23/10/2024
নূহ (আ.)।
তিনি ছিলেন আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা। কুরআনে ঘোষিত দৃঢ়চেতা পাঁচজন রাসূলের মধ্যে তিনি অন্যতম। ইরাকের কূফা নগরীর নিকটবর্তী একটা শহরে আল্লাহ নূহকে (আ.) প্রেরণ করেছিলেন।
..
আদম (আ.) থেকে নূহ (আ.) পর্যন্ত প্রায় একহাজার বছর পৃথিবীতে কোন শিরক হয়নি। নূহের (আ.) যুগে প্রথম শিরকের সূচনা হয়েছিল। ইবলিশ প্রথম নূহের (আ.) সম্প্রদায়ের লোকদের দিয়ে শিরকের সূচনা করেছিল।
..
নূহের (আ.) কওমের মধ্যে পাঁচজন আল্লাহভীরু লোক ছিলো। ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুছ, ইয়াউক এবং নাসের।
..
ইবলিশ তাদের নিকট এসে বললো, তোমরা এসব কি ইবাদাত করছো? তোমাদের পূর্বপুরুষেরা যেভাবে ইবাদাত করে নিজেদেরকে আল্লাহর দরবারে সঁপে দিয়েছিলো, সেই তুলনায় তো তোমাদের ইবাদাত কিছুই না।
..
তোমরা একটা কাজ করো। তোমাদের সেই পাঁচজন আল্লাহভীরু লোকদের মূর্তি তৈরী করে তোমাদের ইবাদাতগৃহে রাখো। এতে তোমরা ইবাদাত করার সময় তাদের দেখলে তোমাদের ইবাদাতের প্রতি স্পৃহা বাড়বে।
..
ইবলিশের এমন মুখরোচক প্ররোচনায় তারা প্রলুব্ধ হলো। তারা সেই পাঁচজন ইবাদাতগুজার লোকের মূর্তি বানিয়ে ইবাদাতগৃহে স্থাপন করলো।
..
মূর্তীকে সামনে রেখে তারা আল্লাহর ইবাদাত করতে লাগলো। অনেক সময় অতিবাহিত হলো। সময়ের প্রবাহে তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে মূর্তিগুলোর ইবাদাত শুরু করে দিলো, মূর্তিগুলোর নিকট মানত করতে শুরু করলো, চাওয়া-পাওয়া সব মূর্তির দিকে প্রত্যাবর্তিত হলো।
..
নূহের (আ.) সম্প্রদায় আল্লাহর ভয়, তাযকিয়া, তাসাউফ ভুলে গেলো। এভাবেই নূহের (আ.) যুগে শিরকের সূচনা হলো।
..
নূহ (আ.) তার সম্প্রদায়ের লোকদের সতর্ক করলেন। তিনি বললেন, তোমাদের কাজগুলো সঠিক নয়। তোমরা যা করছো, তা শিরক। তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে মূর্তিগুলোর ইবাদাত শুরু করে দিয়েছো। আমি তোমাদেরকে সতর্ক করছি, উপদেশ দিচ্ছি- তোমরা এসব থেকে ফিরে এসো।
..
সম্প্রদায়ের লোকেরা নূহকে (আ.) মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো, তিরস্কার করলো। তারা পরস্পরকে বললো, তোমরা নূহের কথায় তোমাদের এই উপাস্যদের ছেড়ে দিও না। এরাই তোমাদের উপাস্য।
..
বারবার প্রত্যাখ্যাত হবার পরও নূহ (আ.) তার সম্প্রদায়ের লোকদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দেওয়া থেকে অবসর নেন নি। তিনি বললেন- হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করো, তিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই। তোমরা কি আল্লাহকে ভয় পাও না?[১]। তোমাদের এমন কাজের জন্য আমি তোমাদের ব্যাপারে ভয়াবহ শাস্তির আশঙ্কা করছি [২]। তোমরা শিরক, পৌত্তলিকতা ছেড়ে আল্লাহর দিকে ফিরে এসো।
..
কোনপ্রকার দাওয়াত নূহের (আ.) সম্প্রদায়ের লোকদের তাওহীদের পথে আনতে পারেনি। তারা নূহের (আ.) প্রতি যুক্তি উত্থাপন করে বললো- তোমার আহ্বানে আমরা কেন সাড়া দিব? আমরা তো দেখতে পাচ্ছি সমাজের নিন্মশ্রেনির লোকেরা তোমার অনুসারী। আমাদের থেকে তোমাদের কোন বিশেষ গুন, শ্রেষ্ঠত্ব তো দেখছিনা। তোমাদেরকে তো আমাদের মিথ্যাবাদী মনে হচ্ছে [৩]। তুমি মনে হয় স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছো [৪]।
..
