10/09/2022
মায়া
জিজ্ঞাসু :— মায়া কী জিনিস? আমাদের আত্মার সাথে পরমাত্মার সম্পর্ক কী, দয়া করে বুঝিয়ে দিলে ভালো হয়।
জয়দীপ মহারাজ :— (হাতে গ্লাস তুলে নিয়ে) এই গ্লাসটি একটি জিনিস আর মায়া এক তত্ত্ব, মায়া এক দার্শনিক অভিধা। প্রথমেই আমাদের শব্দ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। আমরা জড় পদার্থকে ‘জিনিস’ বলি, আর যে থিওরি নিয়ে সাধু সন্ত ঋষি মুনিরা অনেক তর্ক বিতর্ক করেছেন সেগুলোকে আমরা তত্ত্ব বা ভাব বলি। মায়া শব্দটিকে ভাঙলে পাওয়া যায় মা + ইয়া। ‘মা’ মানে ‘না’, আর ‘ইয়া’ মানে ‘হ্যাঁ’। যা নেই অথচ আছে বলে মনে হচ্ছে এবং যা আছে অথচ নেই বলে মনে হচ্ছে তাকেই বলে মায়া। কিভাবে আমরা আছে এবং নেই এর বিচার করব? অস্থায়ী এবং চিরস্থায়ীর নিরিখে। আমাদের শরীর কি চিরস্থায়ী? না, শরীরকে একই অবস্থায় অনন্তকাল আটকে রাখা যাবে না। আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষ, কলা, স্নায়ু, মলিকিউলস ও অভ্যন্তরীণ গতিপ্রকৃতিকে আমরা হুবহু আরেক মুহূর্ত ধরে রাখতে পারব না। আমাদের জ্ঞাতসারে অথবা অজ্ঞাতসারে প্রতি মুহূর্তেই শরীর পাল্টাচ্ছে। ফলস্বরূপ একটি শিশু পর্যায়ক্রমে বালক, কিশোর, তরুণ, যুবক থেকে প্রৌঢ় হচ্ছে।
প্রতিমুহূর্তে যার পরিবর্তন হচ্ছে এবং একদিন যার মৃত্যু হবে, তার কি আসলে কোন অস্তিত্ব আছে? সমুদ্রের ঢেউয়ের মাথায় ফেনা উঠছে, বুদবুদ তৈরি হচ্ছে এবং কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে, আরও কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে ঢেউটাই মিলিয়ে যাচ্ছে। তাহলে ঢেউটা কি সত্য? এটাই ঋষিরা বিচার করেছেন। শরীরও তেমনি সামান্য ঢেউ মাত্র। একটা নাম, ধাম, পরিচয় নিয়ে শরীররূপী ঢেউ উঠেছে। স্রোতের টানাপোড়েনে যেমন ঢেউ তৈরি হয়ে বড় হয় এবং ভাঙতে শুরু করে শেষে মিলিয়ে যায় আমাদের জীবনটাও তেমনি। আমরাও ছোট থেকে যত বড় হই তত বলশালী হয়ে উঠি, শরীরে বল থাকলে মনেও বল বাড়ে, তখন সবাইকে দেখিয়ে দেবার অহমিকা চলে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে শরীর দুর্বল হয়, মনোবল ভাঙে, তখন আর ভালো দেখতে পাই না, শুনতে পাই না, হাঁটাচলা করতে সাহায্য নিতে হয়। তাহলে প্রশ্ন উঠবে, এই শরীরের কি আদৌ কোন অস্তিত্ব আছে? অস্তিত্ব আছে বলে মনে হচ্ছে; আজকে শরীর আছে, কালকে নেই। জন্মের কিছু বছর পর মৃত্যু হল, সেখানেই কি শেষ হয়ে গেল? এমন কিছু কি আছে যার মৃত্যু নেই? যার ক্ষয় নেই? এমন কিছু কি আছে যা