27/03/2015
বিশ্ব নাট্য দিবস আন্তর্জাতিক বাণী-২০১৫: কৃস্তফ ওয়ারলিকভস্কি (পোলিশ নাট্য নির্দেশক)
===[বাঙলায়ন]
সত্যিকারের নাট্যগুরু হিশেবে তাঁদেরকেই খুব অনায়াসে চিহ্নিত করা যায় যাঁরা মঞ্চ থেকে নিজেদের বিযুক্ত রাখতে পারেন। প্রথাবদ্ধ ও একঘেয়েমী নাটকের পুনরাবৃত্তি ও পুনর্সৃজনে তাঁদের কোনও যান্ত্রিক আগ্রহই দেখা যায় না। তাঁরা খুঁজে ফেরে মূল স্পন্দনের উৎস, জীবন্ত স্রোতধারা, যে স্পন্দন ও স্রোতধারা মঞ্চ ও জনারণ্যকে পাশ কাটিয়ে কোনও কতিপয় জগৎকে কিম্বা অন্য কোনো জগৎকে অনুকরণ করে। আমরা জগৎ সৃজন করি না বরং একাধিক জগতের পুনঃউৎপাদন করি যার মূল উদ্দেশ্য কিম্বা বলা যায় প্রধান উপজীব্য দর্শকের সাথে বিতর্ক, তাদের অন্তর্গত আবেগের সাথে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা। সত্যিকার অর্থে নাটকের চেয়ে সফল উপায়ে আর কোনো মাধ্যমই সুপ্ত আবেগকে উন্মোচিত করতে পারে না।
পরামর্শক রূপে আমি প্রায়ই গদ্যরচনার আশ্রয় নেই। প্রতিদিনই আমি এই চিন্তায় আক্রান্ত হই সেইসব লেখক নিয়ে যাঁরা একশ বছর আগে যথেষ্ট সংযমী হয়েই ইউরোপীয় সাহিত্যের দিকদর্শীদের ক্ষয়িষ্ণুতার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, যে ক্রান্তিকাল আমাদের সভ্যতাকে গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত করেছে এবং এই মুহূর্তেও তা
পুনঃপ্রজ্বলিত হবার অপেক্ষায়। আমি ফ্রান্ৎজ কাফকা, টমাস মান এবং মার্সেল প্রুস্ত-এর কথা স্মরণ করছি। আজ এই দূরদর্শী ব্যক্তিদের সারিতে জন ম্যাক্সওয়েল কোয়েৎজিকেও আমি যুক্ত করতে চাই।
বিশ্বের প্রান্তিকতা নিয়ে তাঁদের সাধারণ জ্ঞান আমি এই গ্রহের কথা বলছি না বরং মানবজাতির পারস্পরিক সম্পর্কের রূপরেখার কথা বলছি সামাজিক বিন্যাস এবং তার টানাপড়েন নিয়ে তাঁদের ভাবনা আমাদের জন্য ঠিক এই মুহূর্তেও সূক্ষ্ম ও মর্মভেদীরূপে সাম্প্রতিক। আমরা যারা বেঁচে আছি সেই প্রান্তিক বিশ্বের পরও, বেঁচে আছি অপরাধ ও সংঘাতে নিমজ্জিত হয়ে যা আকস্মিক প্রজ্বলিত হয় নতুন নতুন স্থানে এবং দ্রুততম সময়ে, যার অনুসরণ সর্বব্যাপী গণমাধ্যমের পক্ষেও সম্ভব নয় তাদের জন্য ওই ভবিষ্যদ্বাণী প্রযোজ্য। এইসব সংবাদ সত্বরই একঘেয়ে হয়ে যায় আর সংবাদপত্রের পাতা থেকে সময়ে উধাও হয় আর কখনও ফিরে আসে না। ফলে আমরা হয়ে পড়ি অসহায়, আতঙ্কগ্রস্ত এবং দ্বিধাবিভক্ত। আমরা সাফল্যের স্তম্ভ নির্মাণ করতে অক্ষম। আর ঔদ্ধত্যের সাথে যে দেয়াল প্রস্তুত করি তা কোনোকিছু থেকেই আমাদের প্রতিরক্ষা করতে পারে না। বরং সেই দেয়ালটিকে যতেড়ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় আমাদের বিপুল পরিমাণ প্রাণশক্তি ক্ষয় হতে থাকে। ফটকের কিংবা দেয়ালের বাইরে কী অপেক্ষা করছে তা একনজর দেখার মতোও কোনো উদ্দীপনা আর বেঁচে থাকে না। আর এ কারণেই নাটককে জীবিত থাকতে হবে এবং ঠিক ওই অবস্থান থেকেই এর শক্তিমত্তাকে উদ্ধার করতে হবে। উঁকি দিতে হবে সেই গভীরে যেখানে দৃষ্টি দেয়া নিষেধ।
“পুরাণ সেই কথারই ব্যাখ্যা দিতে চায় যা ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। কারণ এর অবস্থান সত্যের উপর, এর সমাপ্তি নিশ্চিতভাবে অব্যাখ্যেয়” এভাবেই কাফকা প্রমিথিউস-পুরাণের বিশ্লেষণ দিয়েছেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি নাটককেও এভাবেই সংজ্ঞায়িত করা উচিত। আমি সেই নাটকের কথা বলছি যার প্রেরণা সত্য আশ্রয়ে এবং যার পরিসমাপ্তি থাকে অব্যাখ্যাত। আমি মনে করি বিষয়টি শিল্পকর্মে জড়িত নাট্যকর্মী মঞ্চই হোক কিংবা দর্শক সকলের জন্যেই সমভাবে প্রযোজ্য। এটি আমার হৃদয়ের গভীরের একান্ত অনুভূতি।