25/08/2026
গাজায় ইসরায়েলের প্রযুক্তি সন্ত্রাস: মানুষের বিবেক যখন রোবটের 'রাবার স্ট্যাম্প'
-------------
অবরুদ্ধ গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক অভিযানে নতুন মাত্রা যোগ করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্ভর যুদ্ধপ্রযুক্তি।
ইসরায়েলের অস্ত্রাগারে এখন এমন সব অত্যাধুনিক ও আত্মঘাতী মারণাস্ত্র যুক্ত হয়েছে, যেখানে মানবিক বিবোনা-বোধের কোনো স্থান নেই। রক্ত-মাংসের মানুষের বদলে এখন জীবন-মরণের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ২০২৩ সাল থেকে গাজার বেসামরিক মানুষের ওপর ইসরায়েলি গণহত্যায় এই এআই-চালিত প্রযুক্তির নির্বিচার ব্যবহার করা হচ্ছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ফিলিস্তিনিদের দমনে ব্যবহৃত এই এআই প্রযুক্তির পরিধি ও সক্ষমতা দিন দিন আরও হিংস্র হয়ে টাছে। রক্তে রঞ্জিত এই প্রযুক্তির কিছু মারণাস্ত্র তৈরি করেছে খোদ ইসরায়েলি ডিফেন্স ট্রেক কোম্পানিগুলো। আর বাকি অস্ত্রের বড় অংশের জোগান দিয়ে এই গণহত্যায় সরাসরি মদদ দিচ্ছে তাদের পরম মিত্র মার্কিন
কৃত্রিম বুদ্ধিমায়ার এই সমানাধিক ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে ২০২৩
সালেই দস্তোক্তি করেছিলেন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর তৎকালীন চিফ অব স্টাফ আভিত কোহাড়ি। গাজায় নজরদারি ও আক্রমণের তীব্রতা বাড়াতে তিনি গর্ব করে বলেছিলেন, এই এআই ব্যবস্থা তাদের সামরিক বাহিনীকে এমন এক প্রযুক্তি দিয়েছে, যা চোখের পলকে ফিলিস্তিনিদের ওপর নিখুঁত হামলার জন্য তৈরি করেছে
'সুপার ইন্টেলিজেলা গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক।
মোশে দায়ান সেন্টার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল আস্তানা ফিলিস্তিনিদের ওপর দখললীর ইসরায়েলি বাহিনীর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই নির্মম ও যান্ত্রিক প্রয়োগ কিন্তু হঠাৎ শুরু হয়নি। এর বিষবৃক্ষ রোপণ করা হয়েছিল ২০১১ সালেই। ফিলিস্তিনিদের ফোনালাপে আড়ি পাতা, সাইবার যুদ্ধ এবং কোড ভাঙায় কুখ্যাত ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বিশেষ 'ইউনিট ৮২০০১ (Unit ৮২০০)। এই ইউনিটের অধীনেই গড়ে তোলা হয় ডেটা সায়েন্স অ্যান্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিষয়ক 'মোশে দায়ান সেন্টার'। শত শত ইসরায়েলি সেনা ও কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত এই কেন্দ্রের মূল লক্ষ্যই ছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চসংখ্যক ফিলিস্তিনি কে টার্গেট করে হত্যাযজ্ঞ চালানো।
এই 'মোশে দায়ান সেন্টার' থেকে উৎপাদিত প্রথম ঘাতক প্রোগ্রামটির নাম ছিল 'ফায়ার ফ্যাক্টরি' (Fire Factory)। এই -কাজ হলো আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করা এবং সেই টার্গেট গুঁড়িয়ে দিতে ঠিক কতটুকু বিস্ফোরক ও গোলাবারুদ লাগবে, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাব করা।
মার্কিন সাময়িকী 'দ্য নেশন'-এর ২০২৪ সালের ১২ এপ্রিলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলের এই কুখ্যাত ইউনিটোটি মার্কিন টেক কোম্পানিগুলোর সাথে অত্যন্ত গোপনে ও নিবিড়ভাবে কাজ করছে, যারা তাদের বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক এআই সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার সরবরাহ করে আসছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ঘাতক সফটওয়্যার ও ডিভাইসগুলো মূলত ফিলিস্তিনিদের ব্যক্তিগত জীবনের গোপন তথ্যের এক বিশাল ভাণ্ডারের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। আর এই ডেটার বড় একটা অংশ আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (NSA) থেকে। অর্থাৎ, ফিলিস্তিনিদের ওপর ড্রোন হামলা বা বোমাবর্ষণের লক্ষ্যবস্তু ঠিক করতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাই ইসরায়েলকে সরাসরি সাহায্য করছে।
