26/09/2026
হরিতকী গাছ কে? হরিতকী গাছের জন্ম কোথায়? পূর্ব জন্মে হরিতকী গাছ কে ছিল? বর্তমানে হরিতকী গাছ আসলো কিভাবে? হরিতকী কেন পূজায় লাগে?
পদ্ম পুরাণ এবং অন্যান্য শাস্ত্রীয় গ্রন্থ অনুসারে হরিতকী গাছের মহিমা, উৎপত্তি এবং আধ্যাত্মিক গুরুত্ব নিচে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো।
১. হরিতকী গাছ কে? (পরিচয়)
পদ্ম পুরাণ ও আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুসারে, হরিতকী হলো 'অমৃতা' বা দেবমাতা। শাস্ত্রে বলা হয়েছে— "যস্য মাতা গৃহে নাস্তি, তস্য মাতা হরিতকী" (অর্থাৎ, যার ঘরে মা নেই, তার মা হলো হরিতকী)। এটি কেবল একটি বৃক্ষ নয়, এটি জগতের রোগ নিবারণী এক দিব্য শক্তি।
২. হরিতকী গাছের জন্ম কোথায়?
পদ্ম পুরাণের সৃষ্টিখণ্ড অনুযায়ী, হরিতকীর জন্ম মর্ত্যলোকে হলেও এর উৎস হলো স্বর্গীয় সুধা বা অমৃত। এটি স্বর্গ থেকে মর্ত্যে আসা এক পরম ওষধি।
৩. পূর্ব জন্মে হরিতকী গাছ কে ছিল?
পদ্ম পুরাণের কথা অনুসারে, হরিতকী দেবী রূপে গণ্য। সমুদ্র মন্থনের সময় যখন অমৃত কলস নিয়ে ধন্বন্তরি দেব আবির্ভূত হন, তখন সেই কলস থেকে সাতটি অমৃত বিন্দু পৃথিবীতে পড়েছিল। এই সাতটি বিন্দু থেকে সাত প্রকার হরিতকীর জন্ম হয়। অন্য মতে, এটি দেবী অদিতির হর্ষ বা আনন্দের অশ্রু থেকে উৎপন্ন।
৪. বর্তমানে হরিতকী গাছ আসলো কীভাবে? (পদ্ম পুরাণের কথা)
পদ্ম পুরাণে বর্ণিত আছে, একদা দেবরাজ ইন্দ্র স্বর্গলোকে অত্যন্ত তৃপ্তির সাথে অমৃত পান করছিলেন। পানের সময় অসাবধানতাবশত তাঁর মুখ থেকে এক বিন্দু অমৃত পৃথিবীতে পতিত হয়। সেই দিব্য অমৃত মর্ত্যের মৃত্তিকা স্পর্শ করার সাথে সাথেই একটি অলৌকিক বৃক্ষের জন্ম দেয়, যা 'হরিতকী' নামে পরিচিত হয়। অমৃত থেকে জন্ম হওয়ার কারণেই এটি জরা (বার্ধক্য) ও মৃত্যুভয় হরণ করতে সক্ষম।
৫. হরিতকী কেন পূজায় লাগে?
