Untold Stories

Untold Stories Untold Stories

ফেলে আসা বিকেলের ছায়া​পার্ট ১: ক্যাফে উইন্ডো আর সেই হলুদ খাম​ঘটনাটা আমার জীবনের। খুব সাধারণ একটা ছেলে আমি, থাকি উত্তরার ...
21/06/2026

ফেলে আসা বিকেলের ছায়া
​পার্ট ১: ক্যাফে উইন্ডো আর সেই হলুদ খাম
​ঘটনাটা আমার জীবনের। খুব সাধারণ একটা ছেলে আমি, থাকি উত্তরার সেক্টর ১১-এর একটা নিরিবিলি গলিতে। একটা ছোট আইটি ফার্মে কোড লেখার কাজ করি। জীবনটা একদম ঘড়ির কাঁটায় বাঁধা ছিল—অফিস, ল্যাপটপ আর ঘরের কোণ। কিন্তু গত বছরের একটা বৃষ্টিভেজা বিকেল আমার সেই চেনা দুনিয়াটাকে এমনভাবে ওলটপালট করে দেবে, তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।
​সেদিন ছিল একটা মেঘলা শুক্রবার। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে আমি ঝিল পাড়ের একটা ছোট, ছিমছাম ক্যাফেতে ঢুকে বসলাম। জানলার পাশের টেবিলটায় বসে কফিতে চুমুক দিচ্ছি, ঠিক তখনই ও এলো। পরনে সাধারণ একটা নীল কুর্তি, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, আর চুলগুলো বৃষ্টির ছাঁটে সামান্য ভেজা। ও আমার ঠিক সামনের টেবিলটায় বসল। প্রথম দেখাতেই কেন জানি বুকের ভেতর একটা চেনা সুর বেজে উঠেছিল। মেয়েটার নাম ছিল নীলিমা। খুব অদ্ভুত এক সম্মোহন ছিল ওর শান্ত চোখের চাউনিতে।
​ক্যাফেতে ভিড় থাকার কারণে একটা সময় আমাদের কথা শুরু হলো। বিল দেওয়ার সময় জানা গেল, ও ভুল করে ওর পার্সটা বাসায় ফেলে এসেছে। আমি হেসে বিলটা মিটিয়ে দিলাম। ব্যস, সেখান থেকেই শুরু। এরপর আমাদের প্রায়ই দেখা হতো। রিকশায় হুড তুলে বৃষ্টি দেখা, চারুকলার বকুলতলায় বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করা—নীলিমা খুব দ্রুত আমার পুরো আকাশটা জুড়ে বসেছিল। ও জানাত ও ধানমন্ডিতে একটা হোস্টেলে থাকে, পড়াশোনা শেষ করে একটা এনজিওতে যোগ দেবে। আমি ওর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম।
​অস্বাভাবিকতাটা শুরু হলো আমাদের সম্পর্কের ঠিক চার মাসের মাথায়। সেদিন ছিল ওর জন্মদিন। আমি উত্তরা রাজউক কলেজের কাছের একটা রেস্তোরাঁয় ওর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। টেবিলের ওপর রাখা নীলিমার প্রিয় রজনীগন্ধার তোড়া। কিন্তু অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময় পার হয়ে এক ঘণ্টা গেল, দুই ঘণ্টা গেল, নীলিমার ফোন বন্ধ। প্রচণ্ড দুশ্চিন্তা নিয়ে যখন আমি রেস্তোরাঁ থেকে বের হতে যাব, ঠিক তখন একজন ওয়েটার এসে আমার হাতে একটা সামান্য ভেজা হলুদ খাম দিল।
​বলল, "স্যার, বাইরে এক আপা এই চিঠিটা আপনার জন্য দিয়ে গেলেন।"
​আমি অবাক হয়ে খামটা খুললাম। ভেতরে নীলিমার চেনা হাতের লেখায় শুধু একটা লাইন লেখা:
​"আমাকে খোঁজার চেষ্টা করো না অর্ক। আমি যেখানে যাচ্ছি, সেখান থেকে কেউ কোনোদিন ফিরে আসে না। ভালো থেকো।"
​আমার মাথাটা মুহূর্তের মধ্যে ফাঁকা হয়ে গেল। তড়িঘড়ি করে রেস্তোরাঁ থেকে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম, কিন্তু চারপাশের চেনা ভিড়ে কোথাও নীলিমার সেই নীল কুর্তির ছোঁয়া ছিল না।
​পার্ট ২: ধানমন্ডির সেই ঠিকানা আর রহস্যের জাল
​চিঠিটা পাওয়ার পর তিনটে দিন আমি প্রায় না খেয়ে, না ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। ওর ফোনটা অনবরত বন্ধ দেখাচ্ছিল। কোনো উপায় না পেয়ে, ও আমাকে আগে যে হোস্টেলটার কথা বলেছিল, আমি সরাসরি ধানমন্ডির সেই লেনের ঠিকানায় চলে গেলাম।
​পুরোনো আমলের একটা দোতলা বাড়ি, চারপাশটা কেমন যেন থমথমে আর নিস্তব্ধ। গেটের কাছে একজন বয়স্ক দারোয়ান বসে ছিলেন। আমি নীলিমার ছবিটা ফোনে দেখিয়ে ওনার কাছে জানতে চাইলাম, "চাচা, এই মেয়েটা কি এই হোস্টেলে থাকে? তিন দিন ধরে ওনাকে পাচ্ছি না।"
​বৃদ্ধ দারোয়ান চশমাটা ঠিক করে স্ক্রিনের দিকে তাকালেন। তারপর হঠাৎ ওনার মুখের রঙ বদলে গেল। তিনি অদ্ভুত এক আতঙ্কে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "বাবা, তুমি কার খোঁজে আসছ? এই মেয়ে তো আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে এই লেনের মোড়ে একটা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে! ও তো আর এই দুনিয়ায় নাই!"
​দারোয়ানের কথা শুনে আমার পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। "কী আজেবাজে বকছেন চাচা! এই তো চার দিন আগে আমি ওর সাথে রিকশায় ঘুরেছি, কফি খেয়েছি!" আমি প্রায় চিৎকার করে উঠলাম। কিন্তু বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন, "আমি মিথ্যা বলছি না বাবা। বিশ্বাস না হলে ভেতরে গিয়ে ল্যান্ডলর্ড খালাম্মার সাথে কথা বলো।"
​আমি পাগলের মতো ভেতরে গেলাম। বাড়ির মালকিন আমার অবস্থা দেখে ওনার ড্রয়িংরুমে বসালেন। আমি ওনাকে সব খুলে বলতেই তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভেতরের ঘর থেকে একটা ডায়েরি আর কিছু ছবি নিয়ে এলেন। ছবিগুলো দেখে আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। নীল কুর্তি পরা সেই একই মেয়ে, হুবহু আমার নীলিমা—কিন্তু ছবির নিচে তারিখ লেখা '২০২৫ সালের মে মাস'।
