16/08/2026
শ্রীনামহট্ট কথা🙏🌺
যদিও এতদ্দেশে নামহট্ট কথাটি নতুন নহে, তবুও আমাদিগকে নামহট্ট কি—এই প্রশ্নটির প্রায়ই সম্মুখীন হইতে হয়, এই হেতু নামহট্ট সম্বন্ধে যথাসম্ভব এইখানে সংক্ষেপে আলোচিত হইতেছে। ‘নাম’ বলিতে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে / হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে একেই বুঝায় এবং ‘হট্ট’ শব্দের অর্থ হইল হাট। তবে ব্যবহারিক ভাষায় আমরা ‘হট্ট’ বলিতে যাহা বুঝি এই ক্ষেত্রে তাহা হুবহু এক নহে। শুধুমাত্র হাটের সাদৃশ্য হেতু, ‘হট্ট’ কথাটির ব্যবহার। নাম নিত্য বস্তু, অতএব তাহার হাটও নিত্য.....। নাম বৈকুণ্ঠ বস্তু, সুতরাং নামের প্রকৃত হাটও বৈকুণ্ঠেই....। অতএব এই ‘নামহট্ট’ ব্যাপারটি শ্রীমন্নিত্যানন্দ প্রভু ও শ্রীমন্মহাপ্রভুর সময় হইতেই বিশেষ ভাবে লক্ষ্য করা গেলেও, মূলতঃ তাহা একটি নিত্য ব্যাপার... অপ্রাকৃত ব্যাপার। এই ব্যাপারটি শ্রীমন্নিত্যানন্দ প্রভু আমাদের প্রতি অহৈতুকী কৃপা প্রযুক্ত হওয়া। নিবন্ধন, প্রাপঞ্চিক জগতে উদয় করাইয়াছেন মাত্র। সুতরাং সকলকেই এই নামহট্ট সম্বন্ধে কিছু অভিজ্ঞান লাভ করা উচিত।
নামহট্টের প্রকৃত ইতিহাস জানিতে হইলে জীবের নিত্য ধর্ম, জীব ধর্ম, ভাগবত ধর্ম বা বৈষ্ণব ধর্ম নামে ব্যবহারিক ভাষায় যাহা বুঝায়—তাহার সঙ্গে কিছু পরিচয় থাকা দরকার, সুতরাং প্রসঙ্গক্রমে আলোচ্য যে, অতিসম্প্রতি আমারা মানুষকে (বিশেষতঃ তথাকথিত শিক্ষিত বলিয়া পরিচিত সম্প্রদায়) মুখে মুখে বলিতে শুনি যে, “বৈষ্ণব ধর্মটি নিতান্তই নব্য বা আধুনিক। শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাবের পূর্বে এর আদৌ কোন অস্তিত্ব ছিল না।” আবার কেহ কেহ ভ্রম-ধারণায়, প্রমাদ তাড়নায়, বিপ্রলিপ্সা-বশে ইন্দ্রিয়জ্ঞানে অপটুতা-নিবন্ধন নিত্য, পূর্ণ, শুদ্ধ ও নিরপেক্ষ-সত্যগ্রহণে অসমর্থ হইয়া বলেন যে, “ওসব আসলে কোন ব্যাপারই নহে। এইতো এই মুসলমান রাজত্ব কালীন সময়ের কথা। যখন আমাদের দেশের লোক (বিশেষতঃ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক) সকল পাইকারী হারে ধর্মান্তরিত হইয়া মুসলমান হইয়া যাইতেছিল, তখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আবির্ভূত হইয়া সনাতন ধর্মকে রক্ষা করিবার জন্য, এই বৈষ্ণব মতের সূচনা করেন ও প্রচার করেন।” এই ধরণের কথা যাহারা বলেন, তাহারা যে স্বগম গোস্বামী শ্রীল সচ্চিদানন্দ ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের ‘জৈব ধর্ম’ গ্রন্থের চতুর্ভুজ ন্যায়রত্ন মহাশয়ের দলের এক একটি ‘লোকরত্ন’ তাহাতে আর সন্দেহ নাই। সেই ‘চতুর্ভুজ ন্যায়রত্ন মহাশয় এত সব ন্যায় পড়িয়াও শেষ পর্যন্ত বৈষ্ণব ধর্মকে নব্য বা আধুনিক বলিয়া যেইরূপ একটি অন্যায় করিয়াছিলেন, অতি সাম্প্রতিক কালের অবৈদিক দর্শন প্রভাবিত, তথাকথিত শিক্ষিত সম্প্রদায়ের ব্যাপারটাও ঠিক সেইরূপ। অতএব বৈষ্ণব ধর্ম সম্বন্ধে চতুর্ভুজ ন্যায়রত্ন মহাশয়ের প্রশ্নের উত্তরে, শ্রীঅকিঞ্চন দাস বাবাজী মহারাজের কৃপাদেশ ক্রমে শ্রীবৈষ্ণবদাস বাবাজী মহাশয় যাহা বলিয়াছিলেন, তাঁহার সারমর্ম অবহিত হইলেই আমাদের ভ্রম অপণোদনের আনুকূল্য হইবে। তাহা এই যে, “যে সময় হইতে জীব হইয়াছে, সে সময় হইতে এই মতও (বৈষ্ণব মত) হইয়াছে। জড়ীয় কালে জীবের আদি পাওয়া যায় না, অতএব জীব অনাদি ও জীব ধর্মরূপ বৈষ্ণব ধর্মও অনাদি। তাহার শাস্ত্র প্রমাণ এই যে, ব্রহ্মা সকলের আদি জীব। তিনি বৈষ্ণব, তাঁর পুত্র চতুঃসন বৈষ্ণব, তারপর শিব বৈষ্ণব, প্রহ্লাদ বৈষ্ণব, ধ্রুব বৈষ্ণব।” সুতরাং দেখা যাইতেছে যে, যাঁহারা যথার্থই বৈদিক ইতিহাস জানেন ও সম্যক জ্ঞান রাখেন তাঁহারা নির্বিধায় বুঝিতে পারিবেন যে, ‘বৈষ্ণব ধর্ম’—কথাটি মোটেই নব্য বা আধুনিক কিছু ব্যাপার নহে।
ইহা ছাড়াও দেখা যায় বিভিন্ন স্থানে খনন কার্যের সময়, প্রাপ্ত মূর্তিগুলি অধিকাংশই বিষ্ণু মূর্তি। তাহাতেও বুঝা যাইতে পারে যে, পুরাকালে ‘বিষ্ণু উপাসনার অস্তিত্ব সমাজে ছিল। অর্থাৎ তখনও বৈষ্ণব ছিল। ইহা বিলক্ষণ সত্য কথা’।
সেই যে, বৈষ্ণব ধর্ম—তাঁহার ভগবদুপাসনার মূল কথাই হইল “কীর্তনীয় সদা হরিঃ।” এই হরি কীর্তনের কথাটাই শ্রীমন্মহাপ্রভু যথাযথ ভাবে আচার ও প্রচারক্রমে অবহিত করিয়াছেন, যাহাতে জীব আত্যন্তিক মঙ্গল লাভ করিতে পারে.....। অতএব শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মত হইল, জীবের আত্যন্তিক মঙ্গলোদয়ের ব্যবস্থা পত্র, সেই ব্যবস্থাপত্রানুযায়ী দেখা যায় যে, এই কলিতে জীব “হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে। হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।” এই মহামন্ত্র কীর্তনের দ্বারাই পঞ্চমপুরুষার্থ মনিজন সুদুর্লভ কৃষ্ণপ্রেম লাভ করিতে পারিবে। শুধু এই কথাটিই প্রচার করিবার জন্য তিনি শ্রীমন্নিত্যানন্দ প্রভুকে আদেশ করিয়াছিলেন—
শুন শুন নিত্যানন্দ, শুন হরিদাস।
সর্বত্র আমার আজ্ঞা করহ প্রকাশ ॥
প্রতি ঘরে ঘরে গিয়া কর এই ভিক্ষা ।
‘বল কৃষ্ণ, ভজ কৃষ্ণ, কর কৃষ্ণ শিক্ষা ॥’
( চৈঃ ভাঃ মধ্য ১৩/৮-৯)
অনন্তর যাহা হইল, তাহা এই যে, শ্রীমন্নিত্যানন্দ প্রভু ও নামাচার্য শ্রীল হরিদাস ঠাকুর কীর্তনাখ্য ভক্তিপীঠ গোড্রুম দ্বীপের সুরভীকুঞ্জে ‘নাম-প্রচার’ কার্যের কেন্দ্র স্থল করিলেন। এই ভাবেই নামহট্টের প্রাপঞ্চিক প্রকাশ ঘটিল। অতএব এই নামহট্ট ব্যাপারটি একটা নতুন কিছু নহে।