তুমি প্রথমে তোমার আশপাশ থেকে নিন্মশ্রেনির লোকদের সরাও, তাহলে আমরা তোমাকে বিবেচনা করবো। তুমি যে এই নিন্মশ্রেনির লোকদের নিয়ে সমাজে একটা প্রভাবিত, মোহনীয় অবস্থা তৈরী করতে চাচ্ছো, তা হবে না।
..
নূহ (আ.) তার সম্প্রদায়ের বিত্তশ্রেনির লোকদের বললেন- তারা নিন্মশ্রেনির হলেও ঈমানদার। আমি তাদের তাড়াতে পারিনা। তারা তাদের রবের ডাকে সাড়া দিয়েছে, তারা তাদের রবের দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। বরং আমি দেখতে পাচ্ছি তোমরা এক অজ্ঞ, নির্বোধ জাতি [৫]।
..
তোমাদের কথামতো আমি যদি তাদের তাড়িয়ে দিই, তাহলে আমি আল্লাহর শাস্তির মুখোমুখি হবো। তখন আমাকে কে সাহায্য করবে?
..
আমি তো নিশ্চিত বলছিনা যে, আমার কাছে আল্লাহর খাজানা বা ধনভাণ্ডার আছে। আমি কোন গায়েব জানিনা, আমি কোন ফেরেশতাও না।
..
তোমরা যাদের নিন্মশ্রেনির লোক বলছো, তাদের তাকদীর, অন্তরের খবরও আমি জানিনা। আল্লাহ তাদের কোন কল্যান দিবেন কি দিবেন না, তাও জানিনা [৬]। তবে যারা তাওহীদের পথে থাকেন, আল্লাহ তাদের পুরষ্কার দিবেন। আল্লাহ কখনও ওয়াদা ভাঙ্গ করেন না।
..
সম্প্রদায়ের লোকেরা নূহকে (আ.) এবারও হতাশ করলো। তারা বললো- তুমি তো আমাদের সাথে পাগলামি করছো[৭]। তুমি আমাদের সাথে অযথা বাদানুবাদ করছো, বিবাদ করছো[৮]।
..
তুমি তো আমাদের মতই মানুষ। রাসূল হওয়ার মতো বিশেষ কিছু তো তোমার মধ্যে দেখছিনা। আল্লাহ তার বানী প্রচার করতে চাইলে তো ফেরেশতাদের পাঠাতেন। তোমার মতো অনর্থক কথা তো আমাদের পূর্বপুরুষরা কখনও বলেন নি[৯]। তাহলে কি তুমি বলতে চাচ্ছো, আমাদের পূর্বপুরুষরা সত্যের উপর ছিলেন না?
..
নূহ (আ.) তার সম্প্রদায়ের এমন একগুঁয়েমি আচরনের বিপরীতে নয়শো পঞ্চাশ বছর তাওহীদের দাওয়াত দিলেন। দীর্ঘ এই দাওয়াতী মিশনে তিনি ধৈর্য্য হারান নি, নিজ সম্প্রদায় থেকে তিরস্কার, তীর্যক প্রশ্নবান, অপমানিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি পুরো জনপদের ধুলো মাড়ালেন তাওহীদের বানী প্রচারে।
..
দীর্ঘ দশ শতাব্দীর দাওয়াতে নারী-পুরুষ মিলে মাত্র আশি জন লোক নূহের (আ.) প্রতি ঈমান এনেছিলো।
..
নূহ (আ.) আল্লাহর সকাশে আরজ করলো। তিনি বললেন- আল্লাহ, আমি দিন-রাত এক করে তাদের দাওয়াত দিয়েছি। আমি তাদেরকে তাওহীদের দিকে আহ্বান করি, তারা পালিয়ে বেড়ায়।
..
আমি তাদেরকে আপনার বানি শুনাই, দুআ করি, আর তারা পালিয়ে বেড়ায়। তারা আমাকে দেখলে নিজেদের লুকিয়ে ফেলে। তারা আপনার অবাধ্যতায় লিপ্ত। তারা অহংকার করে, ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে[১০]।
..
আমি তাদেরকে ব্যাক্তিকেন্দ্রিক গোপনীয় দাওয়াত দিয়েছি। প্রকাশ্য দাওয়াত দিয়েছি। বাজার, সভা, সেমিনারে দাওয়াত দিয়েছি। কিন্তু তারা সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
..
