজন আরেকজনের স্বরণকারী,সহযোগী হওয়া এভাবে দিন চলতে থাকলো।সেই যে মনের সুপ্ত বাসনা হেফজ করা আবার মনের মধ্যে জেগে উঠলো।আসলে রাস্তা দিয়ে যখন যেতাম তখন যদি কখনো কোন হেফজ মাদ্রাসা চোখে পড়তো বুকের মধ্যে যেন ধুক করে উঠতো।অন্যরকম এক ভালো লাগা কাজ করতো।আর নিজেকে সে জায়গায় কল্পনা করতাম।বলে রাখা ভালো শুরুতে হেফজের স্বপ্ন টা ছিলো শুধু মাত্র ভালো সুর দিতে পারবো এটাই। কেননা কুরআন তিলাওয়াত করা আমার অনেক ভালো লাগতো।কেমন যেন একটা হৃদয়ে প্রশান্তি অনুভব করতাম।আমরা যে বাসায় থাকতাম এটা ছিলো পুরান ঢাকার মধ্যে কিছুটা। আর এখানে ছিল অলিতে গলিতে হেফজ মাদ্রাসা। মাদ্রাসার পাশ কেটে যখন ভার্সিটিতে যেতাম মনে হতো যদি এখানে আবার নতুন করে পড়া শুরু করতে পারতাম।এবার পেলাম আরেকজন হেফজ সঙ্গী। দুজনেই পরিকল্পনা করে একটি মাদ্রাসায় গেলাম হেফজের ব্যাপারে কথা বলতে।যিনি প্রধান ছিলেন তিনি আমাদের সাথে কথা বলে সব কিছু শুনে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না যে আমাদের ভর্তি করাবেন কি না।
ইতস্তত বোধ করছিলেন।কেননা আমরা ভার্সিটির স্টুডেন্ট। আবার ভার্সিটিতে পড়ে এতো দ্বীনদারিত্বের ভাব কেন? কোনো ভ্যাস ধরে আবার তার কাছে যাইনি তো।না জানি তার মাদ্রাসার কোনো ক্ষতি করে ফেলি।উনার এমন ভীতিকর অভিব্যক্তি দেখে আমার মনে মনে হাসি পাচ্ছিল।যাইহোক পরে তিনি রাজি হয়েছিলেন। এ মাদ্রাসায় রয়েছে অনেক স্মৃতি আমার।এখনো কুরআন পড়তে গেলে প্রতিটা পৃষ্ঠায় সে স্মৃতিগুলো ভেসে উঠে।যাইহোক প্রথম দিন ক্লাসে গেলাম আবারও সেই পিচ্চিগুলোই।মজার বিষয় হচ্ছে যাকে উস্তাযা হিসাবে পেলাম তিনিও আমাদের থেকে কম বয়সি ছিলেন।আহা! খুব ভোরে ক্লাসে তার ঘুমের ঝিমুনি এখনো চোখে ভাসে।কি নিষ্পাপ চেহারা। চোখেমুখে লেপ্টে থাকতো তার ঘুমের ঘোর।ভর্তি তো হয়েছি কিন্তু আমার যে পড়ার গতি তাতে আমি হতাশ ই ছিলাম। কুরআন রিডিং পড়াটাই আমার এতোটা ঝরঝরে ছিলো না।তাজবিদ, উচ্চারণের ভুল আরো কত কি।শুধু সুরটাই ভালো ছিলো।কিন্তু কুরআনের মুল বিষয় ই তো হলো শুদ্ধতা।নির্ভূল উচ্চারণে পড়তে হবে।উফ! তখন কতটা হতাশা কাজ করতো সেটা এখন ভাবতেই হাসিই পাচ্ছে আসলে।একেক বয়সের একেক রকম পরিপক্কতা থাকে।এদিকে যিনি আমার সঙ্গী ছিলেন তিনি তো মাশাল্লাহ ধুমায়ে পড়া শেষ করছেন পড়া দিচ্ছেন। তার পড়া বেশ শুদ্ধ ছিলো।প্রতিদিন হাফ পৃষ্ঠা করে মুখস্থ করতেই আমার বারোটা বেজে যেত।হেফজের নিয়ম হচ্ছে পিছনের ৩০ পারা অর্থাৎ আমপারা থেকে শুরু করা। বেশির ভাগ সুরা আমি শেষ রাতে মুখস্থ করতাম কেননা ওই সময় দ্রুত পড়া মুখস্থ হতো।কিন্তু এদিকে আমার ওই পার্টনার শেষ রাতে সলাত আদায় করতেন বেশি।এটা দেখে আমার ভীষণ কষ্ট লাগতো আহা তিনি কত রিল্যাক্সে ইবাদত করেন। তাহাজ্জুদে সময় দেন কিন্তু আমি থাকি শুধু মুখস্থ নিয়ে। আরেকটা সমস্যা হচ্ছে পড়া তো সুন্দর করে মুখস্থ করতাম কিন্তু উস্তাযার কাছে গেলেই ভয়ে সব এলোমেলো হয়ে যেতো।যদিও তিনি আমার বয়সে যথেষ্ট ছোট তারপরেও উস্তাযা বলে কথা।
কত্তটা immature ছিলাম এখন ভাবলে হাসি পায়। এর মধ্যে ই উস্তাযা পরিবর্তন হয়ে গেলো।এবার যিনি আসলেন তিনি বেশ কড়া।