বিশ্বজুড়ে এই প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে নেদারল্যান্ডসের হেগে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ৬০টিরও বেশি দেশের উপস্থিতিতে সেই সম্মেলনে 'রণাঙ্গনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহার' শীর্ষক একটি চুক্তি প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু চরম উদাসীনতা ও আগ্রাসী মনোভাব দেখিয়ে দখলদার ইসরায়েল সেই মানবিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানায়। এর থেকে বোঝা যায়, যা প্রমাণ করে ফিলিস্তিনিদের দমনে যেকোনো অমানবিক প্রযুক্তি ব্যবহারে তারা কতটা মরিয়া।
যন্ত্র যখন জল্লাদ:
অবরুদ্ধ গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো এই নৃশংসতায় দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বহুমুখী ও সুপরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করছে। তাদের এই আগ্রাসী এআই প্রযুক্তির মূল ক্ষেত্রগুলো হলো:
আগ্রাসী পূর্বাভাস: ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সম্ভাব্য গতিবিধি আগে থেকেই অনুমান করা।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নজরদারি: ফিলিস্তিনিদের যেকোনো প্রতিরোধ বা সামরিক প্রস্তুতি আগেভাগেই চিহ্নিত করা।
স্বয়ংক্রিয় লক্ষ্যবস্তু ও অস্ত্র নির্ধারণ: গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘরকে লক্ষ্যবস্তু বানানো এবং তা ধ্বংস করতে কোন অস্ত্র ব্যবহার করা হবে, তা রোবট দিয়ে নির্ধারণ করা।
গাজা উপত্যকার বেসামরিক মানুষকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে দখলদার ইসরায়েল যেসব ভয়াবহ এআই সিস্টেম ব্যবহার করেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ও অমানবিক ব্যবস্থাগুলো হলো:
'ল্যাভেন্ডার': এক যান্ত্রিক জল্লাদ:
ইসরায়েলি সামরিক যন্ত্রপাতির মধ্যে সবচেয়ে নৃশংস হলো এই 'ল্যাভেন্ডার' (Laven-der) সিস্টেম। এটি মূলত এমন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দানব, যা চোখের পলকে লাখ লাখ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যার 'সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু' হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে পারে।
ইসরায়েলি সাময়িকী '+৯৭২'-এর এক প্রতিবেদনে দেশটির কুখ্যাত 'ইউনিট ৮২০০'-এর প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়োসি - শ্যারিয়েলকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, 'নতুন = লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং তা চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে - এই সিস্টেমটি সরাসরি মানুষের বিকল্প হিসেবে - কাজ করছে।' দখলদার বাহিনীর দাবি, এই - ঘাতক প্রোগ্রামটির নিখুঁতের হার প্রায় ৯০ = শতাংশ! আর এই অজুহাতে তারা ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্বিচারে বোমাবর্ষণের জন্য এই রোবটের সাজেশন অন্ধভাবে গ্রহণ করেছে।
গাজা যুদ্ধে সরাসরি এই ল্যাভেন্ডার সিস্টেম পরিচালনায় যুক্ত থাকা ইসরায়েলের ৬ জন গোয়েন্দা কর্মকর্তার বরাতে ম্যাগাজিনটি আরও জানায়, 'গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর ইতিহাসের নজিরবিহীন ও বর্বরতম বোমাবর্ষণের পেছনে, - বিশেষ করে যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে, এই ল্যাভেন্ডার সিস্টেমই ছিল মূল চালিকাশক্তি।'
এক ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা অত্যন্ত নির্বিকারভাবে স্বীকার করেছেন ফিলিস্তিনিদের জীবন-মৃত্যু নিয়ে তাদের ছিনিমিনির কথা। তার ভাষায়, 'যুদ্ধের ওই দিনগুলোতে একেকটি ফিলিস্তিনি লক্ষ্যবস্তু চূড়ান্ত করতে আমি মাত্র ২০ সেকেন্ড সময় দিতাম। প্রতিদিন এভাবে ডজন ডজন মানুষকে হত্যার তালিকায় অনুমোদন = দিতাম। আমার কাজ ছিল রাবার স্ট্যাম্পের মতো - রোবটের সিদ্ধান্তে চোখ বুজে সই করা। এর ফলে আমাদের প্রচুর সময় বেঁচে যেত!'
