20/03/2026
ঈদের রাতের আমল প্রসঙ্গ এবং ঈদের দিনের আমলগুলো সহিহ হাদিসের আলোকে
▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬
❑ ঈদের রাতের আমল প্রসঙ্গে:
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি ইবাদতের উদ্দেশ্যে দুই ঈদের রাতে জেগে থাকবে, তার অন্তর সেদিন মরবে না, যেদিন অন্তরগুলো মরে যাবে।’’ (অর্থাৎ, কিয়ামতের দিন তার ভয় থাকবে না) [ইমাম ইবনু মাজাহ, আস-সুনান: ১৭৮২; হাদিসটি দুর্বল। ইমাম নববি, ইমাম ইবনু হাজার, শায়খ আলবানি (রাহিমাহুমুল্লাহ্)-সহ প্রায় সকল মুহাদ্দিস হাদিসটিকে দুর্বল বলেছেন]
ঈদের রাতের বিশেষ মর্যাদা বা আমলের ব্যাপারে কয়েকটি হাদিস এসেছে। মুহাদ্দিস ইমামগণ সর্বসম্মতভাবে সেগুলোকে ‘দুর্বল’ বলেছেন। তবে, যেহেতু সাধারণ ফজিলতের ক্ষেত্রে দুর্বল হাদিসের উপর আমল করতে অসুবিধা নেই, তাই অধিকাংশ আলিম ঈদের রাতে নেক আমল করা ‘মুস্তাহাব’ (ভালো কাজ) গণ্য করেছেন। অতএব, কেউ চাইলে ঈদের রাতে সাধারণভাবে যেকোনো নেক আমল করতে পারেন। [ইমাম শাফিয়ি, কিতাবুল উম্ম: ২/৪৮৫; ইমাম নববি, শারহু মুসলিম: ৮/৭১; ফাতাওয়া মাহমুদিয়্যাহ: ২/৩৩৫]
অবশ্য বিশুদ্ধ হাদিস না থাকায় কোনো কোনো আলেম এই রাতের বিশেষত্বকে সম্পূর্ণভাবে নাকচ করেছেন। তবে, অধিকাংশ আলিম বলেছেন, যেহেতু দুর্বল হাদিস আছে, সেহেতু এই রাতকে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ মনে করে নেক আমল করতে অসুবিধা নেই। তবে, এই রাতের নির্দিষ্ট কোনো আমলের কথা সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়নি। তাই, এই রাতে তিলাওয়াত, নফল নামাজ, যিকর, দু‘আ, দরুদ, ইস্তিগফার ইত্যাদি যেকোনো নেক আমল করতে পারেন।
❑ ঈদের দিনের উল্লেখযোগ্য আমল ও আদব:
❖ ঈদুল ফিতরে কিছু খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া এবং ঈদুল আজহায় কিছু না খেয়ে যাওয়া সুন্নাহ:
বুরায়দা (রা.) বলেন, ‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন কিছু না খেয়ে বের হতেন না এবং ঈদুল আজহার দিনে ফিরে আসার আগে কিছুই খেতেন না। ফিরে এসে তাঁর কুরবানির পশুর মাংস থেকে খেতেন।’ [ইমাম তিরমিযি, আস-সুনান: ৫৪২; ইমাম আহমাদ, আল-মুসনাদ: ১৪২২; হাদিসটি সহিহ]
সুন্নাত হলো, ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে বিজোড় সংখ্যক খেজুর খাওয়া। [ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ৯৫৩]
❖ ঈদের দিনে বেশি বেশি তাকবির বলা: (পুরুষরা শব্দ করে, নারীরা নীচু আওয়াজে)
হাদিসে এসেছে, ইবনু উমার (রা.) উভয় ঈদে তাকবির বলে বলে ঈদগাহে যেতেন। [ইমাম হাকিম, আল-মুসতাদরাক: ১০৫৬]
একটি সুন্নাহসম্মত তাকবির:
اَللّٰهُ أَكْبَرْ اَللّٰهُ أَكْبَرْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ وَاللّٰهُ أَكْبَرْ اَللّٰهُ أَكْبَرْ وَلِلّٰهِ الْحَمْد
আল্লা-হু আকবার, আল্লা-হু আকবার; লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াল্লা-হু আকবার, আল্লা-হু আকবার; ওয়া লিল্লা-হিল হামদ।
