20/06/2025
রঙিন দেয়ালের মানুষ
ইমতিয়াজ সাহেব ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তার পেছনে ডিজিটাল পর্দায় ভেসে আছে এক রঙিন শহরের ছবি। ইম্প্রেশনিস্টিক ভঙ্গিতে আঁকা একটা ছবির মতো শহর—যেখানে নীল আকাশের নিচে হলুদ, কমলা আর সবুজ রঙের দালানগুলো একে অপরের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এক ঝলমলে, উত্তাপমাখা দিনের প্রতিচ্ছবি।
কিন্তু ইমতিয়াজ সাহেবের মুখে সেই রঙের কোনো ছোঁয়া নেই। তার মুখটা এক নির্লিপ্ত, ধূসর ক্যানভাসের মতো। চোখের দৃষ্টি ক্লান্ত, যেন অনেক নির্ঘুম রাত তার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। কাঁধ দুটো সামান্য ঝুলে পড়েছে, দীর্ঘদিনের বয়ে বেড়ানো কোনো এক অদৃশ্য বোঝার ভারে। তার পাকা দাড়ি আর চুলে সোনালী রঙের ছোপ। একসময় হয়তো শখ করে করা হয়েছিল, কিন্তু এখন মনে হয় যেন জীবনের সব রঙ হারিয়ে যাওয়ার পর শেষ সম্বল হিসেবে কিছু রঙ ধরে রাখার এক মরিয়া চেষ্টা।
তিনি একটি অনলাইন মিটিংয়ে ছিলেন। অন্য প্রান্ত থেকে কেউ একজন কিছু একটা বলছিল, কিন্তু ইমতিয়াজ সাহেবের কানে কিছুই ঢুকছিল না। তার চোখ ছিল নিজের প্রতিবিম্বের পেছনে থাকা ওই ভার্চুয়াল ব্যাকগ্রাউন্ডের দিকে। ওটা কোনো সাধারণ ডিজিটাল ছবি নয়। ওটা তার জীবনের এক হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়।
আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে ইমতিয়াজ এমন ছিলেন না। তিনি ছিলেন এক প্রাণবন্ত যুবক, যার চোখে স্বপ্ন আর হাতে ছিল ক্যামেরা। পেশায় ছিলেন একজন ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফার। পৃথিবী ঘুরে বেড়ানোই ছিল তার নেশা আর পেশা। এমনই এক সফরে তিনি পৌঁছেছিলেন ইতালির এক ছোট ساحلی শহরে, যার নাম ছিল 'সিয়ানা রোসা'। লালচে মাটির আর রঙিন বাড়ির সেই শহর।
সেখানেই তার পরিচয় হয়েছিল লারার সাথে। লারা ছিল একজন চিত্রশিল্পী। তার ক্যানভাসে সব সময় থাকতো সিয়ানা রোসার আলো-ছায়া আর রঙের খেলা। ইমতিয়াজের ক্যামেরার লেন্স আর লারার তুলির আঁচড় যেন একই সুতোয় বাঁধা পড়লো। তাদের প্রেম ছিল ওই শহরের মতোই—উজ্জ্বল, উষ্ণ আর আবেগী।
বিয়ের পর তারা সিয়ানা রোসাতেই থেকে গেল। ইমতিয়াজ ছবি তুলতেন, আর লারা সেই ছবি দেখে আঁকতেন। তাদের ছোট্ট বাড়ির বারান্দা থেকে পুরো শহরটাকে দেখা যেত। ইমতিয়াজের আজকের ল্যাপটপের ব্যাকগ্রাউন্ডের ছবিটি আসলে লারারই আঁকা। তাদের সেই বারান্দা থেকে দেখা শহরের দৃশ্য। লারা আদর করে ছবিটার নাম দিয়েছিল "Il nostro sole" - 'আমাদের সূর্য'।
তখন ইমতিয়াজের চুল-দাড়ি ছিল ঘন কালো। তার হাসিতে ছিল সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্ছ্বাস। লারার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা শহরের অলিগলিতে ঘুরে বেড়াতেন, সেরা শটটার খোঁজে। আর লারা তার ক্যানভাসে সেই মুহূর্তগুলোকে অমর করে রাখতো।