এই জবানবন্দিই প্রমাণ করে, ইসরায়েলি বাহিনী কীভাবে ন্যূনতম বিবেক বিসর্জন দিয়ে একটি যান্ত্রিক সফটওয়্যারকে হাজার হাজার নিরীহ মানুষের জল্লাদ বানিয়ে দিয়েছে।
'হোয়ার ইজ ড্যাডি?': ফিলিস্তিনি পরিবার নিশ্চিহ্নের পৈশাচিক ফাঁদ:
গাজায় ফিলিস্তিনিদের বংশনিধন ও জাতিগতভাবে নির্মূল করতে ইসরায়েল যে কতটা বিকৃত মানসিকতার প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে, তার বড় প্রমাণ 'হোয়ার ইজ ড্যাডি?' (Where's Daddy?) নামের এই এআই সিস্টেম। মার্কিন
সংবাদমাধ্যম 'ডেমোক্রেসি নাও'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি ইসরায়েলের ব্যবহৃত অন্যতম বিপজ্জনক ও নিষ্ঠুর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা, যা তৈরিই করা হয়েছে ফিলিস্তিনি পুরুষদের সার্বক্ষণিক পিছু নেওয়ার জন্য।
এই সিস্টেমের মূল কাজ হলো, কোনো ফিলিস্তিনি পুরুষ কখন সারাদিন শেষে রাতে তার পরিবার, সন্তান ও স্ত্রীর কাছে ফিরছেন, ঠিক সেই মুহূর্তটি নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা। আর ঠিক যখনই ওই ব্যক্তি নিজের ঘরে পা রাখেন, তখনই ইসরায়েলি ড্রোন বা যুদ্ধবিমান থেকে পুরো বাড়িটির ওপর বোমাবর্ষণ করে ভেতরের সবাইকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়।
ইসরায়েলি সাময়িকী '+৯৭২' এবং হিব্রু ভাষার নিউজ ওয়েবসাইট 'লোকাল কল'-এর যৌথ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক হাড় হিম করা তথ্য। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই 'হোয়ার ইজ ড্যাডি?' সিস্টেমটি ব্যবহারের একমাত্র নির্মম পরিণতি ছিল, বিছানায় ঘুমন্ত পুরো ফিলিস্তিনি পরিবারকে তাদের নিজেদের ঘরের ভেতরেই এক নিমেষে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া।
আন্তর্জাতিক মহল দীর্ঘদিন ধরে যে প্রশ্নটি তুলছিল, গাজায় ইসরায়েলি এই যুদ্ধাপরাে কেন এত বিপুলসংখ্যক সাধারণ নাগরিক হচ্ছেন? কেন নিহতদের সিংহভাগই নিরীহ নারী, নিষ্পাপ শিশু আর অসহায় প্রবীণ? 'হোয়ার ইজ ড্যাডি?' সিস্টেমের তথ্যই আজ সেই নির্মম সত্য বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত করেছে। এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করে ফিলিস্তিনিদের পুরো পরিবারসহ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত ও প্রাতিষ্ঠানিক জল্লাদখানা।
'দ্য গসপেল' সিস্টেম:
২০২৩ সালের নভেম্বরে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ঘোষণা করে, তাদের গোয়েন্দা বিভাগের 'টার্গেট ইউনিট' 'দ্য গসপেল' (The Gos-pel) নামক সিস্টেমটি ব্যবহার করেছে। এটি ইসরায়েলের সবচেয়ে বিপজ্জনক ও নৃশংস এআই সিস্টেমগুলোর একটি। যার কাজ হলো ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের ব্যবহৃত ভবন ও স্থাপনাগুলো চিহ্নিত করা এবং ভেতরে থাকা বাসিন্দাদের মাথার ওপর সেগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া।
সে সময় ইসরায়েলি বাহিনী দাবি করেছিল, এই 'গসপেল' সিস্টেমটি গাজায় প্রায় ১২ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে বোমাবর্ষণে সাহায্য করেছে। স্থল, আকাশ ও নৌবাহিনীকে এই এআই 'টার্গেট ফ্যাক্টরি' থেকে তাৎক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করা হয়, যা তাদের একযোগে শত শত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর লাইসেন্স দেয়।
এই ঘাতক ব্যবস্থাটি মূলত রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জ্যামিতিক গতিতে বিপুল পরিমাণ লক্ষ্যবস্তুর তালিকা তৈরি করে, দিনে প্রায় ১০০টি। অথচ অতীতে ইসরায়েলি গোয়েন্দারা ম্যানুয়ালি বছরে মাত্র ৫০টি লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করতে পারত।
ইসরায়েলি পত্রিকা 'জেরুজালেম পোস্ট' এক প্রতিবেদনে লিখেছে, 'এই সিস্টেমটি একটি নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে আক্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত লক্ষ্যবস্তুগুলোর সাজেশন দেয়।' পত্রিকাটি আরও উল্লেখ করেছে যে, 'গসপেল'-এর অ্যালগরিদম লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের সময় বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতিকেও একটি উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে। তবে বাস্তবে এই দাবি সম্পূর্ণ অন্তঃসারশূন্য প্রমাণিত হয়েছে, কারণ এই সিস্টেম গাজায় কেবলই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের কারণ হয়েছে।