কিন্তু ছোটবেলা থেকেই আমার কঠিন হৃদয়ের মানুষ বা এমন আচরণ দেখায় তাদেরকে দেখে আমি অভ্যস্ত না পরিবারেও এমন কাউকে পাইনি।অর্থাৎ কড়াভাবে শাসন করা আমার পছন্দ না এমন ব্যক্তিদের থেকেও দূরে থাকতাম। আর বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখেছি হেফজের উস্তাদ- উস্তাযাগণ সব সময় একটু বেশি কড়া টাইপের হোন। আর যেহেতু ভার্সিটিতে পড়ি একটু বেশি ই নিজেকে বড় মনে হতো।প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে গেছি এমন টাইপ। তো এই নতুন উস্তাযা এসে যখন এমন শাসন করতো ভীষণ ইগো কাজ করতো।আমার ভাব খানা এমন যে আমরা তো নিজ ইচ্ছাতেই পড়তে আসছি আর আমি তো যথেষ্ট matured তাহলে আমাকেও কেন ছোটবাচ্চাদের সাথে সাথে শাসন করতে হবে? উনি আসার পর নিয়ম -কানুনও বেশ কড়াকড়ি ছিল। রোজ সকালে জাস্ট টাইমে উপস্থিত থাকতে হবে।এক মিনিট দেরি করে আসলে কান ধরে উঠবস করতে হবে এবং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়া মুখস্থ করতে হবে। উমমমমম! কি এক অস্থিরতা কাজ করতো তার সামনে এসে।এমন ভয় পেতাম যে পড়া দিতে গেলেই ভুলে যেতাম অথবা তাজবিদের ভুল হতো আর হাত-পা তো ধরধর করে কাঁপত। এদিকে সকালের নিয়ম করা হলো ঠিক টাইমের মধ্যে না আসলে দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে হবে আবার কানও ধরতে হবে। পড়লাম তো বিপদে কেননা আমাদের বাসায় সকাল সকাল এতো তারাতাড়ি গেইট খোলা হয়না। দারোয়ান মামার সাথে কথা বললাম তিনি সকালে কয়েকদিন খুলে দিলেন কিন্তু বিরক্ত হলেন।তারপর কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ চলে গেলো আমরা তার ঘুমের ডিস্টার্ব করি সকাল বেলা গেইট খুলি।সিনিয়র আপুদের ডাকা হলো তাদের সাথে কথা বলার জন্য। উফ" কি এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলেছিলাম তাদের। আল্লাহ আপুদের উত্তম যাজা দান করুন উনাদের একটু বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল আমার জন্য। কিন্তু ফিরে এসে কোন বাজে রিএক্ট ই তারা করেন নি।আর এটাই ইসলামের সৌন্দর্য আলহামদুলিল্লাহ। এদিকে দেরি করে যাওয়ায় আমিও কয়েক দিন শাস্তি পেলাম।ছোট বাচ্চাদের সামনে লজ্জা পাচ্ছিলাম আবার রাগও কাজ করছিলো।এদিকে পড়া নেওয়ার বেলাতেও এত্তো কড়া নিয়ম ছবকের কোথাও ভুল হওয়া যাবে না।সবিনার তিন জায়গার বেশি ভুল হলে সেটা নেওয়া হবে না।এতো এতো নিয়মের ভীরে নিজেকে খুব অসহায় লাগছিল। এগুলো আমার মেনে নিতে যতোটা কষ্ট হচ্ছিল আমার যে পার্টনার ছিল তিনি ততোটাই সহজতার সাথে এগোচ্ছেন ব্যাপার সত্যি বিস্ময়কর ছিলো।পরে উনি আমাকে বুঝালেন দেখ বিদ্যা অর্জনের বেলায় এতো ইগো থাকতে নেই।এভাবেই ৩ মাস লেগে গেলো আমপারা শেষ করতে আর আমারও নতুন হলে লিগ্যাল সিট দেওয়া হলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।কিন্তু আমার হল থেকে মাদ্রাসা অনেক দূরে পরে গেলো।আর আমিও মনে মনে খুশি হলাম আরে একটা অসিলা খুঁজে পাওয়া গেলো আর আসবো না এখানে।দম বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।আর এক পারা যখন মুখস্থ শেষ হলো তখন কি যে খুশি আমি।কত সুরা এখন আমার মুখস্থ। বড় বড় সুরা দিয়ে লম্বা টাইম সলাত পড়তে পারবো।এসব ভেবে আনন্দিত হলাম।অবশেষে হলে চলে আসলাম ওদিকে আর যাওয়া হলো না।ফলে আবারো দের বছরের মতো আমার পড়া বন্ধ ই থাকলো।কিন্তু এখন সেই শাসন গুলো ভীষণ মিস করি সত্যি যদি এগুলো মন থেকে মেনে নিয়ে পড়তাম অনেক অনেক উপকার হতো আমার জন্য। আমি সত্যি অনেক বড় একটি নিয়ামত মিস করেছি উস্তাযার সান্নিধ্য ছেড়ে।কেননা ওই সময় তার কড়া শাসনে যে পাকাপোক্ত ভাবে সুরাগুলো মুখস্থ করেছিলাম সেটা কখনো ভুলিনি।তাজবিদের ভুল কখনো হয়না।পরে যে উস্তাযার কাছে পড়া দিয়েছি উনারা কোন ভুল ধরতে পারেন নি। যাইহোক পরের দের বছর আবারো হেফজ পুরোপুরি বন্ধ না থাকলেও অল্প অল্প করে মুখস্থ করতে থাকলাম আর একে ওকে ধরে পড়া শুনাতাম।এদিকে কিছু কিছু জুনিয়র সিনিয়র আমার হেফজের কথা জানতেন তারা আপডেট জানতে চাইতো কি অবস্থা আমি তাদের কে দেখলে বা এমন ধরনের কথা আসলে এড়িয়ে যেতাম................