হরিতকী 'বিজয়' ও 'মঙ্গল'-এর প্রতীক। এটি বিঘ্ননাশক।
এটি শ্রীবিষ্ণুর অত্যন্ত প্রিয় ওষধি।
যেকোনো পূজা বা শুভ কাজের শুরুতে 'সংকল্প' করার সময় হরিতকী হাতে রাখা হয়, যাতে কর্মটি নির্বিঘ্নে ও সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
৪ বেদের মন্ত্র
১. ঋগ্বেদ (১০/৯৭/১):
য ওষধীঃ পূর্ব জাতা দেবেভ্যস্ত্রিযুগং পুরা।
অনুবাদ: দেবতাদের প্রকাশের তিন যুগ পূর্বে যে ওষধি বৃক্ষরাজি (হরিতকী আদি) উৎপন্ন হয়েছে, তারা আমাদের সকল রোগ থেকে মুক্ত করুক।
২. যজুর্বেদ (১২/৭৫):
মা বো রিষৎ খনিতে যা চ বৈ হং খনামি বঃ।
অনুবাদ: হে ওষধি বৃক্ষ! ঔষধ তৈরির জন্য যখন আমি তোমাকে গ্রহণ করি, তখন যেন তোমার কোনো ক্ষতি না করি। তুমি আমাদের আরোগ্য দান করো।
৩. সামবেদ (মন্ত্র-১):
সোমো ধেনুং সোমো অর্বন্তমাশুং সোমো বীরং কর্মণ্যং দদাতি।
অনুবাদ: সোম বা উদ্ভিদ জগত (যার মধ্যে হরিতকী প্রধান) আমাদের পুষ্টি, শক্তি ও কর্মক্ষমতা দান করে।
৪. অথর্ববেদ (১৯/৩৯/১):
অশ্বত্থো দেবসদনস্তৃতীয়স্যামিতো দিবি।
অনুবাদ: স্বর্গের অমৃত থেকে উদ্ভূত এই সকল ওষধি (হরিতকী) সকল প্রকার রোগ ও অশুভ শক্তি বিনাশকারী।
সাত্ত্বিক শাস্ত্র শ্লোক (শ্রীমদ্ভাগবত ও অন্যান্য শাস্ত্রসহ)
১. শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণ (৮/২/১৪):
পনসৈরাম্রৈঃ পিয়ালৈশ্চ হরিতক্যামলকৈস্তথা।
বিল্বৈঃ কপিত্থৈর্জম্বীরৈর্বৃত্তঃ সর্বর্তুভির্দ্দ্রুমৈঃ।।
অনুবাদ: (গজেন্দ্র মোক্ষণ কথাতে ত্রিকূট পর্বতের বর্ণনায়) সেই দিব্য পর্বতটি কাঁঠাল, আম, পিয়াল, হরিতকী, আমলকী, বেল ও কপিত্থ প্রভৃতি বৃক্ষে সুশোভিত ছিল, যা সকল ঋতুতে ফল প্রদান করে।
২. ভাবপ্রকাশ নিঘন্টু (হরিতক্যাদি বর্গ):
যস্য মাতা গৃহে নাস্তি, তস্য মাতা হরিতকী।
কদাচিৎ কুপ্যতি মাতা, নোদরস্থা হরিতকী।।
অনুবাদ: যার ঘরে মা নেই, হরিতকী তার মায়ের অভাব পূরণ করে। মা কখনো সন্তানের ওপর রাগ করতে পারেন, কিন্তু সেবন করা হরিতকী শরীরের কখনো কোনো ক্ষতি করে না।
৩. পদ্ম পুরাণ (সৃষ্টিখণ্ড):
অমৃতবিন্দু পতনাদ জাতা বৃক্ষ হরিতকী।
অনুবাদ: অমৃতের বিন্দু পৃথিবীতে পতনের ফলেই পরম পবিত্র হরিতকী বৃক্ষের জন্ম হয়েছে।
৪. বিষ্ণু পুরাণ:
সর্বপাপহরা দেবী সর্বব্যাধি বিনাশিনী।
অনুবাদ: এই হরিতকী রূপী দেবী মানুষের সকল পাপ হরণ করেন এবং সকল ব্যাধি বিনাশ করেন।
৫. চরক সংহিতা (চিকিৎসা স্থান):
হরিতকীং পঞ্চরসানাং পরম্।
অনুবাদ: হরিতকী পাঁচটি রসের আধার এবং এটি সমস্ত ঔষধির মধ্যে শ্রেষ্ঠ বা ওষধিরাজ হিসেবে গণ্য।
৬. গরুড় পুরাণ:
ফলানাং হরিতকী শ্রেষ্ঠা ওষধীনাং তথৈব চ।
অনুবাদ: ফলসমূহের মধ্যে হরিতকী শ্রেষ্ঠ এবং ওষধি হিসেবেও এটি সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করে আছে।
সারকথা: হরিতকী কেবল একটি সাধারণ ফল নয়; এটি সাক্ষাৎ অমৃতের অংশ। এটি পূজায় যেমন শুদ্ধি আনে, তেমনি মানবশরীরের আরোগ্য দানে মায়ের মতো ভূমিকা পালন করে। এ কারণেই শাস্ত্রে হরিতকীকে অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।