01/02/2024
“তোমরা আল্লাহর রুজ্জুকে শক্ত করে ধরো এবং পরষ্পর দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে যেও না।তোমরা স্মরণ করো,তোমরা পরষ্পরের শত্রু ছিলে, আল্লাহর অনুগ্রহে তোমরা হলে ভাই ভাই।...তোমাদের মধ্যে এমন একদল লোক থাকবে যারা সতকাজে আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ হতে সবাইকে বিরত রাখবে। প্রকৃতপক্ষে তারাই হবে সফলকাম।
”[সূরা আল-ইমরানঃ১০৩~১০৪]
⛔ Divide And Rule' নীতির সার্থকতা
বহুপূর্বে “The Sun of British Empire will never set” টাইপের একটা বাক্য প্রচলিত ছিল;সম্ভবত অনেকে এখনো বলে থাকেন।
বৃটেনের উপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদের প্রসারের সময় কথাটা বহুল প্রচলিত ছিল। ইউরোপের শিল্প বিপ্লব থেকে শুরু করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত বৃটেনের এই উপনিবেশিক আধিপাত্যের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় Ottoman Islamic Empire বা United Islamic Khilafah. ইসলামের প্রধান শক্তি ইসলামী আক্কীদার অন্যতম গুণ হচ্ছে এটি জাতিগত,বর্ণগত বিভেদ ভুলিয়ে মানুষকে একই কাতারে নিয়ে আসে। ক্রুসেডের মাধ্যমে বিফল ইংরেজরা ভালভাবেই বুঝতে পারলো যে, ইসলামের প্রধান শক্তি ভ্রাতৃত্ববোধ বা ঐক্য যার কারণে কোনো মুসলিম ভূমিতে আক্রমণ চালালে তা প্রতিহত করতে পুরো মুসলিম বিশ্বের সেনাবাহিনী প্রস্তুত থাকে।
তারা নতুন প্রকল্প হাতে নিলো। বিভাজনের প্রকল্প। কিন্তু, বিভাজন করতে হলে তো ভ্রাতৃত্ববোধ কে কিছু একটা দিয়ে প্রতিস্থাপন করা প্রয়োজন। সেটাও হলো। তারা মুসলিমদেরকে অঞ্চলভিত্তিক জাতীয়তাবাদ দিয়ে উদ্ধুদ্ধ করার লক্ষ্যে লক্ষ লক্ষ গোয়েন্দা এবং মিশনারী পাঠালো।তাদের প্রধান কাজ ছিল বিজ্ঞানের স্কুল,বিভিন্ন সোসাইটি,ক্লাব ইত্যাদির মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে ঢুকে পড়ে কিংবা মুসলিম হিসেবে আচরণ করে উগ্র জাতীয়তাবাদ উস্কে দেয়া। ফলশ্রুতিতে তৈরি হয় Young Arabs আর Young Turks এর মত উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রতিষ্ঠান। এর ফলে লোকেরা তাদের আসল পরিচয় মুসলিম এটা ভুলে নিজেদেরকে কোনো অঞ্চলের অধিবাসী যেমন আরব,তুর্কী,ফারসী,সিরিয়ান ইত্যাদি হিসেবে মনে করতে থাকে। ফলে সহজেই তৈরি হয়ে যায় ফাটল ধরানোর মত একটি গ্রাউন্ড। পরিশেষে কেবল কিছু দালালের সহায়তায় তারা এই জাতীয়তাবাদকে খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে রূপান্তরিত করে। এবং ক্রমাগত বিদ্রোহ এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা দালালদের দালালির (কামাল পাশা-আমীরুল জিহাদ, শরীফ হোসেন-হিজ্বাজের গভর্ণর ইত্যাদি) কারণে ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ মুসলমানদের সেই গৌরবময় শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটে যার সূচনা করেছিলেন মুহাম্মদ(স) মদীনায় ৬২২ সালে।