বাড়ে না, কমে না? যার শক্তি বৃদ্ধি অথবা হ্রাস হয় না? এটাই জীবনের খোঁজ। অতএব যা চিরস্থায়ী নয় তাকেই যখন চিরস্থায়ী বলে মনে হয় সেটাই মায়া। পাহাড়, পর্বত, নদী, নালা, সমুদ্র, প্রকৃতি, শহর, গ্রাম — কোন কিছুই কালান্তরালে অবিকৃত থাকে না। আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে এই গ্রামটি হয়তো অজয় নদ ছিল। নদী সরে গিয়ে চর উঠেছে বলেই গ্রামটি তৈরি হয়েছে। আবার আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর বাদে এই গ্রামটি কি থাকবে? এটাই ঋষিদের খোঁজ।
যা নিত্য, শাশ্বত নয় সেই নিয়েই আমরা পড়ে আছি এবং সেটাকেই বাস্তব বলছি। জাগতিকতায় আঁকড়ে থাকা মানুষ বলবে, ‘ওসব ধম্মকম্ম করে কী হবে? বাস্তব নিয়ে থাকো।’ ওদের বাস্তব মানে যা চিরন্তন নয়, যেটাকে ধরে আমার কোন লাভ নেই, যেমন ঘর বাড়ি টাকা পয়সা সম্পত্তি চাকরি ইত্যাদি যেগুলো কোনদিনই আমাকে প্রাণের তৃপ্তি দেবে না, সেটাকেই ধরতে বলছে। আমরা যদি প্রকৃতই ভালো মৃত্যু চাই তখন কি এগুলোর কোনটা কাজে দেবে? দেবে না। একমাত্র মৃত্যুর সম্বন্ধে জ্ঞান কাজে দেবে। যখন আমি জানবো যে শুধু শরীরের মৃত্যু হচ্ছে কিন্তু আমি আছি এবং থাকবো, সেই জ্ঞান কাজে লাগবে। এটাই জীবনের খোঁজ। আমার গুরুদেব বলতেন, ‘The aim of life is to die consciously.’ (জীবনের উদ্দেশ্য সচেতন ভাবে মৃত্যুকে দেখা)।
তাই বলা হয় মহাপুরুষেরা শরীর ছাড়েন আর আমরা মারা যাই। আমরা বাঁচার তীব্র আকুতি নিয়ে, ‘ওরে আমায় বাঁচা, ডাক্তার বাবু আমাকে বাঁচান’ বলতে বলতে মারা যাই। আর মহাপুরুষরা জামা ছাড়ার মত শরীর ত্যাগ করেন কারণ তাঁরা জানেন যে তাঁরা শরীর নন। শরীরকে অতিক্রম করে তিনি নিত্য শাশ্বত সত্তা, যার মৃত্যু হয় না। একেই বলে আত্মা। সুতরাং মায়া হচ্ছে ভ্রম। শরীর, মন, বুদ্ধি এর কোনটাই আসলে আমি নই — এই জ্ঞান যতক্ষণ না হচ্ছে ততক্ষণ আমরা মায়াতে আটকে আছি অর্থাৎ অনিত্যকে আঁকড়ে থাকছি। আমাদের স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, সম্পর্ক, জড় বস্তু ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই আমরা এমন বৃত্তিতে আটকে আছি যার নিত্য, চিরস্থায়ী কোন অস্তিত্ব নেই। একেই বলে মায়া। সুতরাং জগতের মধ্যে মায়া নেই, মায়া আছে আমাদের মনে। এই মন্দির ও পিলারের মধ্যে কোন মায়া নেই। মায়া রয়েছে আমাদের ভাবনায়। এই পিলারের মধ্যে কী আছে? ইঁট, বালি, সিমেন্ট, পাথর, রড। ইঁট, বালি, সিমেন্টের মধ্যে কী আছে? প্রত্যেকটার মধ্যেই পৃথ্বী