15/10/2024
আমার চিন্তা চেতনা এখনও সেকেলে
সেকালে খুলনার দৌলতপুর থেকে ভোর রাতে লঞ্চে উঠতাম। সারাদিন বিরক্তিকর ভুম ভুমমম আওয়াজ সহ্য করে সন্ধার দিকে আমাদের পানাইল ঘাটে নেমে দশ মিনিট হেটে বা বর্ষাকাল হলে নৌকায় বাড়িতে যেতাম। এখন সকাল ছটায় যাত্রা করে সকাল আটটাতেই বাড়িতে পৌছে যাই। কত আরাম।
সেকালে সারাদিন ভ্রমন করে বাড়িতে যাওয়া অত্যন্ত কষ্ট ও ভ্রমনক্লান্তির বিষয় ছিল। মাঝপথে লঞ্চ নষ্ট হয়ে অতিরিক্ত বিলম্ব হওয়া ছিল নৈমত্তিক বিষয়। তার পরেও এত সংগ্রাম, এত কষ্ট সহ্য করে বছরে তিন-চারবার বাড়িতে যেতাম। বাড়িতে যাওয়ার সে আগ্রহ, সে আনন্দ, সে পরানপুড়া এখন উপহাসের সামগ্রি। তবে সুযোগ পেলেই সেই সেকেলে অনুভূতিটা কিভাবে যেনো হৃদয়ে হাহাকার সৃষ্টি করে। আকুল করে তোলে অনুভূতিকে। অস্থিরতায় ছটফট করতে শুরু করে বুকের ভেতর।
এখন আমরা আধুনিক। গ্রামে যাওয়াটা এখন আমাদের শিক্ষিত ব্যক্তিত্বের সাথে যায় না এখন বিলাসবহুল গাড়িতে আরামদায়ক ভ্রমন হলেও পাঁচ বছরেও বাড়িতে যাওয়ার কথা মনেও আসে না। শহুরে ব্যস্ততার মাঝে আমাদের জগৎ সীমাবদ্ধ।
এমনিতে বা শুধুমাত্র বেড়াতে বা মুরুব্বি আত্মীয় সজনকে দেখতে যাওয়ার উদ্যেশ্যে কখনও বাড়িতে যাওয়ার চিন্তাও করি না। গ্রামের নিরক্ষর চাচি, ফুফু, খালারা ফোন করে কত আকূলভাবে যে কান্নাকাটি করে, সে আকূলতা পৃথিবী থেকে এখন বিলুপ্তপ্রায়। ফোনের মধ্যেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে। বাবারে আয়, এটটু চিহারাডা দেহায় যা। কতদিন দেহিনারে বাবা। তোর মা যে কত ভালো মানুষ ছেলো। তোগে বাড়ি যাইয়ে কোনোদিন খালি মুহি আসতি পারিনেই। আয়রে বাবা, চাচিডারে এটটু দেহে যা। এই ছ্যামড়া, তুই এহন মেলা বড় অয়ে গেছিস না? সাহেব অয়ে গেছিস তাই না? বাবারে, আর কয়দিন বা আছি। এট্টু আয়, বাপ-দাদার মাটি ভুলতি নাই।
কিন্তু আমরা এত আধুনিক ওসব মায়াকান্নায় বিগলিত হই না। এত কাজ ফেলে ঐসব নাকিকান্না শুনতে বাড়িতে যাব- পাগোল নাকি!
একেবারে যে যাই না তা কিন্তু না। এখন বাড়িতে যাই কেউ মারা গেলে। মুরুব্বিদের কারও মৃত্যু হলে ব্যস্ততার অজুহাত চলে না। মনে মনে বিরক্ত হলেও জানাজা পড়তে যেতে হয়। এই যাওয়া সামাজিক না লোকদেখানো নাকি আন্তরিক তার পরিমাপ বড় রহস্যপূর্ণ।
আমরা না গেলেও গ্রামের চাচি, ফুফুরা কিন্তু নিঃসঙ্গ নয়। গ্রামের প্রতিবেশীরা বিকেলবেলা একসাথে বসে গল্প করে, পান খায়, শুপারি কেটে একে অপরকে দেয়, তামাক ভাগাভাগি করে। কেউ একজন অসুস্থ হলে গ্রামের মানুষ তার খবর নেয়। মাথায় পানি দিয়ে দেয়। ভাত রেধে খাইয়ে দেয়। গ্রামের এসব আদিক্ষেতা আমরা শহরের মানুষরা কল্পনাও করতে পারি না। আজ কত বছর এই বাসায় থাকি। নিচে উপরে কারা থাকে তা জানিও না।
চাচি-চাচা, খালা-ফুফুদেরকে নিঃসঙ্গ করে আমরা গ্রাম ছেড়ে এলেও ওনারা কিন্তু নিঃসঙ্গ হননি; নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছি আমরা। অত্যাধুনিক নিঃসঙ্গ। বাসার মধ্যে মরে পড়ে থাকলে গন্ধ ছড়ানোর আগে কেউ জানতেও পারবে না।