26/04/2020
▌স্বামী স্ত্রীর মাঝে রোমান্টিকতা এবং রাসুল (সাঃ) এর সুন্নত।
[] প্রথম প্রথম বিয়ে হলে স্বামী স্ত্রীর মাঝে অদ্ভুত ভালো লাগা থাকে। একটুখানি হাসি, একটু মিষ্টি কথা যেন মনকে ছুয়ে ছুয়ে যায়। বিয়ের পর প্রথম যখন স্বামী স্ত্রী একজন আরেকজনের কাছাকাছি আসে, তখন উভয়ের মাঝে মিষ্টতা, আতিশয্য, ভালোলাগা বর্ণনাতীত।
আহা! যদি জীবনের শেষ পর্যন্ত প্রতিটি দিনই এমন হতো। তাহলে কি আর কিছু লাগতো দুনিয়াতে?! বিয়ের প্রথম কয়েকটা মাস হলো হানিমুন টাইপ। যখন এই হানিমুন পিরিয়ড শেষ, তখন থেকেই আসল ঘটনা শুরু।
·
[] স্বামী তাঁর চাকরী, ব্যবসা নিয়া ব্যস্ত। সারাদিন পর ক্লান্ত শ্রান্ত আর খিটখিটে মেজাজ নিয়ে বাসায় ফেরেন তিনি। চিৎকার করে স্ত্রীর কাছে খাবার চান, ধপ করে সোফায় বসে থম মেরে পড়ে থাকেন আর না হয় টিভি দেখেন, অথবা অন্য কাজ করেন।
·
[] অতঃপর খাওয়া শেষে সিংকে প্লেট ফেলে রেখে আবার সোফায় গিয়ে বসেন। এভাবে একটার পর একটা অর্ডার করতে থাকেন স্ত্রীকে। অপরদিকে, স্বামী মহাশয় তাঁর কোন এক পুরনো বন্ধুকে ফোন করেন, অথবা ফোন করেন কোন কলিগকে।
·
[] এরপর ঘুমের পালা। যদি স্বামী মহাশয়ের মুড ভালো থাকে, তাহলে তিনি স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়ে থাকেন। কিন্তু শুধু নিজের খায়েশ মেটানোই থাকে উদ্দেশ্য। কাজ কর্ম শেষে ধপ করে পড়ে তিনি ঘুমিয়ে যান। বেচারী স্ত্রীর ব্যাপারে তাঁর কোন খেয়ালই থাকেনা। এভাবে, এটাই হয়ে যায় প্রতিদিনের রোযনামচা।
·
[] এবার আসুন স্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাপারটা যাচাই করে দেখি। স্ত্রী প্রথম প্রথম চেষ্টা করে স্বামীকে সন্তুষ্ট করার। কিন্তু ধীরে ধীরে সে তাঁর উৎসাহ, উদ্দিপনা হারাতে থাকে। কারণ সে তাঁর স্বামীর মনযোগ পায়না। সে তাঁর স্বামীকে খুশী করার জন্য রান্না করে।
·
[] খাবারের ডেকোরেশন পর্যন্ত নিখুত ভাবে করে। কিন্তু স্বামী তাঁর খাবারের প্রশংসাতো দূরের কথা, দোষ ধরতে ধরতে কিছু বাকি রাখেনা। এভাবে এমন অবস্থা হয় যে, স্ত্রী ততোক্ষণ ভালো থাকে যতক্ষণ স্বামী বাসায় থাকেনা। কারণ স্বামী বাসায় আসলেই শুরু হয় তাঁর দাসত্বের জীবন। সে হয়ে যায় চাকরানীর ন্যায়।
·
[] এধরনের দাম্পত্য ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে যেতে থাকে। জীবনে সুখ পাওয়া হয়ে যায় দুষ্কর।
·
[] স্বামীর উচিৎ রাসুলুল্লাহ "সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের" মতো তাঁর দাম্পত্য জীবনকে সাজিয়ে তোলা। প্রেমের আইকন পুরুষ হিসেবে আমরা রোমিওকে বুঝি, রাসুলকে নয়। এটা আসলেই অত্যন্ত দুঃখজনক।
·
