25/05/2026
স্বামীর খাবার হজম করা কষ্ট শুধু বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ এশিয়ার কিছু দেশে। দেখবেন, চারপাশে দেনমোহর নিয়ে আলোচনা হলেই আপনাকে একটা কথা ঘুরেফিরে বোঝানো হবে, কম মোহরানায় বিয়ে করা সওয়াবের কাজ আর বেশি মোহরানা মানে আপনি লোভী। অথচ যখন সামর্থ্য ছিল, রসূলুল্লহ্ (ﷺ) নিজেই বেশি মোহরানায় বিয়ে করেছেন। উম্মে হাবিবা (রা.)-এর মোহরানা ছিল ৪০০ দিনার, অর্থাৎ তখনকার সময়ে ১.৭ কেজি স্বর্ণ। বর্তমানে এর মূল্য কোটি টাকারও বেশি। [সুনানে আবু দাউদ]
বিখ্যাত সাহাবী উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.) নিজে সাদামাটা জীবনযাপন করলেও স্ত্রীর হক্বের প্রতি তিনি ছিলেন উদার। উম্মে কুলসুমকে মোহরানা দিয়েছিলেন চল্লিশ হাজার দিরহাম, যা আজকের হিসাবে প্রায় ছয় কোটির কাছাকাছি। [তাবাকাত ইবনে সা'দ, ইমাম আয-যাহাবীর সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা]
আরও শুনতে চান?
আয়িশা বিনতে তালহা রাহিমাহাল্লাহ্ ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবীর মেয়ে। উনার দুইটি বিয়ে হয়। প্রথম বিয়েতে উনার মোহরানা ছিল এক লক্ষ দিনার অর্থাৎ প্রায় ২০০ কোটি টাকা। প্রথম স্বামী মারা যাবার পর দ্বিতীয় বিয়েতেও তাঁকে প্রায় সমপরিমাণ মোহরানা দেওয়া হয়।
তখনও কেউ কেউ বেশি দেনমোহর নিয়ে সমালোচনা করেছিল কিন্তু আয়িশা রাহিমাহুল্লাহ'র স্বামী সেসব সমালোচনায় কান দেননি। [ইমাম আয-যাহাবী, সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা: ৪/৩৬৯-৩৭০, আল্লামা ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৯/৪৮০, তাবাকাত ইবনে সা'দ: ৮/৩০১]
সাহাবী আব্দুর রহমান ইবনে আউফের (রা.) মোহরানা ছিল ত্রিশ হাজার দিরহাম, আজকের হিসাবে দেড় কোটি টাকার বেশি। এমনকি বিখ্যাত মুহাদ্দিসগণও মাহরের পাশাপাশি স্ত্রীদের বার্ষিক হাতখরচ দিতেন। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রাহিমাহুল্লাহ তার উইলে লিখে যান, "তাঁর কাছে হাতখরচের জন্যই তিনশ দিনার পাবে তাঁর স্ত্রী।" তখনকার সময়ে তিনশ দিনার দিয়ে বাড়ি কেনা যেত!
আরও অনেক আছে এমন। কিন্তু এই তথ্যগুলো নিয়ে আলোচনা হয় না। সবাই কেবল কম মোহরানার উদাহরণ টানেন। কিন্তু যখন সামর্থ্য ছিল, সাহাবায়ে কেরাম কী করেছেন সেটা দেখুন। মন বড় হলেই না সক্ষমতাও বড় হবে। গালফ কান্ট্রির পুরুষেরা বেশি বেশি মাহর দেয়, তাদের সম্পদও বেশি। মন হবে পুঁটিমাছের মতো, সম্পদও হবে পুঁটিমাছের মতোই।
আমি জানি, আমার পোস্ট তাদের গায়ে লাগবে যারা অবিবাহিত কিংবা যাদের পারিবারিক অশান্তি। কিন্তু যখন নিজেকে মেয়ের বাবা হিসেবে দেখবেন, তখন কন্যার জন্য কোন প্রস্তাবটা আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য?