কুখ্যাত 'ইউনিট ৮২০০' দ্বারা তৈরি এই সিস্টেমটি প্রথমে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের কাছে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর সাজেশন পাঠায়। এরপর কর্মকর্তারা মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নেন যে তারা তা মাঠপর্যায়ের সৈন্য ও পাইলটদের কাছে পাঠাবেন কি না। চূড়ান্ত অনুমোদনের পর, 'পিলার অব ফায়ার' (অগ্নিস্তন্ত) নামক একটি বিশেষ অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে সেই ঘাতক নির্দেশনাবলী যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা বাহিনীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
'ফায়ার ফ্যাক্টরি' (Fire Factory) সিস্টেম:
২০২৩ সালে এই সিস্টেমটির কথা প্রথম প্রকাশ্যে আসে। ফিলিস্তিনিদের ওপর বিমান ও ড্রোন হামলার ব্লুপ্রিন্টকে আরও নিখুঁত ও. বিধ্বংসী করতে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাটি ব্যবহার করে আসছে। মূলত আক্রমণের জন্য বেছে নেওয়া লক্ষ্যবস্তুগুলোর ধরন ও প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করেই কাজ করে এই দানবীয় সিস্টেম।
এই ঘাতক ব্যবস্থাটি অতীতে বোমাবর্ষণে ধ্বংস করা ফিলিস্তিনি লক্ষ্যবস্তুগুলোর ইতিহাসসহ এক বিশাল ডেটা ভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে। এর অ্যালগরিদমগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাব করে ফেলে যে, ফিলিস্তিনিদের ওই স্থাপনাগুলোকে সম্পূর্ণ মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে ঠিক কতটুকু গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক লাগবে। শুধু তাই নয়, এটি আক্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়সূচি নির্ধারণ এবং কোন লক্ষ্যবস্তুটিকে আগে ধ্বংস করা হবে, তার অগ্রাধিকার তালিকাও তৈরি করে দেয়।
'ডেপথ অব উইজডম' (Wisdom's Depth) সিস্টেম:
এটি মূলত এমন একটি এআই সিস্টেম, যা বিশাল পরিমাণ তথ্য বা বিগ ডেটা (Big Data) বিশ্লেষণ করে গাজায় ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ বা টানেল নেটওয়ার্কের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করে। মাটির ওপরে ও নিচে থাকা পুরো নেটওয়ার্কের একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ চিত্র ফুটিয়ে তোলাই এর কাজ। এই সিস্টেমের মাধ্যমে সুড়ঙ্গগুলোর গভীরতা, ছাদ ও দেয়ালের পুরুত্ব এবং চারপাশের রাস্তার গতিপ্রকৃতির মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নিখুঁত বিবরণগুলো চিহ্নিত করা হয়।
'আল-কিমিয়া' বা 'দ্য কেমিস্ট:
২০২১ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্ববাসী এই প্রযুক্তির কথা জানতে পারে। এরপর থেকে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে 'আল-কিমিয়া' বা 'দ্য কেনিস্ট' (The Chemist) সিস্টেমটি বহুল ব্যবহৃত প্রযুক্তিগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর এই ব্যবস্থার কাজ হলো যুদ্ধক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রতিরোধের গতিবিধি শনাক্ত করে তাৎক্ষণিক (রিয়েল-টাইম) সতর্কবার্তা পাঠানো। এসব সতর্কবার্তা সরাসরি মাঠপর্যায়ে থাকা ইসরায়েলি ইউনিটগুলোর কমান্ডারদের হাতে থাকা ডিজিটাল ট্যাবলেটে পৌঁছে যায়, যাতে তারা দ্রুত অভিযান পরিচালনা করতে পারে।
এই সিস্টেমটির একই সাথে রক্ষণাত্মক ও আক্রমণাত্মক, উভয় ধরনের ভয়াবহ সামরিক সক্ষমতা রয়েছে। এটি বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত সব গোপন গোয়েন্দা তথ্যকে একটি একক প্ল্যাটফর্মে এনে নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে। এর স্বয়ংক্রিয় অ্যালগরিদমের মাধ্যমে খুব সহজেই ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের অবস্থান ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করা যায়। এরপর ফিলিস্তিনিদের যেকোনো মুভমেন্ট বা প্রতিরোধী পদক্ষেপের খবর সঙ্গে সঙ্গে মাঠপর্যায়ের ইসরায়েলি বাহিনীর কাছে পৌঁছে দেয় এই সফটওয়্যার, যাতে তারা ফিলিস্তিনিদের ওপর আকস্মিক ও প্রাণঘাতী হামলা চালাতে পারে।
'ফায়ার উইভার': চোখের পলকে ধ্বংসযজ্ঞের নেটওয়ার্ক:
