06/06/2025
ঈদুল আযহার দিনের সুন্নত ও মুস্তাহাব আমল সমূহ এবং ঈদের নামাজ
ঈদুল আজহা ত্যাগ ও আনন্দের দিন। ইসলাম আনন্দ-উৎসবের এ দিনকে ইবাদত-বন্দেগি দ্বারা সুসজ্জিতকরেছে।
⚜️ সম্ভব হলে শেষ রাতে ওঠে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করা। কারণ এ রাতের মর্যাদা অত্যাধিক। হাদীস শরীফে এ রাতকে লাইলাতুল জিজা বা পুরস্কারের রজনী বলা হয়েছে।
⚜️ ঈদের দিন অতি প্রত্যুশে ঘুম থেকে উঠা।
⚜️ মেসওয়াক করা।
⚜️ গোসল করাঃ ঈদের সালাতের আগে গোসল করা সুন্নাত। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল(ﷺ) ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে গোসল করতেন। (মুয়াত্তা ইমাম মালিক)
⚜️ নিজের সামর্থ্যানুযায়ী শরিয়াত সম্মত ভাল পোশাক পরিধান করাঃ ঈদের দিন রাসুল (ﷺ) ভালো পোশাক পরিধান করতেন। হাদিসে আছে, রাসুল (ﷺ)-এর লাল ও সবুজ ডোরার একটি চাদর ছিল, তিনি তা দুই ঈদ ও জুমার দিন পরিধান করতেন।
⚜️ সুগন্ধি ব্যবহার করাঃ সুগন্ধি ব্যবহার সুন্নাত। আর ঈদের দিনে রাসুল (ﷺ) বিশেষভাবে সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। রাসুল (ﷺ)-এর তিনটি পছন্দনীয় জিনিসের মধ্যে একটি হলো সুগন্ধি। তাই ঈদের দিনের পোশাক পরিধানের পর সুগন্ধি ব্যবহার করা চাই।
⚜️ ঈদের নামাজ ঈদগাহে পড়াঃ ঈদের নামাজ যথাসাধ্য চেষ্টা করে ঈদগাহে গিয়ে আদায় খাছ সুন্নাত।মসজিদে নববিতে এক রাকাত নামাজ আদায় করলে পঞ্চাশ হাজার রাকাত নামাজ আদায়ের সমান ছাওয়াব।তথাপি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করতেন। সুতরাং ওজর ছাড়া মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করা উচিত নয়।
⚜️ আগে আগে ঈদগাহে যাওয়া।
⚜️ ওজর না থাকলে, পায়ে হেটে ঈদগাহে যাওয়া।
⚜️ ঈদগাহে যাওয়ার সময় এক পথ ব্যবহার করা আর ফেরার সময় অন্য পথঃ ঈদগাহে একপথ দিয়ে যাওয়া ও অন্যপথ দিয়ে ফেরা সুন্নাত। (বুখারি, হাদিস : ৯৮৬) সম্ভব হলে ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়াও সুন্নাত। -ইবনেমাজাহ, হাদিস : ১০৭১।
⚜️ ঈদগাহে যাওয়ার সময় উচ্চস্বরে তাকবীর বলা।
⚜️ শুভেচ্ছা বিনিময়ঃ ঈদের দিনে ছোট-বড় সবার সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা সুন্নাত। ঈদের দিনে সাহাবায়েকিরামগণের সম্ভাষণ ছিল "তাক্বাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা"।
⚜️ কোরবানী করাঃ ঈদের নামাজ আদায়ের পর নিসাব পরিমাণ মালের মালিকের ওপর কোরবানী করা ওয়াজিব। কোরবানীর গোশত নিজে খাবে, নিজের পরিবারবর্গকে খাওয়াবে, আত্মীয়-স্বজনকে হাদিয়া-তোহফাদেবে ও গরিব-মিসকিনকে দান করবে। মুস্তাহাব হলো, কোরবানীর গোশত তিন ভাগে ভাগ করা।
১. নিজপরিবার-পরিজনের জন্য এক ভাগ।
২. আত্মীয়-স্বজনের জন্য এক ভাগ।
৩. দরিদ্রদের জন্য এক ভাগ। আর যদি পরিবারের লোকসংখ্যা বেশি হয়, তাহলে কোরবানীর সব গোশত খেলেও অসুবিধা নেই। -ফাতোয়ায়েশামী৫/২০৮।
⚜️ সকাল থেকে কোন কিছু না খেয়ে কুরবানীর গোশত দিয়ে খানা শুরু করাঃ কোরবানীর দিনে ঈদের নামাজের আগে কিছু না খাওয়া মুস্তাহাব। নবী করিম (ﷺ) ঈদুল আজহার দিন কিছুই খেতেন না, যে পর্যন্ত ঈদের নামাজ আদায় করতেন। -তিরমিজি, ইবনে মাজাহ শরীফ।
⚜️ ঈদের নামাজের আগে ঘরে বা ঈদগাহে নফল নামাজ না পড়াঃ ঈদের দিন ঈদের নামাজের আগে ওফজরের নামাজের পরে সুন্নত বা নফল কোনো নামাজ নেই। ঈদের নামাজের কোনো আজান ও ইকামত নেই।
⚜️ আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ-খবর নেয়া ও তাদের বাড়ীতে বেড়াতে যাওয়া এবং আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত দেয়া।
⚜️ সর্বক্ষেত্রে ত্যাগ ও উৎসর্গের মানসিকতা প্রকাশ করাঃ শুধু কুরবানীর ত্যাগই নয়; প্রতিটি ব্যক্তির চলা-ফেরায়, ওঠা-বসায়, নামাজ-রোজায়, ইবাদত-বন্দেগিতে, সবক্ষেত্রে ত্যাগের জলন্ত দৃষ্টান্ত স্থাপনই ঈদুল আজহার শিক্ষা।