১. অন্য সবদিক দিয়েই গ্রহণযোগ্য ছেলে কিন্তু দেনমোহর দিবে ৫ লাখ, তাও কয়েকবার দর কষাকষি করে।
২. সবদিক দিয়ে গ্রহণযোগ্য ছেলে, পাশাপাশি দেনমোহর দেবে দশ লাখ, খুশি হয়ে।
নিজেই ভেবে দেখুন, কোন ঘরে মেয়ে দিবেন। দেনমোহর এতটাই বড় ব্যাপার যে, একজন নিঃস্ব ফকির মানুষও যদি বিয়ে করতে চায়, তাকেও অন্তত কুরআনের আয়াত দিয়ে হলেও মাহর পরিশোধ করতেই হবে, মাফ নেই।
উমার (রা.) খলিফা থাকাকালীন একবার মোহরানা সীমিত রাখার প্রস্তাব দিলেন। একজন নারী উঠে দাঁড়িয়ে সূরা নিসার আয়াত তিলাওয়াত করে বললেন, এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার খলিফার নেই। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজের ভুল বুঝতে পেরে সেদিন সবার সামনেই বলেছিলেন, "নারীটি সঠিক বলেছে, উমার ভুল বলেছে।" [ইমাম কুরতুবি, আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন: ৫/৯৫]
এরপর আর কোনো আইন হয়নি।
অথচ এই কথাগুলো এখনকার পুরুষেরা শুনলে আতঙ্কে আপনাকে গালিগালাজ করবে আর কম মোহরানার কাল্পনিক সওয়াবের ঘোষণা দেবে। কারণ দুনিয়া এখন মেয়েলি বৈশিষ্ট্যওয়ালা পুরুষে ভরে গেছে, যারা উপার্জন করতে চায়না, পরিশ্রম করতে চায়না, স্ত্রীর জন্য খরচ করাও যে সওয়াব, এটা শুনতে চায়না৷ এরা শুধু ফাতওয়া দিবে, স্বামীর জন্য স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যয়ভার দেওয়া ফরজ নয়৷ ওয়েল, মেয়েরা যখন পর্যাপ্ত মাহর পাবে, তখন সেটা দিয়ে নিজেই নিজের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে পারবে।
তাছাড়া বেশি দেনমোহর নিলে সওয়াব কামানো যায়না, কে বলল?
মধ্যযুগে নারীরা তাঁদের মোহরানার টাকা দিয়ে মসজিদ বানিয়েছেন, মাদ্রাসা বানিয়েছেন, এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেছেন। সম্পদ থাকলে মানুষ এসব করতে পারে।
তাই মেয়েদের বলি, দেনমোহর কমিয়ে আনার সংস্কৃতি আসলে নিজেদের ভ্যালু কমানোর সংস্কৃতি। কুফু অনুযায়ী মাহর নির্ধারণ করুন। আপনি একজন পুরুষের বংশ বহন করবেন নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে, এর মূল্য শুধু টাকায় কেনাও অসম্ভব। এরপরেও যে প্রস্তাব মোহরানা নিয়ে দর কষাকষি করবে, সরাসরি নাকচ করুন। যার সামর্থ্য নেই আপনার মাহর দেওয়ার, তার জন্য অন্য ঘর আছে।
শুনতে খারাপ লাগলেও, বাস্তবতা হলো দেনমোহর কম নিলে এখন অনেক পুরুষ আপনাকে সহজলভ্য ভাববে। সবাই সহজলভ্যের মূল্য দিতে জানেনা। দেনমোহর কমাতে কমাতেই তো বিধর্মী কালচার যৌতুক চালু করে ফেলছেন সমাজে। আর কত? সম্পদের বিনিময়েও রব্বকে সন্তুষ্ট করা যায়। সম্পদ থাকলে প্রতি ঈদে বাবা-মা, ভাইবোনকে উপহার দিতে না পারার আফসোস করতে হবেনা।
বিয়েতে বাজে অনুষ্ঠান, অতিরিক্ত খরচের বিরোধী আমিও। কিন্তু দেনমোহর সেই ক্যাটাগরিতে পড়ে না। এটা আপনার রব্বের দেওয়া উপহার, আপনার অভিভাবকের দেওয়া হক্ব। সম্পদকে ছোট করে দেখবেন না।
সম্পদের আকাঙ্ক্ষা মানে লোভ নয়, লোভ হলো সম্পদ আঁকড়ে থাকা। মানুষ হতে হবে এমন, হাতভর্তি সম্পদ থাকবে কিন্তু প্রয়োজনে সব ছাড়তেও দ্বিধা করবে না।
১০. ০৫. ২০২৬
কলমে : Sheikh Zannat Mim