সে যাহাই হউক, সারকথা এই যে, শ্রীমন্নিত্যানন্দ প্রভুই নামহট্টের মূল মহাজন। অনন্তর তাঁহার অপ্রকট প্রকটে প্রস্থানের পর, এই নামহট্ট বা প্রচার প্রসঙ্গের দায়িত্ব আসিল ষড়, গোস্বামীর উপর। তাঁহারা সকলেই লুপ্ত-তীর্থ উদ্ধার ও বৈষ্ণব তত্ত্ব সকল পুনঃ প্রোক্তন করিতে ব্যাপৃত ছিলেন। শেষের দিকে ষড়, গোস্বামীর অন্যতম শ্রীজীব গোস্বামীপাদই প্রকট ছিলেন এবং তিনি শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুর, শ্রীনিবাস আচার্য ও শ্রীশ্যামানন্দ প্রভুরকে যাবতীয় গ্রন্থ দিয়া প্রচার কার্য নির্বাহ করিতে আদেশ করিলে পুনরায় নামহট্টের পুষ্টি সূচিত হয়। এই প্রভুরাও এক সময়ে লীলা সংবরণ করিলেন। অতঃপর দীর্ঘ দিন ভারতের পারমার্থিক আকাশ বা গৌড়ীয় গগনে ‘গৌরচন্দ্র’ নানা প্রকার কুসিদ্ধান্তরূপ অন্ধকার দ্বারা দীর্ঘ দিন আচ্ছাদিত ছিলেন।
অনন্তর জীবের কোন অনির্বচনীয় সুকৃতির ফলে গৌড়ীয় আচার্য ভাস্কর শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর প্রভুপাদ প্রকটিত হইয়া গৌড়ীয় গগনকে অন্ধকারমুক্ত করিয়া শ্রীশ্রীগৌরচন্দ্রকে প্রকাশ করিলে, তাঁহার শিক্ষা, ‘জীবে দয়া নামে রুচির’ কথা সাধারণকে বুঝাইয়া দিলেন। তাঁহার পর তদীয় শিষ্যবৃন্দের অন্যতম কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ … … …। তিনি এই নামকে সাত সমুদ্র তের নদীর পার পর্যন্ত প্রচার করিয়া, তথায় সুকৃতিমান ব্যক্তিগণকে শ্রীমন্মহাপ্রভুর কৃপার ছত্রছায়াতলে আকর্ষণ করিলেন, তাহাতে নামহট্টের উত্তরোত্তর সাবলীলতা ও শ্রীবৃদ্ধি হইতে লাগিল। তারপর ১৯৭৭ ইং সালে তিনিও অপ্রকট হইলেন এবং এখন তদীয় কৃপাপাত্র শিষ্যবর্গের অন্যতম—শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামীর পরিচালনায় শ্রীশ্রীহরেকৃষ্ণ নামহট্ট প্রচারের ব্যবস্থা উত্তরোত্তর শ্রী ও সমৃদ্ধি লাভ করিয়া বিশ্ববাসীর আত্যন্তিক মঙ্গলোদয়ের আনুকূল্য করিতেছেন।
এখন নামহট্টের এই শ্রীবৃদ্ধির সময়ে স্বগম গোস্বামী শ্রীল সচ্চিদানন্দ ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের কথাগুলি খুবই প্রনিধানযোগ্য, তিনি বলিয়াছিলেন—
(ক)‘নিস্বার্থভাবে যাঁহারা নাম প্রচার করিবেন, তাঁহারা সর্বত্রপূজনীয় হইবেন এবং বিশুদ্ধ নামের চিহ্ফলকই কুতর্করূপ অন্ধকারকে অতি শীঘ্র নাশ করিবে সন্দেহ নাই, ….. আমরা আশা করিতেছি যে, নামের হাট্টের পব্বটি অতি অল্পদিনের মধ্যে একটি প্রকাণ্ড ব্যাপার হইবে। শ্রীমৎ গৌরাঙ্গ সম্প্রদায়ের মধ্যে যে উপাধি প্রবেশ করিতেছে, তাহা ক্রমশ দূর হইবে এবং অবশেষে শুদ্ধ নামের জয়পতাকা দেশ-বিদেশে উড্ডীয়মান হইতে থাকিবে।
