15/01/2026
এক পান দোকানে প্রতিদিন পান খেতে আসতেন খান সাহেব। একদিন তার নজরে পড়ে দোকানের একটি ছবির দিকে, একটি বাচ্চা ছেলের ছবি, ছবিটি দেখে খান সাহেব বললেন, বাচ্চাটি কে খুব সুন্দর লাগছে, মাথায় ময়ূরের মুকুট,
কানে কানবালা, গায়ে আছে পীত বর্ণের বসন, হাতে বংশী, পায়ে নূপুর, সবই ঠিক আছে, তবে একটি জিনিস কম আছে। ওর পায়ে জুতো নেই, শক্ত মাটি, পাথর ছিটানো রাস্তা, ওর পায়ে চোট লাগবে তাই বাচ্চাটিকে জুতা পরানোর প্রয়োজন ছিল।
পান দোকানদার মজার ছলে বললেন, "তাহলে আপনিই বানিয়ে নিয়ে আসুন জুতো!"
দোকানদারের এই কথাটি শুনে খান সাহেবের
মনে খুব লাগলো। পরের দিনই জুতো বানিয়ে
খান সাহেব দোকানে এলেন আর দোকানদারকে বললেন, "কই ডাকুন তাকে, আমি জুতো পরিয়ে দেব ওকে।"
দোকানদার বললেন, "ও তো এখানে থাকে না!"
খান সাহেব বললেন, "তাহলে কোথাই থাকে?"
দোকানদার বললেন, "সে তো ব্রজধাম শ্রী বৃন্দাবনে থাকেন।"
খান সাহেব বললেন, "তাহলে ওর নাম ঠিকানা বলুন; আমি বৃন্দাবনেই যাব।"
দোকানদার বললেন, "বৃন্দাবনের যে কোন ব্যক্তিকে বললেই দেখিয়ে দেবে; ওর নাম শ্যাম।"
খান সাহেব মন খারাপ করে চলে এলেন পাদুকা হাতে নিয়ে বৃন্দাবনের পথে আর বলছেন, "কোথায় গেলে আমি শ্যামকে পাব? কোথায় আছেন শ্যাম?"
এই বলে বৃন্দাবনের পথে ঘাটে ঘুরে ফিরছেন, কিন্তু শ্যাম নামে কোন ছেলেকে বৃন্দাবনের কেউই চেনেন না। কয়েক দিন এমন দেখতে দেখতে একজন সজ্জন ব্যক্তি তাকে সুধালেন, "কে তোমার শ্যাম? কেমন দেখতে সে, তার চেহারার বর্ননা দাও!
খান সাহেব বললেন, "খুব সুন্দর বদন, শ্যামল বরন গায়ের রং, মাথায় ঘন কালো মেঘের মতো কোঁকড়ানো চুল, মাথায় ময়ূরের মুকুট, কাজল কালো চোখ, হাত খুব সুন্দর আদুরে, পায়ে আছে রুমুর ঝুমুর নূপুর, নজর খুব আকর্ষণীয়, হাসি তার এমন যেন সবার হৃদয় জুড়ে জায়গা করে নেন।"
সজ্জন ব্যক্তি বুঝতে পারলেন খান সাহেব কার কথা বলছেন। তখন তিনি বললেন, "আপনি যাকে খুঁজছেন বৃন্দাবনে শ্যাম নামে কেউ চেনে না; সে তো বঙ্কুবিহারী, কেউ তাকে কৃষ্ণ মুরারি বলে ডাকে, কেউ বা সাবরিয়া, কেউ গোবর্ধন ধারি বলে। ওর হাজার নাম, আছে কত ধাম জগতে।
সজ্জন ব্যক্তির কথা শুনে খান সাহেব ওর ঠিকানা নিয়ে গেলেন বাকেবিহারি মন্দিরে। মন্দিরের গেঁটে পূজারী দারানো, খান সাহেব অন্য জাতি দেখে পূজারী তাকে ঢুকতে দিচ্ছেন না, খান সাহেব অনেক কাকুতি মিনতি করেছেন পূজারীর কাছে , তাকে কিছুতেই ঢুকতে দিলেন না।
খান সাহেব মন্দিরের শিড়ীর নিচে বসে বসে বলেছেন, "শ্যামের সাথে আমার অনেক বর কাজ আছে, আমাকে শ্যামের কাছে যেতে দিন, ঘরের ভেতরে যে আছেন তার সাথে আমাকে দেখা করতে দিন!"
এই বলে কাঁদতে কাঁদতে সারারাত জেগে থাকলেন। রাত্রি প্রায় শেষের দিকে, ভোর হতে যাচ্ছে এমন সময় এক বিকট শব্দ শুনতে পেলেন। খান সাহেব এদিক ওদিক তাকিয়ে কিছু দেখতে পেলেন না, চারিদিকে তাকিয়ে দেখলেন কিছুই দেখতে পেলেন না।
হঠাৎ নীচের দিকে তাকিয়ে দেখেন, সেই ছবির শ্যাম বসে আছে। খান সাহেব তাকে পেয়ে বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরলেন, খুব আদর করতে লাগলেন, পাদুকা পরাতে যখন শ্যামের পায়ের দিকে তাকালেন দেখতে পেলেন শ্যামের পা দিয়ে রক্ত ঝরছে।
খান সাহেব বললেন, "আমি ছবি দেখেই বুঝে ছিলাম পায়ের অবস্থা এমন হবে, তুমি যদি আগে থেকেই আমাকে ডাকতে তাহলে এমন হতো না; আমি চলে আসতাম, তাহলে না বিনতো কাঁটা, না বেরুতো রক্ত।"
তার পর শ্যাম খান সাহেবের হাত ধরে নিয়ে গেলেন মন্দিরের ভিতরে। ভেতরে নিয়ে গিয়ে
তার বাকেবিহারি মূর্তির দিকে দেখিয়ে বললেন, "তোমাকে যদি আগেই মন্দিরের ভিতরে ঢুকতে দিতাম, তাহলে তুমি কি আমার এই রূপ দেখতে পারতে! চিনতে আমাকে?
তোমার মনে কি এই রুপ রেখেছিলে আমার জন্য? পারতে চিনতে আমাকে? না পারতে না! তাই তো ছবিতে যে রূপে আমাকে দেখেছো, আমি সেই রূপেই ধরা দিয়েছি তোমার কাছে। গোকুল থেকে পায়ে হেঁটে এসেছি তোমার জন্য ব্রজধামে।"
ভগবানকে আমরা মন থেকে যে রূপে দেখতে চাই, ভগবান সেই রূপেই ধরা দেন। শ্যামের কথা শুনে খান সাহেব শ্যামের প্রেমে পড়ে গেলেন; বললেন, "তোমার চরণে ঠাঁই দাউ আমাকে,
তোমার চরণ তলেই আমার ঠিকানা, তুমি যে এই জগতের মালিক আমি সেটা বুঝতে পেরেছি। আজ থেকে আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, তোমার গুনগান আমি লিখবো, সকলের কাছে প্রচার করবো।"
🙏 রাধে রাধে 🙏
© Krishna Kotha - কৃষ্ণ কথা