26/05/2026
কোরবানির মাসআলা-মাসায়েল
পবিত্র ঈদুল আযহাকে 'কোরবানির ঈদ' বলা হয়। আল্লাহর প্রিয় বান্দাগন আল্লাহর রাস্তায় কোরবানি দিয়ে থাকেন। হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে তার প্রিয় সন্ধানকে আল্লাহর রাস্তায় কোরবানি দেয়ার যে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তারই স্মৃতিবাহী এ পবিত্র কোরবানি। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- কোরবানির দিন মানুষের কোন নেক আমলই আল্লাহর নিকট ততটুকু প্রিয় নয় যতটুকু প্রিয় কোরবানির পুঞ্জর রক্ত প্রবাহিত করা। কোরবানির দিন কোরবানির পশুর রক্তের ফোঁটা মাটিতে পড়ার পূর্বেই আল্লাহ তায়ালার নিকট তা কবুল হয়ে যায়। অতএব তোমরা আনন্দচিত্তে কোরবানি কর।। আল হাদিস।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহ আলাহাই ওয়াসাল্লাম আরো এরশাদ করেন- আল্লাহ তায়ালা কোরবানির পশুর প্রত্যেক পশমের পরিবর্তে একটি করে সাওয়াব দান করেন। অন্যত্র বর্ণিত আছে, হাশরের দিনে কোরবানির পশুগুলো কোরবানি দাতাগণকে আপন পৃষ্ঠে করে পুলসিরাত পার করে বেহেশতে পৌঁছে দেবে। নিম্নে কোরবানির বিশেষ প্রয়োজনীয় মাসছালা গুলো উল্লেখা করা হল।
কোরবানি কার উপর ওয়াজিব। স্বাধীন ও মুক্বীম (অমুসাফির। ব্যক্তি মালিকে নেসাব অর্থাৎ এতটুকু সম্পদের অধিকারী হওয়া যতটুকু সম্পদ হলে সাদকায়ে ফিতর প্রদান করা ওয়াজিব হয়, তার উপর কোরবানি ওয়াজিব। মালিকে নেসাবের ব্যাখ্যা হলে-মানুষের মৌলিক চাহিনা অর্থাৎ-প্রয়োজনীয় খরচ ব্যতীত সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য ও সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা ওই পরিমাণ অর্থের মালিক হওয়া। মৌলিক চাহিদা বলতে বাসস্থান, আসবাবপত্র, অনু, বস্ত্র, চাকর, সফরের বাহন, হাতিযার ও পেশার সরঞ্জাম ইত্যাদি।
কোরবানির সময়ঃ চান্দ্র মাসের জিলহজ্বের ১০-১২ তারিখ পর্যন্ত অর্থাৎ-তিন দিন দুই রাত।
মাসআলা: কোরবানির পশু ক্রয়ের আগে কোরবানির পশুর অংশিদার ঠিক করা উত্তম। পশু ক্রয়ের পর অন্য কাউকে অংশীদার বানাতে
চাইলেও পারবে; কিন্তু মাকরুহ।
মাসআলাঃ যদি কেউ নিয়াত করে যে, আমার ঐ কাজটি হলে আমি কোরবানি করব। অথবা আল্লাহর কসম এ পশুটিকে আমি অবশ্যই অল্লাহর রাস্তায় কোরবানি করব- এ সু শ্রেণীর লোক ধনী হোক কিংবা গরীব হোক, এদের উপর কোরবানি দেয়া ওয়াজিব। (বাদায়ে- ৫:৬২) মাসআলাঃ কোন ধনী লোক মাম্রতের কোরবানি দিলে, তার উপর যে কোরবানি ওয়াজিব, তা থেকে অব্যহতি পাবেনা; বরং তার উপর পৃথকভাবে কোরবানি ওয়াজিব হবে। অর্থাৎ তাকে দুটি কোরবানি দিতে হবে- একটি মনু্যুতের অপরটি মালিকে নেসাব হওয়ার কারণে। যদি কোরবানির দিন শপথ করে তাহলে শপথের কোরবানির দ্বারা ওয়াজিব কোরবানিও আদায় হয়ে যাবে।
মাসআলা : কোবোনির দিনসমূহের মধ্যে কোরবানির নিয়্যতে মোরগ-মোরগী ইত্যাদি যবেহ করা মাকরুহ। (আলমগীরী-৪-১০৫)
মাসআলাঃ কেউ জিলহস্থের ১০-১২ তারিখ পর্যন্ত। তিন দিন দুই রাতের মধ্যে) যদি কোরবানি করতে সমস্যা হয়, তাহলে তিনদির পর কেঁড়া বা ছাগলের মুল্য পরিমাণ অর্থ সলক্বা করে দেয়া ওয়াজিব। যদি মুমুর্ষ হয়, তাহলে ওসিয়্যত করে যাবে।
