06/06/2020
কোন আলেম বা দায়ীর নাম ধরে কথা বলা আমার পছন্দ না। এটি যথাসম্ভব এড়িয়ে যাওয়া উত্তম। তবে মাঝেমাঝে নাম ধরে কথা বলা দরকার হয়ে যায়। কিছু বিষয় স্পষ্ট করে বলা না হলে সাধারণ মানুষের পক্ষে বুঝা কঠিন হয়ে যায়। তাই সোজাসাপ্টা কিছু কথা এখন বলা জরুরী মনে করছি।
শায়খ আনোয়ার আল-আ(ওলা)কী রহ. কে নিয়ে শায়খ মঞ্জুরে ইলাহির একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেখলাম। শায়খ আ(ওলা)কী রহ. কে আলাদাভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। তাওহিদ ও জি(হা)দের দাওয়াতকে অবিকৃতভাবে বিশ্বের মুসলিমদের কাছে পৌছে দেওয়ার কারণে, মুমিনদের কি(তা)লের জন্য উদ্বুদ্ধ করার কারণে আমেরিকা তাঁকে হত্যা করে। ইনশাআল্লাহ তিনি শহীদ। প্যারিস থেকে ঢাকা পর্যন্ত রসুলের সা. অবমাননাকারীদের উপযুক্ত প্রাপ্য যেই মর্দে মুসলমানগণ বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁদের সকলে কোন না কোনভাবে শায়খ আ(ওলা)কীর কাছে কৃতজ্ঞ। আমরা আশা রাখি শুধু এই একটি অবদানের জন্যই তিনি আমাদের রবের কাছে অত্যন্ত উত্তম প্রতিদান পাবেন। তাঁর অন্যান্য খেদমতের প্রতিদান তো আছেই।
এই মহান ব্যক্তি সম্পর্কে শায়খ মঞ্জুরে ইলাহী বলেছেন যে তাঁর বক্তব্য থেকে ইলম গ্রহণ করা যাবে না। এছাড়া শায়খ মঞ্জুরের কথায় তাচ্ছিল্যের ভাবও ফুটে উঠেছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এভাবে বিভিন্ন প্রশ্ন করে করে “জারহ তাদিল” করা মাদখালিদের পছন্দের পদ্ধতি। শায়খ মঞ্জুরে ইলাহি তাই করেছেন। তো শায়খ যখন এই ডিজিটাল জারহ তাদিলের পথ খুলে দিয়েছেন তখন প্রাসঙ্গিকভাবে কিছু কথা আমি শায়খের কাছে, তার ভক্ত-অনুসারী ও ছাত্রদের কাছে, এবং আমভাবে সকল পাঠকের সামনে রাখছি।
যেহেতু আলেমদের নাম ধরে ধরে প্রশ্ন করা হচ্ছে, তাই আমার প্রশ্ন হল -
যে ব্যক্তি মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত কোন কাফের রাষ্ট্রের সরকারের আমন্ত্রনে সেই দেশে যায়। এবং উক্ত দেশে গিয়ে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি সংক্রান্ত আলোচনা ও প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে। এবং আন্তঃধর্মের দাওয়াতের দিকে আহ্বানকারীদের সাথে একসাথে বসে। যে স্থানে একই সাথে কুফরী ধর্ম ও ইসলামকে মিশিয়ে ফেলার কাজ করা হয়, সেখানে যায় ও হাস্যোজ্জল মুখে ছবি তুলে – এমন ব্যক্তির কাছ থেকে কি ইলম গ্রহণ করা যাবে? এবং এমন ব্যক্তির ব্যাপারে হুকুম কী হবে? কিবারুল উলামা এমন ব্যক্তির ব্যাপারে কী অবস্থান গ্রহণ করেছেন?