​বাড়িওয়ালি মহিলা কাঁপানো গলায় বললেন, "নীলিমা আমার এখানেই থাকত বাবা। ও মারা যাওয়ার পর ওর টেবিলের ড্রয়ারে এই ডায়েরিটা পাওয়া যায়। ও একটা ছেলেকে খুব ভালোবাসত, কিন্তু ও কোনোদিন ছেলেটার সামনে যাওয়ার সাহস পায়নি। দূর থেকে দেখত।"
​আমি কাঁপতে কাঁপতে ডায়েরির পাতাগুলো উল্টাতে লাগলাম। প্রতিটা পাতায় নীলিমার হাতের অক্ষরে আমার দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি লেখা—আমি কখন অফিসে যাই, কখন কফি খাই। ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা ছিল: "আমি জানি আমার সময় শেষ, কিন্তু আমি একবার, শুধু একবার ওর হাতটা ছুঁয়ে দেখতে চাই। ঈশ্বর কি আমাকে সেই চারটা মাস সময় দেবেন না?"
​ঠিক তখনই আমার পকেটের ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। স্ক্রিনে তাকিয়ে আমার কলিজা শুকিয়ে গেল। কোনো নম্বর নেই, শুধু লেখা 'Unknown Number'। ফোনটা কানে নিতেই ওপাশ থেকে একটা খুব চেনা, ভাঙা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। নীলিমা কাঁদছে। ও ফিসফিস করে বলল, "অর্ক, তুমি ওখানে কেন গিয়েছ? ওরা জেনে গেছে আমি নিয়ম ভেঙেছি। ওরা আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে... বাঁচাও আমাকে, অর্ক!" ফোনের ওপাশ থেকে তীব্র বাতাসের আর ভারী কিছু টেনে নেওয়ার শব্দ আসতে লাগল।
​পার্ট ৩: ঝিল পাড়ের শেষ দেখা ও নির্মম সত্য
​আমি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালাম না। ফোনটা হাতে নিয়েই ল্যাপটপ, ব্যাগ সব ফেলে ধানমন্ডির ওই বাড়ি থেকে এক লাফে রাস্তায় নেমে এলাম। চারপাশের বাতাস তখন কেমন যেন ভারী হয়ে এসেছে, দিনের বেলাতেই চারদিক অন্ধকার করে মেঘ জমেছে। ফোনের ওপাশ থেকে তখন শুধু নীলিমার গোঙানির শব্দ আর অমানুষিক একটা আর্তনাদ আসছিল। আমি চিৎকার করে বললাম, "নীলিমা! তুমি কোথায়? আমি আসছি, বলো তুমি কোথায়!"
​ওপাশ থেকে অত্যন্ত দুর্বল গলায় উত্তর এলো, "আমাদের সেই প্রথম দেখার ক্যাফেটার পেছনের ঝিল পাড়ে... অর্ক, এটাই শেষ..." এরপরই ফোনটা কেটে গেল।
​আমি একটা বাইক ভাড়া করে তীব্র গতিতে উত্তরার সেই ঝিল পাড়ের দিকে ছুটলাম। যখন পৌঁছালাম, তখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে। ক্যাফের পেছনের ঝিল পাড়টা একদম জনমানবহীন। ঝাপসা বৃষ্টির মধ্যে আমি দূর থেকে দেখতে পেলাম, একটা অবয়ব ঝিলের ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে। সেই নীল কুর্তি, বাতাসে উড়ছে ওর চুল।
​আমি দৌড়ে ওর কাছে গেলাম। "নীলিমা!" বলে ওর কাঁধে হাত দিতেই ও ঘুরে দাঁড়াল। কিন্তু ও ঘুরে দাঁড়াতেই ভয়ে আর শোকে আমার চিৎকার আটকে গেল।
​সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির মুখটা আর সেই চেনা সুন্দর নীলিমার মতো নেই। ওর গায়ের চামড়া কেমন যেন ফ্যাকাসে, সাদাটে হয়ে গেছে। চোখ দুটো সম্পূর্ণ রক্তবর্ণ, আর ও অনবরত কাঁদছে, কিন্তু চোখ দিয়ে পানির বদলে কালচে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। ওর শরীরটা যেন ধীরে ধীরে বাষ্পের মতো বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে।
​ও আমার দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিল। ওর সেই হাত, যা আমি কতবার ভালোবেসে ছুঁয়েছি, আজ সেটা বরফের চেয়েও ঠান্ডা। ও কাঁপা গলায় বলল, "আমি শুধু একটু ভালোবাসার ছোঁয়া পেতে চেয়েছিলাম অর্ক। কিন্তু মৃতের সাথে জীবিতের প্রেম তো প্রকৃতির নিয়ম লঙ্খন করে। আমার সময় শেষ। ওরা আমাকে নিতে এসেছে।"
​আমি ওর হাতটা শক্ত করে ধরতে গেলাম, কিন্তু আমার হাত ওর শরীরের ভেতর দিয়ে গলে চলে গেল। আমি শূন্য বাতাসকে আঁকড়ে ধরলাম। ও আমার দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো সেই চেনা মিষ্টি হাসিটা দিল, যা দেখে আমার বুকটা ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছিল। তারপর, চোখের পলকে একটা তীব্র বাতাসের ঝাপটা এলো, আর নীলিমা পুরোপুরি মিলিয়ে গেল বাতাসে। ঘাটের ওপরে পড়ে রইল শুধু ওর সেই ভেজা রজনীগন্ধার তোড়াটা, যা আমি ওনাকে জন্মদিনে দেব বলে ভেবেছিলাম।
​আজ সেই ঘটনার পর বেশ কয়েকটা মাস কেটে গেছে। পুলিশ, সমাজ—সবাই এটাকে আমার মানসিক রোগ বা হ্যালুসিনেশন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমি জানি, সেটা ভুল ছিল না।
​আজও যখন খুব বৃষ্টি হয়, আমি একা একা সেই ঝিল পাড়ের ঘাটটায় গিয়ে বসি। আর অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বৃষ্টির শব্দের মাঝখানেও আমি খুব স্পষ্ট শুনতে পাই, কেউ একজন আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে যায়—"আমি আজও তোমাকে দূর থেকে দেখি, অর্ক।" অবিকল আমার নীলিমার কণ্ঠস্বর। এ এক এমন ট্র্যাজেডি, যা আমাকে প্রতিদিন বাঁচিয়ে রাখে, আবার প্রতি মুহূর্তেই একটু একটু করে মেরে ফেলে।