ইসরায়েলের কুখ্যাত ও রাষ্ট্রায়ত্ত সামরিক সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান 'রাফায়েল' (Rafa-el Advanced Defense Systems) তৈরি করেছে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সিস্টেম। 'ফায়ার উইভার' (Fire Weaver) মূলত এমন এক ভয়ঙ্কর নেটওয়ার্ক, যা যুদ্ধক্ষেত্রে ছড়িয়ে থাকা আগ্রাসী ইসরায়েলি সৈন্যদের সাথে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহকারী আকাশ ও ভূমির সেন্সরগুলোর সরাসরি ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ স্থাপন করে। অর্থাৎ, সেন্সর যেখানেই কোনো ফিলিস্তিনির উপস্থিতি শনাক্ত করবে, মুহূর্তের মধ্যে সেই তথ্য চলে যাবে ইসরায়েলি শুটারের স্ক্রিনে।
ইসরায়েলি সামরিক বিষয়ক ওয়েবসাইট 'আইএইচএলএস'-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সিস্টেমটি যুদ্ধক্ষেত্রের ভৌগোলিক অবস্থান, দেখার সীমানা (লাইন অব সাইট), আক্রমণের কার্যকারিতা এবং সৈন্যদের কাছে মজুত গোলাবারুদের মতো একাধিক জটিল উপাদান স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাব করে। এরপর ফিলিস্তিনিদের ওপর নিখুঁত ও প্রাণঘাতী আক্রমণের জন্য সৈন্যদের সামনে সবচেয়ে কার্যকর পথ বাতলে দেয়। যদিও দখলদার ইসরায়েলের দাবি, এর মূল উদ্দেশ্য 'আক্রমণের বাড়ানো এবং তথাকথিত অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করা', কিন্তু বাস্তবে এটি গাজার সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংসেরই প্রধান হাতিয়ার।
উচ্চ-তীব্রতার যুদ্ধের সময় একই সাথে একাধিক টার্গেটে একযোগে ও সমন্বিত আঘাত হানার জন্য এই সিস্টেমটি বিশেষভাবে নকশা করা হয়েছে। এর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটি ইসরায়েলি সৈন্যদের কোনো ফিলিস্তিনি লক্ষ্যবস্তুর ওপর হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়কে নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনে। আগে যেখানে কোনো টার্গেটে আঘাত হানতে কমপক্ষে কয়েক মিনিট সময় লাগত, এই 'ফায়ার উইভার' সিস্টেমের কারণে এখন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তারা ফিলিস্তিনিদের ওপর ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে। যন্ত্রের এই দানবীয় গতি - আজ গাজার হাজার হাজার মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে প্রতি মুহুর্তে।
'ফ্লো' (Flow): দখলদারদের তথ্যের ডিজিটাল ভাণ্ডার
যুদ্ধক্ষেত্রে সাধারণ ফিলিস্তিনি ও প্রতিরোধ যোদ্ধাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে ইসরায়েলি বাহিনী যেসব ছোট অথচ অত্যন্ত কার্যকর এআই টুটুল ব্যবহার করছে, তার একটি হলো 'ট্রো'। এটি মূলত এমন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত সিস্টেম, যা গাজার মাটিতে থাকা দখলদার ইসরায়েলি সেনাদের যেকোনো মুহূর্তে বিভিন্ন গোপন ও সংবেদনশীল ডেটা বা তথ্য অনুসন্ধানের (কোয়েরি করার) সুযোগ দেয়। এর মাধ্যমে সৈন্যরা তাদের সামরিক মিশনগুলো সফল করতে এবং ফিলিস্তিনিদের যেকোনো প্রতিবোধকে ফাঁকি দিতে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় সব তথ্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পাবে।
'হান্টার' (Hunter): যুদ্ধক্ষেত্রের লাইভ ট্রাকিং
'হান্টার' বা শিকারি, নামটির মতোই এর কাজও অত্যন্ত নৃশংস। এটি রণাঙ্গনে থাকা ইসরায়েলি সৈন্যদের সরাসরি ও মুহূর্তের মধ্যে এক বিশাল গোয়েন্দা তথ্যভাণ্ডারে ডিরেক্ট একসেস দেয়। যুদ্ধক্ষেত্রে ফিলিস্তিনিদের অবস্থান কিংবা কোনো সুনির্দিষ্ট টার্গেটের নড়াচড়া কেমন, তা এই সিস্টেমের মাধ্যমে সৈন্যরা লাইভ দেখতে পায়। এব ফলে কোনো ফিলিস্তিনি প্রতিবোধ যোদ্ধা বা সাধারণ নাগরিকের ওপর আক্রমণ করার জন্য সৈন্যদের ওপর মহলের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় বসে থাকতে হয় না; তারা নিজেরাই 'হান্ট' বা শিকার করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
'জেড-টিউব' (Z-Tube): ক্যামেরার মরণফাঁদ
ফিলিস্তিনিদের চেনা শহর আর জনপদগুলোতে পা রাখার আগেই তা ফধ্বংস করার এক আধুনিক ব্লুপ্রিন্ট হলো এই জেড-টিউব সিস্টেম। এই এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলি সৈন্যরা কোনো ফিলিস্তিনি এলাকায় বা ভবনে ঢোকার ঠিক আগের মুহূর্তে, সেই এলাকার চারপাশের একদম লাইভ ভিডিও ফুটেজ দেখতে পায়। আকাশ থেকে ড্রোন বা আশেপাশের নজরদারি ক্যামেরা থেকে আসা এই লাইভ ভিডিওর মাধ্যমে তারা ফিলিস্তিনিদের প্রতিটি কোণ, প্রতিটি গলির অবস্থান আগেভাগেই স্ক্রিনে দেখে নেয়। ফলে, কোনো ফিলিস্তিনি পরিবার বা প্রতিবোধ যোদ্ধা নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য কোনো প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই, এই জেড-টিউব সিস্টেমের কারণে ইসরায়েলি বাহিনী সেখানে অতর্কিত হামলা বা বোমাবর্ষণ করতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ড্রোন ও আকাশযান:
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনিদের অভিযানের জবাবে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলিদের বর্বর হামলা শুরু হওয়ার মাত্র কয়েকদিনের মাথায় এক চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করে মার্কিন সংবাদপত্র পলিটিকো। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ড্রোন তৈরিতে স্পেশালাইজড একটি মার্কিন কোম্পানির কাছে জরুরি ভিত্তিতে এক ঝাঁক ড্রোনের রিকোয়েস্ট করে ইসরায়েল। এগুলো সাধারণ কোনো ড্রোন নয়, বরং সম্পূর্ণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চালিত শর্ট-রেঞ্জের গোয়েন্দা ও নজরদারি বিমান, যা ফিলিস্তিনিদের প্রতিটি পদক্ষেপ ট্র্যাক করার জন্য আনা হয়েছিল।
এই ড্রোনগুলোর মূল কাজ হলো, যেকোনো জটিল ও বহুতল ভবনের ভেতরের এবং বাইরের নিখুঁত থ্রিডি মানচিত্র তৈরি করা। গাজার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বহুতল ভবনগুলোর ভেতরে ঠিক কোথায় ফিলিস্তিনিরা অবস্থান করছেন, এই এআই প্রযুক্তিদা সাহায্যে তা নিখুঁতভাবে স্ক্যান করা হয়। এরপর সেই জটিল নকশা বিশ্লেষণ করে কোনো বাড়ি বা স্থাপনাকে সুনির্দিষ্ট টার্গেট হিসেবে লক করা হয়, যাতে পরবর্তী সময়ে সেখানে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো যায়।
'লোভা ২' (Nova ২):
গাজা যুদ্ধে অবরুদ্ধ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত ভবনগুলোর ভেতরে থাকা ফিলিস্তিনিদের খোঁজে বের করে হত্যা করতে ইসরায়েল ব্যবহার করেছে মার্কিন প্রযুক্তিতে তৈরি নোভা টু নামক সম্পূর্ণ অটোমেটিক ড্রোন। এই ড্রোনগুলোর বিশেষত্ব হলো, এগুলো ভবনের ভেতরে বা বদ্ধ জায়গায় অনায়াসে চলতে পারে। এর ভেতরে থাকা এআই পাথ-প্ল্যানিং অ্যালগরিদম এবং কম্পিউটার ভিশন প্রযুক্তির কারণে ড্রোনটি কোনো প্রকার জিপিএস নেটওয়ার্ক কিংবা বাইরে থেকে মানুষের কোনো রিমোট কন্ট্রোল ছাড়াই ভবনের অন্ধকার ও সংকীর্ণ অলিগলিতে নিজে নিজেই উড়ে বেড়াতে পারে। ভবনের ভেতবে কোনো ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধা বা বেসামরিক নাগরিক লুকিয়ে আছেন কিনা, তা খুঁজে বের করাই এই অদৃশ্য জল্লাদের কাজ।
'সুইচব্লেড ৬০০' (Switchblade ৬০০): আকাশের আত্মঘাতী ড্রোন
গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনীর ব্যবহৃত এআই চালিত বিমানগুলোর মধ্যে অন্যতম আলোচিত হলো সুইচব্লেড ৬০০ মডেলের আত্মঘাতী বা কামিকাজে ড্রোন। অত্যাধুনিক এআই ক্যামেরা সম্বলিত এই ড্রোনটি নিজের শরীরে হাই এক্সপ্লোসিভ বিস্ফোরক বহন করে সরাসরি আকাশ থেকেই নির্দিষ্ট টার্গেট খুঁজে বের করতে পারে।
এই ড্রোনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এটি এককভাবে কাজ করার পাশাপাশি আশেপাশে থাকা অন্যান্য ইসরায়েলি ড্রোন বা নজরদারি বিমান থেকে রিয়েল-টাইম ইন্টেলিজেন্স ডেটা গ্রহণ করতে সক্ষম। অর্থাৎ, অন্য কোনো ড্রোন ফিলিস্তিনিদের কোনো অবস্থানের খোঁজ পেলেই সেই তথ্য মুহূর্তের মধ্যে এই আত্মঘাতী ড্রোনের এআই সিস্টেমে ট্রান্সফার হয়ে যায়।
মূলত কাছাকাছি দূরত্বে থাকা ফিলিস্তিনিদের বিভিন্ন টার্গেটের ওপর আকস্মিক হামলা চালানোর জন্য একে তৈরি করা হয়েছে। এই ড্রোনটির বেঞ্জ প্রায় ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এটি একটানা প্রায় ৪০ মিনিট পর্যন্ত গাজার আকাশে ফ্লাই করে ফিলিস্তিনি টার্গেট শনাক্ত করতে পারে। এর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখনই কোনো অবস্থান বা ব্যক্তিকে টার্গেট হিসেবে লক করে, তখনই এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি মিসাইলের মতো সেই টার্গেটের ওপর হামলে পড়ে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুদ্ধট্যাংক 'ইটান এপিসি' (Eitan APC) যুদ্ধযান:
২০২২ সালের জানুয়ারিতে ইসরায়েলের সামরিক সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রাফায়েল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত একটি অত্যাধুনিক সামরিক যান প্রকাশ করে, যার নাম ইটান এপিসি। এই যুদ্ধযানটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এর চালক কেবল চোখের দৃষ্টি বা নজর দিয়েই পুরো যানটিকে কন্ট্রোল ও ডিরেকশন দিতে পারেন।
