24/05/2026
দ্বিতীয়ত, কাফিরদের মতো নামকরণ করবেন না-এটা হারাম। কাফিরদের নামে কোনো মুসলিমকে ডাকা নিষিদ্ধ। জর্জ টাইপ আরও যত নাম আছে কাফিদের এগুলো ব্যবহার করা যাবে না। কেননা এটা কাফিরদের সাদৃশ্য অবলম্বনের নামান্তর। আর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
من تشبه بقوم فهو منهم
"যে কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করল, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত।"[৩৮]
মুসলিম হিসেবে আমাদের জন্য জরুরি আমরা কাফিরদের অন্তর থেকে ঘৃণা করব। তাদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করব। যতই ভালো লাগুক এবং যতই কাছের মানুষ হোক-আমাদের শত্রু জ্ঞান করব। তারা আল্লাহর শত্রু, ফেরেশতাদের শত্রু, নবিদের শত্রু এবং নেককার ব্যক্তিদের শত্রু-যতই হৃদ্যতার পোশাক পরুক আর নিজেদের আন্তরিকরূপে পেশ করুক। আল্লাহর কসম করে বলছি, তারা শত্রু। তাই আমাদের জন্য তাদের প্রতি শত্রুতা রাখা অপরিহার্য। দুজন কাফির ব্যক্তির মাঝে একজনের দুনিয়া জুড়ে খ্যাতি রয়েছে, সব জায়গায় সে অনেক দাম পায়, আরেকজনের কোনো খ্যাতি নেই, কেউ মূল্যায়ন করে না-শত্রুতার বিধানে উভয়ের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। আল-ওয়ালা ওয়াল-বারার [৩৯] নীতি সকল কাফিরের ক্ষেত্রে অভিন্ন, এমনকি তারা খাদেম হলেও।
আমরা মোটেও পছন্দ করব না মুসলিমদের ছেড়ে আমাদের দেশের বিভিন্ন খাতে তাদের নিয়োগ দেব। কেননা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
أخرجوا اليهود والنصارى من جزيرة العرب
"জাজিরাতুল আরব থেকে ইহুদি এবং নাসারাদের বের করে দাও।"
আরেকটি হাদিসে আরও জোর দিয়ে বলেছেন,
الأخرجن اليهود والنصارى من جزيرة العرب حتى لا أدع إلا مسلما
"আমি অবশ্যই আরব থেকে ইহুদি এবং নাসারাদের তাড়িয়ে দেব। মুসলিম ছাড়া কাউকে রাখব না।"
এমনকি জীবনের অন্তিম লগ্নে, মৃত্যুশয্যায় শায়িত অবস্থায় তিনি উম্মাহকে নসিহত করে গেছেন,
أخرجوا المشركين من جزيرة العرب
"জাজিরাতুল আরব থেকে মুশরিকদের তাড়িয়ে দেবে।"
অথচ আজকের যুগে কিছু মানুষ-আল্লাহর পানাহ চাই-কর্মচারী নিয়োগদানের বেলায় মুসলিমদের তুলনায় কাফিরদের বেশি প্রাধান্য দেয়। কাফিরদের নিয়োগদান করে। মূলত তাদের অন্তরগুলো গোমরাহিতে নিমজ্জিত, হকের প্রতি ভ্রূক্ষেপ নেই। নয়তো তারা কীভাবে কাফিরদের প্রাধান্য দিচ্ছে? সত্যি বলতে শয়তান তাদের আমলগুলো তাদের সামনে সুশোভিত করে উপস্থাপন করে রেখেছে। তারা বলে, 'মুসলিম ব্যক্তির চাইতে অমুসলিম ব্যক্তি কাজে অধিক নিষ্ঠাবান।' এটা মিথ্যা বৈ কিছু নয়। পাপ তো বটেই, সাথে সুস্পষ্ট মিথ্যাচার। আল্লাহর নিকট এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি হতে আশ্রয় চাই।