পার্ট ১: বসন্তের এক চিলতে রোদ​সকাল থেকেই ঢাকার আকাশটা কেমন যেন মেঘলা হয়ে ছিল। উত্তরা এগারো নম্বর সেক্টরের চার তলার ফ্ল্য...
20/06/2026

পার্ট ১: বসন্তের এক চিলতে রোদ
​সকাল থেকেই ঢাকার আকাশটা কেমন যেন মেঘলা হয়ে ছিল। উত্তরা এগারো নম্বর সেক্টরের চার তলার ফ্ল্যাটটিতে বসে সুমি যখন দুপুরের রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন ওর মনে হচ্ছিল জীবনটা যেন এই চার দেয়ালের ভেতরেই আটকে গেছে। স্বামী জাহিদ পেশায় স্থপতি, কাজের সূত্রে তাকে প্রায়ই ঢাকার বাইরে থাকতে হয়। যখন বাসায় থাকে, তখনও সে ল্যাপটপের স্ক্রিন আর ড্রয়িংয়ের মাঝেই ডুবে থাকে। সুমির সাথে তার কথা হয় কেবল রুটিনমাফিক—"কী রান্না হলো?", "বিলটা দেওয়া হয়েছে?" ব্যস, এতটুকুই। বিয়ের সাত বছরে সুমি কোনোদিন জাহিদের কাছে নিজের মনের কথাগুলো গুছিয়ে বলতে পারেনি। ও যেন এই সংসারের একজন অবৈতনিক ব্যবস্থাপক মাত্র।
​সুমি নিজে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় পার্ট-টাইম প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করে। সপ্তাহে তিন দিন ওকে অফিসে যেতে হয়। সেদিন অফিসে একটা নতুন প্রজেক্টের মিটিংয়ে ওর পরিচয় হলো আরিফের সাথে। আরিফ অন্য একটি ডিপার্টমেন্টের কনসালটেন্ট। মাঝবয়সী, চোখে চশমা, এবং কথা বলার ধরণটা ভীষণ মার্জিত।
​মিটিং শেষে লাউঞ্জে কফি খাওয়ার সময় আরিফ সুমির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, "সুমি শুনুন, আপনার আজকের প্রেজেন্টেশনটা বেশ চমৎকার ছিল। বিশেষ করে প্রান্তিক নারীদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে আপনি যেভাবে বললেন, বোঝা যায় আপনি মানুষকে খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।"
​সুমি একটু লজ্জিত হয়ে বলল, "ধন্যবাদ আরিফ ভাই। আসলে আমি নিজে যা অনুভব করি, সেটাই বলার চেষ্টা করেছি।"
​"ভাই বলতে হবে না, আরিফ বললেই চলবে," ও হাসল। "আর হ্যাঁ, আমাদের এই যান্ত্রিক শহরে অনুভূতিগুলো প্রকাশ করার মানুষ পাওয়া সত্যিই কঠিন।"
​সেই শুরু। এরপর থেকে প্রতি বুধ আর বৃহস্পতিবার লাউঞ্জের কফি টেবিলটা যেন ওদের নিজস্ব একটা কোণ হয়ে উঠল। আরিফও বিবাহিত, ওর স্ত্রী সুবর্ণা একটি কলেজের শিক্ষক। আরিফের মুখেও সুমি শুনল একই একাকীত্বের গল্প। সুবর্ণা তার নিজের জগত, ক্যারিয়ার আর বাপের বাড়ি নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে, আরিফের ভালো লাগা বা মন্দ লাগার খবর রাখার সময় তার নেই।
​দুটো একাকী মন যখন পাশাপাশি বসে, তখন সময়ের হিসাব থাকে না। সুমি খেয়াল করল, ও এখন জাহিদের ফোনের চেয়ে আরিফের একটা মেসেজের জন্য বেশি অপেক্ষা করে। আরিফ ওকে খুব সাধারণ জিনিস জিজ্ঞেস করত—"আজ দুপুরের মেন্যু কী ছিল?" কিংবা "রবীন্দ্রনাথের এই কবিতাটা পড়েছেন?"—কিন্তু এই সাধারণ কথার মাঝেই সুমি খুঁজে পেত এক অদ্ভুত চেনা ওম, যা ও নিজের সংসারে কোনোদিন পায়নি।
​এক বিকেলে ধানমন্ডি লেকের পাশে একটা জরুরি অফিশিয়াল কাজ শেষে দুজনে একসাথে রিকশায় ফিরছিল। তীব্র জ্যামে রিকশা যখন ল্যাবএইডের সামনে আটকে, তখন হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি নামল। হুডটা তোলার পরও বৃষ্টির ছাঁট আসছিল। আরিফ আলতো করে নিজের ছাতাটা মেলে ধরে সুমির দিকে একটু ঝুঁকে বসল, যাতে সুমির কাঁধটা ভিজে না যায়।
​সুমি আরিফের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো চপলতা ছিল না, ছিল এক তীব্র আকুলতা। সুমির বুকের ভেতরটা তখন ধড়ফড় করছিল। ও জানত, এটা ভুল। ও একজন বিবাহিত নারী, আরিফও বিবাহিত। কিন্তু এই নিষিদ্ধ টানের মোহ যে এত তীব্র হতে পারে, তা ও আগে কখনো বোঝেনি।
​বাসায় ফিরে সুমি যখন আয়নার সামনে দাঁড়াল, ওর ফোনটা কেঁপে উঠল। আরিফের মেসেজ: "বাসায় ঠিকঠাক পৌঁছেছেন? আজ বৃষ্টির চেয়েও আপনার চোখের নীরবতা আমাকে বেশি ছুঁয়ে গেছে।" সুমি আয়নায় নিজের লাল হয়ে যাওয়া মুখটা দেখল। ও বুঝতে পারছিল, ও এক অতলান্ত খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখান থেকে ফিরে আসা অসম্ভব।
​পার্ট ২: মায়াজাল ও মানসিক যুদ্ধ
​মাস ছয়েক কেটে গেছে। সুমি আর আরিফের সম্পর্কটা এখন আর কেবল অফিসের কফি টেবিল বা মেসেজের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। তারা এখন প্রায়ই লাঞ্চের বাহানায় খিলগাঁও বা গুলশানের নিরিবিলি রেস্তোরাঁগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটায়। তাদের মধ্যে কোনো শারীরিক ঘনিষ্ঠতা হয়নি, কিন্তু মানসিক দিক থেকে তারা একে অপরের অস্তিত্বের অংশ হয়ে গেছে।
​এক শুক্রবার জাহিদ ঢাকার বাইরে ছিল। আরিফ সুমিকে বলল, "আজ চলো কোথাও ঘুরে আসি, ঢাকার বাইরে। রূপগঞ্জের দিকে একটা নিরিবিলি রিসোর্ট আছে, সেখানে দুপুরে লাঞ্চ করব।"
​সুমি প্রথমে দ্বিধা করেছিল, কিন্তু নিজের ভেতরের একাকীত্ব আর আরিফকে দেখার তীব্র ইচ্ছা ওকে বাধ্য করল রাজি হতে। রূপগঞ্জের সেই রিসোর্টের এক কোণে বসে যখন তারা দুপুরের খাবার খাচ্ছিল, তখন চারপাশের সবুজ আর শীতল হাওয়া তাদের আরও কাছাকাছি নিয়ে এলো।
​আরিফ সুমির হাতটা টেবিলের ওপর আলতো করে স্পর্শ করল। সুমি হাতটা সরিয়ে নিল না। আরিফ ফিসফিস করে বলল, "সুমি, আমি জানি এটা অন্যায়। সমাজে আমাদের এই সম্পর্কের কোনো স্বীকৃতি নেই। কিন্তু সুবর্ণার সাথে আমার শুধু একটা আইনি চুক্তি টিকে আছে, আর আমার আত্মা পড়ে থাকে তোমার কাছে।"
​সুমি চোখ মুছল। "আরিফ, আমিও একই আগুনে পুড়ছি। জাহিদ যখন রাতে আমার পাশে ঘুমায়, আমার নিজেকে একজন অপরাধী মনে হয়। আমি জাহিদের সাথে প্রতারণা করছি, আবার তোমাকে ছাড়াও আমি বাঁচতে পারছি না। এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব আমাকে প্রতিদিন ভেতর থেকে শেষ করে দিচ্ছে।"