(আল্লাহ সবচেয়ে বড়; আল্লাহ সবচেয়ে বড়; আল্লাহ ছাড়া কোনও উপাস্য নেই। আল্লাহই সবচেয়ে বড়; আল্লাহই সবচেয়ে বড়; আর আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা)
এটি প্রখ্যাত সাহাবি ইবনু মাস‘উদ (রা.) ও অন্যান্য পূর্বসূরিদের থেকে প্রমাণিত। [ইমাম দারা কুতনি, আস-সুনান: ১৭৫৬; শায়খ আলবানি, ইরওয়াউল গালিল: ৬৫৪; বর্ণনাটির সনদ সহিহ]
আরেকটি বিশুদ্ধ সনদের সহজ তাকবির:
প্রখ্যাত সাহাবি সালমান আল ফারসি (রা.) বলেন, ‘তোমরা তাকবির দাও (এভাবে)—
اَللّٰهُ أَكْبَرْ اَللّٰهُ أَكْبَرْ اَللّٰهُ أَكْبَرْ كَبٍيْرًا
আল্লা-হু আকবার, আল্লা-হু আকবার, আল্লা-হু আকবার কাবি-রা
(আল্লাহ সবচেয়ে বড়; আল্লাহ সবচেয়ে বড়; আল্লাহ সবচেয়ে বড়; তিনি মহান)।’
[ইমাম বাইহাকি, ফাদ্বাইলুল আওক্বাত: ২২৭; ইমাম ইবনু হাজার, ফাতহুল বারি: ২/৪৬২; বর্ণনাটির সনদ সহিহ]
এছাড়াও আরও তাকবির বর্ণিত হয়েছে। তবে, এ দুটোই উত্তম ও প্রসিদ্ধ।
আলিমগণ বলেন, ঈদের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর (সূর্যাস্ত) থেকে ঈদের নামাজ পর্যন্ত নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বেশি বেশি তাকবির দিতে থাকবে। নারীরা চুপে চুপে (শুধু নিজে শুনতে পেলেই যথেষ্ট) আর পুরুষরা আওয়াজ করে। [ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ, মাজমু‘উ ফাতাওয়া: ২৪/২২০; ইমাম ইবনুল কায়্যিম, যাদুল মা‘আদ: ২/৩৬০; ইমাম শামি, রাদ্দুল মুহতার: ৩/৬১; আল্লামা উসমানি, ইলাউস সুনান: ৮/১৫৬]
❖ ঈদগাহে যাওয়া-আসায় রাস্তা বদলানো উত্তম।
জাবির (রা.) বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিন (যাওয়া-আসায়) রাস্তা পরিবর্তন করতেন। [ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ৯৮৬]
❖ সামর্থ্যবান হলে পায়ে হেঁটে যাওয়া সুন্নাহ।
ইবনু উমার (রা.) বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেঁটে হেঁটে ঈদের (নামাজের) জন্য যেতেন এবং হেঁটে হেঁটে ফিরতেন। [ইমাম ইবনু মাজাহ, আস-সুনান: ১২৯৪; হাদিসটি হাসান]
❖ ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়:
মুহাম্মাদ বিন যিয়াদ আল আলহানি (রাহ.) বলেন, আমি সাহাবি আবু উমামা আল বাহিলি (রা.)-কে ঈদের দিন তাঁর সাথীদের উদ্দেশ্যে বলতে দেখেছি—
تَقَبَّلَ اللّٰهُ مِنَّا وَمِنْكُمْ
[তাক্বাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম]
অর্থ: আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের পক্ষ থেকে (নেক কাজগুলো) কবুল করুন। [ইমাম বাইহাকি, আস-সুনানুল কুবরা: ৬২৯৬ ও শু‘আবুল ঈমান: ৩৭২০; বর্ণনাটির সনদ হাসান]
অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘তাক্বাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা।’ অর্থ: আল্লাহ আমার ও আপনার পক্ষ থেকে (নেক কাজগুলো) কবুল করুন।
তবে, ‘ঈদ মুবারক’ বা এজাতীয় আঞ্চলিক পরিভাষা দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোও বৈধ। এতে কোনো সমস্যা নেই। এ ব্যাপারে আলিমগণ একমত।
❖ ঈদের দিনে গোসল করা ও নতুন কাপড় বা পরিচ্ছন্ন কাপড় পড়া সুন্নাহ। [ইমাম মালিক, আল-মুওয়াত্তা: ৪১৪; ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ৯৪৮]
