18/02/2025
মাধবেন্দ্র পুরী উড়িষ্যার অভিমুখে চললেন, তখন পথে রাজায় রাজায় বিরোধ, পথ অতি দুৰ্গম ও বিপদসঙ্কুল। মাধবেন্দ্রের মাত্ৰ কটিবাস সম্বল, বিপদ সম্পদ তাঁর জ্ঞান নেই।-- তিনি রেমুনা নগরীতে উপস্থিত হয়ে গোপীনাথ-বিগ্ৰহ দৰ্শন করলেন, এই বিগ্রহকে ক্ষীরাভোগ দেওয়া হয়-গোপীনাথের ক্ষীরভোগ অতি প্ৰসিদ্ধ । মাধবেন্দ্র ভাবলেন, “যদি এই ক্ষীরের একটু আস্বাদ পেতাম তবে আমি বৃন্দাবনে গিয়ে গোপালকে এইরূপ ক্ষীরভোগ দিতে পারতাম।” কিন্তু পরক্ষণেই মনে বিবাগ উপস্থিত হল,
“ছিঃ, আমার ক্ষীর খাবার জন্য জিহ্বার লালসা এখনও গেলনা ?”
অনুতপ্ত হয়ে তিনি বাজারের একটু দূরে একটি গাছের তলায় বসে গোপালের চিন্তায় ধ্যানমগ্ন হলেন। তখন বেলা পড়ে গেছে। গোপীনাথ-মন্দিরের প্রধান পাণ্ডা ভগবান শ্রী কৃষ্ণকে ভোগ দেওয়ার পর নিজে প্রসাদ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন, এমন সময়ে হঠাৎ ঘুম ভেঙে তিনি চমকে উঠলেন, এবং দ্রুতগতিতে মন্দিরে গিয়ে দেখিলেন-গোপীনাথের পিছনে তাঁর উত্তরীয়র সঙ্গে কিছুটা ক্ষীর বাধা আছে।
তখন পাণ্ডার দুই চক্ষু জলে পূর্ণ।
তিনি উচ্চস্বরে বললেন, “গোপীনাথ "আমায় বলছেন, ‘আজ আমি ভোগ খাই নি, কারণ আমার শ্রেষ্ঠ ভক্ত মধবেন্দ্র পুরী না খেয়ে আছেন। তাঁর জন্য আমি আঁচলে কিছুটা ক্ষীর বেঁধে রেখেছি , আগে মধবেন্দ্র পুরীকে ক্ষীর খাইয়ে এস, তবে আমি প্রসাদ গ্রহণ করবো ।” ”
সেই ক্ষীর খণ্ড হাতে করে পাগলের মত পাণ্ডা বাজারে ছুটলেন,
“এমন ভাগ্যবান কে যার জন্য স্বয়ং গোপীনাথ ক্ষীর চুরি করেছেন, তাঁর দর্শন এবং মহা পবিত্র
স্পর্শ কখন পাবো ?
চিৎকার করে বললেন কোন সন্নাসীর নাম মধবেন্দ্র পুরী ?” এই চীৎকারে মধবেন্দ্র পুরীর ধ্যানভঙ্গ হইল, তিনি ধরা দিলেন ।
এরই মধ্যে বিশাল জনতা মধবেন্দ্র পুরীকে
ঘিরে ধরলো। তিনি সমস্ত শুনে রোমাঞ্চিত কলেবরে ক্ষীরপ্রসাদ পেলেন এবং মহা আনন্দে নৃত্য করতে লাগলেন, সেই সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত রেমুনাবাসীর আবাল - বৃদ্ধ - বনিতা নৃত্য করতে লাগলেন—– তারা মধবেন্দ্র পুরীর সঙ্গ ছাড়তে চায় না কেউ। কিন্তু যশ প্ৰতিষ্ঠা বৈষ্ণবদের চোখে অতি ঘৃণার বিষয়, এই প্ৰতিষ্ঠায় ভয় পেয়ে সন্ন্যাসী রেমুনা হইতে উদ্ধার পাবার পথ খুজতে লাগলেন ;
রাত্রে তিনি উৰ্দ্ধশ্বাসে ছুটে পলিয়ে বহুদূরে চলে গেলেন। — এখনও বৃন্দাবনের পাণ্ডারা বাংলায় রচিত এই দুইটি চরণ আবৃত্তি করে থাকে-
“ধন্য ধন্য মহাভক্ত মাধবেন্দ্র পুরী।
যার জন্য গোপীনাথ ক্ষীর করিলেন চুরি।”
গোপীনাথের এই চুরির আখ্যা এখনও যায়নি –এখনও রেমুনার গোপীনাথ “ক্ষীর-চোরা গোপীনাথ” নামে পরিচিত ।
পুরী হইতে চন্দন লইয়া মাধবেন্দ্ৰ বৃন্দাবনে ফিরে আসলেন। দাক্ষিণাত্যে শ্ৰীপৰ্ব্বতে মাধবেন্দ্ৰ পুরীর সঙ্গে নিত্যানন্দের দেখা হয়েছিল। মাধবেন্দ্রের ভক্তি অসাধারণ -আকাশে মেঘোদয় হইলেই তিনি কৃষ্ণস্ৰমে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চাহিয়া থাকিতেন এবং মুছিত হইয়া পড়িতেন।
“মাধবেন্দ্র পুরীর কথা অকথ্য কথন । মেঘদরশনমাত্র হয় অচেতন ৷।”
এই মাধবেন্দ্ৰ পুরীর রচিত শ্লোকগুলি চৈতন্য আগ্রহ সহকারে আবৃত্তি করিতেন।
“যার জন্য গোপীনাথ ক্ষীর করিলেন চুরি।
ধন্য ধন্য মহাভক্ত মাধবেন্দ্র পুরী।"
