21/06/2026
ফেলে আসা বিকেলের ছায়া
পার্ট ১: ক্যাফে উইন্ডো আর সেই হলুদ খাম
ঘটনাটা আমার জীবনের। খুব সাধারণ একটা ছেলে আমি, থাকি উত্তরার সেক্টর ১১-এর একটা নিরিবিলি গলিতে। একটা ছোট আইটি ফার্মে কোড লেখার কাজ করি। জীবনটা একদম ঘড়ির কাঁটায় বাঁধা ছিল—অফিস, ল্যাপটপ আর ঘরের কোণ। কিন্তু গত বছরের একটা বৃষ্টিভেজা বিকেল আমার সেই চেনা দুনিয়াটাকে এমনভাবে ওলটপালট করে দেবে, তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।
সেদিন ছিল একটা মেঘলা শুক্রবার। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে আমি ঝিল পাড়ের একটা ছোট, ছিমছাম ক্যাফেতে ঢুকে বসলাম। জানলার পাশের টেবিলটায় বসে কফিতে চুমুক দিচ্ছি, ঠিক তখনই ও এলো। পরনে সাধারণ একটা নীল কুর্তি, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, আর চুলগুলো বৃষ্টির ছাঁটে সামান্য ভেজা। ও আমার ঠিক সামনের টেবিলটায় বসল। প্রথম দেখাতেই কেন জানি বুকের ভেতর একটা চেনা সুর বেজে উঠেছিল। মেয়েটার নাম ছিল নীলিমা। খুব অদ্ভুত এক সম্মোহন ছিল ওর শান্ত চোখের চাউনিতে।
ক্যাফেতে ভিড় থাকার কারণে একটা সময় আমাদের কথা শুরু হলো। বিল দেওয়ার সময় জানা গেল, ও ভুল করে ওর পার্সটা বাসায় ফেলে এসেছে। আমি হেসে বিলটা মিটিয়ে দিলাম। ব্যস, সেখান থেকেই শুরু। এরপর আমাদের প্রায়ই দেখা হতো। রিকশায় হুড তুলে বৃষ্টি দেখা, চারুকলার বকুলতলায় বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করা—নীলিমা খুব দ্রুত আমার পুরো আকাশটা জুড়ে বসেছিল। ও জানাত ও ধানমন্ডিতে একটা হোস্টেলে থাকে, পড়াশোনা শেষ করে একটা এনজিওতে যোগ দেবে। আমি ওর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম।
অস্বাভাবিকতাটা শুরু হলো আমাদের সম্পর্কের ঠিক চার মাসের মাথায়। সেদিন ছিল ওর জন্মদিন। আমি উত্তরা রাজউক কলেজের কাছের একটা রেস্তোরাঁয় ওর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। টেবিলের ওপর রাখা নীলিমার প্রিয় রজনীগন্ধার তোড়া। কিন্তু অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময় পার হয়ে এক ঘণ্টা গেল, দুই ঘণ্টা গেল, নীলিমার ফোন বন্ধ। প্রচণ্ড দুশ্চিন্তা নিয়ে যখন আমি রেস্তোরাঁ থেকে বের হতে যাব, ঠিক তখন একজন ওয়েটার এসে আমার হাতে একটা সামান্য ভেজা হলুদ খাম দিল।
বলল, "স্যার, বাইরে এক আপা এই চিঠিটা আপনার জন্য দিয়ে গেলেন।"
আমি অবাক হয়ে খামটা খুললাম। ভেতরে নীলিমার চেনা হাতের লেখায় শুধু একটা লাইন লেখা:
"আমাকে খোঁজার চেষ্টা করো না অর্ক। আমি যেখানে যাচ্ছি, সেখান থেকে কেউ কোনোদিন ফিরে আসে না। ভালো থেকো।"
আমার মাথাটা মুহূর্তের মধ্যে ফাঁকা হয়ে গেল। তড়িঘড়ি করে রেস্তোরাঁ থেকে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম, কিন্তু চারপাশের চেনা ভিড়ে কোথাও নীলিমার সেই নীল কুর্তির ছোঁয়া ছিল না।
পার্ট ২: ধানমন্ডির সেই ঠিকানা আর রহস্যের জাল
চিঠিটা পাওয়ার পর তিনটে দিন আমি প্রায় না খেয়ে, না ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। ওর ফোনটা অনবরত বন্ধ দেখাচ্ছিল। কোনো উপায় না পেয়ে, ও আমাকে আগে যে হোস্টেলটার কথা বলেছিল, আমি সরাসরি ধানমন্ডির সেই লেনের ঠিকানায় চলে গেলাম।
পুরোনো আমলের একটা দোতলা বাড়ি, চারপাশটা কেমন যেন থমথমে আর নিস্তব্ধ। গেটের কাছে একজন বয়স্ক দারোয়ান বসে ছিলেন। আমি নীলিমার ছবিটা ফোনে দেখিয়ে ওনার কাছে জানতে চাইলাম, "চাচা, এই মেয়েটা কি এই হোস্টেলে থাকে? তিন দিন ধরে ওনাকে পাচ্ছি না।"
বৃদ্ধ দারোয়ান চশমাটা ঠিক করে স্ক্রিনের দিকে তাকালেন। তারপর হঠাৎ ওনার মুখের রঙ বদলে গেল। তিনি অদ্ভুত এক আতঙ্কে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "বাবা, তুমি কার খোঁজে আসছ? এই মেয়ে তো আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে এই লেনের মোড়ে একটা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে! ও তো আর এই দুনিয়ায় নাই!"
দারোয়ানের কথা শুনে আমার পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল। "কী আজেবাজে বকছেন চাচা! এই তো চার দিন আগে আমি ওর সাথে রিকশায় ঘুরেছি, কফি খেয়েছি!" আমি প্রায় চিৎকার করে উঠলাম। কিন্তু বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন, "আমি মিথ্যা বলছি না বাবা। বিশ্বাস না হলে ভেতরে গিয়ে ল্যান্ডলর্ড খালাম্মার সাথে কথা বলো।"
আমি পাগলের মতো ভেতরে গেলাম। বাড়ির মালকিন আমার অবস্থা দেখে ওনার ড্রয়িংরুমে বসালেন। আমি ওনাকে সব খুলে বলতেই তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভেতরের ঘর থেকে একটা ডায়েরি আর কিছু ছবি নিয়ে এলেন। ছবিগুলো দেখে আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। নীল কুর্তি পরা সেই একই মেয়ে, হুবহু আমার নীলিমা—কিন্তু ছবির নিচে তারিখ লেখা '২০২৫ সালের মে মাস'।
বাড়িওয়ালি মহিলা কাঁপানো গলায় বললেন, "নীলিমা আমার এখানেই থাকত বাবা। ও মারা যাওয়ার পর ওর টেবিলের ড্রয়ারে এই ডায়েরিটা পাওয়া যায়। ও একটা ছেলেকে খুব ভালোবাসত, কিন্তু ও কোনোদিন ছেলেটার সামনে যাওয়ার সাহস পায়নি। দূর থেকে দেখত।"
আমি কাঁপতে কাঁপতে ডায়েরির পাতাগুলো উল্টাতে লাগলাম। প্রতিটা পাতায় নীলিমার হাতের অক্ষরে আমার দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি লেখা—আমি কখন অফিসে যাই, কখন কফি খাই। ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা ছিল: "আমি জানি আমার সময় শেষ, কিন্তু আমি একবার, শুধু একবার ওর হাতটা ছুঁয়ে দেখতে চাই। ঈশ্বর কি আমাকে সেই চারটা মাস সময় দেবেন না?"
ঠিক তখনই আমার পকেটের ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। স্ক্রিনে তাকিয়ে আমার কলিজা শুকিয়ে গেল। কোনো নম্বর নেই, শুধু লেখা 'Unknown Number'। ফোনটা কানে নিতেই ওপাশ থেকে একটা খুব চেনা, ভাঙা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। নীলিমা কাঁদছে। ও ফিসফিস করে বলল, "অর্ক, তুমি ওখানে কেন গিয়েছ? ওরা জেনে গেছে আমি নিয়ম ভেঙেছি। ওরা আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে... বাঁচাও আমাকে, অর্ক!" ফোনের ওপাশ থেকে তীব্র বাতাসের আর ভারী কিছু টেনে নেওয়ার শব্দ আসতে লাগল।
পার্ট ৩: ঝিল পাড়ের শেষ দেখা ও নির্মম সত্য
আমি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালাম না। ফোনটা হাতে নিয়েই ল্যাপটপ, ব্যাগ সব ফেলে ধানমন্ডির ওই বাড়ি থেকে এক লাফে রাস্তায় নেমে এলাম। চারপাশের বাতাস তখন কেমন যেন ভারী হয়ে এসেছে, দিনের বেলাতেই চারদিক অন্ধকার করে মেঘ জমেছে। ফোনের ওপাশ থেকে তখন শুধু নীলিমার গোঙানির শব্দ আর অমানুষিক একটা আর্তনাদ আসছিল। আমি চিৎকার করে বললাম, "নীলিমা! তুমি কোথায়? আমি আসছি, বলো তুমি কোথায়!"