শ্রীশ্রীনামহট্ট, বিঃ পঃ
১ম বর্ষ।
(খ)আহা! যেদিন ইংল্যান্ডে, ফ্রান্সে, রাশিয়ায়, প্রশিয়ায় ও আমেরিকায় তদ্দেশের ভাগ্যবন্ত পুরুষসকল নিশান, ডঙ্কা, খোলকরতলাদি লইয়া মুহুর্মুহ নিজ নিজ নগরে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নাম উল্লেখপূর্বক হরিনাম কীর্তনের তরঙ্গ উঠাইবেন, সেদিন কবে হইবে! আহা! যেদিন একদিক হইতে বিলাতীয় শ্বেতবর্ণ_ পুরুষ সকল ‘জয় শ্রীশচীনন্দন কী জয়’ এরূপ ধ্বনি করত প্রসারিত বাহু হইয়া অপরদিকে অম্মদেশীয় ভক্তবৃন্দের সহিত আলিঙ্গনপূর্বক ভ্রাতৃভাব করিবেন, সে দিন কবে হইবে! যে দিন
_তিনি নিজেকে শ্রীনামহট্টের ঝাড়ুদার বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন। তাঁহারা বলিবেন, হে আর্যভাতৃগণ! আমরা প্রেমসমুদ্র শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর চরণাশ্রয় করিয়াছি, এখন তোমরা দয়া করিয়া আমাদিগকে আলিঙ্গন দাও! সেদিন কবে হইবে।
যেদিন পবিত্র চিন্ময় বৈষ্ণব প্রেমই সর্ব জীবের একমাত্র ধর্ম হইবে এবং সমুদ্রে নদীগণের ন্যায় সমস্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রধর্ম অনন্ত বৈষ্ণব ধর্মে আসিয়া মিলিত হইবে, সেদিন কবে হইবে!
—নিত্য ধর্ম সূর্যোদয়,
সঃ তোঃ ৪/৩
অনন্তর তাঁহারই আর একটি বক্তব্যের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে নামহট্ট কার্য-সূচির সঙ্গে যুক্ত হইতে আহ্বান জানাইয়া এই নামহট্ট কথা উপসংহার করি। তাহা এই, “হে শুদ্ধ ভক্তবৃন্দ। শ্রীমদ্ গৌরাঙ্গ প্রচারিত বৈষ্ণব ধর্ম জগজ্জীবের পরম ধন। যে সকল ধর্ম আজকাল ধুমধামের সহিত দেশে দেশে প্রচারিত হইতেছে, সে সমস্তই সদোষ ও অসম্পূর্ণ। যখন সেই সমস্ত ধর্ম কুণ্ঠিত হইয়া নিজ নিজ দুর্গমধ্যে লুক্কায়িত হইবে এবং পরম ধর্ম অগ্রসর হইয়া সকল দেশে ব্যাপ্ত হইবে, সেই সুখজনক সময় আমাদের আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। এখন সকলে বদ্ধ পরিকর হইয়া শ্রীনামহট্টের পুষ্টি করুন। ভারতবর্ষের সমস্ত প্রদেশ শ্রীমদ্ গৌরাঙ্গ ভক্ত রাজকবিপণী মহোদয়গণ শুদ্ধনামের পসরা মস্তকে করিয়া আমাদের হৃদয়নাথ শ্রীগৌরাঙ্গকে ও তাঁহার জগৎ পাবন হরিনামের প্রচার করুন।”
শ্রীশ্রীনামহট্ট, বিঃ পঃ
যদি কেউ কিছু জলকে দূষিত করে এবং এতে সূর্য কিরণ দেয়, তাতে সূর্য দূষিত হয়ে যায় না। সূর্য ময়লাকে পরিশুদ্ধ করে, এভাবে কৃষ্ণনাম জপের মাধ্যমে প্রত্যেকেই উদ্বর্তিত এবং শুদ্ধ হতে পারে।