তত্ত্ব আছে। পৃথ্বী তত্ত্বের মধ্যে কী আছে? গভীরে গেলে দেখবে পৃথ্বী তত্ত্ব এসেছে তেজ তত্ত্ব থেকে। তেজ তত্ত্বের মধ্যে কী আছে? আরও গভীরে গেলে দেখবে সবই আকাশ তত্ত্ব থেকে এসেছে। কেন আকাশ তত্ত্ব থেকে এসেছে? কেন জগতে পঞ্চভূত তৈরি হয়েছে? ইচ্ছা থেকে। একেই বলে মহতের ইচ্ছা। এই মন্দিরের পিলারটাকে যদি আমরা বাস্তব ভাবতে শুরু করি তাহলে সেটাই মায়া। আর আমরা যদি মনে করি ঈশ্বরের ইচ্ছায় এই পিলার এখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেই ইচ্ছাই সত্য বাদবাকি সব যতক্ষণ তিনি চাইছেন ততক্ষণ আছে, তাহলে আমরা মায়ামুক্ত হচ্ছি।
মানুষের মনের মধ্যে যিনি মায়া তৈরি করে জগতের সৃজন করছেন এবং সেই তৈরি করা রূপকল্প দিয়ে গ্রাম, শহর তৈরি হচ্ছে, আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা তৈরি হচ্ছে, তাঁকে বলা হয় মায়াধীশ। শ্রীকৃষ্ণকে বলা হয় মায়াধীশ। তিনি মায়াধীন বা মায়ামুক্ত কোনটাই নয়, তিনি মায়া তৈরি করেন। কে মায়ামুক্ত হবে, কে সাধনায় সিদ্ধ হবেন সেটা তিনিই ঠিক করবেন। তাই তিনি মায়াধীশ, মায়াকে তিনি চালনা করেন। সুতরাং মায়া হচ্ছে অজ্ঞানতা। জ্ঞান হলে জগতের কোন পরিবর্তন হবে না। জ্ঞান হলে এই বিভ্রম কাটবে, তখন জড়কে আর সত্য বলে মনে হবে না কারণ জড়ের কোন স্থায়ী অস্তিত্ব নেই। যার স্থায়ী অস্তিত্ব আছে তিনি আত্মা।
আত্মা পরমাত্মার মধ্যে কোন ভেদ নেই। আমরা নিজেদের যুক্তি দিয়ে বা সাধনার জন্য জীবাত্মা, পরমাত্মা বলে ভেদ করি। এই গ্লাসে এখন অর্ধেক জল আছে। বাকি অর্ধেকে কী আছে? আকাশ আছে। গ্লাসের বাইরে কী আছে? আকাশ আছে। এবার ধরো গ্লাস ঠিক করল যে সাধনা করে সে কে জানবে। জানতে জানতে দেখলো তার মধ্যে তো শুধু আকাশ রয়েছে। ওর মধ্যেকার জলও আকাশেরই রূপ। তখনও ওর জানা পুরো হলো না কারণ তখনও বাইরের সবকিছুর থেকে সে নিজেকে বিচ্ছিন্ন ভাবছে। আরও গভীরে গিয়ে দেখল গ্লাসটাই নেই। গ্লাসের স্টিলের মধ্যেও আকাশ তত্ত্বই আছে। বাইরের যে আকাশকে সে বিশ্ব প্রকৃতি ব্রহ্মাণ্ড বলে ভাবছিল এবং নিজেকে তার থেকে আলাদা ভাবছিল, তেমন কোন ভেদ নেই। সবই এক। এটাই পরমাত্মা। যখন গ্লাস নিজেকে আকাশ বলে আবিষ্কার করল, সেটা জীবাত্মা। আর যখন আমি গ্লাস নই, আমি কোন আবিষ্কারও নয়, আমি বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সব এক, তখন পরমাত্মা। পরমাত্মাই সত্য কিন্তু যতক্ষণ না বোধ হচ্ছে ততক্ষণ আমরা জীবাত্মা এবং পরমাত্মার ভেদ করি।
[গৌরবাজার, পাণ্ডবেশ্বর, ১’লা জুন ২০২২]