18/06/2020
শায়খুল ইসলাম আল্লামা মুফতি তাকী উসমানী দাঃবাঃ এর "গীবত" বই থেকে সংগ্রহীত।
*গীবত কাকে বলে?*
গীবত অর্থ পরনিন্দা। কারো অনুপস্থিতিতে তার দোষ-ত্রুটি আলোচনা করা। হতে পারে দোষটি তার মধ্যে আছে। কিন্তু এই আলোচিত দোষটির কথা শুনলে সে নির্ঘাত মনে ব্যথা পাবে। তাহলে এটাই গীবত। হাদীস শরীফে এক সাহাবীর কথা এসেছে, যিনি নবীজী ﷺ-কে প্রশ্ন করেছিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! গীবত কাকে বলে?
নবীজি ﷺ উত্তরে বলেছিলেন, আপন ভাইয়ের আলোচনা তার পেছনে এমনভাবে করা যা তার নিকট পছন্দনীয় নয়। অর্থাৎ সে পরবর্তীতে যদি জানতে পারে তার সম্পর্কে অমুক মজলিসে এ আলোচনা হয়েছে তাহলে মনে কষ্ট পাবে। এটাই গীবত।
সাহাবী পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, আমি যে দোষ নিয়ে আলোচনা করেছি তা যদি সত্যি সত্যি আমার ভাইয়ের মাঝে থাকে?
নবীজি ﷺ উত্তর দিলেন, আসলেই যদি দোষ থাকে তাহলেই গীবত হবে। অন্যথায় তার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার হবে। (আবু দাউদ, বাবলু গীবাত ৪৮৭৪)
লক্ষ্য করুন, আমাদের আলোচনা এবং সভা-সমিতির প্রতি একটু চোখ বুলিয়ে দেখুন। কত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এই মহামারি! আমরা দিবানিশি এই জঘন্য পাপে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকি। আল্লাহ আমাদেরকে হেদায়েত করুন। অনেকে গীবতকে বৈধতার পোশাক পরাতে চায়। বলে থাকে, আমি গীবত করছি না; বরং আমি কথাটি তার মুখের উপরও বলে দিতে পারব। সুতরাং এটা তার পেছনেও বলতে পারব। জেনে রাখুন, গীবত গীবতই। মুখের উপর বলতে পারা আর না পারার বিষয় এখানে বিবেচ্য নয়। কারো দোষ-ত্রুটি তার অনুপস্থিতিতে আলোচনা করলেই তার গীবত হবে। যা একটি কবিরা গুনাহ; মহাপাপ।
*যেসব ক্ষেত্রে গীবত জায়েজ*
গীবত-এর সংজ্ঞা তো আপনাদের অজানা নয়। কারো অনুপস্থিতিতে দোষচর্চা করা। বাস্তবে দোষ থাকুক বা না থাকুক সে শুনলে মনে কষ্ট পাবে। এটাই তো গীবত-এর সংজ্ঞা। এই সুবাদে আমাদের ভালো করে বুঝতে হবে যে, ইসলাম প্রকৃতির ধর্ম। প্রতিটি জিনিসের স্বভাব বা প্রকৃতির প্রতি লক্ষ্য রেখেই ইসলাম বিধান প্রণয়ন করেছে। মানুষের স্বভাব ও চাহিদার প্রতিও ইসলাম লক্ষ রেখেছে। তদনুযায়ী বিধান প্রদান করেছে। এরই নিমিত্তে ইসলাম কয়েকটি বিষয়কে গীবতের আওতামুক্ত রেখেছে। বিষয়গুলো বাহ্যিক দৃষ্টিতে গীবত মনে হবে। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে এগুলো গীবত নয়।
*প্রকাশ্যে গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির গীবত*
এক হাদীসে আছে, যার সঠিক অর্থ অনেকে উদ্ধার করতে পারেনা। হাদীসটি হল, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
لَا غِيبَةَ لِفَاسِقِ ولا مجاهر
অর্থাৎ, ফাসিক ও প্রকাশ্যে গুনাহকারী ব্যক্তির গীবত করলে তা গীবত হিসাবে বিবেচিত হবে না। (জামেউল উসূল, খন্ড ০৮ পৃষ্ঠা ৪৫০)
হাদীসটির অর্থ অনেকে উল্টোভাবে করে। তাদের ধারণা, কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির অথবা বেদআতে অভ্যস্ত ব্যক্তির গীবত যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে করা যাবে। এতে কোন গোনাহ নেই। এটা জায়েজ। মূলত হাদীসটির অর্থ এটা নয়। বরং হাদীসটির মর্মার্থ হল, প্রকাশ্যে গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির গীবত করা যাবে। যেমন মদ্যপ। প্রকাশ্যে মদপান যার জন্য নিতান্ত মামুলী ব্যাপার। এরকম ব্যক্তির পেছনে কেউ যদি বলে, অমুক মদপান করে; তাহলে এটা গীবত হবে না। কারণ সে তো প্রকাশ্যে মদ পান করে। এর মাধ্যমে কেমন যেন সে ঘোষণা করে বেড়াচ্ছে যে, আমি মদ পান করি। সুতরাং তার অনুপস্থিতিতে কথাটি আলোচনা করলে তার মনে কষ্ট যাওয়াটা বিবেচ্য বিষয় নয়। বিধায় এটা গীবত হবে না।