❖ সামর্থ্য থাকলে সুগন্ধি ব্যবহার করা:
ইমাম মালিক (রাহ.) বলেন, ‘আমি আলিমদের কাছ থেকে শুনেছি, তাঁরা প্রত্যেক ঈদে সুগন্ধি ব্যবহার ও সাজ-সজ্জা করাকে মুস্তাহাব (উত্তম কাজ) বলেছেন।’ [আল-মুগনি লি ইবনি কুদামাহ]
❖ ফিতরা আদায় করা:
আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকজনের ঈদের নামাজে বের হওয়ার পূর্বেই যাকাতুল ফিতর (ফিতরা) আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। [ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ১৫০৯]
❖ ঈদের নামাজের তাকবিরসংখ্যা:
মোটাদাগে এদেশে অধিকাংশ মানুষ অতিরিক্ত ৬টি তাকবিরে ঈদের নামাজ আদায় করেন আর আহলে হাদিস মাসলাকের অনুসারীগণ ১২ তাকবিরে আদায় করেন। দুটোই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবিদের থেকে সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং এ বিষয় নিয়ে ঝগড়া করা উচিত নয়। [১২ তাকবিরের হাদিস: সুনানে আবু দাউদ: ১১৪৯; ৬ তাকবিরের হাদিস: মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক: ৫৬৮৬ ও ৫৬৮৭; দুটো হাদিসই সহিহ]
❖ ঈদের নামাজে নারীদের অংশগ্রহণ:
প্রায় সমস্ত আলিম মত দিয়েছেন—ঈদ ও জুমার নামাজে নারীদের অংশগ্রহণ করা জরুরি নয়। আলিমগণের একাংশ নারীদের ঈদের জামাতে অংশগ্রহণের ব্যাপারে বেশ জোর দিয়েছেন। তাঁরা উম্মু আতিয়াহ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসের দলিল দিয়েছেন। [ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ৯৭৪ ও ৯৮১; ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ: ১৯৩০]
তবে, হানাফি মাযহাবের অনেক আলিমের মতে, স্বাভাবিকভাবে নারীদের ঈদের জামাতে অংশ নেওয়া মাকরুহ (অপছন্দনীয়)। তাঁরা বলেন, বর্তমানে সেই পরিবেশ নেই, সঠিক পর্দাব্যবস্থা নেই, ফলে ফিতনার আশঙ্কা রয়েছে। তাই, নারীদের অংশগ্রহণ করা উচিত নয়। তবে, কোনো নারী অংশ নিলে তার নামাজ নষ্ট হবে না।
যাহোক, আমরা বলবো, যথাযথ পর্দা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকলে কোনোরূপ সাজসজ্জা ও সুগন্ধি ব্যতীত নারীরা ঈদের নামাজে যাবেন। বাসায় একাকী ঈদের নামাজ পড়া জায়েয নেই। কারণ ঈদের নামাজ জামাতে আদায় করতে হয়।
❖ ঈদের দিন ঈদের নামাজের আগে বা পরে কোনো নামাজ না পড়া:
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দুই রাকাত নামাজ পড়েছেন, কিন্তু এর আগে বা পরে কোনো নামাজ পড়েননি। [ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ৯৬৪]
❖ ঈদের দিনে কবর যিয়ারত করা সুন্নাহ নয়, তবে জায়েয। এটি করা যাবে। তাই বলে, এটিকে এই দিনের জন্য রীতি বানিয়ে নেওয়া উচিত নয়।
❖ ঈদের মাঠে/মসজিদে নামাজ শেষ করার পর মুসাফাহা ও কোলাকুলি করা সুন্নাহ নয়। তবে, সুন্নাহ বা জরুরি মনে না করে দীর্ঘদিন পর কারো সাথে দেখা হলে স্বাভাবিক সৌজন্যে তার সাথে কোলাকুলি করা যাবে।
সবাইকে ঈদ মুবারক।
সবার ঈদ সুন্দর কাটুক।
তাক্বাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম।