14/05/2026
সম্ভাজি মহারাজা, যে মারাঠা রাজাকে নির্মম ভাবে হত্যা করেছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেব!
ছত্রপতি সম্ভাজি মহারাজ (১৪ মে ১৬৫৭ – ১১ মার্চ ১৬৮৯) ছিলেন মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা শিবাজী মহারাজের জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং মারাঠা সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় ছত্রপতি। ১৬৮১ থেকে ১৬৮৯ সাল পর্যন্ত শাসনকালে তিনি মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যান, হিন্দু স্বরাজ্য রক্ষায় অসামান্য কূটনীতি ও সাহসিকতা প্রদর্শন করেন এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অদম্য মনোবল বজায় রেখেছিলেন।
১৬৮০ সালের এপ্রিলে শিবাজির মৃত্যুর পর, সম্ভাজি তাঁর সৎ ভাই রাজারামের সঙ্গে এক তীব্র সিংহাসন দখলের লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন, যার বয়স তখন ১০ বছর। সম্ভাজির সৎমা এবং রাজারামের মা সয়রাবাই, সম্ভাজিকে সিংহাসন থেকে দূরে রাখার জন্য তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সম্ভাজি মারাঠা সেনাপতি হাম্বিররাও মোহিতের সমর্থন লাভ করেন এবং ১৬৮১ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে মারাঠাদের শাসক হিসেবে অভিষিক্ত হন। রাজারাম, সোয়ারাবাই এবং তাদের সহযোগীদের গৃহবন্দি করা হয়।
সম্ভাজির মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ:
১৬৮৭ সালে ওয়াইয়ের যুদ্ধে মারাঠা সেনাপতি এবং সম্ভাজির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক হাম্বিররাও মোহিত নিহত হন। যদিও মারাঠারা যুদ্ধে জয়লাভ করে, কিন্তু মোহিতের মৃত্যু তাদের জন্য একটি বড় আঘাত ছিল। ফলস্বরূপ, বিপুল সংখ্যক মারাঠা সৈন্য সম্ভাজিকে ত্যাগ করতে শুরু করে।
১৬৮৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, মহারাষ্ট্রের সঙ্গমেশ্বর (Sangameshwar) নামক স্থানে যখন সম্ভাজী মহারাজ অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, তখন মুঘল সেনাপতি মুকররব খান (Mukarrab Khan) অতর্কিতে আক্রমণ করেন।
অতর্কিত আক্রমণের ফলে সম্ভাজী মহারাজ আত্মরক্ষার সুযোগ পাননি এবং অল্প সময়ের মধ্যেই মুঘল সৈন্যদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েন।
বন্দি অবস্থায় হস্তান্তর: গণোজি শিরকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মুঘলরা সরাসরি তাঁবুতে প্রবেশ করে সম্ভাজী মহারাজ ও তাঁর বন্ধু কবি কলশকে বন্দি করেন।
নির্যাতন ও হত্যা:
সম্ভাজি এবং কবি কলশকে ভীমা নদীর কাছে রাজকীয় শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল । সম্ভাজির রাজকীয় মর্যাদা থাকা সত্ত্বেও, বিজাপুর এবং গোলকোন্ডার শাসকদের মুঘলরা যে সম্মান দিত, সেই একই সম্মান তাঁকে দেওয়া হয়নি। পরিবর্তে, তাঁকে এবং তাঁর মন্ত্রীদের লম্বা ঘণ্টা লাগানো ভাঁড়ের টুপি পরিয়ে , উটের পিঠে বসিয়ে, ঢাকের বাদ্যি ও তূর্যধ্বনির মধ্যে দিয়ে মুঘল শিবিরে ঘোরানো হয়েছিল। এরপর তাঁদের আওরঙ্গজেবের সামনে হাজির করা হয়, যিনি তখন কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের প্রার্থনা করছিলেন। মুঘল ইতিহাসবিদ খাফি খান এবং ঈশ্বর দাস নগরের মতে , সেই রাতেই সম্ভাজি এবং কবি কলশকে লাল-গরম লোহা দিয়ে অন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ১৬৮৯ সালের ১১ই মার্চ, ভীমা নদীর তীরে কোরেগাঁওতে , যেখানে আওরঙ্গজেব শিবির স্থাপন করেছিলেন, সম্ভাজীকে শিরশ্ছেদ করা হয়। শিরচ্ছেদের আগে তাকে নির্মম নির্যাতন করা হয়, তার জিহবা টেনে ছিড়ে ফেলা হয়।দাক্ষিণাত্যে ছয় বছর থাকার আগেই আওরঙ্গজেবের স্বপ্ন এভাবে পূরণ হয়েছিল। নর্মদা থেকে তুঙ্গভদ্রা পর্যন্ত সমগ্র অঞ্চল এখন তাঁর শাসনাধীনে চলে আসে। যে ভূমিতে শিবাজী একসময় যুদ্ধ করেছিলেন তা বশীভূত হয় এবং প্রতিরোধের কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট ছিল না। সম্ভাজীর দেহাবশেষ টুকরো টুকরো করে কুকুরদের খাওয়ানো হয়েছিল।
তথ্যসূত্র -
শিবদে, সদাশিব। জ্বলজ্বালান্তেজস সাম্ভাজিরাজ (1 সংস্করণ)। পুনে: ডায়মন্ড পাবলিকেশনস। পৃ. ৩৭৮।
Govind Sakharam Sardesai (১৯৪৬)। New History of the Marathas। Phoenix Publications। পৃ. ২৫১।
Gordon, Stewart (১৯৯৩)। The Marathas 1600-1818। Cambridge: Cambridge University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫২১-২৬৮৮৩-৭।
Sen, Sailendra (২০১৩)। A Textbook of Medieval Indian History। Primus Books। পৃ. ১৯৯–২০০। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৩-৮০৬০৭-৩৪-৪।
Malgonkar, Manohar (১৯৭১)। Chhatrapatis of Kolhapur (ইংরেজি ভাষায়)। Popular Prakashan। পৃ. ৭।
Desāī, Rameśa (১৯৮৭)। Shivaji, the Last Great Fort Architect (ইংরেজি ভাষায়)। Maharashtra Information Centre, Directorate-General of Information and Public Relations, Government of Maharashtra।
Sardesai, Govind Sakharam (১৯৪৬)। New History of the Marathas: Shivaji and his line (1600-1707 (ইংরেজি ভাষায়)। Phoenix Publications। পৃ. ২৩০।