​গোপন যোগাযোগ বজায় রাখাটা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছিল। সুমি এখন বাথরুমের দরজা বন্ধ করে মেসেজ ডিলিট করে, ফোনের পাসওয়ার্ড বদলে ফেলেছে। জাহিদ একদিন রাতে বলল, "সুমি, ইদানীং তোমাকে খুব অন্যমনস্ক লাগে। ফোনটা সবসময় বুকে ধরে রাখো কেন?" সুমি আমতা আমতা করে অফিসের কাজের বাহানা দিল, কিন্তু জাহিদের চোখে ও সন্দেহের আভাস দেখতে পেল।
​এদিকে আরিফের ঘরেও ঝড় শুরু হয়েছিল। সুবর্ণা একদিন আরিফের ল্যাপটপে সুমির পাঠানো একটি ইমেইল দেখে ফেলে, যেখানে সুমি লিখেছিল—"তোমার সাথে কাটানো সময়গুলোই আমার বেঁচে থাকার অক্সিজেন।"
​ব্যস, আরিফের সংসারে তুলকালাম কাণ্ড শুরু হলো। সুবর্ণা আরিফকে স্পষ্ট জানিয়ে দিল, সে এই অপমান মেনে নেবে না। সে সুমির অফিসে এসে সিন ক্রিয়েট করার হুমকি দিল।
​পরদিন অফিসে আরিফের মুখ দেখে সুমি ভয় পেয়ে গেল। জাহিদও সেদিন হুট করে সুমিকে নিতে অফিসের নিচে গাড়ি নিয়ে চলে এসেছিল। সুমি যখন অফিস থেকে বের হচ্ছিল, তখন আরিফ ওর পিছু পিছু আসছিল কিছু বলার জন্য। কিন্তু নিচে জাহিদের গাড়ি দেখে আরিফ থমকে দাঁড়াল।
​জাহিদ গাড়ি থেকে নেমে আরিফকে দেখল। জাহিদের চোখ দুটো সরু হয়ে গেল। সে সুমিকে গাড়িতে উঠতে বলে আরিফের দিকে তাকিয়ে এক বরফশীতল গলায় বলল, "আপনাকে তো আগে সুমির সাথে দেখেছি। আপনাদের অফিশিয়াল খাতিরটা একটু বেশিই মনে হচ্ছে ইদানীং।"
​গাড়ির ভেতর জাহিদ এক মুহূর্তও কথা বলল না। সুমি জানালার বাইরে তাকিয়ে কাঁপছিল। ও বুঝতে পারছিল, গোপন খামটি এবার খোলাই হতে চলেছে।
​পার্ট ৩: ভাঙন ও নতুন দিগন্ত
​মালিবাগের বাসায় সেদিন রাতে যে দৃশ্য তৈরি হলো, তা সুমি কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেনি। ড্রয়িংরুমে জাহিদ স্তব্ধ হয়ে বসে ছিল, আর ওর সামনে টেবিলের ওপর রাখা ছিল সুমির ফোনটা, যা জাহিদ সুমি ওয়াশরুমে থাকার সময় আনলক করতে পেরেছিল (সুমি অসাবধানতাবশত জাহিদের চেনা একটি পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেছিল)।
​"এই তোমার সততা, সুমি?" জাহিদের গলার স্বর কাঁপছিল রাগে আর অপমানে। "আমি দিনরাত খাটছি আমাদের একটা সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য, আর তুমি অন্য একটা বিবাহিত পুরুষের সাথে দিনের পর দিন লিভ-ইন করছ মানসিকভাবে?"
​"জাহিদ, আমি দুঃখিত... আমাদের মধ্যে তেমন কিছুই হয়নি," সুমি কেঁদে ফেলল।
​"তেমন কিছু বলতে তুমি কী বোঝো, সুমি? বিছানায় যাওয়াটাই কি সব? তুমি তোমার মনটা ওকে দিয়ে দিয়েছ। আমার স্পর্শকে তুমি ঘৃণা করতে শুরু করেছ। এর চেয়ে বড় পরকীয়া আর কী হতে পারে?" জাহিদ সোজা জানিয়ে দিল, সে সুমির সাথে আর সংসার করবে না।
​খবরটা সুমির বাপের বাড়িতে পৌঁছাতে সময় লাগল না। ওর মা এসে ওকে অনেক গালমন্দ করলেন, বাবা মুখ ফিরিয়ে নিলেন। সমাজ, পরিবার সবার চোখে সুমি তখন একটা 'নষ্ট' মেয়ে।
​একই অবস্থা হলো আরিফেরও। সুবর্ণা ডিভোর্স ফাইল করে বাপের বাড়ি চলে গেল এবং আরিফের ক্যারিয়ারের ওপরও এর একটা বড় ধাক্কা এলো, কারণ অফিসে এই নিয়ে কানাঘুষা শুরু হয়েছিল।
​এক মাস পর।
​সুমি এখন ধানমন্ডির একটা ছোট সাবলেট রুমে একা থাকে। জাহিদের সাথে ওর আইনি বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া চলছে। ও এখন সম্পূর্ণ একা। সমাজ ওকে বর্জন করেছে, পরিবারও দূরত্ব বজায় রাখছে।
​একদিন সন্ধ্যায় আরিফ সুমির সেই ছোট ফ্ল্যাটে এলো। আরিফের চুলগুলো উসকোখুসকো, চোখে ক্লান্তির ছাপ। ও সুমির সামনে এসে বসল।
​"সুমি, আমাদের সব শেষ হয়ে গেল। সুবর্ণা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। এখন তো আমাদের আর কোনো বাধা নেই। চলো, আমরা কোর্টে গিয়ে বিয়েটা করে ফেলি," আরিফ সুমির হাত ধরে বলল।
​সুমি আরিফের হাতের দিকে তাকাল। যে স্পর্শের জন্য ও একসময় ব্যাকুল থাকত, আজ সেই স্পর্শে ও কোনো রোমাঞ্চ খুঁজে পেল না। ও আলতো করে হাতটা সরিয়ে নিল।
​"না, আরিফ। আমরা বিয়ে করব না," সুমি শান্ত গলায় বলল।
​আরিফ চমকে উঠল, "কেন সুমি? এই দিনটার জন্যই তো আমরা এত কিছু হারালাম!"
​"আমরা যা হারিয়েছি, তা অনুশোচনার পাহাড়, আরিফ," সুমি জানালার বাইরে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল। "আমরা ভেবেছিলাম আমাদের সম্পর্কটা খুব পবিত্র, খুব আত্মিক। কিন্তু আজ যখন আমরা দুটো সংসার ভেঙে, চারটে মানুষের জীবন ছারখার করে একসাথে দাঁড়াতে যাচ্ছি, তখন এই সম্পর্কের গায়ে শুধু অপরাধবোধ আর রক্তের দাগ লেগে আছে। আমি যখনই তোমার দিকে তাকাব, আমার মনে হবে আমি জাহিদের বিশ্বাসের লাশটার ওপর দাঁড়িয়ে আছি। তুমি সুবর্ণার মুখটা ভুলতে পারবে না।"
​আরিফ চুপ হয়ে গেল। ও বুঝতে পারছিল, সুমির কথাগুলো নিষ্ঠুর হলেও সত্যি। ভাঙা কাচের ওপর নতুন করে প্রাসাদ গড়া যায় না।
​"তাহলে আমাদের এই ত্যাগের মূল্য কী রইল?" আরিফ ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করল।
​"মূল্য এটাই যে, আমরা মোহ আর ভালোবাসার তফাতটা বুঝতে পারলাম। যখন কোনো সম্পর্কে একাকীত্ব আসে, তখন সঙ্গীর সাথে লড়াই করতে হয়, সম্পর্কটা মেরামতের চেষ্টা করতে হয়। বাইরের কোনো মানুষের ভেতর আশ্রয় খোঁজাটা সাময়িক শান্তি দিলেও, দিনশেষে তা শুধু ধ্বংসই ডেকে আনে। আমি এখন কিছুদিন নিজের সাথে থাকতে চাই, আরিফ। নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই।"
​আরিফ আর কোনো কথা বলল না। সে ধীরে ধীরে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। সিঁড়ি দিয়ে ওর নেমে যাওয়ার শব্দটা সুমি শুনল।
​সুমি ঘরের লাইটটা নিভিয়ে দিল। ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল ও। ঢাকার চেনা ব্যস্ত সড়ক, গাড়ির হর্ন, দূর থেকে ভেসে আসা মানুষের কোলাহল—সবকিছুর মাঝে ও ভীষণ একা। তবে এই একাকীত্বে এখন আর কোনো লুকোচুরি নেই, কোনো ভয়ের মেসেজ ডিলিট করার তাড়া নেই। ও নিজের ভুলের দায় স্বীকার করে নিয়েছে। আকাশ থেকে তখন দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছিল, যেন সুমির ভেতরের সব গ্লানি ধুয়ে দিতে চাইছে এক নতুন, কঠিন কিন্তু সৎ ভোরের আশায়।