শুধুমাত্র মুসলমানদের ক্ষেত্রেই নয়,সব শোষিত ভূমিতেই বৃটিশরা একটা Common Plan করে। সেটাকে বলা হয়, “Divide And Rule”। অর্থাৎ,বিভাজন করো এবং শাসন করো। আজ আমরা মুসলিম বিশ্বের দিকে তাকালে দেখতে পাই তা ৫৭টি রাষ্ট্রে টুকরো টুকরো করে দেয়া হয়েছে এবং প্রতিটি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান এমন কাউকে রাখা হয়েছে যে কিনা মুসলিমদের বাদ দিয়ে কাফিরদের সহায়তা করছে বিভিন্নভাবে। সেটা সৌদি বাদশাহ ফয়সালই হোক, সামরিক স্বৈরশাসক গাদ্দাফীই হোক আর গণতান্ত্রিক প্রতারণাকারী জারদারী কিংবা খা #@*% - হা&% #@ হোক।
আজকে মুসলিম বিশ্বের এই দূর্দিনেও এমন অনেক তথাকথিত আলিম তৈরি হয়েছে যারা সামান্য অর্থ আর ক্ষণস্থায়ী সম্মানের বিনিময়ে হালালকে হারাম আর হারামকে হারাম বলে থাকেন। তারা বলেন, ইসলামে রাজনীতি করা হারাম,শাসকের বিরুদ্ধে টু শব্দটি করাও হারাম,আবার শেয়ার ব্যবসা হালাল,গণতন্ত্র হালাল,সুদের উপর প্রতিষ্ঠিত যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা তাও নাকি হালাল !! আজকে মুসলমানেরা নিজেরাই নিজেদের সাথে হানাহানি,রক্তারক্তিতে লিপ্ত। ছাত্ররাজনীতির নামে এদেশে করা হচ্ছে মেধা নষ্ট। ছাত্ররাজনীতির বেড়াজালে আবদ্ধ সেসব ছাত্ররা তাই আজ কলম ছেড়ে রাইফেল,হকিস্টিক আর চাপাতি ধরেছে। কেউ ধরছে ধর্মের নামে, কেউ জাতীয়তাবাদের নামে, কেউ ধর্মনিরপেক্ষতার নামে আর কেউবা ধর্মহীনতা(নাস্তিকতা) এর নামে।
বৃটিশরা প্রতিটি ঔপনিবেশ ছাড়ার আগে এমন পরিকল্পনা নিয়ে সেগুলো ছাড়ে যেন এর ফলে তাদের কিছু বৈতনিক কিংবা অবৈতনিক দালাল তৈরি হয়। তারা বুঝতে পেরেছিল যে,কেবল তিন শ্রেণীর লোকের কর্তৃত্ব নেয়া গেলেই একটি রাষ্ট্রের উপর তার অস্থায়ী হাত বরাজ থাকবে।নিচে একটি একটি করে বর্ণণা দেয়া হল।
❤️ শাসক সমাজঃ যে কোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বে নিজের ভাগ সবসময় বহাল রাখার সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম শাসক সমাজ। পশ্চিমারা ভালই বুঝছিল যে, শাসক সমাজ যদি নামে মাত্র শাসক থেকে তাদের আদেশই পালন করে, শাসক সমাজ যদি তার জনগণের চেয়ে তাদেরকেই বেশি ভালবাসে কিংবা ভয় করে,তাদের মতাদর্শ প্রচার করার জন্যই মিডিয়াকে বাধ্য করে, তার আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক আদর্শের লোকেদের দমন-উৎপীড়ন করার জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে বাধ্য করে, লোকচক্ষুর অন্তরালে দেশের খনিজ সম্পদ তুলে দেয় তাদের মাল্টিনেশনাল কোম্পানীর হাতে,তাদের সন্তুষ্টির জন্য দেশের নদীতে বাঁধ দিয়ে দেশকে পানিশুন্য করতে পারে,তাদের সন্তুষ্টি অর্জনে দেশের সেনাবাহিনী কিংবা নৌবাহিনীর সঙ্গে তাদের সখ্য গড়ার লক্ষ্যে সামরিক মহড়া করে(And so on…) তবেই তো তারা না থেকেও আছেন। না থেকেও তারা সেই লন্ডন আর ওয়াশিংটনের কার্যালয় থেকে
নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন তাদের ছেড়ে দেয়া ভূমিগুলো। তাই শাসক সমাজে কিছু বৈতনিক দালাল বসিয়ে রাখা Divide And Rule পলিসি সফল করার অন্যতম প্রধান অস্ত্র।
❤️ প্রভাবশালী ব্যাক্তিবর্গঃ এই শ্রেণীর মধ্যে পড়ে বুদ্ধিজীবী মহল এবং আলিম সমাজ। প্রথমেই আসা যাক বুদ্ধিজীবী মহলের কথায়। বুদ্ধিজীবী মহল যেকোনো দেশের মানুষের চিন্তার প্রতিফলন নয়, বরং তারা সেদেশের মানুষের চিন্তা-চেতনার নির্ধারক। যেমন ধরুন, জাফর ইকবাল কিংবা আনিসুল হকের কথা যে আমাদের সবার মনের কথা তা কিন্তু নয়। কিন্তু,তবুও তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ,বাগপটুতা সর্বোপরী কিছু ব্যবহার করা শব্দের মোহে আবিষ্ট হয়ে আমরা আমাদের বিশ্বাসের সাথে দ্বান্দ্বিক আদর্শে আক্রান্ত মগজ ও মনন নিয়ে ভেবে বসি,আরে! এটাই তো আমার মনের কথা। আমাদের মনস্তাত্বিক জগতে তাই বুদ্ধিজীবীদের একটি আলাদা স্থান আছে।আশ্চর্যজনক হলেও সত্য এই যে, বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই নিজের অজান্তেই কিছু চক্রে আবর্তন খান। তারা সব কিছুকেই পশ্চিমাদের বেঁধে দেওয়া সেকুলার লেন্স দিয়ে বিচার করেন এবং ফলশ্রুতিতে উন্নতি এবং সমাধান হিসেবে তারা গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, মানবতা কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতাকে মেনে নেবার চোরাবালিতে আবদ্ধ হয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ এ চক্রে বেতনভুক্ত, কেউ আবার বিনা বেতনেই তাদের কাজটা সেরে দেন। সুতরাং, বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক আদর্শের আদর্শিক দেউলিয়াত্বের বেড়াজালে তারা প্রায়শই হতাশ হয়ে পড়েন এবং উত্তরণের উপায় না পেয়ে বলেন, “আপনি ভালো তো জগত ভাল” কিংবা “বদলে যান,বদলে দিন।” অথচ, সমাজ ব্যবস্থা বদলানোর জন্য যে ধরে ধরে ব্যাক্তি বদলানো আর পায়ে হেটে বিলেতে গমনের স্বপ্ন দুটোই আকাশ কুসুম কল্পনা তা তাদের বোধগম্য হয় না।
আসি আলিম সমাজের কথায়।আলিম সমাজের মধ্যে দারুল উলুম দেওবন্দের মাওলানা মুহাম্মদ আলী,মাওলানা শকত আলী প্রমুখ ভারতবর্ষে ইসলামী শাসন ব্যবস্থার পতন ঠেকাতে ‘খিলাফত আন্দোলন’ গড়ে তুলেছিলেন ১৯২১ সালে। ইংরেজরা তখন বুঝছিল, এই অঞ্চলের মানুষকে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা কিংবা ব্যাক্তিগত (সেকুলার) ইসলামে আবদ্ধ রাখার জন্য এসব আলিমদের তীর্থস্থানে সমস্যা