17/05/2026
এক শীতের রাতে আমীরুল মুমিনীন হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) মদীনার উপকণ্ঠে টহল দিচ্ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন হযরত আসলাম (রা.)।
হঠাৎ দূরে আগুনের আলো দেখে হযরত ওমর (রা.) বললেন,
“আসলাম! মনে হচ্ছে কোনো মুসাফির বা অসহায় পরিবার শীতের রাতে আটকে পড়েছে। চলো, দেখে আসি।”
হযরত আসলাম (রা.) বর্ণনা করেন,
আমরা কাছে গিয়ে দেখলাম, এক নারী চুলার পাশে বসে আছেন। তাঁর ছোট ছোট শিশুরা ক্ষুধায় কাঁদছে।
হযরত ওমর (রা.) সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“আপনাদের কী হয়েছে?”
নারীটি বললেন,
“শীত আর রাত আমাদের এখানে আটকে দিয়েছে।”
তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন,
“শিশুরা কাঁদছে কেন?”
নারীটি ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বললেন,
“ক্ষুধায়।”
হযরত ওমর (রা.) ডেকচির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“এর ভেতরে কী রান্না হচ্ছে?”
নারীটি বললেন,
“এখানে শুধু পানি আর কিছু পাথর আছে। আমি শুধু বাচ্চাদের সান্ত্বনা দিচ্ছি, যেন তারা ভাবে খাবার রান্না হচ্ছে, আর অপেক্ষা করতে করতে যেন ঘুমিয়ে পড়ে। আমাদের আর ওমরের মধ্যে আল্লাহ বিচার করবেন!”
এ কথা শুনে হযরত ওমর (রা.) কেঁপে উঠলেন।
তিনি বললেন,
“আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন! ওমর তোমাদের এই অবস্থা জানবে কীভাবে?”
নারীটি কিছুটা ক্ষোভ নিয়ে বললেন,
“তিনি যদি আমাদের শাসক হন, তাহলে আমাদের খবর রাখবেন না কেন?”
এই কথা শুনে হযরত ওমর (রা.) আর এক মুহূর্ত দেরি করলেন না। দ্রুত বায়তুল মালের দিকে গেলেন। সেখান থেকে একটি আটার বস্তা ও একটি ঘি-এর পাত্র নিয়ে এলেন।
তিনি হযরত আসলাম (রা.)-কে বললেন,
“এটা আমার কাঁধে তুলে দাও।”
হযরত আসলাম (রা.) বললেন,
“আমীরুল মুমিনীন! আমি বহন করছি।”
হযরত ওমর (রা.) বললেন,
“আসলাম! কিয়ামতের দিন তুমি কি আমার গুনাহের বোঝা বহন করবে? তাহলে এই বোঝাও তুমি বহন করতে পারবে না। এটা আমার কাঁধেই দাও।”
এরপর তিনি নিজেই কাঁধে আটা বহন করে সেই তাঁবুতে ফিরে এলেন।
তিনি নিজ হাতে চুলা জ্বালালেন। আগুনে ফুঁ দিতে দিতে তাঁর ঘন দাড়ির ফাঁক দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছিল। তিনি নিজ হাতে আটা মেখে খাবার তৈরি করলেন এবং শিশুদের পেট ভরে খাওয়ালেন।
শিশুরা ধীরে ধীরে কান্না থামিয়ে হাসতে শুরু করল।
এ দৃশ্য দেখে সেই নারী আবেগে বললেন,
“আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন! আপনিই তো খলিফা হওয়ার বেশি যোগ্য!”
নারীটি তখনো বুঝতে পারেননি, এ ব্যক্তিই আসলে খলিফা ওমর (রা.)।
হযরত ওমর (রা.) মুচকি হেসে বললেন,
“ইনশাআল্লাহ, আপনি যখন আমীরুল মুমিনীনের কাছে যাবেন, আমাকে সেখানেই পাবেন।”
এরপরও হযরত ওমর (রা.) সঙ্গে সঙ্গে ফিরে গেলেন না। তিনি একটু দূরে গিয়ে মাটিতে বসে শিশুদের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
হযরত আসলাম (রা.) বললেন,
“আমীরুল মুমিনীন! চলুন, এখন ফিরে যাই।”
কিন্তু তিনি নীরব থাকলেন।
কিছুক্ষণ পর যখন তিনি দেখলেন, যে শিশুরা ক্ষুধায় কাঁদছিল, তারা এখন তৃপ্ত মনে খেলছে, হাসছে, তারপর শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে, তখন তাঁর মুখে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল।
ওমর (রা.) বললেন,
“হে আসলাম! ক্ষুধাই তাদের কাঁদাচ্ছিল। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যতক্ষণ না আমি তাদের হাসতে দেখি এবং শান্তিতে ঘুমাতে দেখি, ততক্ষণ এখান থেকে যাব না।”
একজন প্রকৃত নেতার সবচেয়ে বড় গুণ হলো জনগণের প্রতি দায়িত্ববোধ। হযরত ওমর (রা.) ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও সাধারণ মানুষের কষ্টের জন্য নিজেকে আল্লাহর দরবারে অপরাধী মনে করেছেন।
নিজের পরিচয় গোপন রেখে, কোনো সস্তা প্রচারণার আশা না করে, খলিফা নিজ কাঁধে আটার বস্তা বহন করেছেন এবং নিজ হাতে রান্না করে ক্ষুধার্ত শিশুদের খাইয়েছেন।
সাধারণ এক নারীর তীব্র সমালোচনা শুনে তিনি ক্ষুব্ধ হননি, বরং নিজের ভুল বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ তা সংশোধনের ব্যবস্থা করেছেন।
রদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু
সূত্র: তারিখ আত তাবারি