আশা করি শায়খ মঞ্জুরে ইলাহির কাছে আপনারা এ প্রশ্ন পৌছে দিবেন, এবং শায়খ এ প্রশ্নের উত্তর দিবেন। এ প্রশ্ন কেন এইখানে করা দরকার তা নিয়ে বলি। ২০১৮ সালে শায়খ মঞ্জুরে ইলাহি জার্মান সরকারের আমন্ত্রনে এমনই একটি আন্তঃধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন। তার বিভিন্ন ছবিও আছে। তার এই জার্মানী সফরের ব্যাপারে তারই সফরসঙ্গী তারেক শামসুর রহমানের বক্তব্য উপস্থাপন করছি, যাতে সন্দেহের কোন অবকাশ না থাকে। ৯ এপ্রিল, ২০১৮ তারিখে, দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত, “জার্মানির অভিজ্ঞতায় ধর্মীয় সম্প্রীতি” শীর্ষক প্রবন্ধে তারেক শামসুর এই সফর নিয়ে বিস্তারিত লিখেছে। পাঠক মূল প্রবন্ধটি পড়ে নিবেন - https://www.jugantor.com/…/জার্মানির-অভিজ্ঞতায়-ধর্মীয়-সম্প্…
আমি এখানে উল্লেখযোগ্য কিছু অংশ উল্লেখ করছি-
তারেক শামসুর রহমান লিখেছে –
১। প্রায় প্রতিবছরই একবার জার্মানিতে বেড়াতে যাই। কিন্তু এবারের যাওয়াটা ছিল একটু ভিন্ন ধরনের। আমন্ত্রণটা এসেছিল জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে।
২। Diversity and co-existence of Religions in Germany প্রোগ্রামের আওতায় জার্মান সরকার বাংলাদেশের কয়েকজন শিক্ষাবিদ, সরকারি কর্মকর্তা ও মিডিয়া তথা সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা একটিভ তাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। আমরা মোট ছয়জন ছিলাম। (সেই ছয়জনের ছবি। কালো জ্যাকেট গায়ে, চশমা পরিহিত লম্বা ব্যাক্তি হলেন তারেক শামসুর রহমান। সর্ববামে শায়খ মঞ্জুরে ইলাহি, তার পাশে ফেবুর মহাপন্ডিত আসিফ শিবগাতও আছে)
৩। আমরা খুব কাছ থেকে দেখেছি কীভাবে জার্মান সরকার সেখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষদের একই জায়গায় দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে। দেখেছি কীভাবে ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এটা ছিল এক ধরনের শিক্ষা সফর।...এমনকি সব ধর্মকে এক পতাকাতলে আনার একটি উদ্যোগও আমরা লক্ষ্য করেছি।
৪। আমাদের জন্য নতুন এক অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছিল The House of one এ যাওয়ার এবং তাদের ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগের কথা শোনার। House of one হচ্ছে তিনটি ধর্মের (ইসলাম, খ্রিস্ট ও ইহুদিবাদ) একটি মিলনস্থল। যেখানে ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করার খবর আমরা জানি, যেখানে ইহুদি ধর্ম আর ইসলাম ধর্মের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও বিভেদ ফিলিস্তিন সংকটকে গভীর থেকে গভীরতর করেছে, সেখানে জার্মানিতে এ তিনটি ধর্মের মাঝে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
৫। (হাউজ অফ ওয়ান) প্রজেক্টের আওতায় একই জায়গায় তিন ধর্মের উপাসনালয় প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রজেক্টের স্থান আমাদের ঘুরিয়ে দেখালেন ইমাম ওসমান ওরস। একই ভবনে তিন ধর্মের মিলনমেলা। ওরা এর নামকরণ করেছে House of owe। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এ রকমটি আছে কিনা আমার জানা নেই।
