17/07/2025
সূরা মারিয়াম একটু গভীর ভাবে পড়লে একটা ইন্টারেস্টিং প্যাটার্ন চোখে পড়ে। আল্লাহর একটা নাম এখানে বার বার রিপিট হয়েছে।
নামটা হলো "রহমান"
অথচ যেখানে সূরা রহমানে এই নামটা এসেছে মাত্র একবার
সেখানে সূরা মারিয়ামে এসেছে গুনে গুনে মোট ষোল বার !
কেন?
কারণটা পাওয়া গেল অবশ্য একটু ঘাঁটাঘাঁটি করতেই। সহীহ তিরমিযীর ১৯০৭ হাদিসে আল্লাহর রসুলু বলেন, আল্লাহ নিজে ঘোষণা দিচ্ছেন-
"আমি হলাম "রহমান"
এবং আমিই এই রহম কে (মাতৃ গর্ভের স্থানটাকে) সৃষ্টি করেছি এবং একে যে রহম বলা হয় এটা আমার নামের জন্যই বলা হয়!"
অর্থাৎ বুঝাই যাচ্ছে যে রহমান নামের সাথে মাতৃত্বের একটা স্পেশ্যাল বন্ডিং আছে।
আর সূরা মারিয়ামে তো মাতৃত্বকে ট্রিবিউট করা একটা পুরোদস্ত সূরা। এখানে সন্তানের শুরুর পূর্বের গল্প থেকে শুরু করে ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত মোটামুটি মাতৃত্বের প্রতিটা সোশ্যাল স্টেইজকেই ফোকাস করা হয়েছে।
যেমন-
এই সূরাতে আমরা পাই হজরত জাকারিয়া আ. কিভাবে বুড়ো বয়সে সন্তানের জন্য ক্রেইভ করছেন।
দেখতে পাই কিভাবে মারিয়াম আ. না চাইতেও কিভাবে তাকে মাতৃত্বের সুসংবাদ দিয়ে তাকে সম্মানিত করা হলো। দেখতে পাই তার মাতৃত্বকালীন ডেভেলপমেন্ট স্টেইজ গুলো।
দেখতে পাই তার প্রসব যন্ত্রণার বর্ণনা।
দেখতে পাই ঈসা আ. এর ভূমিষ্ঠ।
দেখতে পাই এই মাতৃত্বের কারণে তার মানুষের কাছে লাঞ্ছনা
আর দেখতে পাই ছোট্ট ঈসা আ এর দোলনা থেকে কথা বলার অদ্ভুৎ ঘটনা!
মাতৃত্বের প্রতি মনে হয় প্রতিটা মানুষেরই একটা তীব্র আকর্ষণ আছে। তাইতো বোধহয় আল্লাহর নামের হিলিং ইফেক্ট নিয়ে লেখাটা লেখার পর অগণিত মানুষ এই একটা জিনিস নিয়ে আমাকে ইনবক্স করেছেন। সবার যেন একটাই প্রশ্ন-
মাতৃত্ব রিলেটেড কমপ্লেক্সিটি দূর করার জন্য ড. ইব্রাহিম কি কোনো নাম সাজেস্ট করে রেখেছেন?
উত্তর: হ্যা করেছেন!
তবে সেডলি সেটা ইয়া রহমানু নয়!
নামটা হলো "ইয়া খলিকু" অর্থ সৃষ্টিকারী!
যারা জানি না তাদের জন্য বলে রাখি,
ড: ইব্রাহিম করিম একজন ইজিপশিয়ান বায়ো ফিজিসিস্ট।দীর্ঘ ৩ বছর গবেষণার পর তিনি দেখতে পান যে-
আল্লাহর বিভিন্ন নাম আমাদের বডির বিভিন্ন অর্গানের উপর হিলিং ইম্প্যাক্ট আনতে সক্ষম!
