01/03/2026
বিসমিল্লাহ্ এর ফজিলত
بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
উচ্চারণঃ বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
ভুমিকাঃ ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ বাক্যবন্ধটি পবিত্র কোরআনের সুরার অংশ। ‘বিসমিল্লাহ্’ বলে সব শুরু করা সুন্নত। ইসলামি শরিয়তের মূলনীতি হলো, প্রত্যেক ভালো কাজ ‘বিসমিল্লাহ’ বলে শুরু করা উচিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন, ' বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম উচ্চারণ না করে যে কোনও কাজ করা হলে তা সমস্ত বরকত থেকে বঞ্চিত হয়।' বিসমিল্লাহ্ বলা মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর আগে পূর্ববর্তী নবীগণেরও সুন্নাত ছিল। এতে আল্লাহর তিনটি সুন্দর নাম রয়েছেঃ ১) আল্লাহ্ ২) আর রহমান ৩) আর রহীম।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম এর বাংলা অর্থঃ ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ একটি আরবি বাক্যবন্ধ; যুগল বাক্য। এর সরল বাংলা অর্থ, পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহ তা’য়ালার নামে (শুরু করছি)। এ বাক্যে ‘শুরু করা’ ক্রিয়াটি ঊহ্য। এর উদ্দেশ্য যেকোনো ভালো ‘কাজ’ বা ‘নেক আমল’ আল্লাহর নামে শুরু করা।
প্রাসঙ্গিক আলোচনা ও গুরুত্বঃ বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম‘র এর গুরুত্ব অপরিসীম। “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” কোরআন শরীফের সূরা নামলের একটি আয়াত বা অংশ। কোরআনুল কারিমের দিকে তাকালে দেখবো পবিত্র কুরআন শরীফের ১১৪টি সূরার মধ্যে সূরা তওবা ব্যতিদরেকে বাকি ১১৩টি সূরা শুরু করা হয়েছে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রহীম” দিয়ে। ইমাম আবু হানিফা (র) বলেন- ‘এটা এমন একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ আয়াত যা প্রত্যেক সূরার প্রথমে লেখা এবং দু’টি সূরার মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করার জন্য অবতীর্ণ হয়েছে।’ কোরআন শরীফের স্থানে স্থানে উপদেশ রয়েছে যে, প্রত্যেক কাজ “বিসমিল্লাহির রাহমানির রহীম” বলে আরম্ভ কর। মুসনাদে আহমাদ, ১৪/৩২৯ নং হাদীসে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু এঁর বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘প্রত্যেক কথা বা কাজ যা আল্লাহর নাম ছাড়া শুরু করা হয়, তা লেজবিহীন বা অসম্পূর্ণ (বরকতশূন্য)।’
কলেমা শরীফ, লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) পাঠ করা যেভাবে উত্তম যিকর, তেমনি বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম পাঠ করাও আল্লাহর মাকবুল ও উত্তম যিকর।
ফজিলতঃ
▪️যখনই আমরা বিসমিল্লাহ্ বলে কিছু শুরু করি , আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাতে বিশেষ বরকত বর্ষণ করেন। তিনি কাজের মধ্যে যে কোনও ত্রুটি থাকলে তা দূর করেন, এটিকে সমৃদ্ধ করতে সাহায্য করেন এবং শয়তানের প্রভাব দূর করে দেন।
▪️আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাযাহ্ শরীফে হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, প্রত্যেক ভাল কাজ যেটা বিসমিল্লাহ্ দ্বারা শুরু করা হয়না সেটা লেজবিহীন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
▪️বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম আল্লাহ্ তায়ালার সর্ব শেষ গ্রন্থ কোরআনে কারীমের হীরক খন্ড, যা কারো দিলে একবার বসে গেলে সেখানেই ঘর বানিয়ে নেয়। বিসমিল্লার আমল যার দিলে থাকবে তাকে যে সম্মান, শান্তি, বরকত ও মহত্ব দান করা হয় অন্য কোনো আমলের দ্বারা তা সম্ভব নয়। বিসমিল্লার ‘বা’ এর নুকতার বরকতে আল্লাহ্ তা’য়ালার যে রহমতের ঝর্না ধারা প্রবাহিত হয়, সমস্ত মাখলুক সেই রহমত থেকে উপকৃত হতে থাকে।