তৈরি করে না দিলে তারা আবার একসময় জনসম্মুখে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা চাইবে,যা কোনো ভাবেই কাম্য নয়। তাই তারা মাদ্রাসা বোর্ডের প্রিন্সিপাল হিসেবে বৃটিশদের রাখলো দেশ ত্যাগের আগ পর্যন্ত। মাদ্রাসার সিলেবাস তারা নিজেদের ইচ্ছামত সাজালো,সিলেবাস থেকে রাজনীতি সম্পর্কিত অংশ বাদ দিল এবং এদেরকে শায়েস্তা করার জন্য রাখলো মসজিদ কমিটি আর ইমাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
আলিম সমাজের মধ্যে ধীরে ধীরে এমন আলিম গড়ে উঠলো যারা না জেনেই একসময় প্রচলিত কুফর ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলা বন্ধ করে দিল।যারা দিল না,তাদেরকে মসজিদ কমিটি নামক নতুন কমিটি(যেখানে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যাক্তিবর্গরা ইমামদের শাসিয়ে থাকেন) এবং বর্তমানে ইমাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে সরাসরি নজরদারীতে রাখা হয়। যে ইমাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সভাপতি গণতান্ত্রিক সরকার দ্বারা নির্বাচিত,যে কেন্দ্রের অনুষ্ঠানে ‘ব্যালী ড্যান্স’ দেখাতে ইমামদের বাধ্য করা হয়,যে কেন্দ্রে ইসলামের কী কী বিষয় বলা হারাম তা লিখে পাঠায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,সেই ইমাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আসলে ইসলামের জন্য না কি কুফরের জন্য কাজ করে সেটা আপনারাই বুঝে নিন। আলিমদের মধ্যে এক সমাজ দেখলো শাসকের তোয়াজ না করে দুনিয়াতে কিছু পাওয়া যাবে না; তাই তারা ব্যাক্তিকেন্দ্রিক ইসলামে মানুষকে উৎসাহী করতে লাগলো।তারা চেপে গেলো যে ইসলামে গণতন্ত্র,সুদ,শেয়ার ব্যবসা হারাম।কেউ আবার এদের মধ্যে তৈরি হলো যারা ফতোয়া দিতে লাগলো, মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে কথা বলা হারাম। কেউ আবার ইসলামী জীবন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে উদ্যত লোকেদের ঠেকাতে বললো,আমরা অনেক কম জানি কিংবা কোরআন অনেক কঠিন, ভালো আলিম(ব্যাক্তিকেন্দ্রিক ইসলামে আহবানকারী আলিম) এর সান্নিধ্য ছাড়া কোরআনের অর্থ বা তাফসীর পড়লে বিগড়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। এভাবে তারা এই নবী-রাসূলদের ওয়ারিশ যারা,সেসব আলিম সমাজের মধ্যেও তাদের নীতি নানাভাবে ঢুকিয়ে দিল।
