19/08/2026
▪️আজ ৩রা রবিউল আউয়াল;
ইমামুত ত্বরীকত খাজায়ে খাজেগান নক্বশা-এ নক্বশবন্দ, সাইয়্যেদ খাজা বাহাউদ্দিন নক্বশেবন্দ বুখারী (রাদ্বি.) এঁর ওফাত বার্ষিকী।
|| ❝ মুহররমের মেহমান খাজা বাহাউদ্দীন আসিলেন কারবালার কুরবানী বুকে লইয়া। তাঁহারই পূর্ব পুরুষগণের খুনে রঞ্জিত হইয়াছিলো কারবালার মরু প্রান্তর; ফোরাতের তীর। খাজা বাহাউদ্দীনের বুকেও সেই কুরবানীর বাণী। কি করিয়া কলিজার খুন দিয়া প্রেমের প্রান্তর প্লাবিত করিয়া দেওয়া যায়, তাহাই শিখাইবার জন্য তিনি আসিলেন বোখারার জমিনে❞ ||
তিনি বুখারার সন্নিকটে কাসরে আরেফান নামক স্থানে (বর্তমানে উজবেকিস্তান) ১৪ মুহররম ৭১৮ হিজরী দুনিয়ার জমিনে তাশরীফ এনেছিলেন।
বুখারাতে ফুটেছিলো নূর কাননের ফুল,
সেই ফুলেরই পাপড়ি মোরা নকশেবন্দী কুল।
বাগে নববীর সেই শুভ্র গোলাপ রইলো বুখারায়,
জগতময় তাঁর নির্মল সৌরভ আজও মন মাতায়।
❝.. বুখারার বাগানে যে কলি ফুটেছিলো। তাঁর সৌরভ ছড়িয়ে গেছে আজ দিক দিগন্তে। কে আছো আশেক অন্তরের অঙ্গন সুবাসিত করতে চাও, সেই মধুর সৌরভে। সেই ফুলের নাম নকশবন্দ। বুখারায় ফুটেছিলো; বুখারায় ঝরে গেছে। কিন্তু সৌরভ আজও অম্লান। আজও আশেকের অন্তর সেই সুরভিতে আমোদিত হয়। ইশকের যন্ত্রনায় জ্বলে, দগ্ধীভূত হয়। বুখারা যেয়ারতের জন্য পাগল হয়❞
ভারতবর্ষে এই তরীকার প্রচারক হযরত খাজ বাকী বিল্লাহ (রহ:)। উনার মাজার মুবারক দিল্লিতে অবস্থিত। উনার পর এই তরিকার প্রচারক হলেন ইমামে রাব্বানী, গাউসে সামদানী শেখ আহমদ ফারুকী সেরহিন্দী মুজাদ্দেদ আলফে সানী (রহ:)। মুজাদ্দেদ আলফে সানী'র নামানুসারে এই তরীকার নাম হয় নকশেবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া।
নকশবন্দীয়া তরিকায় আটটি বিশেষ তাসাউফি পরিভাষা রয়েছে। যেগুলোকে এ তরিকার ভিত্তি মনে করা হয়। পরিভাষাগুলো হলো:
1. হুশ দার দিখ- মনের বিক্ষিপ্ততা প্রতিরোধে নিঃশ্বাস সংযম।
2. নজর বর্ কদম- দৃষ্টির বিক্ষিপ্ততা প্রতিরোধে দৃষ্টি সংযম বা সর্বদা সম্মুখে দৃষ্টিপাত।
3. সফর দর্ ওয়াতান- মুকিম হয়েও মুসাফির বা নিজের সত্ত্বার মধ্যে ভ্রমণ।
4. খালওয়াত দর্ আনজুমান- সংসারে থেকেও তার প্রতি নির্লিপ্ত বা জনতার মধ্যেও নির্জনতা।
5. ইয়াদ কর্দ- সকল অবস্থায় আল্লাহর স্মরণ-জিকিরে আত্মনিয়োগ।
6. বাস্ গাশ্ত- প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর চিন্তায় নিমগ্ন থাকার প্রক্রিয়া সন্ধান।
7. নিগাহ্ দাশ্ত- সার্বক্ষণিক আত্মরক্ষার চেষ্টায় অতন্দ্র থাকা।
8. ইয়াদ দাশ্ত বা হুশ হরদম- সার্বক্ষণিক আল্লাহর চিন্তায় নিমজ্জিত থাকা বা সর্বদা জিকিরের “স্বরণ” প্রতি খেয়াল।
খাজা বাহাউদ্দীন উপর্যুক্ত বিষয়গুলোর সঙ্গে আরও তিনটি বিষয় সংযোজন করেন। সেগুলো হলো:
1. ওয়াকূফ-ই-জামানি- নিজের সময় ও গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ।
2. ওয়াকূফ-ই-কালবি- হৃদয় নিয়ন্ত্রণ এবং