[] অথচ পৃথিবীর বুকে সর্বশ্রেষ্ঠ রোমান্টিক স্বামী যদি বলতে হয়, তাহলে বলতে হবে আমাদের রাসূলুল্লাহ "সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম" এর কথা। তাঁর জীবনী ভালোভাবে পড়লে তা আমাদের নিকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
·
[] আমাদের রাসুল (সাঃ) আদর্শ স্বামীর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি ছিলেন তাঁর স্ত্রীদের কাছে সবচাইতে শ্রেষ্ঠ মানুষ।
·
একটি সুখী সংসার করতে হলে স্বামী এবং স্ত্রীর মাঝে অবশ্যই মনস্তাত্তিক, শারিরীক এবং আধ্যাত্নিক বন্ধন সুদৃঢ় হতে হবে।
·
[] নিচে রাসুলের সুন্নত থেকে কিছু টিপস দেয়া হল, যা পালন করলে অবশ্যই সুখী সংসার গড়া সম্ভব হবে।
·
১./ সঙ্গী/সঙ্গিনীর অনুভুতি বোঝার চেষ্টা করুন,
·
[] স্বামী স্ত্রী পরস্পরকে পরস্পরের অনুভুতির ব্যাপারে অবশ্যই অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। স্বামীকে বুঝতে হবে কখন স্ত্রীর মন মেজাজ ভাল বা খারাপ। তেমনি স্ত্রীকেও বুঝতে হবে কখন স্বামীর মন মেজাজ স্বাভাবিক না। কখনই দুই জনের মন মেজাজ একসাথে খারাপ হওয়া যাবে না।
·
[] কথাকাটাকাটি বা ঝগড়ার সময় দুই জনের একজনকে অবশ্যই চুপ থাকতে হবে। এ সময় উচিত একজন আরেকজনের পাশে বসে ঠান্ডা মাথায় সমস্যা বোঝার চেষ্টা করা।
·
[] আমাদের রাসুল (সাঃ) আম্মাজান আয়েশা (রাঃ) এর ব্যাপারে এতটাই সচেতন ছিলেন যে, তিনি বুঝতেন কখন আমাদের আম্মাজান খুশী হয়েছেন আর কখন বেজার হয়েছেন।
·
২./ তাঁকে আশ্বস্ত করুন।
·
[] স্বামী ও স্ত্রী দুজনকেই দুজনে আস্বস্ত রাখতে হবে। মানুষের জীবনে ভাল, খারাপ সময় এসেই থাকে। তাদেরকে জীবনের ভাল এবং খারাপ এই দুই সময়েই পাশে থাকতে হবে। ভাল সময় পাশে থাকলাম আর খারাপ সময় এলে ছেড়ে দূরে গেলাম এমনটি যেন না হয়। তাদের পরস্পরকে পরস্পরের কাছে স্বস্তি, ছায়া, অবলম্বন ইত্যাদি পেতে হয়।
·
[] একবার সাফিয়াহ (রাঃ) কোন এক সফরে রাসুল (সাঃ) এর সাথে যাবেন, কিন্তু তিনি একটু দেরী করে ফেললেন। যার ফলে তিনি কাঁদছিলেন। রাসুল (সাঃ) যখন তাঁকে এ অবস্থায় পেলেন, তিনি উম্মুল মুমিনীনের চোখের পানি মুছে দিয়ে প্রবোধ দিয়েছেন।
·
৩./ স্ত্রীর কোলকে বালিশ বানিয়ে শুয়ে থাকুন
·
[] স্বামীর কাছে ব্যাপারটা অত্যন্ত তুচ্ছ মনে হতে পারে। কিন্তু স্ত্রীর জন্য এটা অনন্য। এই আচরণ দুই হৃদয়কে কাছে টেনে নিয়ে আসে। এই আচরণে স্ত্রী প্রচন্ডভাবে আস্বস্ত হয়। বাহির থেকে স্বামীরা যখন বাসায় আসবেন, কিছুক্ষণের জন্য হলেও আপনার স্ত্রীর কোলে মাথা রেখেন শুয়ে পড়ুন। এতে আপনার বিশ্রাম ও হবে, সেই সাথে স্ত্রী ও খুশী হবেন।
·
[] হাদিসে এসেছে, রাসুল (সাঃ) আয়েশা (রাঃ) এর কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকতেন, এমনকি কুরআন তেলাওয়াত ও করতেন।
·
৪./ চুল আচড়ে দিন।
·