▪️হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু জনাবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এরশাদ ফরমান – যে ব্যক্তি বিসমিল্লাহির রাহমানি রাহীম পাঠ করবে আল্লাহ্ তায়ালা তাকে প্রত্যেক হরফের পরিবর্তে চার হাজার নেকি দান করবেন, চার হাজার গুনাহ মাফ করে দিবেন, এবং চার হাজার সস্মান বৃদ্ধি করে দিবেন। -নুজহাতুল মাজালিশ।
▪️বিসমিল্লার মধ্যে ১৯টি হরফ আছে, এই ১৯টি হরফ একবার পাঠ করবার কারনে ৭৬ হাজার নেকি দান করা হবে, ৭৬ হাজার গুনাহ্ মাফ করা হবে, এবং ৭৬ হাজার সম্মান বৃদ্ধি করা হবে। সুবহানাল্লাহ্ আল্লাহ্ রব্বে কারীম কত বড় দেনেওয়ালা তা মানুষের কল্পনাতীত অতুলনীয়।
▪️যখন বিসমিল্লাহ্ শরীফ নাযিল হয় তখন শয়তান লজ্জায় মাথায় মাটি মাখে এবং তাকে পাথর নিক্ষেপ করে বেইজ্জত করা হয়। অতঃপর আল্লাহ্ রাব্বুলআলামিন স্বীয় ইজ্জত ও বড়ত্বের কসম করে বলেন – যে কাজের মধ্যেই আমার বান্দা আমার এই বরকতপুর্ন নাম নিবে সে কাজের মধ্যে আমি বিপুল বরকত দান করবো। কোন রোগী যদি পাঠ করে তবে আমি পূর্ন আরোগ্য দান করবো। অবশেষে পাঠ কারীকে জান্নাতে প্রবেশ করাবো। সুবহানাল্লাহ্।
▪️হজরত আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, আদম সন্তান যখন কাপড় খোলে, তখন তার সতর ও নিজদের চোখের মধ্যবর্তী পর্দা হচ্ছে বিসমিল্লাহির-রাহমানির রাহীম`। তাহলে আল্লাহ ইচ্ছা করলে বিসমিল্লাহর আমলকারীদের জন্য জাহান্নামকেও আড়াল করে দিতে পারেন।
▪️হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে লক্ষ্য করে ইরশাদ করেন, ‘হে আবু হুরায়রা! তুমি যখন অজু করবে, বিসমিল্লাহ্ বলবে। তাহলে ফেরেশতাগণ তোমার অজু শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোমার জন্য পুণ্য লিখতে থাকবে। তুমি যখন স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করবে, তখন বিসমিল্লাহ্ বলবে। তাহলে যতক্ষণ না তুমি গোসল শেষ করবে, ততক্ষণ ফেরেশতাগণ তোমার জন্য পুণ্য লিখতে থাকবে। সেই সহবাসে যদি তোমার কোনো সন্তান লাভ হয়, তবে সেই সন্তানের নিঃশ্বাস এবং তার যদি বংশধারা চালু থাকে, তবে যতকাল তা চালু থাকবে, ততকাল পর্যন্ত তাদের সবার নিঃশ্বাসের সংখ্যা পরিমাণ পুণ্য তোমার আমলনামায় লেখা হতে থাকবে। হে আবু হুরায়রা! তুমি যখন পশুর পিঠে চড়বে, তখন বিসমিল্লাহ্ বলবে। তাহলে তার প্রতি কদমে তোমার জন্য পুণ্য লেখা হবে। আর যখন নৌকায় চড়বে, তখনো বিসমিল্লাহ্ বলবে। তাহলে যতক্ষণ না তুমি তা থেকে নামবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার জন্য পুণ্য লেখা হতে থাকবে। সুবহানাল্লাহ্।
▪️নবী করীম (সাঃ ) বলেছেন ,যখন মানুষ প্রস্রাব পায়খানার জন্য, নিজ স্ত্রীর সাথে মিলনের জন্য তৈরী হয় , তখন শয়তান তার প্রত্যেক কাজে অনিষ্ট করে। কিন্তু যখন বিসমিল্লাহ পড়ে তৈরী হয় তখন পুরুষ হোক বা স্ত্রী লোক হোক তার মধ্যে এবং শয়তানের মধ্যে একটি আবরণ পরে যায়। তাতে তার শরীর কেউ দেখতে পায় না আর দেখলেও কোনো অনিষ্ট করতে পারে না।
▪️যে ব্যক্তি নিয়মিত বিসমিল্লাহ পাঠ করবে কিয়ামতের দিন সে আল্লাহর রহমতের মধ্যে ডুবে যাবে অথার্ৎ বেহেশতের অশেষ নেয়ামত পাবে।
▪️বিসমিল্লাহ্র বরকতে ওস্তাদ ও মাতা পিতার ক্ষমাঃ হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যখন শিক্ষক শিক্ষার্থীকে বলে পড়ো, ‘‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ তখন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষার্থীর পিতামাতার জন্য ক্ষমা লিপিবদ্ধ করা হয়। -দায়লামী, আনোয়ারুল বয়ান, খন্ড-৩, পৃ. ১৩৫।
▪️▪️হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে ব্যক্তি দোজখ রক্ষী ১৯ জন ফেরেস্তার হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে চায় তার অবশ্যই উচিত ১৯ বার বিসমিল্লাহ্ পাঠ করে। আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাবো “বিসমিল্লাহর রাহমানির রাহীম” এ রয়েছে মোট ১৯ টি বর্ণ। “বিসমিল্লাহর রাহমানির রাহীম” এর মোট ১৯ টি বর্ণের এক একটি বর্ণ পাঠ করার ফলে ওই ব্যক্তি একেক জন ফেরেশতার আজাব হতে মুক্তি পাবে। সুবহানাল্লাহ্
▪️একটি উদাহরণঃ বাদশাহ্ হিরাক্লিয়াসের মাথা ব্যথা দূরীভূত হলো
পবিত্র কোরআন সকল রোগের মহৌষধ। আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেছেন-
وَ نُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْاٰنِ مَا هُوَ شِفَآءٌ وَّ رَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِیْنَۙ-
অর্থঃ এবং আমি ক্বোরআনের মধ্যে অবতীর্ণ করি ওই বস্তু যা ঈমানদারদের জন্য আরোগ্য ও রহমত। -সূরা বনী ইস্রাঈল: আয়াত-৮২।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত আমিরুল মুমেনীন ওমর ইবনে খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর নিকট একদা রোম সাম্রাজ্যের বাদশাহ্ হিরাক্লিয়াস পত্র লিখলেন, আমিরুল মু’মিনেীন, আমি প্রচন্ড মাথা ব্যথায় ভুগছি আপনি একটু আমার চিকিৎসা করুন, খলিফাতুল মুসলেমীন বাদশাহর কাছে একটি টুপি প্রেরণ করলেন, বাদশাহ্ যখন এ টুপি মাথায় পরিধান করতেন, মাথা ব্যথা চলে যেতো, মাথার টুপি যখন নামিয়ে ফেলতেন, পুনরায় মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যেতো। বাদশাহ্ আশ্চর্য হলেন এর কি রহস্য? এক পর্যায়ে টুপি খুলে দেখলেন, টুপির ভিতরে এক টুকরো কাগজে পবিত্র কুরআনের আয়াত ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ লিখা ছিলো, বিসমিল্লাহ্ শরীফের বরকতে মাথা ব্যথা দূরীভূত হলো, সাহাবায়ে কিরামের কুরআনী চিকিৎসা ইসলামের এক বিস্ময়কর আধ্যাত্মিক শক্তির গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। -তাফসীরে নাঈমী, খন্ড-১ম।
▪️আল কুরআনের সংখ্যাতাত্মিক রহস্য
‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ আয়াতে আরবি বর্ণমালার ১৯টি অক্ষর রয়েছে। গোটা কুরআনের সূরা সংখ্যা ১১৪টি। যা ১৯ দিয়ে বিভাজ্য (১৯x৬ = ১১৪)। কুরআনে ইসম শব্দটি এসেছে ১৩৩ বার (১৯x৭ = ১৩৩)। আল্লাহ্ শব্দটি এসেছে ৫৭ বার (১৯x৩= ৫৭) রাহীম শব্দটি এসেছে ১১৪ বার (১৯x৬= ১১৪)।
এ অলৌকিকত্ব আল কুরআনের এক বিস্ময়কর মুজিযা। -আল কুরআন- ও সাহেবে কুরআন, পৃ. ১১।
সার সংক্ষেপঃ উপরোক্ত আলোচনার আলোকে “বিসমিল্লাহর রাহমানির রাহীম” এর ফজিলতের সার সংক্ষেপ যদি বলি, বলতে পারি এর দ্বারা
জাহান্নাম থেকে মুক্তিঃ কিয়ামতের ভয়াবহ দিনে জাহান্নামের ১৯ জন ফেরেশতার(দারোগা) শাস্তি থেকে এটি রক্ষা করবে।
রক্ষণশীলতা বা নিরাপত্তাঃ প্রতিটি হরফ বা বর্ণ জাহান্নামের এক একটি ফেরেশতার হাত থেকে সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করে। এটি পড়ার মাধ্যমে প্রতিটি বর্ণ পাঠকারীর জন্য ঢাল স্বরূপ কাজ করে এবং বিপদ-আপদ থেকে নিরাপত্তা প্রদান করে।
নেকী ও গুনাহ মাফঃ নিয়মিত পাঠকারীকে আল্লাহ তাআলা অগণিত নেকী দান করেন এবং গুনাহ মাফ করে দেন।
কবরের শাস্তি হ্রাসঃ এই বাক্যটি নিয়মিত পাঠ করলে কবরের আযাব থেকে মুক্তিপাওয়া যায়।
আল্লাহর সাহায্যঃ যেকোনো কাজ শুরু করার আগে এটি পড়লে আল্লাহর রহমত, বরকত ও সাহায্য পাওয়া যায় এবং আধ্যাত্মিক প্রশান্তি বৃদ্ধি পায়।
উপসংহারঃ আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম এর হক বুঝে প্রতিটি ভালো কাজের শুরুতে আমল করার তাউফীক দান করুন। আমীন। সুম্মা আমীন।
আল ইসলাম জহুরীয়া
ইসলামী গবেষণা কেন্দ্র
উত্তর বাহেরচর, তারানগর
কেরাণীগঞ্জ, ঢাকা, বাংলাদেশ।