পার্ট ১: মেঘের মতো জমাট অনুভূতি🚫​সকাল সাড়ে সাতটার অ্যালার্মটা যখন বাজল, অনন্যার তখনো মনে হচ্ছিল ঘুমটা ঠিক ভাঙেনি। পাশে ত...
11/06/2026

পার্ট ১: মেঘের মতো জমাট অনুভূতি🚫

​সকাল সাড়ে সাতটার অ্যালার্মটা যখন বাজল, অনন্যার তখনো মনে হচ্ছিল ঘুমটা ঠিক ভাঙেনি। পাশে তাকিয়ে দেখল শুভ্র গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। গত রাতেও ওর ফিরতে ফিরতে একটা বেজেছে। ধানমন্ডির একটা বেসরকারি ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার হিসেবে কাজ করে শুভ্র, কাজের চাপ ওর সবসময়ই বেশি।

​অনন্যা আলতো করে বিছানা ছেড়ে উঠল। মিরপুরের এই ফ্ল্যাটটাতে ওরা আছে প্রায় চার বছর হলো। বিয়ের পর প্রথম দুটো বছর বেশ কেটেছিল, কিন্তু আস্তে আস্তে শুভ্র যেন শুধু ওর ক্যারিয়ার আর ল্যাপটপের স্ক্রিনের ভেতর ঢুকে গেল। অনন্যা নিজেও একটা নামী মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে এইচআর-এ কাজ করে। ওরও কম ধকল যায় না, কিন্তু দিনশেষে ও একটু গল্প করতে চায়, একটুখানি সখ্যতা খোঁজে। শুভ্রর সেখানে উত্তর থাকে—"হুম, আচ্ছা, খুব টায়ার্ড লাগছে, পরে শুনব।"
​অফিসে সেদিন লাঞ্চের পর কফি মেশিনের সামনে অনন্যার দেখা হলো অয়নের সাথে। অয়ন মাস ছয়েক হলো ওদের টিমে জয়েন করেছে। শান্তশিষ্ট, কাজের প্রতি দারুণ মনোযোগী।

​"আপনাকে আজ একটু অন্যমনস্ক লাগছে, অনন্যা আপু," অয়ন কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল।
​অনন্যা একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, "না রে অয়ন, এমনি। রাতের ঘুমটা ভালো হয়নি।"
​"আসলে এই জ্যাম আর কাজের প্রেশারে আমাদের নিজেদের জীবনটাই হারিয়ে যাচ্ছে, তাই না?" অয়নের গলার স্বরে কেমন একটা গভীর সহানুভূতি ছিল, যা অনন্যাকে একটু অবাক করল।
​সেদিন থেকে শুরু। খুব ছোট ছোট ঘটনা। কখনো লাঞ্চ টেবিলে টুকটাক গল্প, কখনো কোনো প্রেজেন্টেশন নিয়ে একসাথে কাজ করা। অয়ন খুব ভালো শ্রোতা। অনন্যা খেয়াল করল, ও যেসব ছোটখাটো বিষয় শুভ্রকে বলতে গিয়েও বলতে পারে না—যেমন কোন বইটা ও পড়ছে, বা ছোটবেলার কোনো স্মৃতি—সেগুলো অয়ন খুব মন দিয়ে শোনে।
​এক রাতে রিকশায় করে মিরপুর ফেরার পথে বৃষ্টি নামল। শুভ্রকে ফোন দিল অনন্যা, "শুভ্র, খুব বৃষ্টি হচ্ছে। শেওড়াপাড়া সিগন্যালে আটকে আছি। গাড়ি নিয়ে আসতে পারবে?"
ওপাশ থেকে বিরক্ত গলা এলো, "অনন্যা, আমি একটা মিটিংয়ে আছি। উবার ট্রাই করো।"
​ফোনটা কেটে অনন্যা যখন প্রায় কাঁদ কাঁদ, তখন অয়নের মেসেজ এলো: "বাসায় পৌঁছেছেন? বৃষ্টিটা কিন্তু বেশ নামল।"
​অনন্যা লিখল, "না, আটকে আছি।"
পাঁচ মিনিটের মধ্যে অয়ন ফোন করল, "আমি টেকনিক্যালের মোড়েই আছি, আপনি দাঁড়ান, আমি একটা সিএনজি নিয়ে আসছি।"
​সেদিন সিএনজির ভেতর পাশাপাশি বসে ফেরার সময় অনন্যার বুকের ভেতর কেমন একটা অদ্ভুত কাঁপন তৈরি হলো। অয়ন কিন্তু ওকে ছোঁয়ার চেষ্টাও করেনি, বরং জানলা দিয়ে আসা বৃষ্টির ছাঁট থেকে অনন্যাকে বাঁচানোর জন্য নিজে একপাশে চেপে বসেছিল। অনন্যা মনে মনে এক তীব্র অপরাধবোধে ভুগতে লাগল, আবার একই সাথে ওর ভালোও লাগছিল। ও বুঝতে পারছিল, ও একটা নিষিদ্ধ টান অনুভব করছে।
​মাসখানেক পরের কথা। সেদিন অফিসে একটা প্রজেক্ট সাকসেসফুল হওয়ার পর সবাই পার্টি করছিল। অয়ন আর অনন্যা একটু সাইডে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল।
​হঠাৎ অয়ন বলল, "অনন্যা, একটা কথা বলব? জানি বলাটা ঠিক না..."
অনন্যা ওর চোখের দিকে তাকাল। অয়নের চোখে এক অদ্ভুত আকুলতা।
​"আমি জানি আপনি বিবাহিত, কিন্তু... আমি নিজেকে আটকাতে পারছি না। আপনাকে প্রতিদিন অফিসে দেখার পর আমার দিনটা অন্যরকম হয়ে যায়।"
​অনন্যা স্তব্ধ হয়ে গেল। ও কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই ওর ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। শুভ্রর ফোন। কিন্তু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে অনন্যার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। শুভ্রর ফোন থেকে অন্য একজন অচেনা মানুষ ফোন করেছে।
​ওপাশ থেকে ভেসে এলো, "হ্যালো, আপনি কি শুভ্রর ওয়াইফ? ওনার একটা বড় অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে, আমরা ওনাকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি..."