-শ্রীল জয়পতাকা স্বামী গুরুমহারাজ🙏❤️
ফেব্রুয়ারি ১০,১৯৯০,ব্যাঙ্গালুরু,কর্ণাটক
🌷🌷ষড় গোস্বামীগণ বা নামাচার্য শ্রীল হরিদাস ঠাকুর যখন প্রচার করতেন বা দীক্ষা দান করতেন, তখন কি তাঁরা মাছ-মাংসাহারী (আমিষভোজী) ব্যক্তিদের দীক্ষা প্রদান করতেন?🌷🌷
গৌড়ীয় বৈষ্ণব শাস্ত্র ও আচার্যদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রশ্নের উত্তরটি নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
মূল উত্তর:
ষড় গোস্বামীগণ বা নামাচার্য শ্রীল হরিদাস ঠাকুর যখন প্রচার করতেন, তখন তাঁরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকেই কৃষ্ণনাম ও হরিকথা প্রদান করতেন। কিন্তু দীক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে শাস্ত্রীয় নিয়ম অত্যন্ত কঠোর। তাঁরা আমিষভোজী (মাছ-মাংসাহারী) ব্যক্তিদের সেই অবস্থায় দীক্ষা দিতেন না। দীক্ষা গ্রহণের পূর্বশর্ত হিসেবে শিষ্যকে অবশ্যই সমস্ত প্রকার অভক্ষ্য ভক্ষণ (মাছ, মাংস, ডিম) ত্যাগ করতে হতো।
তবে তাঁদের প্রচারের মহিমা এমন ছিল যে, ঘোরতর মাংসাহারী বা ব্যাধও তাঁদের সংস্পর্শে এসে মুহূর্তে আমিষ আহার ত্যাগ করে পরম বৈষ্ণবে পরিণত হতেন।
বিস্তারিত শাস্ত্রীয় বিশ্লেষণ ও রেফারেন্স:
১. দীক্ষার পূর্বশর্ত: চারটি নিয়ম পালন
গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতে, দীক্ষা গ্রহণের সময় শিষ্যকে চারটি পাপকর্ম ত্যাগের সংকল্প করতে হয়:
১. আমিষ আহার (মাছ, মাংস, ডিম) ত্যাগ।
২. নেশা গ্রহণ ত্যাগ।
৩. অবৈধ স্ত্রী-সঙ্গ বা পরকীয়া ত্যাগ।
৪. দ্যুতক্রীড়া বা জুয়া খেলা ত্যাগ।
শ্রীল সনাতন গোস্বামী তাঁর 'হরিভক্তিবিলাস' গ্রন্থে (যা বৈষ্ণবদের স্মৃতিশাস্ত্র) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, অভক্ষ্য ভক্ষণকারী ব্যক্তি ভক্তির পথে অগ্রসর হতে পারে না।
২. শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রমাণ (কৃষ্ণ কী গ্রহণ করেন?)
শ্রীকৃষ্ণ গীতায় (৯/২৬) বলেছেন:
পত্রং পুষ্পং ফলং তোয়ং যো মে ভক্ত্যা প্রযচ্ছতি।
তদহং ভক্ত্যুপহৃতমশ্নামি প্রযতাত্মনঃ।।
অনুবাদ: যারা ভক্তির সঙ্গে আমাকে পত্র, পুষ্প, ফল ও জল অর্পণ করেন, সেই শুদ্ধচিত্ত ভক্তের ভক্তিপুত উপহার আমি গ্রহণ করি।
যেহেতু ভগবান আমিষ গ্রহণ করেন না, তাই তাঁর ভক্ত বা গোস্বামীগণ শিষ্যদের আমিষ ত্যাগের নির্দেশ দিতেন, যাতে তাঁরা ভগবানকে ভোগ নিবেদন করে প্রসাদ গ্রহণ করতে পারেন।
৩. শ্রীমদ্ভাগবতমের প্রমাণ (কলির নিবাস)
শ্রীমদ্ভাগবতে (১/১৭/৩৮) বর্ণিত হয়েছে যে, কলিযুগের অধর্মের চারটি প্রধান স্থানের একটি হলো যেখানে পশুবধ বা মাংসাহার হয়:
অভ্যর্থিতস্তদা তস্মৈ স্থানানি কলয়ে দদৌ।
দ্যুতং পানং স্ত্রিয়ঃ সূনা যত্রাধর্মশ্চতুর্বিধঃ।।
অনুবাদ: পরীক্ষিৎ মহারাজ কলিকে থাকার জন্য চারটি স্থান দিলেন— দ্যুতক্রীড়া (জুয়া), পান (মদ্যপান), স্ত্রী-সঙ্গ (অবৈধ সঙ্গ) এবং সূনা (পশুবধ বা আমিষ আহার)।
একজন বৈষ্ণব কলির এই প্রভাব থেকে মুক্ত থাকেন। তাই ষড় গোস্বামীগণ কলির এই কলুষতাযুক্ত ব্যক্তিকে দীক্ষা দিতেন না যতক্ষণ না সে তা ত্যাগ করছে।
৪. নামাচার্য হরিদাস ঠাকুরের উদাহরণ
হরিদাস ঠাকুর যখন বেনাপোলের জঙ্গলে ছিলেন, তখন এক বেশ্যা তাঁকে প্রলুব্ধ করতে আসে। হরিদাস ঠাকুর তাকে নাম সংকীর্তনের মাধ্যমে পবিত্র করেন। যখন সেই নারী অনুতপ্ত হয়ে দীক্ষা চাইল, তখন হরিদাস ঠাকুর তাকে বলেছিলেন তার সমস্ত সম্পত্তি দান করে দিতে এবং তুলসী দেবীর সেবা ও কৃষ্ণনাম করতে। সেই নারী আমিষ ও অসৎ পথ ত্যাগ করার পরেই হরিদাস ঠাকুরের কৃপা লাভ করেছিলেন।
৫. মৃগারি ব্যাধের কথায় (আদর্শ প্রচার পদ্ধতি)
শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতে নারদ মুনির একটি কথা বর্ণিত আছে (যা গোস্বামীরা অনুসরণ করতেন)। নারদ মুনি এক নিষ্ঠুর ব্যাধকে (মৃগারি) ভক্তে রূপান্তরিত করেছিলেন। নারদ মুনি তাকে দীক্ষা বা হরিনাম দেওয়ার আগে তার ধনুক ভেঙে ফেলার শর্ত দিয়েছিলেন (অর্থাৎ হিংসা ও আমিষ আহার ত্যাগ)। পরবর্তীকালে সেই ব্যাধ এতটাই অহিংস হয়ে গিয়েছিল যে, একটি পিঁপড়াকেও মারতে তার কষ্ট হতো।
উপসংহার:
ষড় গোস্বামীগণ (শ্রীল রূপ, সনাতন, রঘুনাথ দাস, রঘুনাথ ভট্ট, গোপাল ভট্ট ও জীব গোস্বামী) এবং হরিদাস ঠাকুর 'পতিত পাবন' ছিলেন। তাঁরা প্রচারের মাধ্যমে আমিষভোজীদের হৃদয়ে ভক্তির বীজ বপন করতেন। কিন্তু যখন দীক্ষার প্রশ্ন আসত, তখন তাঁরা শিষ্যকে দিয়ে মাছ-মাংস ত্যাগের কঠোর ব্রত গ্রহণ করাতেন।
শ্রীল সনাতন গোস্বামী 'হরিভক্তিবিলাস'-এ বলেছেন—
যথা কাঞ্চনতাং যাতি কাংস্যং রসবিধানতঃ।
তথা দীক্ষাবিধানেন দ্বিজত্বং জায়তে নৃণাম্।।
(অনুবাদ: যেমন পারদ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাঁসা সোনায় রূপান্তরিত হতে পারে, তেমনি উপযুক্ত দীক্ষা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে কোনো ব্যক্তি (শুদ্ধাচারী হয়ে) দ্বিজত্ব বা আধ্যাত্মিক পুনর্জন্ম লাভ করতে পারে।)
অর্থাৎ, দীক্ষা হলো একটি রূপান্তর। মাছ-মাংসাহারী ব্যক্তি যখন দীক্ষা নেন, তখন তিনি তাঁর পুরাতন স্বভাব ত্যাগ করে একজন অহিংস ও সাত্ত্বিক বৈষ্ণবে পরিণত হন। তাঁরা আমিষভোজী অবস্থায় কাউকে "বৈষ্ণব" হিসেবে স্বীকৃতি দিতেন না।🌷🌷
#সনাতনধর্ম