3. ওয়াকূফ-ই-‘আদাদি- জিকির বেজোড় সংখ্যায় সম্পন্নকরণ।
হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নক্বশেবন্দ বুখারী (রা.) প্রায়ই বলতেন,
❝যখন আমার বিদায়ের সময় আসিবে, তখন কিভাবে মৃত্যুকে বরণ করিতে হয়, তাহা আমি সকলকে শিখাইয়া দিবো❞
অবশেষে সেই মুহূর্ত উপস্থিত হলো। মিলন লগ্নের আর বেশী দেরী নাই। আর এক মুহূর্তের দেরীও যে সহ্য হয় না।
হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নক্বশেবন্দী বুখারী (রা.) তাঁর দুই হাত উপরে উঠালেন। রহমানুর রাহীমের দরবারে অনন্ত প্রেমের আকর্ষণে মশগুল হৃদয় পূর্ণরূপে রুজু করলেন। দীর্ঘক্ষণ নীরবে দোয়া করলেন। আশেক মাশুকে আলাপন হলো। কতো কথা হলো। কি কথা হলো, কে জানে!
হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নক্বশেবন্দী বুখারী (রা.) দোয়া শেষ করলেন। দুই হাত নিজের মোবারক চেহারার উপরে মুছলেন। তারপরই আল্লাহ তায়ালার হুজুরে নিজেকে সমর্পণ করলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তিনি রফীকে আ'লার পাক দরবারে গমন করলেন।
চারিদিকে শোকের মাতম। আসমানের চারিদিকে মাতমের সুর। নিসর্গের অন্তর বেদনাহত। বাতাসে বিদায়ের মর্মবিদারক রাগিনী। বুখারার বাগান, বুখারার বাজার, বুখারার বাসিন্দা সকলেই কেমন নির্বাক ও ম্লান। বিদায় ব্যথায় হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। পবিত্র প্রেম সুবাসিত এই পুষ্প হযরত খাজা বাহাউদ্দিন নক্বশেবন্দী বুখারী (রা.) আজ বিদায় গ্রহণ করলেন। বুখারার আকাশে বাতাসে তাই বিষণ্ন বিষাদের গুঞ্জরণ। আর শোকার্ত মানুষের হৃদয় আপ্লুত শেষ শ্রদ্ধা, শেষ সালাম দুই চোখের অশ্র ধারায়।
বিদায়, হে পবিত্র আশেক, বিদায়। হে নক্বশবন্দ- হে নকশাকার, বিদায়।
এই মহান আকাবীরে আউলিয়া ৭৯১ হিজরি সালের ৩রা রবিউল আউয়াল ৭৩ বছর বয়সে কাসরে আরেফানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। খান আবদুল আজিজ তাঁর কবরের উপরে একটি সমাধি এবং আশেপাশের ইমারত নির্মাণ করেছিলেন। বুখারা থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে একটি মেমোরিয়াল কমপ্লেক্স রয়েছে এবং বর্তমানে তাসাউফ পন্থীদের জন্য এটি তীর্থ স্থান বা যিয়ারতগাহ হিসেবে পরিণত হয়েছে।
হযরত ইন্তেকালের পূর্বে অসিয়ত করে গিয়াছিলেন, ‘আমার জানাজা লইয়া যাইবার সময় তোমরা এই রুবায়ী পড়িও।
মাকাসাতীম আমর-হ দর কুয়ে তু
শায়আল্লাহ আয্জিমালে কুদিয়ে’-তু ;
দাস্ত বাক্শা জানিব যানবীলে মা
আফরী কর দাস্ত ও বিরুয়ে তু;
|| আমলের দিক হতে দরিদ্রের বেশে,
তোমার দুয়ারে আজ দাঁড়ালাম এসে।
দয়া কর, জাহের কর দীদারে জামাল,
তোমারই অনুকম্পা যাচে মিসকিনের হাল।
শতমূখী প্রশংসা প্রভু, কি যে রহমত তোমার।
কি খুবসুরত, কি মধুর তোমার দীদার ||
মওলায়ে কারীম জান্নাতে উনার মাক্বাম বুলন্দ করুন এবং তাঁর রুহানী ফয়ুজাত আমাকে নসীব করুন। আল্লাহুম্মা আমিন।