তিনি অ্যাডভান্সড স্যাটেল এনার্জি মুভমেন্ট মেশার করে দেখান যে- সেই নামগুলো আমাদের বডির এনার্জি ফ্লো কে স্টিমুলেট করে স্পেসিফিক অর্গান গুলোর ইমিউন সিস্টেমকে বুস্ট করতে থাকে। সেই সূত্রে ইয়া খালিকু বুস্ট করে ওভারি রিলেটেড ইমিউনকে।
তবে একটা জিনিস একটু বলে রাখি
"ইয়া খলিকু" হয়ত ফিজিক্যালি আপনার কমপ্লেক্সিটি হিল করবে, তবে এর কোনো গ্যারান্টি নেই যে এটা আপনাকে সন্তান পাইয়ে দিবে! কারণ সন্তানের বিষয়টা একমাত্র উনার হাতেই।
তবে একজন মুমিনের এই বিষয় আবার নিরাশ হওয়া যাবে না। কারণ আল্লাহর রাসূল বলেন,
"একজন মুমিনেই ব্যাপারটাই আশ্চর্যের সব অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর যদি তার কোনো ভালো অবস্থা আসে, সে শোকর করে এটা যেমন তার জন্য ভালো আর যদি সে বিপদে পড়ে, সে সবর করে এটাও তার জন্য ভালো"
[সহীহ মুসলিম ২৯৯৯]
আর তার থেকেও বড় কথা এক জন মুমিন তো শুধু এই টাইমলাইনেই আবদ্ধ নয়, মুমিননের বিগেস্ট টাইমলাইন হচ্ছে জান্নাহ। এবং স্রষ্টা জানিয়েছেন,
জান্নাতে সে যা চাইবে তাই পাবে [সূরা ক্বাফ, ৫০:৩৫]
এমন কি কেউ যদি মাতৃত্বের সাধ অনুভব করতে চায় সেটাও সে সেখানে পাবে!
জি ঠিকই শুনেছেন!
সহীহ তিরমিযী শরীফের ২৫৬৩ নং হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি, জান্নাতে সে চাইলে গর্ভধারণ করতে পারবে চাইলে গর্ভপাতও করাতে পারবে এবং চাইলে সেই ভূমিষ্ঠ হওয়া সন্তানকে বড়ও হতে দেখতে পারবে এবং এ সবই পারবে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে!
মানে সুপার ফাস্ট মুডে!
তো যা বলছিলাম, দুনিয়াতে তিনি সন্তান কাকে দিবেন আর কাকে দিবেন না মোর ইম্পোর্টেন্টলি কখন দিবেন আর কখন দিবেন না। এটা একমাত্র তারই হাতে।
কারণ অহরহ দেখছি, কেউ না চাইতেই পেয়ে যাচ্ছে,আবার কেউ কেউ হাজার চেষ্টা তদবির করেও পাচ্ছে না।
কেউ আবার এমন কোনো মেডিক্যাল প্রসিডিউর নেই যে করে নাই কিন্তু পায় নাই। কিন্তু বাইতুল্লাহ গিয়ে ফরিয়াদ করতেই পেয়ে গিয়েছে।
আবার এও দেখেছি যে, মেডিক্যাল প্রসিডিউর কমপ্লিট করে বাইতুল্লাহর গিলাফ ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়েও কেঁদেও কেউ পায়নি।
সো স্ট্রংলি বলা যায় না যে, এর কোনো কোনো স্পেসিফিক রেসিপি বা প্যাটার্ন আছে কিনা!
তবে জান্নাতে পাবো বলে দুনিয়াতে আকাঙ্ক্ষা ছেড়ে দিবো?
একদমই না!
কুরআন সেটা শিখায় নি বরং শিখিয়েছে উল্টোটা। ইব্রাহিম আ আর জাকারিয়া আ এর ঘটনা শুনিয়ে শিখিয়েছে যে, প্রয়োজনে বুড়ো বয়স পর্যন্ত আমরা তা চাইতে থাকবো।
তবে এই চাওয়ার ভিতরে অবশ্য একটা প্যাটার্ন ঠিকই লক্ষ্য করা যায়।
আর তা হলো,
নিরাশ না হয়ে একটা স্পেশাল নামে তার কাছে চাইতে হবে। স্পেশাল নামটা আমাদের সবারই জানা।
"ইয়া রব" বা "হে রব"
রব্বি অর্থ "আমার রব" আর রব্বানা অর্থ "আমাদের রব"
কুরআন খুললেই দেখতে পাবেন, এই রব্বি বা রব্বানার কম্বিনেশনে এটলিস্ট ৪০ টা দুয়া এসেছে!
যদিও এই রব নামটা আসমাউল হুসনাতে নেই তবুও কেন জানি নবি রাসূলগণ এই নামটাকেই বেছে নিয়েছিলেন বারবার!