​পার্ট ২: টানাপোড়েন ও ভাঙন💔💔
​হাসপাতালের করিডোরে যখন অনন্যা পৌঁছাল, ওর পা কাঁপছিল। অয়ন ওর সাথেই এসেছিল, ও-ই সিএনজি ডেকে অনন্যাকে আগলে নিয়ে এসেছে। শুভ্রর মাথায় আর হাতে চোট লেগেছে, তবে ডাক্তার জানালেন বিপদমুক্ত।
​কেবিনে শুভ্রর পাশে বসে অনন্যার চোখ দিয়ে জল পড়ছিল। এটা কি শুধু শুভ্রর জন্য কষ্ট, নাকি নিজের ভেতরের অপরাধবোধ? শুভ্র যখন চোখ খুলল, অনন্যা ওর হাতটা ধরল। শুভ্র দুর্বল গলায় বলল, "অফিস থেকে ফেরার পথে একটা বাইক এসে..."
​ঠিক তখনই শুভ্রর চোখ গেল দরজার দিকে। সেখানে অয়ন দাঁড়িয়ে আছে, ওর হাতে অনন্যার ব্যাগ আর প্রেসক্রিপশনের ফাইল। শুভ্রর চোখটা একটু কুঁচকে গেল, "ও কে?"
​অনন্যা আমতা আমতা করে বলল, "ও অয়ন... আমার কলিগ। ও-ই আমাকে নিয়ে এলো।"
শুভ্র শুধু একটা শুকনো "ধন্যবাদ" বলল, কিন্তু ওর চাউনিটা অনন্যার ভালো ঠেকল না।
​পরের দুটো সপ্তাহ শুভ্রর সেবা করতে গিয়ে অনন্যা অফিসে যায়নি। অয়ন ওকে রোজ টেক্সট করত, অফিসের কাজের আপডেটের বাহানায় খোঁজ নিত। অনন্যা উত্তর দিত খুব সংক্ষিপ্ত। ও নিজেকে বোঝাত, ও শুভ্রর স্ত্রী, এই টানটা ভুল, পাপ।
​কিন্তু শুভ্র সুস্থ হয়ে অফিসে ফেরার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হলো। শুভ্রর মেজাজ খিটখিটে হয়ে উঠেছিল। একদিন রাতে অনন্যার ফোনে অয়নের একটা মেসেজ এলো—"আজ নীল শাড়িতে আপনাকে খুব সুন্দর লাগছিল।" (অনন্যা সেদিন একটা পারিবারিক অনুষ্ঠানে নীল শাড়ি পরে ছবি ফেসবুকে দিয়েছিল)।
​শুভ্র মেসেজটা দেখে ফেলল। ব্যস, ঝড়ের গতিতে অশান্তি শুরু হলো।
"অনন্যা, এই ছেলের সাথে তোমার কী সম্পর্ক? ও কেন তোমাকে মাঝরাতে টেক্সট করবে?" শুভ্রর চিৎকার পুরো ফ্ল্যাটে প্রতিধ্বনিত হলো।
​"ও আমার শুধু সহকর্মী, শুভ্র! তুমি ভুল ভাবছ," অনন্যা কেঁদে ফেলল।
​"আমি অন্ধ নই, অনন্যা। হাসপাতালে ও যেভাবে তোমার ব্যাগ ধরে দাঁড়িয়ে ছিল, আর এখন এই মেসেজ—সব প্রমাণ করে তোমরা ফ্রেন্ডশিপের চেয়ে বেশি কিছু করছ!" শুভ্রর এই সন্দেহ অনন্যাকে ভেঙে চুরমার করে দিল। যে স্বামী বছরের পর বছর ওর আবেগের কোনো মূল্য দেয়নি, সে আজ সস্তা চরিত্রহনন করছে।
​পরদিন অফিসে অনন্যা খুব বিষণ্ণ ছিল। লাঞ্চের সময় ও অয়নকে একা পেয়ে একটা ফাঁকা কনফারেন্স রুমে ডাকল।
​"অয়ন, দয়া করে আমাকে আর পার্সোনাল মেসেজ কোরো না। আমার সংসারে আগুন লেগে যাচ্ছে," অনন্যা ফিসফিস করে বলল, ওর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
​অয়ন অনন্যার খুব কাছে চলে এলো। ও অনন্যার চোখের জলটা মুছিয়ে দিতে গিয়েও হাতটা নামিয়ে নিল। অত্যন্ত আবেগ জড়ানো গলায় বলল, "আমি আপনাকে কষ্ট দিতে চাইনি, অনন্যা। কিন্তু আমি কী করব? যে মানুষটা আপনার চোখের জলের দাম দেয় না, তার জন্য আপনি নিজেকে কেন শেষ করছেন? আমি আপনাকে ভালোবাসি, অনন্যা। শুভ্রর চেয়ে অনেক বেশি সম্মান আর ভালোবাসা আমি আপনাকে দেব।"
​অনন্যা স্তব্ধ হয়ে অয়নের দিকে তাকিয়ে রইল। এই প্রথম কেউ ওকে এত সরাসরি নিজের করে চাইল। ওর মন চাইছে অয়নের বুকে মাথা রেখে সব কষ্ট ভুলে যেতে, কিন্তু ওর সমাজ, ওর বিয়ে ওকে টেনে ধরছে।
​ও দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে নিজের ডেস্কে চলে এলো। সারাটা দিন ও এক তীব্র ঘোরের মধ্যে কাটাল। বিকেলে অফিস ছুটির পর ও ব্যাগ গুছিয়ে লিফটের দিকে যাচ্ছে, এমন সময় ও দেখল অফিসের নিচে একটা পরিচিত গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
​গাড়ির কাচ নামল। ভেতরে শুভ্র বসে আছে, আর ওর পাশে বসে আছে অনন্যার নিজের মা! মায়ের মুখটা ভীষণ গম্ভীর এবং চোখ দুটো লাল। শুভ্র গাড়ি থেকে নেমে অনন্যার দিকে এগিয়ে এসে বলল, "তোমার মা সব শুনেছেন। আজ একটা চূড়ান্ত ফয়সালা হবে। গাড়িতে ওঠো।"

​পার্ট ৩: সত্যের মুখোমুখি এবং নতুন সকাল❤️❤️

​মিরপুরের বাসায় সেদিন যে পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তা অনন্যা কোনোদিন ভুলবে না। ড্রয়িংরুমে একদিকে ওর মা, অন্যদিকে শুভ্র আর ওর শ্বশুর-শাশুড়ি বসে আছেন।
​অনন্যার মা অত্যন্ত কড়া গলায় বললেন, "অনন্যা, আমরা তোকে এই শিক্ষা দিইনি। একটা পরপুরুষের জন্য তুই নিজের চার বছরের সংসার ভাঙতে বসেছিস?"
​অনন্যা সোফায় মাথা নিচু করে বসেছিল। ও বলল, "মা, তোমরা শুধু অয়নের মেসেজটাই দেখলে? এই চার বছরে শুভ্র আমাকে কতটা একা করে রেখেছিল, সেটা একবারও জিজ্ঞেস করলে না? আমি তো রোবট নই, মা।"
​শুভ্র রেগে গিয়ে বলল, "কাজের চাপ কার থাকে না? তাই বলে তুমি অন্য একটা ছেলের সাথে...?"
​"আমি অয়নের সাথে কোনো শারীরিক সম্পর্কে জড়াইনি, শুভ্র," অনন্যা স্পষ্ট গলায় বলল। "কিন্তু হ্যাঁ, ও আমাকে মানসিক শান্তি দিয়েছিল, যা আমি এই ঘরে পাইনি। তুমি কোনোদিন জানতেও চাওনি আমার মন কেমন থাকে।"
​সংসারের এই চরম অশান্তি আর সন্দেহের পরিবেশে অনন্যা দমবন্ধ অনুভব করতে লাগল। এক সপ্তাহের মধ্যে ও সিদ্ধান্ত নিল, ও এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। ও নিজের মায়ের বাড়িতেও গেল না, কারণ সেখানেও ওকে অপরাধী ভাবা হচ্ছিল। ও লালমাটিয়ায় একটা ছোট সাবলেট রুম ভাড়া নিল। শুভ্রর সাথে ওর ডিভোর্সের প্রক্রিয়া শুরু হলো পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমেই, কারণ শুভ্রও এই 'কলঙ্কিত' সম্পর্ক আর টানতে চাইল না।
​এই কঠিন সময়ে অয়ন অনন্যার পাশে ছায়ার মতো ছিল। ও অনন্যাকে নতুন বাসা খোঁজা থেকে শুরু করে আইনি কাজেও সাহায্য করল।
​ছয় মাস পর। অনন্যা এখন একা থাকে। শুভ্রর সাথে ওর আইনি বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। একদিন বিকেলে ধানমন্ডি লেকের পাড়ে অয়নের সাথে ওর দেখা হলো।
​অয়ন আলতো করে অনন্যার হাতটা ধরে বলল, "অনন্যা, অনেক তো ঝড় গেল। এবার কি আমি তোমার জীবনে পাকাপাকিভাবে আসতে পারি? আমরা নতুন করে শুরু করতে পারি না?"
​অনন্যা অয়নের হাতের দিকে তাকাল, তারপর আলতো করে হাতটা সরিয়ে নিল। ও একটু হাসল, যে হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, শুধু ছিল এক গভীর ম্যাচিউরিটি।
​"অয়ন," অনন্যা বলল, "তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে আমার হাত ধরেছিলে, সে জন্য আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমি একটা জিনিস বুঝতে পেরেছি। শুভ্রর সাথে আমার দূরত্ব তৈরি হয়েছিল বলেই আমি তোমার দিকে ঝুঁকেছিলাম। সেটা ভালোবাসা ছিল, নাকি একাকীত্ব কাটানোর একটা আশ্রয়—সেটা আমি আজও নিশ্চিত নই।"
​অয়ন অবাক হয়ে তাকাল, "তার মানে তুমি আমাকে চাও না?"
​"আমি এখন কাউকে চাই না, অয়ন," অনন্যা লেকের পানির দিকে তাকিয়ে বলল। "একটা ভাঙা মন আর একরাশ অপরাধবোধ নিয়ে আমি যদি তোমার জীবনে আসি, আমি তোমাকে কোনোদিন সুখী করতে পারব না। তাছাড়া, আমি নিজেকে নতুন করে চিনতে শিখেছি। এতদিন আমি অন্যের ওপর নির্ভর করে ভালো থাকতে চেয়েছি—প্রথমে শুভ্র, তারপর তুমি। কিন্তু এখন আমি নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে চাই। নিজের একাকীত্বকে ভালোবাসতে চাই।"
​অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "আমি তোমার সিদ্ধান্তের ওপর জোর করব না। তবে আমি অপেক্ষা করব।"
​অনন্যা আর কিছু বলল না। ও রিকশা ডেকে উঠে বসল। বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা নামছে ঢাকার আকাশে।
​একটি বাস্তব শিক্ষা:
আমাদের সমাজে অনেক সময়ই বৈবাহিক জীবনের একাকীত্ব মানুষকে অন্য কারও দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু অন্য কেউ এসে সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে না, যদি না মানুষ নিজের ভেতর থেকে শক্ত হয়। আবেগ আর মোহের পার্থক্যটা বুঝতে বুঝতে অনেক সময় অনেক দেরি হয়ে যায়, তবে নিজের ভুল বুঝতে পেরে সততার সাথে নতুন করে বাঁচতে শেখাটাই জীবনের আসল পরীক্ষা।