রাফায়েলের তৈরি এই সামরিক যানে সংযুক্ত করা হয়েছে গিল নামক মিসাইল এবং উইন্ডকোর্ট বা ট্রফি নামের একটি অ্যাক্টিভ প্রোটেকশন সিস্টেম। এই প্রযুক্তিটি একযোগে একাধিক টার্গেট খুঁজে বের করতে এবং সেগুলোকে নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম। যানটির চারপাশে একগু শক্তিশালী সেন্সর বসানো রয়েছে, যা অনবরত এর চারপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে এবং যেকোনো সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে ভেতরে থাকা সেনাদের তাৎক্ষণিকভাবে অ্যালার্ট পাঠায়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সীমান্ত নজরদারি:
ইসরায়েলি বাহিনী তাদের সীমান্ত এলাকা, বিশেষ করে গাজা উপত্যকা এবং পশ্চিম তীরের বর্ডারগুলোতে কড়া নজরদারির উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে। এর অংশ হিসেবে পুরো সীমান্তজুড়ে এআই চালিত উন্নত ভিডিও ক্যামেরার একটি বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে।
এই ক্যামেরাগুলো থেকে প্রাপ্ত সব তথ্য ও ডেটা সরাসরি চলে যায় মেইন কন্ট্রোল রুম এবং অপারেটরদের কাছে। সেখানে এআই সিস্টেমের সাহায্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডেটা অ্যানালাইসিস করে সীমান্তে থাকা মানুষ, যানবাহন কিংবা প্রাণীদের সুনির্দিষ্ট আইডেন্টিটি শনাক্ত করা হয়। এরপর প্রাপ্ত ছবি ও দৃশ্যগুলোকে অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ডেটাবেজের তথ্যের সাথে ম্যাচ করে দেখা হয়। কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা বা জরুরি পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তা তাৎক্ষণিকভাবে অ্যালার্টের মাধ্যমে দায়িত্বরত বাহিনীকে জানিয়ে দেওয়া হয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত নজরদারি ক্যামেবাহগুলোর মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনীর ব্যবহৃত প্রধান প্রধান সিস্টেমগুলো হলো:
উলফ প্যাক বা নেকড়ে দল:
এটি মূলত একটি অত্যন্ত বিশাল ও সেন্ট্রাল ডেটাবেজ, যেখানে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের সম্পর্কিত এ পর্যন্ত সংগৃহীত সমস্ত তথ্য ও ডেটা স্টোর করে রাখা হয়।
ব্লু উলফ বা নীল নেকড়ে:
এটি একটি বিশেষ অ্যাপ্লিকেশন, যা ইসরায়েলি সৈন্যরা তাদের স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটের মাধ্যমে ব্যবহার করতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সৈন্যরা এই অ্যাপের সাহায্যে সেন্ট্রাল উলফ প্যাক ডেটাবেজে সংরক্ষিত ফিলিস্তিনিদের যাবতীয় তথ্য মুহূর্তের মধ্যে সরাসরি নিজেদের স্ক্রিনে দেখতে পায়।
রেড উলফ বা লাল নেকড়ে:
এটি মূলত একটি ফেসিয়াল রিকগনিশন বা মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তি। সীমান্ত ও চেকপোস্টগুলোতে থাকা ফিলিস্তিনিদের মুখাবয়ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্ক্যান করা এই সিস্টেমের কাজ। স্ক্যান করার পর কোনো প্রকার পূর্ব অনুমতি ছাড়াই ফিলিস্তিনিদের সেই ছবি ও পরিচিতি নজরদারির জন্য তৈরি এই বিশাল ডেটাবেজে যুক্ত করে নেওয়া হয়।
সমালোচনা ও বিতর্ক:
গাজা যুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির এমন ব্যাপক ব্যবহারের কারণে আন্তর্জাতিক মহলে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। যুক্তরাজ্যের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, আগের যুদ্ধগুলোতে কাউকে বৈধ টার্গেট হিসেবে গণ্য করার আগে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতো এবং লিগ্যাল অ্যাডভাইজারদের চূড়ান্ত সাইনের প্রয়োজন হতো। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর এই পুরো প্রক্রিয়াটির গতি নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয় এবং আরও বেশি পরিমাণে টার্গেটস খুঁজে বের করার জন্য এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক চাপ তৈরি হয়।
এই বিপুল পরিমাণ চাহিদা মেটাতে ইসরায়েলি বাহিনী মূলত ল্যাভেন্ডার প্রোগ্রামের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই প্রোগ্রামটি এমন একটি ডেটাবেজ সরবরাহ করে, যা হামাস বা ইসলামিক জিহাদের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সাথে ম্যাচ করে, এমন ব্যক্তিদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করে।