মাসআলাঃ প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে মেয়ে স্ত্রী অথবা এমন ব্যক্তি, যার উপর কোরবানি করা ওয়জিব হয়েছে, ওয়াজিব কোরবানি তাদের অনুমতি ব্যতিরেকে তাদের পক্ষ হয়ে কেউ কোরবানি করলে কোরবানির ওয়াজিব আদায় হবে না। এমনকি তার কোরবানির পশুর শরীকলার ব্যক্তিদের কোরবানিও হবে না। কিন্তু যার প্রতি বছর কোরবানি করার অভ্যাস আছে, তার কোরবানি জায়েয হবে। কিন্তু এ অবস্থায়ও অনুমতি বা পরামর্শ করা অতি উত্তম। (ফতওয়া-কাযী খান-২০২)
মাসআলাঃ কোরবানির ৩ দিনের মধ্যে। ১০-১২ তারিখের মধ্যে) কোরবানির পশুর দাম সদকা করে দেয়া হলে, কোরবানি ওয়াজিব আদায় হবে না এবং সব সময় কনাহগার থেকে যাবে।
মাসআলাঃ প্রিয় নবী সাল্লাল্ল্যাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং তাঁর মৃত উম্মতের পক্ষ থেকে কোরবানি করেছেন। তাই সম্ভব হলে প্রিয় নবী সল্লল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামে কোরবানি করা সৌভাগ্যবানদের কাজ হবে। (বাহারে শরীয়ত)
গরু ও উট যারা কোরবানি করলে নফল হিসেবে একভাগ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামে কোরবানির দেয়া অনেক উত্তম। মাসআলা। কেউ যদি তীর মৃত মা-বাবা ও দাদা-দাদীর করবে সাওয়াব পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে এক অংশ কোরবানি করতে চায়, তাহলে পারবে। এতে কোরবানি দাতা একজন হলেও সবাই সাওয়াবের অংশীদার হবে।
কোরবানির পশুর বয়সঃ কোরবানির ছাগল ১ বছর, গরু ২ বছর, এবং উট ৫ বছর বয়সের হতে হবে। কোরবানির জন্য সুন্দর ও নিখুঁত জন্ন বাছাই করা উত্তম। যে সব জদ্র অন্ধ ও এমন খোঁড়া যে, যবেহ করার স্থানে যেতে অক্ষম, শিং ভাঙ্গা, লেজ এবং কান কাটা বা দূর্বল ইত্যাদি পশু কোরবানির উপযুক্ত নয়।
কোরবানির পশুঃ গরু, মহিষ, উট, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা ইত্যাদি হালাল চতুস্পদ গৃহপালিত পশু দ্বারা কোরবানি করা জায়েয।
অংশীদারিত্বে কোরবানি করার নিয়মঃ গরু, মহিষ ও উট এ তিন প্রকার পশুর প্রত্যেকটিতে এক হতে সাত জনের নামে কোরবানি করা যায়। তবে শর্ত হল সবকটি অংশ শুধু মাত্র আল্লাহর ওয়াস্তে হতে হবে; নিছক গোশত খাওযার খেয়ালও থাকতে পারবে না। এক পক্ষতে কয়েকজন শরীক থাকলে, গোশত পাল্লা দিয়ে ওজন করে সমপরিমাণে ভাগ করে দিতে হবে। কোন শরীকদার বেশী পেয়ে থাকলে অন্যরা মাফ করে দিলেও কারো কোরবানি বৈষ হবে না। সম্মিলিত কোরবানির পশু ক্রয় করার পর তাতে ভাগ বা অংশ অবশিষ্ট থাকলে অন্য লোককে শামিল করতে কোন অসুবিধে নেই। কেউ একা কোরবানি করার মানসে গঞ্জ ক্রয় করলেও তাতে অন্যকে শরীক করতে পারবে।
তবে ক্রয় করার পূর্বে ভাগগুলো ঠিক করে নেওয়া উত্তম; অন্যখায় মাকরুহ।
কোরবানির গোশত ভাগ করার নিয়মঃ কোরবানির গোশতই তিন ভাগে ভাগ করে এর এক ভাগ গরীব ও ইয়াতীম মিসকীনদের দান করা, এক ভাগ আত্মীয় স্বজনকে দেয়া এবং অন্য ভাগ নিজে রাখা মুস্তাহাব। কোরবানির পশু যবেহকারী ও গোশত প্রস্তুতকারীকে কোরবানির
পশুর গোশত থেকে পারিশ্রমিক দেয়া যাবে না।
মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোরবানি। যদি মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোরবানি দেওয়া হয় তাহলে গোশতও উপরোল্লেখিত নিয়মে বন্টন হবে। তবে যদি মৃত ব্যক্তির অসিয়ত পালনের উদ্দেশ্যে কোরবানি করা হয়, তাহলে অসিয়তকৃত অংশের সদকা করে দেয়া ওয়াজিব।