তারা বলে, 'অমুসলিমরা সালাত পড়ে না। উল্টো সালাতের সময় তারা কাজে ব্যস্ত থাকে। হজ্জ উমরার জন্যও ছুটি চায় না, সিয়াম রাখতে হয় না, সর্বক্ষণ কাজ করে।' এই লোকদের কাছে দ্বীনের এই বিষয়গুলো যেন কোনো বিষয়ই না! অথচ আসমান জমিনের স্রষ্টা আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
ولعبد مؤمن خير من مشرك ولو أعجبكم أوليك يَدْعُونَ إلى النار ، والله يَدْعُو إلى الجنَّةِ والمَغْفِرَة باديه
"আর একজন মুমিন দাস একজন মুশরিক পুরুষের চেয়ে উত্তম, যদিও সে তোমাদের মুগ্ধ করে। তারা তোমাদের আগুনের দিকে আহবান করে, আর আল্লাহ তাঁর অনুমতিতে তোমাদের জান্নাত ও ক্ষমার দিকে আহবান করেন।" (সূরাহ বাকারাহ, ২: ২২১)
কাজেই ভাইয়েরা আমার, তোমরা যারা আমাদের এই কথাগুলো শুনছো বা পড়ছো, আমাদের ভাইদের উপদেশ দাও। তাদের নসিহত করো। কেননা শয়তান তাদের বিপথে নিয়ে গেছে। কাফিররা কাজের নাম করে আমাদের দেশে যা কিছু নিয়ে আসছে, শয়তান তাদের সেই কাজগুলো সুশোভিত করে তুলেছে আমাদের ভাইদের মনে। ভাল করে জেনে রাখো, এভাবে তাদের সুযোগ করে দেয়া মানে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফিরদের সাহায্য করা। কেননা কাফিররা তাদের দেশের সরকারকে কর প্রদান করে। আর এই করকে কাজে লাগিয়ে তাদের সরকার মুসলিমদের দেহেই ছুরি চালায়। এর বহু সাক্ষ্য-প্রামণ রয়েছে। সুতরাং আমাদের নৈতিক দায়িত্ব আমরা কাফিরদের থেকে যথাসম্ভব দূরত্ব বজায় রাখব, যাতে আমাদের নামগুলো তাদের নামের সাথে আসমানের খাতায় উঠে না যায়। আমরা তাদের নামানুসারে নাম রাখব না, তাদের ভালোবাসবো না, সম্মান করব না এবং সালামও দেব না, এমনকি রাস্তায় জায়গা দেব না। [৪০]
কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لا تبدؤوا اليهود ولا النصارى بالسلام، فإذا لقيتم أحدهم في طريق فاضطروهم إلى أضيقه
"ইহুদি নাসারাদের সালাম দেবে না। চলার পথে তাদের কারও সাথে সাক্ষাৎ হলে তাদের জন্য রাস্তা সংকুচিত করে দেবে। "[৪১]
এক রাতে নবিজির ঘুম ভেঙে গেল হঠাৎ। চেহারা জুড়ে দুশ্চিন্তার ছাপ দেখা যাচ্ছে। তিনি বললেন,
لا إله إلا الله، ويل للعرب من شر قد اقترب
"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ! আরবদের জন্য দুর্ভোগ! বিপদ নিকটে চলে এসেছে।"
অর্থাৎ তিনি সাবধান করছেন, সতর্ক করছেন। 'আরবদের জন্য দুর্ভোগ', যারা ইসলামের পতকা বহন করছে। কারণ, বিপদ দ্বারসীমানায় চলে এসেছে। তারপর বললেন,
فتح اليوم من ردم يأجوج ومأجوج مثل هذه وحلق بأصبعه الإتهام والتي تليها، قالت زينب: يا رسول الله، أنهلك وفينا الصالحون؟ قال نعم إذا كثر الخبث
