11/11/2024
একটি সুবিখ্যাত হাদিস। এক সাহাবি আল্লাহর রাসুল সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে জিগ্যেস করলেন বাবা-মা দুজনের মধ্যে কার হক তার ওপর বেশি।
আল্লাহর রাসুল বললেন, ‘তোমার মায়ের’।
সাহাবি আবার জিগ্যেস করলেন, ‘তারপর?’
নবিজি আবার বললেন, ‘তোমার মায়ের’।
উক্ত সাহাবি প্রশ্ন করা থামালেন না। তিনি পুনরায় জিগ্যেস করলেন, ‘তারপর?’
আল্লাহর নবি একই উত্তর দিলেন—‘তোমার মায়ের’।
চতুর্থবারের মতো সাহাবি জিগ্যেস করলেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, তারপর?’
এবার নবিজি সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তোমার বাবার’।
আব্বার চেয়ে আম্মার সাথে আমার বোঝাপড়াটা ভাল। দুজনের জন্যে যদিও আমার বুকে মহাকাশ পরিমাণ ভালোবাসা জমা, তথাপি, যদি জিগ্যেস করা হয় দুজনের মধ্যে কাকে বেশি ভালোবাসি, অবশ্যই আম্মার কথাই বলবো। যেহেতু আম্মার জন্যে টানটা একটু বেশিই, ফলে বিয়ের আগে এই হাদিসটা যতবার পড়তাম ততবার খুব ভাল লাগত।
কিন্তু, বিয়ের পর, যখন সংসারের যাবতীয় দায় দায়িত্ব কাঁধে আসলো, যখন সকলের দেখভাল করা, সকলের প্রয়োজন, আবদার, ইচ্ছাগুলো পূরণের সাথে আমার পরিশ্রম আর ছুটোছুটিটা একাত্ম হয়ে গেল, আমার প্রায়ই মনে হতো—আচ্ছা, একজন পুরুষ পরিবারের জন্য এতো পরিশ্রম করে, এতো ত্যাগ স্বীকার করে, কিন্তু সেই বিখ্যাত হাদিসে আল্লাহর রাসুল সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম টানা তিনবার কেন শুধু মায়ের কথাই বলেছিলেন?
কোনো অভিযোগ থেকে নয়, এর পেছনের রহস্যটা বুঝতে চাওয়া শুধু।
তারপর, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার অপার রহমতে বাবা-মা হওয়ার সংবাদটা এক পশলা বৃষ্টির মতো সজীবতা নিয়ে আমাদের জীবনে আসে, আলহামদু লিল্লাহ।
একজন নারী ‘মা’ হয়ে উঠার কালে যে সময়টার ভেতর দিয়ে যায়, সেই সময়টাকে আমি খুব কাছ থেকে পরখ করেছি। সন্তান গর্ভে আসবার পর একজন নারী শারীরিক, মানসিক এবং আচরণগত কতোটা পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যায়—তা গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করার পরে আমার মনে হয়েছে—সেদিনের ঘটনায় চতুর্থবারে বাবার কথা বলার পর পঞ্চমবারে যদি উক্ত সাহাবি পুনরায় জিগ্যেস করতেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, তারপর কার অধিকার?’, আমার ধারণা, আল্লাহর রাসুল আবার মায়ের প্রসঙ্গে ফিরে যেতেন এবং বলতেন—‘তোমার মায়ের’।
একটা সন্তান গর্ভে ধারণ করা মানে আলাদা একটা শরীরকে নিজের ভেতরে বড় করে তোলা। দাঁতের মাড়িতে সামান্য একটু মাংশ বাড়লেই ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে যাই আমরা। অথচ, একজন নারী তার গর্ভে জায়গা দেয় একটা আস্ত মানবশরীর। শুনতে বেশ সাধারণ মনে হলেও, এটা কিন্তু অত্যন্ত ভাবনা-জাগানিয়া একটা ঘটনা।
এটা এতোই চমকপ্রদ, চিন্তা জাগানিয়া এবং কষ্টসাধ্য ঘটনা যে—সূরা লুকমানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা স্পষ্ট করেই বলেছেন—‘তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে গর্ভে ধারণ করে’। (সুরা লুকমান, ১৪)
একজন নারী তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়টা পার করে গর্ভকালীন সময়গুলোতে। খেতে পারে না, ভালো করে হাঁটতে পারে না, বসতে পারে না। বিছানায় আরাম করে শুতে পারে না। সারাদিন বকবক করা যে মেয়ের অভ্যেশ, কিন্তু গর্ভের সময়ে সেই মেয়েটাও দুটো শব্দ উচ্চারণ করতে হাঁপিয়ে উঠে। ভালোমন্দ পেটে গেলেই বমি হয়ে যায়।