❤️ তরুণ-সমাজঃ যে কোনো সমাজ ব্যবস্থার পতনে কিংবা সমাজ পরিবর্তনে তরুণরা সবচেয়ে সোচ্চার ছিল। রাসূল(স) এর আদর্শ তরুণেরা বেশী নিয়েছিল।মক্কার প্রথম দিকের কঠিন সময়ে ৩৭ জন সাহাবীর ৩২ জনই ত্রিশের কোঠা পাড় করেননি। অন্যায়ের সমাজে সকল বিপ্লবের মূলে ছিল তরুণেরা চিরকাল। এমনকি ভাষা আন্দোলনে ছাত্ররা নিহত না হয়ে সাধারণ জনগণ মারা গেলে তা এতটা সফল হতো না।তাই তরুণ সমাজের নষ্টের জন্য তারা বেশ কিছু পদক্ষেপ হাতে নিল।প্রথমত, তরুণদের মধ্যে নিজেদের ‘হিরো’ হিসেবে জাহির করার আকাঙ্খা প্রবল।তাই তারা এই ‘হিরোইসম’ কে গণতান্ত্রিক দলের মাধ্যমে টুকরো টুকরো করে দিলো।এক ভাই আরেক ভাইকে মেরে হিরো সাজে, এক ভাই আরেক ভাইয়ের সর্বনাশ করে দেখায় যে সে বড় হিরো। ইসলামে যে হিরোইসম ছিলো কাফিরদের মোকাবিলা করায়, তা আজ কাফিররা বদ্ধ করে দিলো গণতান্ত্রিক দলগুলোর খাচায়। গণতন্ত্রের ব্যানারে কেউ ধর্মের নামে,কেউ জাতীয়তার নামে আর কেউবা ধর্মনিরপেক্ষতার নামে হিরো সাজে। ৫ বছর ক্ষমতার সময় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, বক্তৃতা আর পাঁচ বছর ক্ষমতাহীন অবস্থায় হরতাল আর হানাহানিতে বদ্ধ ‘হিরোইসম’ এ আক্রান্ত তরুণসমাজ। ছাত্রসমাজ আক্রান্ত ‘হল পলিটিক্সে’।এক প্রকার হলে সীট পাবার জন্য বাধ্য হয়েই এই নোংরা রাজনীতিতে ঢুকতে হয় অনেককে।কলম আজ প্রতিস্থাপিত হয়েছে চাপাতি,কুড়াল আর হকিস্টিক দিয়ে। আর মেধাবী ছাত্রদের ক্ষমতার প্রলোভন আর আরাম আয়েশের সর্বোচ্চ ব্যবস্থার অঙ্গীকার দিয়ে ইচ্ছামত কাজ আদায় করে নেয় গণতান্ত্রিক দলগুলো যাদের ভিত্তিপ্রস্তরই হচ্ছে (বিভিন্ন শ্লোগানের মাধ্যমে) প্রতারণা।
শেষ কথাঃ দিন যায়,মাস যায়,বছর যায়। বসুন্ধরা সিটি হয়,যমুনা ফিউচার পার্ক হয়,রাস্তাঘাট বদলায়,বদলায় না আমজনতার ভাগ্য। সকাল বেলা কাঁধে কোদাল নিয়ে শ্রম দিতে যাওয়া শ্রমিক কিংবা হাতে ব্রিফকেস নিয়ে মেধা বিক্রি করতে যাওয়া অফিসারের ভাগ্যে আসে না কোনো পরিবর্তন।রাতের বেলা ক্লান্ত কায়িক শ্রমিক কোদাল হাতে আর মেধা শ্রমিক ব্রিফকেস হাতে ফিরে। বিশ্বের চারিদিকে কি ঘটছে না ঘটছে তা কোনো শ্রমিকের কাছেই পরিষ্কার নয়। আরে বাবা,আগে তো খেয়ে পরে,বউ-বাচ্চার খরচ চালিয়ে বাঁচি ।পরেই না বিশ্বের চিন্তা।ওবামা খারাপ নাকি ওসামা খারাপ তাতে আমার কি আসে যায়! পত্রিকা আর মিডিয়াতে যা দেখায় তাই তো যথেষ্ঠ।পত্রিকায় যদি বলে, ইসলামের কথা যারা বলে,তারাই জঙ্গী,তবে তাই সই। এবার সে আমার ছেলে আর ছোট ভাই-ই হোক,সে জঙ্গী।পত্রিকায় যদি আনিসুল হোক বলেন, সেকুলারিসম এ-ই মুক্তি,তবে তা ঠিক।বাবারে কত বড় বুদ্ধিজীবী,তার কথা কি ঠিক না হয়ে যায়?রাজনীতি তো এক নংরা বিষয়,আমি না জড়ালেই হয়। আমাদের ভাগ্য,সে তো আল্লাহর হাতে। চেষ্টা করে দেখি,মকবুল সাহেব টাকা বানাতে পারলে আমি কেন পারব না? ছেলেমেয়ের বিয়ে দিয়ে একটি আলিশান ফ্লেটে বৃদ্ধকাল আল্লাহ-আল্লাহ করে;তওবা করে জীবনটা নির্ঝঞ্ঝাটে পাড় করে দিলেই তো হয়।