""আজ ইয়াজুজ মাজুজদের প্রাচীরের একটি ছিদ্র খুলে গেছে'-এরপর তিনি দুই আঙ্গুল গোল করে দেখালেন। যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা জানতে চাইলেন, 'আল্লাহর রাসূল, আমাদের মাঝে নেককার লোকেরা থাকা সত্ত্বেও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাব?' নবিজি উত্তরে বললেন, 'হ্যাঁ, যখন খারাপের সংখ্যা বেড়ে যাবে।"[৪২]
এখানে খারাপ বলতে খারাপ কাজ এবং খারাপ লোক বেড়ে যাবার কথা বোঝানো হয়েছে। আমাদের কাজে-কর্মে মন্দের পরিমাণ বেড়ে গেলে ধ্বংস অনির্বায। এভাবে দেশ জুড়ে যদি খারাপ লোকের জয় জয়কার শুরু হয়-দেশ ধ্বংস হতে খুব বেশি সময় লাগবে না। বাস্তবে এর বহু নজির রয়েছে। আল্লাহর নিকট দুআ করি, আমাদের শত্রুদের অনিষ্ট হতে আল্লাহ যেন আমাদের দেশকে রক্ষা করেন। প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সব ধরনের শত্রুদের কবল থেকে রক্ষা করেন। সেই সাথে দুআ করি, মুনাফিক এবং কাফিরদের অন্তরে আল্লাহ তাআলা ত্রাস সৃষ্টি করে দিক, তাদের চক্রান্ত দ্বারা তাদেরই কণ্ঠনালী আঁটকে দিক। নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত উদার এবং বদান্যতায় অতুলনীয়।
----------
[৩৮] আবু দাউদ (৪০৩১), মান: হাসান সহিহ, আলবানি
[৩৯] আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা: আল্লাহর জন্য ভালোবাসা, আল্লাহর জন্য ঘৃণা করা। ইসলামি আকিদার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই লেখক এখানে জোরালো ভাষা প্রয়োগ করেছেন। এর অর্থ এই নয়, তাদের সাথে মুআমালাত নিষিদ্ধ কিংবা সর্বক্ষণ তাদের সাথে খারাপ আচরণ করবেন। বরং এখানে 'দৃষ্টিভঙ্গি' উদ্দেশ্য। তাদের ব্যাপারে আমাদের কিরূপ আকিদা থাকা উচিত, এখানে এটাই বোঝানো হয়েছে। আর দাওয়াতি কাজের ক্ষেত্রে উত্তম আখলাকের গুরুত্ব বলার অপেক্ষা রাখে না। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন, 'আকীদাহ আত-তাওহীদ (শায়খ সালেহ আল-ফাওযান), ইসলামি জীবনব্যবস্থা (মুফতি তারেকুজ্জামান)'-অনুবাদক।
[৪০] শায়খ আল-উসাইমীন (রহ.) তাঁর মাজম্ আল-ফাতাওয়া (৩/৩৮) গ্রন্থে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, 'এর অর্থ তাদের সাথে সাক্ষাৎ হলে তুমি হাঁটতে থাকবে, তাদের বেশি জায়গা দিতে সরে যাবে না। এর অর্থ এই নয়, তুমি তাদের সাথে চিৎকার চেঁচামেচি করবে, কিংবা দেয়াল ঘেঁষে হাঁটতে বাধ্য করবে। কারণ, মদিনায় থাকাবস্থায় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরূপ করেন নি, তাঁর কোনো সাহাবিও এমন করেন নি।'
[৪১] সহিহ মুসলিম (২১৬৭)
-----------
বই: স্টোরিজ ফ্রম রিয়াদুস সালেহীন
মূল: শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু সালেহ আল-উসাইমীন এর (বক্তৃতা সংকলন)
অনুবাদ: মহিউদ্দিন রূপম
প্রকাশক: সিরাত পাবলিকেশন