অন্ধকারের কড়া নাড়া​পার্ট ১: একটা অদ্ভুত রাতের শুরু​ঘটনাটা ঘটেছিল আজ থেকে বছর দুয়েক আগে। আমি তখন ঢাকার ধানমন্ডির একটা পুর...
10/06/2026

অন্ধকারের কড়া নাড়া

​পার্ট ১: একটা অদ্ভুত রাতের শুরু

​ঘটনাটা ঘটেছিল আজ থেকে বছর দুয়েক আগে। আমি তখন ঢাকার ধানমন্ডির একটা পুরোনো ফ্ল্যাটে একা থাকতাম। চাকরি সূত্রে পরিবার থেকে দূরে থাকা, তাই দিনের শেষে ওই নিস্তব্ধ ফ্ল্যাটটাই ছিল আমার ঠিকানা। আমি বরাবরই একটু রাতজাগা মানুষ। সেদিন রাতেও একটা প্রজেক্টের কাজ শেষ করতে করতে ঘড়িতে তখন প্রায় রাত পৌনে দুটো।
​বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল, আর পুরোনো জানলার কাচগুলো বাতাসে খড়খড় করে কাঁপছিল। হঠাৎ করেই ড্রয়িংরুমের দিক থেকে একটা শব্দ পেলাম। মনে হলো কেউ যেন খুব আস্তে করে মেইন দরজায় কড়া নাড়ল।
​খট... খট... খট...🕸️🕸️

​আমি ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে কান খাড়া করলাম। এই এত রাতে কে আসবে? হয়তো মনের ভুল ভেবে আবার কাজে মন দিলাম। কিন্তু ঠিক দুই মিনিট পর আবার সেই একই শব্দ। এবার একটু জোরে, আর অনেক বেশি স্পষ্ট।
​আমি চেয়ার ছেড়ে উঠলাম। মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইটটা জ্বালিয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে এগোলাম। দরজার কাছে গিয়ে আই-হোল (eye-hole) দিয়ে বাইরে তাকালাম। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার, করিডোরের লাইটটা ফিউজ হয়ে আছে। তাও সেই আবছা আলো-আঁধারিতে যা দেখলাম, তাতে আমার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল।🕸️🕸️

​দরজার ওপাশে কেউ দাঁড়িয়ে নেই। কিন্তু দরজার ঠিক নিচ দিয়ে, ভেতর দিকে গলে আসছে একটা কুচকুচে কালো রঙের তরল। ঠিক যেন তাজা রক্ত, কিন্তু রঙটা কালচে। আর সবচেয়ে ভয়ার্ত ব্যাপার হলো, সেই তরলটা মেঝে বেয়ে আস্তে আস্তে আমার পায়ের দিকেই এগিয়ে আসছে!

​পার্ট ২: রহস্যের গভীরে
​ভয়ে আমি দু-পা পিছিয়ে গেলাম। কলিজাটা যেন মুখের কাছে চলে এসেছিল। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনের লাইটটা মেঝেতে ফেললাম। তরলটা সত্যি সত্যিই দরজার তলা দিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকছে, আর অদ্ভুত একটা পচা গন্ধ সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে।

​আমি নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম। "না, এটা অলৌকিক কিছু না। হয়তো ওপরের তলার ড্রেনেজ পাইপ ফেটে নোংরা পানি আসছে," মনে মনে ভাবলাম। কিন্তু মনকে সান্ত্বনা দিলেও হাত-পা কাঁপছিল। সাহস করে দরজার লকটা খুললাম। একটা হালকা ক্যাঁচক্যাচ শব্দ করে দরজাটা খুলতেই বাইরের করিডোরের ঠান্ডা বাতাস আমার মুখে এসে লাগল।

​বাইরে কেউ নেই। করিডোরটা একদম ফাঁকা। কিন্তু মেঝের দিকে তাকাতেই আমার চোখ কপালে উঠল। দরজার বাইরে কোনো তরল বা রক্তের দাগ নেই! মেঝে একদম শুকনো! তাহলে ঘরের ভেতরের এই তরলটা কোথা থেকে এল?
​পেছন ফিরে তাকাতেই আমার চিৎকার আটকে গেল। ঘরের ভেতরের সেই কালো তরলটা এখন আর মেঝেতে ছড়িয়ে নেই। সেটা অদ্ভুতভাবে জমাট বেঁধে ঘরের দেয়ালে দেয়ালের দিকে এগোচ্ছে, আর দেয়ালে নিখুঁত বাংলায় একটা লেখা ফুটে উঠছে—একদম তাজা রক্তে লেখা:
​"তুই একা নোস।"
​ঠিক তখনই আমার ঠিক পেছনের অন্ধকার করিডোর থেকে একটা ভারী চটি জুতো পরে হেঁটে আসার শব্দ হলো। খুব ধীর পায়ে কেউ একজন আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। আমি ঘুরে তাকালাম, কিন্তু অন্ধকারের কারণে কিছুই দেখতে পেলাম না। শুধু শুনতে পেলাম একটা খসখসে, অতিপ্রাকৃতিক কণ্ঠস্বর আমার কানের ঠিক পাশে ফিসফিস করে বলে উঠল, "ভেতরে আসতে পারি?"🙄