এই যে আমাদের সকলের চিন্তা ব্যাক্তিকেন্দ্রিক,এটাই তো এই Divide And Rule পলিসির সার্থকতা। তার সার্থকতা আরো এক জায়গায়, তা হচ্ছে আমাদেরকে নিজেদের মধ্যে কলহে ব্যস্ত রেখে তার কাজটা ঠিকই এই তিন শ্রেণীর মাধ্যমে তাদের জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে আদায় করে নেয়া। বিশ্বাসের সঙ্গে দ্বান্দ্বিক আদর্শের গর্তে নিমজ্জিত আমরা এটা বুঝি না যে,সবাই মুসলিম,সবাই ভাই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবির কর্মী নোমানীও আমার ভাই, ছাত্রলীগ কর্মী ফারুকও আমার ভাই।ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করলে কিয়ামতের দিনে তারা মুসলিম হিসেবেই উঠবে। পার্থক্য শুধু একজায়গায়,সেটাও কাফিরদের করে দেয়া শীমার কারণে। কেউ বুঝে এসেছে “দ্বীনের ব্যাপারে জোরাজোরি নেই” আর কেউ বুঝে এসেছে “কুফরের সাথে সমঝোতা ছাড়া ইসলাম আনা যাবে না”। অথচ, দুই জনেই ভুল বুঝে, ভুল ব্যানারে, ইসলামের মূলনীতির সাথে,আল্লাহর গুণাবলীর সাথে সাংঘর্ষিক শাসন ব্যবস্থা গণতন্ত্র নামক মাকাল ফলের কাঁটায় বিদ্ধ হয়েই এখানে এসেছে। আমরা কেন বুঝি না যে,কাফিরদের দেয়া ক্ষমতায় আমরা আমাদের ভাগ নিশ্চিত করার জন্য আমি আমার ভাইকে হত্যা করছি,ভাই এর সাথে হানাহানিতে লিপ্ত হচ্ছি। সময় এসেছে সকল অজ্ঞানতা আর মূর্খতাকে বিদায় জানিয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে যাবার।আফগানিস্তান আর পাকিস্তানের রাস্তা ধরে,জঙ্গীবাদের মিথ্যা ধুয়া তুলে কিন্তু আপনার দিকেই আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মরণ কামড় বসাতে।তখন কিন্তু সে দেখবে না, কে কোন দলের কর্মী। সে দেখবে না কোন দল কতটা গণতান্ত্রিক বা কতটা অনুগত ভৃত্য ছিল। কর্মীদের তো বটেই,প্রয়োজন ফুরালে সে সাদ্দাম,বেনেজীরের মতো নেতা কর্মীদেরও লাশ বানিয়ে ছাড়বে।সে আক্রমণ চালালে আওয়ামীলীগ,বিএনপি,জাপা,শিবিরে কোনো পার্থক্য করবে না। সবাইকেই হত্যা করবে কেবল মুসলিম হবার অপরাধে। তবুও কি আমরা তাদের দেয়া গণতান্ত্রিক বিভাজনে থাকবো নাকি এই কুফরী ব্যবস্থা বর্জন করে এক হয়ে কাফির- মুশরিকদের মোকাবিলা করবো? উত্তরটা এখন আপনি দিন আর না দিন,মনে রাখুন তারা আক্রমণ করলে আপনি ঠিকই বুঝতে পারবেন আপনারা সবাই ভাই,সবাই মুসলিম।
সবশেষে একটি আয়াত দিয়ে শেষ করবোঃ
“তোমরা আল্লাহর রুজ্জুকে শক্ত করে ধরো এবং পরষ্পর দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে যেও না।তোমরা স্মরণ করো,তোমরা পরষ্পরের শত্রু ছিলে, আল্লাহর অনুগ্রহে তোমরা হলে ভাই ভাই।...তোমাদের মধ্যে এমন একদল লোক থাকবে যারা সতকাজে আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ হতে সবাইকে বিরত রাখবে। প্রকৃতপক্ষে তারাই হবে সফলকাম।”[সূরা আল-ইমরানঃ১০৩~১০৪]
এখন Divide And Rule পলিসির দ্বারা বিভক্ত থেকে প্রতারিত হবেন নাকি একতাবদ্ধ হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি তা আপনাদের উপর।