আমি তাদেরকে উৎসাহ প্রদান, জান্নাতের নিয়ামত, সুসংবাদ প্রদান, জাহান্নামের ভয়, আপনার সত্য ওয়াদা, আখিরাত, আপনার পুরষ্কার, আপনার কুদরতের বর্ণনা দিয়ে তাওহীদের দিকে আহ্বান করেছি। কোনকিছুতেই তারা সাড়া দেয়নি। বরং তারা আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে।
..
নূহের (আ.) সম্প্রদায় তাদের চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানালো। তারা বললো- নূহ, অনেক হয়েছে। এবার তুমি থামো। তুমি যদি না থামো, তাহলে আমরা পাথর মেরে তোমাকে মেরে ফেলবো[১১]।
..
তুমি আমাদের সাথে অনেক তর্ক করেছো, বাড়াবাড়ি করেছো। তুমি আমাদেরকে যে আযাবের ভয় দেখাচ্ছো, পারলে সেটা দেখাও[১২]। তুমি যে ধ্বংসলীলার ভয় দেখাচ্ছো, পারলে সেটা আমাদের সামনে উপস্থাপন করো।
..
নূহ (আ.) হতাশ হলেন। যে সম্প্রদায়ের লোকদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি বিনা পারিশ্রমিকে নয়শো পঞ্চাশ বছর তাওহীদের দাওয়াত দিলেন, সে সম্প্রদায়ের লোকজন তাকে হত্যার হুমকি দিলেন।
..
নূহ (আ.) আল্লাহর কাছে অভিযোগ করলেন। তিনি বললেন- আল্লাহ, আপনি আমার আর আমার সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে একটা মীমাংসা করে দিন।
..
আমাকে এবং আমার দাওয়াতে যারা সাড়া দিয়ে মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, আপনি তাদের রক্ষা করুন [১৩]।
..
হে প্রভু, আপনি যমীনের উপর আর কোন কাফিরকে অবশিষ্ট রাখবেন না। যদি অবশিষ্ট রাখেন, তবে তারা মুমিনদের পথভ্রষ্ট করবে, পাপাচারী, কাফিরদেরই জন্ম দিবে[১৪]।
..
হে প্রভু, আপনি আমাকে, আমার পিতামাতাকে, আমর ঘরে যারা ঈমানদার হয়ে প্রবেশ করবে এবং মুমিনদের আপনি ক্ষমা করুন।
..
আমার পূর্বের দশজন পূর্বপুরুষ মুমিন ছিলেন। আমার পিতার পূর্বে কোন পূর্বপুরুষ কোনরুপ কুফরী, শিরক করেন নি। এই কুফরী, শিরক আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা আমার সময়েই শুরু করেছে।
..
সম্প্রদায়ের প্রতি নূহের (আ.) অভিশাপ, বদদোয়া আল্লাহ কবুল করলেন। আল্লাহ নূহকে (আ.) আশ্বস্ত করলেন, তিনি এবার এটার মীমাংসা করবেন।
..
তবে তোমার সম্প্রদায়ের লোকেরা তোমার নিকট যে আযাব দেখতে চেয়েছিলো, তারা তা দেখবে, উপভোগ করবে। কিন্তু বর্ণনা করার সুযোগ পাবেনা, তাদের প্রত্যাশিত আযাবই তাদের শেষ দেখা হবে।
..
আমি তোমার সম্প্রদায়ের লোকদের এক মহাপ্লাবনে ভাসাবো। এই প্লাবনে পুরো পৃথিবী প্লাবিত হবে৷ তারা কোথাও আশ্রয় পাবেনা। সেই প্লাবন থেকে বাঁচার জন্য তুমি আমার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী একটা নৌকা বানাবে। তবে এই নৌকার ব্যাপারে তুমি কাফেরদের কিছু বলবেনা, আমি তাদেরকে মহাপ্লাবনে হাবুডুবু খাওয়াবো[১৫]।
..
তথসূত্র:
[১] সূরা মূমিনুন- ২৩
[২] সূরা আরাফ- ৫৯
[৩] সূরা হুদ- ২৭
[৪] সূরা আরাফ- ৬০
[৫] সূরা হুদ- ২৯
[৬] সূরা হুদ- ৩০,৩১
[৭] সূরা মূমিনূন- ২৫
[৮] সূরা হুদ- ৩২
[৯] সূরা মুমিনুন- ২৪
[১০] সূরা নূহ- ৫-৯
[১১] সূরা শুয়ারা- ১১৬
[১২] সূরা হুদ- ৩২
[১৩] সূরা শুয়ারা- ১১৮
[১৪] সূরা নূহ- ২৬,২৭
[১৫] সূরা হুদ- ৩৭
পরবর্তী পর্ব আগামী বৃহস্পতিবার...