​পার্ট ৩: চরম সত্য ও পরিণতি
​ভয়ে আমার মুখের ভাষা হারিয়ে গিয়েছিল। আমি এক লাফে ঘরের ভেতর ঢুকে দরজাটা দড়াম করে বন্ধ করে লক করে দিলাম। বুকে হাত দিয়ে হাঁপাতে লাগলাম। সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে।🕸️🕸️
​ফোনটা তুলে আমার এক বন্ধুকে কল দেওয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু ফোনে কোনো নেটওয়ার্ক নেই। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, রাত ২টা ৪৫ মিনিট। ঠিক তখনই ঘরের সব লাইট একসাথে দপ করে জ্বলে উঠল, আবার নিভে গেল। পুরো ফ্ল্যাটটা যেন বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেছে।
​আমি দেয়ালের দিকে তাকালাম। সেই রক্তের লেখাটা এখন আর নেই, কিন্তু তার বদলে ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা ছায়া দাঁড়িয়ে আছে। লম্বা, কুঁজো এক অবয়ব। তার মুখটা দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু তার গা থেকে সেই পচা গন্ধটা আসছিল।
​আমি দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে মেঝেতে বসে পড়লাম। চোখ বন্ধ করে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকতে লাগলাম। হঠাত করেই কানে এলো একটা কান্নার শব্দ। খুব চেনা একটা কণ্ঠস্বর। মনে হলো আমার মায়ের গলা! চোখ খুলে দেখি, সেই অবয়বটা আমার দিকে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসছে, আর তার মুখটা অবিকল আমার মায়ের মতো, কিন্তু চোখ দুটো সম্পূর্ণ কুচকুচে কালো, কোনো মণি নেই!
​সে আমার দিকে তাকিয়ে একটা বিকৃত হাসি দিল। আমি আর সহ্য করতে পারলাম না, জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লাম।
​পরদিন সকালে যখন আমার জ্ঞান ফেরে, তখন দেখি আমি আমার বিছানায় শুয়ে আছি। বাইরে ঝলমলে রোদ। রাতের সেই কালো তরল, দেয়ালে লেখা—কিচ্ছু নেই। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, ভাবলাম হয়তো খুব ভয়াবহ কোনো দুঃস্বপ্ন দেখেছি। মনটা শান্ত হলো।🕸️🕸️

​বিছানা থেকে উঠে বাথরুমে গেলাম মুখ ধুতে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পানি দিয়ে যেই মুখটা মুছলাম, অমনি আমার নজর গেল আয়নার ওপর। আয়নার ঠিক কোণায়, ছোট ছোট অক্ষরে ধুলো দিয়ে কেউ একটা লাইন লিখে গেছে। লেখাটা দেখে আমার হাত থেকে পানির মগটা পড়ে ভেঙে গেল।
​সেখানে লেখা ছিল: "দুঃস্বপ্নটা সত্যি ছিল। আমি এখনও এখানেই আছি।"
​আজ দুই বছর হয়ে গেছে, আমি সেই ফ্ল্যাট ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু আজও, মাঝরাতে ঘুমাতে গেলে মনে হয় খাটটার ঠিক নিচে কেউ একজন শুয়ে আছে, আর আমার নিঃশ্বাসের শব্দ গুনছে।

10/06/2026

পার্ট ২: আয়নার সামনে অপরাধী
​"একটা সময় টেক্সট থেকে ফোনে কথা, তারপর একদিন কফি শপে দেখা। নীলয়ের চোখে আমার জন্য যে মুগ্ধতা দেখেছিলাম, তা আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম আমার একটা সংসার আছে, একটা সন্তান আছে।🖤🖤🖤

​কিন্তু সত্যি বলব? এই সমান্তরাল জীবনে কোনো শান্তি নেই। এটা একটা জীবন্ত নরক।
​যখন নীলয়ের সাথে দেখা করে রিকশায় ফিরতাম, তখন মনে হতো আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। কিন্তু যেই বাসার কলিং বেলে হাত দিতাম, অমনি অপরাধবোধে আমার দম বন্ধ হয়ে আসত। আমার মেয়েটা যখন দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলত, 'আম্মু তুমি কোথায় গিয়েছিলে?'—আমার মনে হতো আমি এই নিষ্পাপ বাচ্চাটার কপালে একটা কলঙ্কের দাগ এঁকে দিয়ে এসেছি।🖤🖤🖤

​সবচেয়ে বেশি কষ্ট হতো আসিফের মুখোমুখি হতে। ও যখন অফিস থেকে ফিরে ক্লান্ত শরীরেও আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলত, 'শরীরটা খারাপ লাগছে নাকি? একটু রেস্ট নাও।'—তখন নিজের ওপর ঘেন্না লাগত। যে মানুষটা আমাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে, তার পেছনে আমি ছুরি মারছি?🖤🖤🖤

​আমি নীলয়কে ব্লক করতে চেয়েছি হাজারবার। কিন্তু পরমুহূর্তেই একাকীত্ব আর নীলয়ের অ্যাটেনশনের টান আমাকে আবার ওর কাছে টেনে নিয়ে যেত। একটা চোরাবালিতে আটকে গিয়েছিলাম আমি, যত বের হতে চাচ্ছিলাম, তত বেশি ডাবছিলাম।"🖤🖤🖤💔

09/06/2026



🚫পার্ট ১: ভুল দরজায় কড়া নাড়া
​"সবচেয়ে ভয়ংকর ভুলগুলো কিন্তু কোনো প্ল্যান করে হয় না। খুব সাধারণ একটা দিনে, খুব স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয়।🖤🖤🖤

​আসিফের সাথে আমার বিয়ের বয়স এখন সাত বছর। আমাদের একটা পাঁচ বছরের মেয়েও আছে। লাইফটা একদম ছকে বাঁধা—সকালে ঘুম থেকে ওঠা, বাচ্চার স্কুল, রান্না, আসিফের অফিস, আর রাতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়া। ভালোবাসা কমেনি, কিন্তু কেমন যেন একটা একঘেয়েমি চলে এসেছিল। আসিফ তার কাজ আর ক্যারিয়ার নিয়ে এত ব্যস্ত যে, দিনশেষে আমার একাকীত্বটা দেখার সময় তার ছিল না।
​ঠিক তখনই নীলয়ের সাথে আলাপ। একটা ফেসবুক গ্রুপে কমেন্ট সেকশনে টুকটাক কথা থেকে ইনবক্স।🖤🖤🖤

​প্রথম প্রথম নীলয় ছিল স্রেফ একজন ভালো বন্ধু। কিন্তু ও এমনভাবে আমার খোঁজ নিত, যা আমি বহু বছর ধরে পাইনি। 'দুপুরে খেয়েছ?', 'আজ তোমাকে একটু মন খারাপ লাগছে কেন?'—এই ছোট ছোট প্রশ্নগুলো কেন জানি আমার ভেতরে ম্যাজিকের মতো কাজ করতে শুরু করল।🖤🖤🖤

​আমি বুঝতে পারছিলাম আমি একটা ভুল লাইনে হাঁটছি। আসিফের পাশে শুয়ে যখন নীলয়ের টেক্সটের রিপ্লাই দিতাম, বুকটা কেঁপে উঠত। কিন্তু ওই যে—বহুদিন পর নিজেকে কারও কাছে স্পেশাল মনে হওয়ার যে লোভ, সেটা আমি সামলাতে পারলাম না। এক রাতের একটা সাধারণ চ্যাট যে আমার পুরো লাইফ ওলটপালট করে দেবে, সেটা তখন বুঝিনি।"
To Be Continued 💔💔💔

Address

137/1, Hazaribagh Road
Dhaka
1209

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Untold Stories posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share