ওপাশ থেকে অত্যন্ত দুর্বল গলায় উত্তর এলো, "আমাদের সেই প্রথম দেখার ক্যাফেটার পেছনের ঝিল পাড়ে... অর্ক, এটাই শেষ..." এরপরই ফোনটা কেটে গেল।
আমি একটা বাইক ভাড়া করে তীব্র গতিতে উত্তরার সেই ঝিল পাড়ের দিকে ছুটলাম। যখন পৌঁছালাম, তখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে। ক্যাফের পেছনের ঝিল পাড়টা একদম জনমানবহীন। ঝাপসা বৃষ্টির মধ্যে আমি দূর থেকে দেখতে পেলাম, একটা অবয়ব ঝিলের ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে। সেই নীল কুর্তি, বাতাসে উড়ছে ওর চুল।
আমি দৌড়ে ওর কাছে গেলাম। "নীলিমা!" বলে ওর কাঁধে হাত দিতেই ও ঘুরে দাঁড়াল। কিন্তু ও ঘুরে দাঁড়াতেই ভয়ে আর শোকে আমার চিৎকার আটকে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির মুখটা আর সেই চেনা সুন্দর নীলিমার মতো নেই। ওর গায়ের চামড়া কেমন যেন ফ্যাকাসে, সাদাটে হয়ে গেছে। চোখ দুটো সম্পূর্ণ রক্তবর্ণ, আর ও অনবরত কাঁদছে, কিন্তু চোখ দিয়ে পানির বদলে কালচে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। ওর শরীরটা যেন ধীরে ধীরে বাষ্পের মতো বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে।
ও আমার দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিল। ওর সেই হাত, যা আমি কতবার ভালোবেসে ছুঁয়েছি, আজ সেটা বরফের চেয়েও ঠান্ডা। ও কাঁপা গলায় বলল, "আমি শুধু একটু ভালোবাসার ছোঁয়া পেতে চেয়েছিলাম অর্ক। কিন্তু মৃতের সাথে জীবিতের প্রেম তো প্রকৃতির নিয়ম লঙ্খন করে। আমার সময় শেষ। ওরা আমাকে নিতে এসেছে।"
আমি ওর হাতটা শক্ত করে ধরতে গেলাম, কিন্তু আমার হাত ওর শরীরের ভেতর দিয়ে গলে চলে গেল। আমি শূন্য বাতাসকে আঁকড়ে ধরলাম। ও আমার দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো সেই চেনা মিষ্টি হাসিটা দিল, যা দেখে আমার বুকটা ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছিল। তারপর, চোখের পলকে একটা তীব্র বাতাসের ঝাপটা এলো, আর নীলিমা পুরোপুরি মিলিয়ে গেল বাতাসে। ঘাটের ওপরে পড়ে রইল শুধু ওর সেই ভেজা রজনীগন্ধার তোড়াটা, যা আমি ওনাকে জন্মদিনে দেব বলে ভেবেছিলাম।
আজ সেই ঘটনার পর বেশ কয়েকটা মাস কেটে গেছে। পুলিশ, সমাজ—সবাই এটাকে আমার মানসিক রোগ বা হ্যালুসিনেশন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমি জানি, সেটা ভুল ছিল না।
আজও যখন খুব বৃষ্টি হয়, আমি একা একা সেই ঝিল পাড়ের ঘাটটায় গিয়ে বসি। আর অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বৃষ্টির শব্দের মাঝখানেও আমি খুব স্পষ্ট শুনতে পাই, কেউ একজন আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে যায়—"আমি আজও তোমাকে দূর থেকে দেখি, অর্ক।" অবিকল আমার নীলিমার কণ্ঠস্বর। এ এক এমন ট্র্যাজেডি, যা আমাকে প্রতিদিন বাঁচিয়ে রাখে, আবার প্রতি মুহূর্তেই একটু একটু করে মেরে ফেলে।