*গীবত থেকে বাঁচবো কিভাবে*
গীবত থেকে বাঁচার উপায় হল, এর মারাত্মক পরিণতি ও শাস্তির কথা হৃদয়ে বসাতে হবে। প্রতিজ্ঞা করতে হবে, জীবনে কখনো গীবত করব না। অতঃপর বিনয়ের সাথে আল্লাহর দরবারে দোয়া করতে হবে, ‘হে আল্লাহ! গীবত নামক জঘন্য গুনাহাটি থেকে আমি পরিত্রান চাই। বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে গল্প করার সময় গীবত লিপ্ত হয়ে পড়ি; হে আল্লাহ! আমি শপথ করছি, ভবিষ্যতে কখনো গীবত করব না। কিন্তু আমার এই শপথ ঠিক রাখা এবং এর উপর বদ্ধপরিকর থাকা তোমার সাহায্য ও তৌফিক ছাড়া সম্ভব নয়। হে আল্লাহ! দয়া করে আমাকে গীবত থেকে বেঁচে থাকার সাহস, উৎসাহ ও তৌফিক দান করো।
আজই সাহস করে এভাবে শপথ ও দোয়া শুরু করুন।
*গীবত না করার প্রতিজ্ঞা করুন*
কোনো কাজ করার ইচ্ছা করলে তার উপর দৃঢ়সংকল্প করতে হয়। অন্যথায় কাজটি পূর্ণ করা যায় না। কারণ সকল নেক কাজের পথে শয়তান বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। সে কাজকে পেছনে নিয়ে যেতে থাকে। সাথে সাথে প্ররোচনাও দিতে থাকে যে, ঠিক আছে, কাজটি আগামী দিন থেকে শুরু করা যাবে। কথিত ‘আগামী দিন’ এলে দেখা যায় নতুন আরেকটি ওযর সামনে এসে দাঁড়ায়। কাজ আর করা সম্ভব হয়ে উঠে না। তখন মনে মনে বলে, ঠিক আছে, আগামী দিন শুরু করা যাক। এভাবে ‘আগামী দিন’ শুধু ‘আগামী দিন’ থেকে যায়। আগামী দিন আর ‘বর্তমান’ হয় না। তাই কাজ করতে হলে সাথে সাথেই করতে হবে।
জাগতিক কর্মের বেলায়ও আমরা দেখি, যার আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি– সে আয় বাড়ানোর জন্য কেমন হাড়ভাঙ্গা মেহনত করে! ঋণী ব্যক্তি ঋণ পরিশোধ করার জন্য কত কষ্ট করে! অসুস্থ ব্যক্তি আরোগ্য লাভের জন্য কতইনা প্রচেষ্টা চালায়! অথচ আমাদের কী হলো, আমরা আমাদের বদভ্যাস ত্যাগ করতে পারি না এবং এর জন্য চিন্তিতও হই না!!!
নিজের অন্তরে অনুশোচনা জাগিয়ে তুলুন। ব্যাকুল ও অনুতপ্ত হয়ে দুই রাকাত সালাতুল হাজত পড়ুন। অনুনয়-বিনয়ের সাথে আল্লাহর দরবারে দোয়া করুন যে, হে আল্লাহ! আমি মন্দ কাজ পরিহার করতে চাই, আপনি দয়া করে আমাকে মন্দ কাজ থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দিন। আমাকে দৃঢ়তা দান করুন।
এভাবে দোয়ার পর বদ্ধপরিকর হবেন এবং প্রতিজ্ঞা পালনে নিজেকে বাধ্য রাখবেন।
হযরত থানবী রহ. বলেন, তবুও যদি কাজ না হয় তাহলে নিজের উপর কিছু জরিমানা নির্দিষ্ট করে নাও। যথা, এভাবে প্রতিজ্ঞা করবে যে, কোনো সময়ে গীবত হয়ে গেলে দু’রাকাত নফল নামাজ পড়বো অথবা আল্লাহর রাস্তায় এত টাকা দান করব। এভাবে আমল করলে ইনশাআল্লাহ ধীরে ধীরে গুনাহটি থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। এর জন্য অন্তরের ব্যকুলতাও থাকতে হবে। কঠিন রোগাক্রান্ত ব্যক্তি রোগমুক্তির জন্য যেরূপ ব্যাকুল থাকে ঠিক তদ্রূপ ব্যাকুল থাকতে হবে। কারণ এ বদ স্বভাব মারাত্মক একটি ব্যাধি। শারীরিক ব্যাধির চেয়েও মারাত্মক ব্যাধি। এটি মানুষকে জাহান্নামের অতলান্ত গহ্বরে নিক্ষেপ করে ছাড়ে। তাই গুনাহটি ছাড়তেই হবে। পরিবারকেও রক্ষা করতে হবে এ জঘন্য গুনাহ থেকে।
নারীদের মধ্যে গুনাহটির প্রচলন বেশি। দু-চারজন নারী একত্র হলেই শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। এজন্য নারীরা সর্বপ্রথম প্রতিজ্ঞা নিতে হবে। তাহলে সংসার ও পরিবার গুনাহটি থেকে সহজে বাঁচতে পারবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রত্যেককে আমল করার তৌফিক দিন। আমীন।