কোরবানির পশু যবেহ করার নিয়ম। যবেহ করা জানা থাকলে কোরবানীর পশু নিজ হাতে যবেহ করা মুস্তাহাব। যদি নিজে করতে
না পারে, তাহলে অন্যের মাধ্যমেও তা সমাধা করা যাবে। তবে যবেহ্ 'র সময় নিজে সামনে থাকা উত্তম। যবেহ্'র সময় নিম্নের রগসমূহ কাটার ব্যাপারে বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হবে। (ক) শ্বাসনালী (খ) খাদ্যনালী (গ) এবং রক্ত চলাচলের রগদুটি। বক্ষস্থল হতে গলদেশের মধ্যবর্তী কোন স্থানে যবেহ করা বানচনীয়। যবেহ'র পূর্বে ছুরি খুব ধারালো করে নিতে হবে। তারপর কোরবানির জন্তর মাথা দক্ষিণে এবং পিছনের দিক উত্তর দিকে রেখে কেবলামুখী শায়িত করে নিম্ন লিখিত দু'আটি পড়বে।
দু' আঃ "ইন্নী ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাহী ফাতারাস্ সামাওয়াতী ওয়াল আরদ্ধা হানীফাঁও ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকীন, ইন্না সালাতী ওয়ানুসুকী ওয়া মাহইয়ায়া ওয়া মামাতী লিল্লাহী রাকিবল আলামিন। আল্লাহখা ওয়ালাকা বিদৃমিল্লাহি আল্লাহ আকবার বলে যবেহ করবে। কোরবানির পশু যবেহ করার পর পাঠ করবে আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল মিন্নী (অংশীদ্বার থাকলে ওয়া মিন বলার পর প্রত্যেকের নাম ও বাপের নাম। কামা তাকাব্বালতা মিন খালিলিকা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ওয়া হাবীকিকা মুহাম্মাদিনিল মুস্তফা সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম।" আর এ দোয়া জানা না থাকলে যাদের জন্য কোরবানির হবে তাদের নামগুলো স্মরণ করে মনে মনে নিয়্যত করে নিলে কোরবানি আদায় হয়ে যাবে। চামড়াঃ কোরবান্দির পক্ষর চামড়া, নাড়িভুড়ি, রশি ও ফুলের মালা-প্রকৃতি সদক্বা করে দিতে হবে। চামড়া সদক্কা না করে নিজেরাও ব্যবহার করতে পারবে। যেমন- জায়নামায, বিছানা ইত্যাদি বানাতে পারবে। কিন্তু কোরবানির চামড়া বিক্রি করে এর মূল্য নিজ কর্মে ব্যয় করতে। পারবে না। এ টাকা গরীব মিসকীনদের মাঝে সদকা করে দেয়া ওয়াজিব। চামড়া দ্বানী-সুন্নী মাদরাসায়ও সদকা করে দেয়া যায়। যদি উক্ত কোরবানির পশুর পেটে জীবিত বাচ্চা থাকে তাহলে সেটিকে যবেহ করে দিতে হবে। তখন সেটার গোশতও আহার করা যাবে। যদি মৃত হয় তাহলে ফেলে দিতে হবে। কোরবানির উদ্দেশ্যে ক্রয় করা পশু কোরবানির পূর্বে বাচ্চা দিলে সেই বাচ্চাকে ও যবেহ করে দিতে হবে। অথবা বাচ্চা বিক্রি করে টাকাগুলো সদকা করে দিতে হবে। বাচ্চা যদি কোরবানির দিনসমূহে যবেহ করা না হয়, তাহলে সদকা করে দিতে হবে।
প্রকাশনায়ঃ কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া আলিয়া কামিল মাদরাসা, আজীজ মহল্লা, মোহাম্মদপুর
প্রচারেঃ আঞ্জুমান-এ-রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট, ঢাকা ও গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ, ঢাকা মহানগর
👍 LIKE/SHARE/COMMENT
Facebook: https://www.facebook.com/GausiaCommitteeBangladeshDhaka
Instagram: gausia.tv
Youtube: https://www.youtube.com/
Gausia Committee Bangladesh - Dhaka
#দাওয়াতে_খায়র