03/01/2026
রিকসাচালক সুজনের কথা আপনাদের মনে আছে? বিপ্লবের তকমাধারী দলটি সাধারণ মানুষের দল হয়ে ওঠার গল্প বুনেছিলো যাকে ঢাকা-৮ আসনে এমপি প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে। তাদের নেতারা রিকসাওয়ালার হাত উঁচিয়ে ধরে ছবি তুলে বেশ হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু গল্প যখন বিক্রি শেষ হলো, হাট যখন ভেঙে গেলো তখন জানা গেলো যে সুজন প্রাথমিক বাছাইয়েই টেকেনি। কোনো হইচই আছে?
গণতন্ত্র দরিদ্র মানুষের হাতে একটি কাগজের চাবি তুলে দেয়—নাম তার ভোটাধিকার। এই চাবি দেখিয়ে তাকে বোঝানো হয়, দেশটির মালিক সে-ই। কিন্তু বাস্তবে সে চাবি দিয়ে তাদের ভাগ্যের দরজাটি কখনো খোলে না; খুলে যায় অন্য কারও জন্য।
ভোটাধিকার এখানে ক্ষমতার বাস্তব উৎস নয়, বরং ক্ষমতাহীনতাকে বৈধতা দেওয়ার এক সূক্ষ্ম কৌশল।
দেখবেন, নির্বাচনকে বাইরে থেকে উৎসবমুখর করার জন্য রাষ্ট্রের এক ধরনের তাগাদা থাকে, ভেতরে যতই তাহাজ্জুদ পড়ে ভোট দেওয়ার, কিংবা পর্দার আড়ালে আগেই সিদ্ধান্তকৃত দলকে ক্ষমতায় নিয়ে আসার চক্রান্ত থাকুক না কেন।
উৎসবমুখর করার পেছনে মূলত থাকে সাধারণ মানুষকে অংশগ্রহণের অনুভুতি দেওয়া। নির্বাচনের দিন দরিদ্র মানুষ লাইনে দাঁড়ায়, ভোট দেয়, ছবি তুলে পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করে। রাষ্ট্র বলে, “দেখো, তুমিও এই রাষ্ট্রের অংশীদার।” কিন্তু নির্বাচনের পর যে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, তার বাজেট, নীতি, আইন-- সবই লেখা হয় ধনীদের স্বার্থ রক্ষা করে। কর কাঠামো এমনভাবে সাজানো হয় যাতে বড় কর্পোরেটদের ছাড় বাড়ে, আর পরোক্ষ করের বোঝা পড়ে সাধারণ মানুষের কাঁধে।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান--এসব মৌলিক অধিকারগুলো বাজারে ঠেলে দেওয়া হয়; কিনতে না পারলে বঞ্চনা স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া হয়।
নামকাওয়াস্তে মুখ বাঁচানোর জন্য সরকারি একটা ব্যবস্থা থাকে, কিন্তু সেখানে ধনীরা, সরকারের উচ্চপদস্থ লোকেরা, মন্ত্রী আমলারা যায় না। তারা চিকিৎসা নেয় উন্নত প্রাইভেট হাসপাতালে, কিংবা বিদেশে। তাদের সন্তানরা সরকারি স্কুলে যায় না। তারা পড়ে উন্নত স্কুলে, কিংবা বিদেশে।
একারণে সেসব হাসপাতাল বা স্কুল কলেজের শিক্ষার মান নিয়ে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক বা ধনীদের কোনো মাথাব্যথা নাই।
গরীবের সন্তানরা নিম্নমানের নামকাওয়াস্তে চালানো শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়ে কখনো ধনীদের সন্তানদের সমান যোগ্য হয়ে উঠতে পারে না। ফলাফল কাঠামোগতভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে গরিব আরও গরীব হয়, ধনি আরও ধনি হয়।
নির্বাচনী প্রচারে রাজনীতিকেরা দরিদ্রের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করেন। কারণ দরিদ্রের সংখ্যা বেশি। কিন্তু ক্ষমতায় এসে দেখা যায় এরাই ব্যাংককে বেইলআউট দেয়, বড় শিল্পগোষ্ঠীর ঋণ মওকুফ করে, শেয়ারবাজার বাঁচাতে রাষ্ট্রীয় তহবিল ঢালে।
একই সময়ে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি বাড়াতে বলা হলে বলা হয়, “অর্থনীতি চাপ সহ্য করতে পারবে না।” প্রশ্ন হলো, কোন অর্থনীতি? কার চাপ?
গণতন্ত্রে নীতিনির্ধারণের টেবিলে বসে কর্পোরেট লবিস্ট, বড় দাতারা, মিডিয়ার মালিকরা, যাদের হাতে অর্থ ও বয়ান নির্মানের ক্ষমতা। দরিদ্র মানুষ ভোট দেয়, কিন্তু নীতি লেখে না। সে প্রতিনিধি বেছে নেয়, কিন্তু প্রতিনিধির ওপর বাস্তব নিয়ন্ত্রণ রাখে না। পাঁচ বছরে একদিনের ভোট, বাকি সময়ে নীরবতা।এটাই গরীবের ক্ষমতা ও অংশগ্রহণের সীমা।
আরেকটি ভ্রান্তি হলো “সমান সুযোগ”-এর গল্প। বলা হয়, সবাই সমানভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারে। কিন্তু যাদের হাতে উন্নত শিক্ষা, অঢেল পুঁজি, ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকার লোন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে, দরিদ্ররা তাদের কীভাবে সমান প্রতিযোগী হয়? গণতন্ত্র এখানে মাঠ সমান না করে রেফারির ভূমিকায় থাকে; খেলা চলে আগেই শক্তিশালীদের পক্ষে ঢালু করা মাঠে। পানি যেদিকেই ঢালা হোক, গড়িয়ে তা ধনীদের ক্ষেতেই যাবে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এই ব্যবস্থা দরিদ্রকে তার পরাজয়ের জন্য নিজেকেই দোষী বানায়। বলা হয়, তুমি ভোট দিয়েছ, তাই এই অবস্থার জন্য দায় তোমারই। ফলে কাঠামোগত বৈষম্য আড়ালে থাকে, ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প সামনে আসে।
অনেকে মনে করেন, এটা কেবল তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর চিত্র। না, বরং কথিত উন্নত বিশ্বের বাস্তব চিত্রও একইরকম।
গণতন্ত্র যদি সত্যিই জনগণের শাসন হতো, তবে ভোটাধিকার কেবল প্রতীক থাকত না; অর্থনৈতিক ক্ষমতা, নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ, জবাবদিহি—এসবও জনগণের হাতে থাকত।
দিন শেষে যা হয়, তা হলো, গণতন্ত্র দরিদ্রকে নিয়ন্ত্রণের একটা অনুভূতি দেয়, কিন্তু দেশটি নির্মিত হয় ধনী ও সুবিধাভোগীদের জন্য। ভোটের বাক্সে সমতা দেখানো হয়, কিন্তু জীবনের বাক্সে বৈষম্যই থাকে যায়।
আর কতদিন ঠকতে রাজি আপনারা?
Ahmed Rafique