যেমন,
এই সূরা মারিয়ামেই আমরা দেখতে পাই
যেখানে রহমান নামটা ১৬ বার এসেছে!
সেখানে কিন্তু হজরত জাকারিয়া সন্তান চাওয়ার বেলায় ইয়া রাহমানু বলে চাননি।
চেয়েছেন এই "ইয়া রব" বলেই [সূরা মরিয়াম ১৯:৪-৫]
আবার হজরত ইব্রাহিমও কিন্তু এই নামেই ডেকেছিলেন তার সন্তান চাওয়ার বেলাতেও [৩৭:১০০-১০১]
শুধু কি তাই?
মোটামুটি প্রতিটা নবি রাসূলই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ চাওয়া ছিল এই ইয়া রব কে ঘিরে। যেমন এই ইয়া রব নাম নিয়ে ডেকেছিলেন, আদম আ. তার গুনাহ মাফের জন্য [সূরা আরাফ ৭:২৩]
নূহ আ. ডেকেছিলেন নৌকা থেকে ক্ষমার পাওয়ার জন্য [সূরা হুদ ১১:৪৭]
মুসা আ. ডেকেছিলেন ফেরাউনের বিরুদ্ধে সাহস সঞ্চারের জন্য [সূরা তোহা ২০:২৫-২৮]
ইউসুফ আ. স্মরণ করেছিলেন টেম্পটেশন থেকে বাঁচার জন্য [সূরা ইউসুফ ১২:২৩-৩৩]
আর লুত আ. ডেকেছিলেন তার এলাকার ওই নিকৃষ্ট মানুষগুলো নষ্টামি থেকে বাঁচার জন্য [সূরা শুরা ২৬:১৬৯]
তবে নবি রসুলের কথা না হয় বাদই দিলাম, খোদ ইবলিশও যখন এই নাম নিয়ে দুয়া করেছিল।
ইয়া রব তুমি আমাকে পুনরুত্থান দিন পর্যন্ত সময় দাও [সূরা হিজর ১৫:৩৬]
আমার রব কিন্তু তার দুয়াও ফেলেননি, কেয়ামত পর্যন্ত তাকে সময় দিয়ে রেখেছেন!
অর্থাৎ এই ইয়া রব ডেকে চাওয়াটা আসলে কোনো অ্যাক্সিডেন্টাল বিষয় না...
সো সন্দেহ ছাড়া এই নামে ডাকা শুরু করেন। কারণ চাওয়া পাওয়ার সাথে এই রব নামটা ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।
প্রশ্ন আসতেই পারে যে, এই রব শব্দের অর্থ টা কি?
শব্দটা এসেছে র-বা-বা (ر-ب-ب) থেকে
র-বা-বা একটা বিশাল স্পেকট্রাম
এর মানে একইসাথে লালনপালন করা, রক্ষা করা, ঠিকভাবে পরিচালনা করা আবার বাড়িয়ে তোলা। অর্থাৎ এই এক নামে মোটামুটি সবকিছুই কভার্ড।
অর্থাৎ রব মানে শুধু স্রষ্টা না, রব মানে হলো একজন অভিভাবক।
যিনি আমাদেরকে শুধু তৈরিই করেননি, সাথে যত্নের সাথে লালনপালন করছেন এবং পরপর মমতায় আগলে রাখছেন এবং দিন কে দিন ধীরে ধীরে আমাদেরকে বাড়িয়ে তুলছেন!
সো যদি ডাকতেই হয়, এই নামেই ডাকাটাই আসলে লজিকাল। আর তিনি তো বলেই রেখেছেন,
"আমি নিকটেই আছি দুয়াকারী যখনই আমার কাছে দুয়া করে আমি সাথে সাথেই সেই দোয়ায় সাড়া দেই"
[কুরআন ২:১৮৬]
সো যদি চাইতেই হয় এই নামে চাইতে থাকুন। আশা নিয়ে চাইতে থাকুন। ব্যাকুল হয়ে চাইতে থাকুন।
কারণ সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি।
কে জানে হয়তো তিনি অপেক্ষায় আছে আপনার মুখে জাস্ট এই একটা ডাকটা শুনার জন্যই!
লেখা: সামিউল হক
সুকুন- The Peace of Heart