৬। House of one আমাদের স্মরণ করিয়ে দিল জেরুজালেমের কথা। এ জেরুজালেম শহরেই তিন ধর্মের- ইসলাম, খ্রিস্ট ও ইহুদিবাদের ধর্মীয় স্থাপনা আছে। জার্মানিতে, বার্লিনে এমনটাই হতে যাচ্ছে। তবে পার্থক্যটি হল একই ভবনে হতে যাচ্ছে তিন ধর্মের ধর্মস্থান, মসজিদ, গির্জা আর সিনোগোগ। (হাউজ অফ ওয়ানে শায়খ মঞ্জুরে ইলাহি ও তার সফর সঙ্গীদের ছবি পোস্টের সাথে সংযুক্ত)
অজানা কারণে তারেক শামসুর তার প্রবন্ধে house of one কে ভুল করে house of owe লিখেছে। আমরা সেটিকে সঠিক করে দিলাম। এই হাউস অফ ওয়ানে, শায়খ মঞ্জুরে ইলাহি এবং তাঁর সফরসঙ্গী এবং তাঁদের জার্মান আপ্যায়নকারীদের ছবিও আছে। পাঠকের সুবিধার্থে সেটি যুক্ত করে দেওয়া হল। হাউস অফ ওয়ান নিয়ে একটি ভিডিও - https://www.youtube.com/watch?v=61O5cjQTfco
হাউস অফ ওয়ানের ওয়েবসাইট - https://house-of-one.org/en
উইকিপিডিয়া - https://en.wikipedia.org/wiki/House_of_One
উল্লেখ্য শায়খ মঞ্জুর ইলাহি এবং তাঁর ভক্ত-অনুসারীরা যাদেরকে হক্কানী উলামা মনে করেন আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি নিয়ে তাঁদের অত্যন্ত কঠিন বক্তব্য আছে। আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির নামে যে কার্যকলাপ চলে সেগুলোকে তাঁরা কুফর ও রিদ্দা বলেছেন।
- যেমন লাজনাহ ওয়াদদাইমাহর একটি ফতোয়াতে বলা হয়েছে, কোন মুসলিমের কাছ থেকে যদি ইন্টারফেইথ/আন্তঃধর্মীয় আহ্বান আসে তাহলে সেটি সরিহ রিদ্দা গণ্য হবে। উক্ত ফতোয়ার লিঙ্ক (আট নং পয়েন্ট দ্রষ্টব্য) - https://islamhouse.com/ar/fatwa/65889/
- শায়খ সালিহ ইবনে উসাইমিন রহ.কে ইন্টারেফেইথ তথা ইহুদী-খ্রিষ্টানদের সাথে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির দিকে আহ্বানকারীদের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়েছিল। শায়খ রহ. এমন ব্যক্তির উপর কুফরের হুকুম দিয়েছেন। লিঙ্ক - http://binothaimeen.net/content/676
- শায়খ আবদূররহমান বিন নাসের আল-বাররাক বিস্তারিত ফতোয়াতে বলেছেন যে ইন্টারফেইথের কার্যকলাপ হল কুফর ও রিদ্দা - https://www.saaid.net/fatwa/f64.htm
- এমন ফতোয়া শায়খ সালেহ আল-ফাউজান, আর-রাজিহি, আব্দুল্লাহ আল-গুনাইমান, আলুশ শায়খসহ বিভিন্ন আলেমের কাছ থেকে এসেছে। (আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি তথা ইন্টারফেইথ কার্যক্রম নিয়ে জানতে পাঠক এ প্রবন্ধটিও পড়ুন - https://dorar.net/artic…/…/الحوار-بين-الأديان-حقيقته-وأنواعه )
তো শায়খ মঞ্জুরে ইলাহির কাছে আমার প্রশ্ন - ইন্টারফেইথের ‘শিক্ষাসফরে’ যাওয়া ব্যক্তির ব্যাপারে কিবারে উলামার ফতোয়াসমূহ অনুযায়ী হুকুম কী হবে? আর এই ব্যক্তির কাছ থেকে কি ইলম গ্রহণ করা যাবে?
একই ছাদের নিচে মসজিদ, গীর্জা আর সিনাগগ নির্মাণ হয়েছে। সেখানে গিয়ে হাসিমুখে ছবি তুলার ব্যাপারে ফতোয়া কী হবে? আর এমন কাজ করা ব্যক্তির কাছ থেকে কি ইলম গ্রহণ করা যাবে?
এই ‘শিক্ষাসফর’ থেকে ফিরে এসে শিক্ষাগ্রহণকারীরা বাংলাদেশে যদি আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি সংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মকান্ড শুরু করে, কিংবা এমন কোন কর্মকান্ডের “শরঈ উপদেষ্টা’ হিসাবে ভূমিকা পালন করে, কিংবা এমন অন্য কোন কাজের সাথে যুক্ত হয় তাহলে সেই ব্যাপারে কী ফতোয়া হবে? এমন ব্যক্তির কাছ থেকে কি ইলম নেওয়া যাবে?
আশা করি আমার এ প্রশ্নগুলোর উত্তর পাবো।
===
লিখেছেন - Ibrahim ভাই