এই মাধবেন্দ্র পুরী তারপর তীর্থ ভ্রমন করতে করতে বৃন্দাবনে উপনীত হন। তিনি গিরিগোবর্ধন
পরিক্রমা করে যমুনায় স্নান সেরে গোবিন্দকুন্ডের তীরে একটি বৃক্ষ্মুলে বসে প্রেমানন্দে হরিনাম জপ করছিলেন। সে সময় এক গোপ বালক এক ভান্ড দুধ অযাচক মাধবেন্দ্র পুরীকে দিয়ে বললেন,''এই দুধ টুকু তুমি পান কর।
এখানে সবাই মেগে খায়, তুমি মেগে খাচ্ছ না কেন ?'' পুরীপাদ ছোট গোপ বালকের রুপে মুগ্ধ হলেন এবং বললেন, তুমি কি করে জানলে আমি না খেয়ে আছি ? গোপ বালক উত্তর দিল,
'' স্ত্রীলোকেরা রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় তোমাকে দেখে গেছে তারাই আমাকে এই দুধ দিয়ে পাঠালেন। তুমি দুধ টুকু খাও আমি পরে এসে ভান্ডটি নিয়ে যাব ।"
গোপ বালক চলে গেলে দুধ খেয়ে ভান্ডটি ধুয়ে তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল কিন্তু ও এল না এবং পুরীপাদ ঘুমিয়ে গেলেন। পুরীপাদ স্বপ্নে দেখলেন গোপ বালক তাঁকে বলছেন,
'' আমি বহুবছর ধরে এই কুঞ্জের ভিতর পড়ে আছি। তুমি গ্রামের লোকজন নিয়ে এই কুঞ্জ থেকে উদ্ধার কর এবং গিরিগোবর্ধনে যত্ন করে মন্দির স্থাপন করে শীতল জল দিয়ে পরিমার্জন কর। আমি শ্রীকৃষ্ণের প্রপৌত্র ব্রজ্যনাভের স্থাপিত বিগ্রহ আমার নাম গোপাল ।"
তারপর মাধবেন্দ্র পুরীপাদ আশেপাশের গ্রামের লোকজন নিয়ে সেই কুঞ্জ খনন করে ভগবান গোপালকে উত্তোলন করে গিরিগোবর্ধনে স্থাপন করে সেবা পুজা করেন। যা অন্নকূট মহোৎসব নামে পরিচিত।
অন্নকুট শব্দের অর্থ অন্নের পর্বত। দ্বাপরের শেষের দিকে গোবর্ধন পুজা উপলক্ষে বৃন্দাবনের ব্রজবাসীরা যে অন্নকুট মহোৎসবের আয়োজন করেছিলেন, তাতে কৃষ্ণ স্বয়ং গিরিগোবর্ধন রুপ ধারন করে পর্বত-প্রমান ভোগ্যবস্তু খেয়েছিলেন। আর এই কলিয়ুগে প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর পূর্বে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুদ্ধভক্ত মাধবেন্দ্র পুরী কর্তৃক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই উৎসবে স্বয়ং গোপাল পর্বত সমান ভোগ্যসামগ্রীগুলি গ্রহন করেছিল।
বর্তমানে এই গোপাল বিগ্রহ নাথোদ্বারে শ্রীনাথজী নামে বল্লভ-সম্প্রদায়দ্বারা স্বাড়ম্বরে পুজিত হচ্ছে।
''প্রভু কহে--নিত্যানন্দ, করহ বিচার,
পুরীসম ভাগ্যবান জগতে নাহি আর।
দুগ্ধদান ছলে কৃষ্ণ যারে দেখা দিল,
তিনবারে স্বপ্নে আসি যাঁরে আজ্ঞা দিল।
যাঁর লাগি গোপীনাথ ক্ষীর কৈল চুরি,
অতএব নাম হৈল ক্ষীরচোরা করি''।।
শ্রীল মাধবেন্দ্রপুরী ব্রহ্ম-মাধ্ব-গৌড়িয় সম্প্রদায়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আচার্য। তিনি ১৪০০ খ্রিস্টাব্দে আবির্ভূত হন। মাধবেন্দ্রপুরীপাদ ছিলেন কৃষ্ণপ্রেমে উন্মত্ত ও তিনিই রাধাকৃষ্ণের যুগলমূর্তির মহিমা সবার নিকট বিভাতিচিত্তে বর্ননা করেন। তিনিই ছিলেন রাধাকৃষ্ণের ভক্তিতত্ত্ব দানকারী প্রথম সন্ন্যাসী।
তিনি হচ্ছেন শ্রীপাদ লক্ষ্ণীপিতির প্রধান শিষ্য। পরবর্ত্তীতে তিনি অনেক শিষ্য করেন।
তাদের মধ্যে
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর গুরুদেব ঈশ্বর পুরী অন্যতম,
অদ্বৈত আচার্য, শ্রীমনিত্যানন্দ প্রভু, পরমানন্দ পুরী, ব্রহ্মানন্দ পুরী, রঙ্গপুরী, পুন্ডরীক বিদ্যানিধি ও রঘুপতি উপাধ্যায় প্রমূখ বিখ্যাত ছিলেন।