[] কোন কোন কাজ অনেক সময় সামান্য বলে মনে হলেও দাম্পত্য জীবনে এর প্রভাব যাদুময়ী। চুল আঁচড়ে দেয়া হল তাঁর মধ্যে অন্যতম। স্বামী স্ত্রী একে অপরের চুল মাঝে মাঝে আঁচড়ে দিতে পারেন। আমাদের উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা (রাঃ) মাঝে মাঝে নবীজির চুল আঁচড়ে দিতেন।
·
[] তেমনিভাবে অন্যান্য ছোটখাট কাজ করেও ভালবাসা বৃদ্ধি করতে পারেন। যেমনঃ জামা পড়তে সাহায্য করা, গরমের দিনে ঠান্ডা শরবত করে দেওয়া ইত্যাদি।
·
৫./ গ্লাস বা পাত্রের একই জায়গা দিয়ে খান।
·
[] হযরত আয়েশা (রাঃ)যখন কোন পাত্র দিয়ে পানি পান করতেন, রাসুল (সাঃ) সেই একই পাত্রের সেই একই জায়গা দিয়ে পানি পান করতেন। তেমনি ভাবে গোশত খাওয়ার সময় আয়েশা (রাঃ) যে স্থান হতে খেতেন রাসুল (সাঃ) ও ঐ একই স্থান হতে খেতেন।
·
[] আপনি ও আপনার স্ত্রী বা স্বামীর সাথে এভাবে ব্যবহার করুন। আপনাদের মাঝে ভালবাসা হবে প্রকট এবং বন্ধন হবে অটুট।
·
৬./ চুম্বন করুন।
·
[] হাদিসে এসেছে স্ত্রীর মুখে খাবারের লোকমা তুলে দেয়াতেও সওয়াব রয়েছে। তাই স্বামী স্ত্রী উভয়েই পরস্পরকে খাবার মুখে তুলে খাইয়ে দিন। সুযোগ পেলেই এ কাজ করুন।
·
৭./ ঘরের কাজে সাহায্য করুন।
·
[] রাসুল (সাঃ) যতক্ষণ বাসায় থাকতেন, ঘরের কাজে স্ত্রীদের সাহায্য করতেন। তিনি নিজের কাজ নিজে করতেন। নিজের কাপড় ধোয়া, জুতা সেলাই করা তিনিই করতেন।
তেমনিভাবে স্বামী স্ত্রী যদি বিনা দ্বিধায় এবং বিনা জিজ্ঞাসাতেই পরস্পরের কাজে সাহায্য করে তাহলে একে অপরের প্রতি সহানুভুতিশীলতা অনুভব করবে যা দাম্পত্য জীবনের অন্যতম চালিকা শক্তি।
·
৮./ গল্প করুন।
·
[] স্ত্রীর সাথে আপনার জীবনের ঘটে যাওয়া কোন মজার ঘটনা, অথবা গল্প শেয়ার করুন। স্বামী স্ত্রীর মাঝে দেখা যায় এক পর্যায়ে গিয়ে কাজের আর সংসারের কথা ছাড়া অন্য কোন কথাবার্তা হয়না। এটা ঠিকনা। তাঁদের উচিত নিজেদের মাঝে হাল্কা খোশগল্পে মেতে ওঠা।
·
[] অথচ আমরা যা করি তা হল, কোন ঘটনা বন্ধুদের কে ফোন করে বলে থাকি আর হাহাহুহু করে হাসি। কিন্তু স্ত্রীকে বলিনা। অথচ উচিত ছিল স্ত্রীকে নিয়েই সবার আগে হাহা হুহু হিহি করা। কাজেই আর দেরী না করে একটা রুটিন করুন, যে সময় আপনি ও আপনার স্ত্রী বসে হাল্কা খোশ মেজাজে কথাবার্তা বলবেন।
·
৯./ সুখের কোন সংবাদ বা সময়টুকু তাঁর সাথে শেয়ার করুন।
·
[] জীবনের ভাল সময় গুলো অথবা কোন ভাল ঘটনায় যখন আপনি খুশী হন, সে সময় টুকু স্ত্রীর সাথে উদযাপন করুন। স্বআমী স্ত্রী পরস্পর সুখ ও দুঃখ উভয় ক্ষেত্রেই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে কাজ করে থাকে।
·
১০./ বাচ্চাদের মতো খেলুন এবং প্রতিযোগিতা করুন।
·