কিন্তু সুখ চিরস্থায়ী হয় না। এক ঝড়ের রাতে হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়ে লারা। ধরা পড়ে এক কঠিন রোগ। ইমতিয়াজ তার সব সঞ্চয় দিয়ে চিকিৎসা করালেন। সিয়ানা রোসার উষ্ণ সূর্য ধীরে ধীরে তার জীবন থেকে অস্ত যেতে শুরু করলো। লারার তুলিতে আর নতুন রঙ চড়লো না। তার শেষ দিনগুলোতে ইমতিয়াজ তার ক্যামেরাও ধরেননি। শুধু লারার হাতটা ধরে বসে থাকতেন, তার বিবর্ণ হয়ে আসা মুখের দিকে তাকিয়ে।
লারা চলে যাওয়ার পর সিয়ানা রোসা শহরটা ইমতিয়াজের কাছে এক বিশাল শূন্যতার মতো মনে হতে লাগলো। যে রঙগুলো তাকে আনন্দ দিত, সেগুলোই তাকে বিদ্রূপ করতে শুরু করলো। তিনি তার ক্যামেরা, লারার আঁকা ছবিগুলো—সবকিছু গুছিয়ে ফিরে এলেন নিজের দেশে।
এখন ইমতিয়াজ এক বহুজাতিক কোম্পানিতে ডেটা অ্যানালিস্টের কাজ করেন। সংখ্যার নীরস জগতে তিনি নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছেন, যাতে রঙের কথা মনে না পড়ে। তার জীবন এখন রুটিনে বাঁধা—সকাল ন'টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা।
আজকের এই অনলাইন মিটিংটা ছিল কোম্পানির বার্ষিক পর্যালোচনা নিয়ে। নিয়ম অনুযায়ী সবাইকে একটা সুন্দর ব্যাকগ্রাউন্ড ব্যবহার করতে বলা হয়েছিল। পুরোনো ফাইল ঘাঁটতে গিয়ে হঠাৎই ইমতিয়াজ লারার আঁকা সেই ছবিটা খুঁজে পান। কোনো কিছু না ভেবেই ওটাকে নিজের ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে সেট করে দেন।
আর তখন থেকেই তিনি মিটিংয়ে থেকেও নেই। তার মন চলে গেছে পঁচিশ বছর পেছনে। তিনি যেন এখনো দেখতে পাচ্ছেন, লারা বারান্দায় ইজেল পেতে বসে আছে, তার চুলে এসে পড়েছে পড়ন্ত বিকেলের সোনালী রোদ, আর সে মুচকি হেসে বলছে, "দেখো ইমতিয়াজ, আমাদের সূর্যটা কী সুন্দর, তাই না?"
হঠাৎ করেই কর্কশ শব্দে তার ঘোর কাটলো। মিটিংয়ের সঞ্চালক তার নাম ধরে ডাকছেন, "মিস্টার ইমতিয়াজ, আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন? আপনার মতামত জানতে চাইছিলাম।"
ইমতিয়াজ সাহেব সোজা হয়ে বসলেন। তার গলাটা ধরে এলো। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তিনি দেখলেন, তার পেছনে থাকা রঙিন শহরের দিকে সবাই তাকিয়ে আছে। একজন সহকর্মী বলেই ফেললেন, "বাহ্, ইমতিয়াজ সাহেব! আপনার ব্যাকগ্রাউন্ডটা তো অসাধারণ। কোনো শিল্পীর আঁকা মনে হচ্ছে।"
ইমতিয়াজ সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো এক বিষণ্ণ হাসি, যা গত কয়েক বছরে কেউ দেখেনি। তিনি শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, "হ্যাঁ, একজন শিল্পীরই আঁকা। সে রঙ ভালোবাসতো। আর আমি... আমি সেই রঙের মাঝে হারিয়ে যাওয়া একজন মানুষ।"
মিটিংয়ের বাকি সময়টা আর কেউ তাকে কোনো প্রশ্ন করলো না। সবাই শুধু চুপ করে তাকিয়ে রইল সেই প্রাণবন্ত, রঙিন ছবিটার দিকে আর তার সামনে বসে থাকা বিবর্ণ, সোনালী দাড়িওয়ালা মানুষটার দিকে। দুটি ভিন্ন পৃথিবী, যারা একসময় এক ছিল, কিন্তু এখন কেবলই এক ডিজিটাল দেয়ালের ব্যবধানে দাঁড়িয়ে আছে।