⚜️ পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখাঃ ঈদুল আজহায় পশুর রক্ত, আবর্জনা ও হাড় থেকে যেন পরিবেশ দূষিত না হয়, সেদিকে প্রত্যেক মুসলমানের খেয়াল রাখা উচিত। কোরবানী শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্ত, আবর্জনা ও হাড় নিরাপদ দূরত্বে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলে দেয়া কর্তব্য। মনে রাখতে হবে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ।
⚜️ ঈদের নামাজের নিয়মঃ
ঈদের নামায দুই রাকাত অন্যান্য নামাযের মতই। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, প্রতি রাকাআতে ইমাম-মুক্তাদি সকলকে অতিরিক্ত তিনটি তাকবীর বলতে হয়। প্রথম রাকাআতে ছানা পড়ার পর কেরাআতের আগে আর দ্বিতীয় রাকাআতে কিরাতের পর রুকুর আগে অতিরিক্ত এ তাকবীর গুলোতে কান পর্যন্ত হাত ওঠাতে হবে। প্রথম রাকাআতে দুই তাকবীরের পর হাত ছেড়ে দিবে, তৃতীয় তাকবীরের পর হাত বাঁধবে। দ্বিতীয় রাকাতে তিনো তাকীবেরর পর হাত ছেড়ে দিবে। চতুর্থ তাকবীর বলে রুকুতে চলে যাবে। ঈদের নামাযের পর খুতবা শোনা ওয়াজিব।
ঈদুল আজহায় বর্জনীয় কাজঃ
⚜️ এলাকায় ঈদগাহ থাকা সত্যেও কোন ওজর ব্যতিরেকে ঈদগাহে নামাজ আদায় না করে মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করা কোন ভাবেই উচিত নয়। কারন এটি সুস্পষ্ট ভাবে সুন্নাতের খেলাফ একটি কাজ।
⚜️ ঈদের দিনে রোজাঃ ঈদের দিনে রোজা রাখা হারাম। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনেরোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। -বুখারী ও মুসলিম শরীফ।
⚜️ ঈদের দিনকে কবর জিয়ারতের জন্য নির্দিষ্ট করাঃ ঈদের দিনকে কবর জিয়ারতের বিশেষ দিন মনে না করে জিয়ারত করলে দোষণীয় নয়।
⚜️ ঈদের সালাত আদায় না করে শুধু আনন্দ-ফুর্তি করাঃ অনেকে ঈদের আনন্দে মশগুল হয়ে নতুন জামা-কাপড় পরিধান, সেমাই, ফিরনি গান বাদ্য ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, ঈদের সালাত আদায় করার কথা ভুলেযায়। অথচ এই দিনে ঈদের সালাত ও কোরবানী করাই হচ্ছে মুসলমানদের মূল কাজ।
⚜️ মুসাফাহা-মুআনাকা এ দিনে জরুরী (ফরজ) মনে করাঃ ঈদগাহে বা ঈদের দিন সাক্ষাৎ হলে মুসাফাহা ও মুআনাকা করতেই হবে এমন বিশ্বাস না করে সালাম ও মুসাফাহার পর মুআনাকা (গলায় গলা মিলানো) করায় কোনো অসুবিধা নেই। কারণ মুসাফাহা ও মুআনাকা করার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি হয়। আবু হুরায়রা (رضي الله عنها) থেকে বর্ণিত, একদা হাসান ইবনে আলী(رضي الله عنها) নবী করিম (ﷺ)-এর কাছে এলেন, তিনি তখন তাঁকে জড়িয়ে ধরেন ও মুআনাকা(কোলাকুলি) করেন।
⚜️ কোরবানীর কোনো কিছু বিক্রি করাঃ কোরবানির গোশত, চামড়া ও এর কোনো অংশ বিক্রি করা যাবে না।অর্থাৎ বিক্রি করে নিজে উপকৃত হওয়া যাবে না। এমনকি কসাইকে ও জবাই কারিকে পারিশ্রমিক স্বরূপ গোশত দেওয়া নিষিদ্ধ। -বুখারী শরীফ, হাদিস : ১৭১৭, মুসলিম শরীফ, হাদিস : ১৩১৭) তবে সাধারণ ভাবে তাকে খেতে দেওয়ায় অসুবিধা নেই।
⚜️ গান-বাজনা করা, অশ্লীল সিনেমা ও নাটক দেখাঃ ঈদের দিন উপলক্ষে যেখানে গান-বাজনা, অবাধে নারী-পুরুষ বিচরণ ইত্যাদির আয়োজন থাকে, এমন মেলা আয়োজন করা, অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা দেয়া সম্পূর্ণ হারাম। অনুরূপ ঈদ উপলক্ষে বাড়ি-ঘর গান-বাজনার বিশেষ আয়োজন, নারী-পুরুষের বিশেষ সাক্ষাৎও অবাধে যেখানে-সেখানে ঘোরাফেরা অমুসলিমদের কালচার। মুসলিমদের জন্য এগুলো সম্পূর্ণ হারাম। -সুরাআলে ইমরান, আয়াত : ১৪৯, সুরা লুকমান, আয়াত : ৬, ৭।
উপসংহারঃ
আল্লাহ আমাদের প্রত্যেককে কোরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক আমলি জিন্দেগি যাপন করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এঁর নৈকট্য অর্জন করার তাওফিক দান করুন। আমিন, ছুম্মা আমিন।
সম্পাদনায়ঃ মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম
(উপরোক্ত আলোচনায় কোন ত্রুটি বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হলে জানানোর জন্য বিনীত অনুরোধ করছি।পরবর্তীতে সংশোধন করা হবে ইনশাআল্লাহ্।