[] রাসুল (সাঃ) তাঁর স্ত্রীদের সাথে হাসিতামাশা এবং ক্রীড়া কৌতুকে অংশগ্রহণ করতেন। আয়েশা (রাঃ) এবং রাসুল (সাঃ) এর দৌড় প্রতিযোগিতার ঘটনাটি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
·
১১./ সুন্দর নাম দিন এবং সেই নামে ডাকুন।
·
[] রাসুল (সাঃ) তাঁর স্ত্রীদের সুন্দর নামে ডাকতেন। অনেক সময় তিনি আয়েশা (রাঃ) কে আহ্লাদ করে “আয়েশ” বলে ডাকতেন। তিনি কোন কোন সময় “হুমায়রা” বলেও ডাকতেন। হুমায়রা অর্থ হল হাল্কা লালাভ। আলিমগণ বলেছেন, কেউ যদি এত ফর্সা হয় যে রোদের আলোয় তাঁর চেহারা লাল বর্ণ হয়ে যায়, তখন এ অবস্থাকে হুমায়রা বলা হয়।
দাম্পত্য জীবনে এটাই দরকার। স্বামী স্ত্রী একজন আরেকজনকে প্রশংসা করবে, ভালবাসবে। ফলে জীবন হবে সুখময়।
·
১২./ সুন্দর জামা কাপড় পরুন এবং সাজুন।
·
[] স্বামী স্ত্রী একজন আরেকজনের জন্য পরিপাটি করে থাকা জরুরী। স্ত্রীরা যেমন স্বামীর জন্য ভাল ভাল জামা কিনে পড়ে, সাজগোজ করে। স্বামীর ও উচিত ভাল ভাল জামা পড়া, নিজেকে পরিপাটি করে রাখা, পরিচ্ছন্ন রাখা। অথচ আমাদের পুরুষদের মাঝে এটা দেখা যায়না। আর পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারেতো একেবারেই উদাসীন।
·
[] রাসুল (সাঃ) যখন বাহির থেকে বাসায় ফিরতেন, সঙ্গে সঙ্গে মেছয়াক করে নিতেন।
·
১৩./ সুগন্ধি ব্যবহার করুন।
·
[] রাসুল (সাঃ) সুগন্ধী অনেক পছন্দ করতেন এবং দুর্গন্ধ ঘৃণা করতেন। তাঁর এক সুগন্ধীদানী ছিল এবং সেখানে থেকে তিনি নিয়মিত সুগন্ধী লাগাতেন।
স্বামী স্ত্রীর উচিত সুগন্ধি ব্যবহার করা। নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখার মাধ্যমে মনোরম থাকা। কারণ দুর্গন্ধ স্বামী স্ত্রীর মাঝে ভালবাসার অন্তরায়।
·
১৪./ একান্তে ঘটে যাওয়া বিষয় গোপন রাখুন।
·
[] স্বামী স্ত্রীর মাঝে ঘটে যাওয়া একান্ত মুহুর্তের ব্যাপারগুলো কখনই বন্ধু মহলে আলোচনা করবেন না। এটা সম্পর্কের মাঝে খারাপ প্রভাব বিস্তার করে। আপনার স্ত্রী শুধু আপনার জন্যই, আপনার স্বামী শুধু আপনার জন্যই।
·
[] কখনই গোপন বিষয়গুলো বাহিরে প্রকাশ করবেন না। যারা গোপন বিষয় বাহিরে বলে বাড়ায়, তাদের ব্যাপারে রাসুল (সাঃ) এ ধরনের ব্যক্তিকে নিকৃষ্ট বলে আখ্যা দিয়েছেন।.
·
১৫./ সঙ্গীর পরিবারের সদস্যদের ভালবাসুন এবং সম্মান করুন।
·
[] স্বামী এবং স্ত্রী শুধু তাদের নিজেদেরকে না, তাদের পরিবারের সদস্যদেরকেও সম্মান দেখাতে হবে, স্নেহ করতে হবে। অপরজনের সামনে নিকট আত্নীয়ের প্রশংসা করতে হবে। এতে উভয়ের মনে ভালবাসা বৃধি পাবে।
▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂▂
(আমাদের লেখাটি শেয়ার করে আপনিও হোন ইসলামের একজন দ্বায়ী)
Collected & edited :Umar Ibn Abdul Kadir
💕 বিয়ে : অর্ধেক দ্বীন ( .page)
👉 ইনশাআল্লাহ বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।