তবে, শারীরিক এই পরিবর্তনের চেয়ে মানসিক পরিবর্তনটাই যেন তার জন্যে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে সামনে আসে। প্রেগন্যান্সি রিলেটেড যেকোনো লিটারেচারে দেখা যায়, ডাক্তারেরা বলেন—হরমোনাল ইমব্যালেন্সের কারণে গর্ভকালীন সময়ে মেয়েরা খুব উদ্ভট আর অদ্ভুত আচরণের ভেতর দিয়ে যেতে পারে।
জীবনে যে আচরণ করার কথা সে কোনোদিন ভাবনাতেও আনবে না, হরমোনাল ইমব্যালেন্সের কারণে গর্ভকালীন সময়ে হরহামেশাই সে ওই আচরণ করে বসতে পারে।
গর্ভকালীন এই সময়ে শারীরিক পরিবর্তনের ধাক্কা আর মানসিক পরিবর্তনের ধাক্কা—উভয় চাপ সামলাতে গিয়ে মেয়েরা অনেকসময় ভীষণ হতাশার মধ্যে নিমজ্জিত হয়। দুঃশ্চিন্তা আর দূর্ভাবনার কারণে এই সময়টায় তাদের সাথে দূরত্ব তৈরি হয় অনেককিছুর সাথে। শুধু মানুষের সাথেই নয়, গর্ভকালীন এই সময়টায় তারা আল্লাহর স্মরণ থেকেও অনেকটা ছিটকে যায়। সঠিকভাবে আমল আর ইবাদাতগুলোতে মন বসাতে পারে না।
গর্ভকালীন সময়ে একজন নারী কী খাবে, কীভাবে ঘুমোবে, কীভাবে কথা বলবে—ইত্যাদি বিষয়ে অনেক লিটারেচার পাওয়া যায়। কিন্তু, নির্দিষ্ট এই সময়টাতে একজন নারী কীভাবে আল্লাহর সাথে সম্পর্কটা ধরে রাখবে, কীভাবে সেই সম্পর্কে ‘শুন্যতা’ তৈরি হওয়া আটকাবে, কীভাবে আল্লাহর সাথে সম্পর্কটাকে আরো উন্নত করবে—এই বিষয়ে লিটারেচার এতো অপ্রতুল যে, একজন মুসলিম নারীকে গর্ভকালীন সময়ের প্রস্তুতি, করণীয় আর বর্জনীয় সম্পর্কে পড়তে দেওয়ার জন্য ভালো বই খুঁজে পাওয়াই মুশকিল।
আলহামদুলিল্লাহ, গত একুশে বইমেলায় আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘মা হওয়ার দিনগুলোতে’ বইটি এই অপ্রতুলতার জায়গায় একটি অত্যন্ত উপকারি সংযোজন বলে বিশ্বাস করি। একজন মুসলিম নারী তার গর্ভকালীন কঠিন সময়টাতে শুধু শারীরিক ধাক্কা নয়, মানসিক ধাক্কাটাও সামলিয়ে কীভাবে তার রবের সাথে সম্পর্কটাকে উন্নত থেকে উন্নততর করে তুলতে পারবে, অনাগত সন্তানকে ঘিরে কীভাবে সাজাবে যাবতীয় পরিকল্পনা—এসবকিছু নিয়ে এই বইটি।
যারা মা হবে, মা হতে যাচ্ছে কিংবা মা হতে চায়—এমন সকল নারীর জন্যে অত্যন্ত উপকারি একটি বই হয়ে উঠতে পারে এটি, ইন শা আল্লাহ। গর্ভকালীন সময়ে শারীরিক পরিচর্যা শুধু নয়, আত্মার পরিচর্যাটাও কীভাবে করবে—সেই বিষয়ে বাংলা ভাষায় প্রকাশ হওয়া একটি অনবদ্য বই এটি, আলহামদু লিল্লাহ।
যারা গর্ভকালীন এই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাবেন বা যাচ্ছেন, তাদেরকে এই বইটি পড়বার জন্য বলবো। এটি শুধু বই নয়, যেন একজন সুহৃদ, হাতেকলমে পাশে বসে শিখিয়ে দিচ্ছেন সময়টাকে কীভাবে সর্বোচ্চ উপায়ে কাজে লাগানো যায়, কষ্টের এই সময়টাতে কীভাবে নিজের জীবনে আল্লাহকে আরো ভালোভাবে চেনা যায়, আরো বেশি করে ভালোবাসা যায়।
বইটি প্রকাশ করেছে Sukun Publishing
তাদেরকে ম্যাসেজ করে বইটি সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানা যাবে। অথবা, বইটি সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে কিংবা অর্ডার করতে ভিজিট করা যায় তাদের ওয়েবসাইটে—
https://sukunpublishing.com/book/ma-howar-dingulote/
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যেন মায়েদের এই ত্যাগ, এই কষ্টকে অনুধাবন করে, জাগতিক সবকিছুর উর্ধ্বে তাদেরকে ভালোবাসা আর ভালো রাখাটাকে আমাদের অন্তরে গেঁথে দেন। আমীন।