একই বিষয়ে ২০২৩ সালের ২ ডিসেম্বর ফ্রান্সের প্রভাবশালী সংবাদপত্র লিবেরাসিও একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে তারা উল্লেখ করে, ইসরায়েল কিংবা বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তৈরি এই অ্যালগরিদমগুলো মূলত একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ও প্রাণঘাতী বোমাবর্ষণের অন্যতম প্রধান হাতিয়াবে পরিণত হয়েছে।
২০২৪ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক বিবৃতিতে গাজায় সামরিক অভিযানে ইসরায়েলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের খবরে উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, এই ধরনের প্র্যাকটিস বেসামরিক জনগণকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে এবং যেকোনো অপরাধের জবাবদিহিতার জায়গাটুকুকে পুরোপুরি মুছে দেয়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচও গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনীর এআই প্রযুক্তির এই ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তাদের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গাজায় আক্রমণের টার্গেট আইডেন্টিফাই ও ট্র্যাক করার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বেসামরিক নাগরিকদের অপূরণীয় ক্ষতি করছে এবং এটি একই সাথে গুরুতর এথিক্যাল ও লিগ্যাল উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মানবাধিকার সংস্থাটি আরও উল্লেখ করেছে, এই ডিজিটাল টুলগুলো মূলত ভুল ডেটা এবং নিখুঁত নয় এমন প্রেডিকশনের ওপর ভিত্তি করে সামরিক অভিযানগুলোতে ইনফরমেশন সাপ্লাই দিচ্ছে। এই প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে ইসরায়েলের যে লিগ্যাল অবলিগেশন রয়েছে, বিশেষ করে আক্রমণের ক্ষেত্রে সাধারণ বেসামরিক নাগরিক ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে পার্থক্য করা এবং আগাম সতর্কতা অবলম্বনের নিয়মের স্পষ্ট ভায়োলেশন।
আমেরিকার এআই ইনস্টিটিউটের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যাসুরেন্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পরিচালক হেইডি খালাফ এই প্রযুক্তির ত্রুটি নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সিস্টেমগুলোর অতীতে যে বিপুল পরিমাণ ভুল করার রেকর্ড রয়েছে, তাতে বলা যায়, ত্রুটিপূর্ণ ও পক্ষপাতদুষ্ট তথ্যের ওপর ভিত্তি করে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে টার্গেট নির্ধারণ করা আর লক্ষ্যহীনভাবে নির্বিচারে হামলা চালানোর মধ্যে বাস্তবে কোনো পার্থক্য নেই।
একইভাবে, স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট বা সিপ্রির গবেষক মার্তা বো গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলের এআই ব্যবহারের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীলতা মানুষের নিজস্ব চীন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে চরমভাবে প্রভাবিত করে এবং মানুষের ওপর এই যন্ত্রগুলোর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাবেক আইনজীবী লিতাল মিমরান যুদ্ধক্ষেত্রে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রোগ্রামের ব্যবহারের সমালোচনা করে বলেন, যুদ্ধের এই চরম বিশৃঙ্খলা ও ধোয়াশার, মধ্যে এআই-চালিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার নিয়ে আমি বেশ শঙ্কিত। এই প্রযুক্তি কি আদতে গুণগত কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে? আমি তা মনে করি না।
অন্যদিকে, 'স্টপ কিলার রোবটস' জোটের গবেষক ক্যাথরিন কনোলি সতর্ক করে বলেন, সফটওয়্যারের যেকোনো ধরনের পরিবর্তন বা রূপান্তর এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাগুলোকে কেবল আধা-স্বয়ংক্রিয় রাখার পরিবর্তে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন বা পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করে তুলতে পারে।
গাজা উপত্যকাকে এখন বিশ্বের বড় বড় সামরিক বিশ্লেষকরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক উন্মুক্ত পরীক্ষাগার হিসেবে দেখছেন। এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে ভবিষ্যৎ যুদ্ধ হবে সম্পূর্ণ সাইবার ও ডিজিটাল।
প্রযুক্তির দায় ও বিপন্ন মানবতা:
গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর এই এআই চালিত যুদ্ধকৌশল বিশ্বজুড়ে সামরিক প্রযুক্তির নৈতিকতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। দ্য গসপেল, ল্যাভেন্ডার কিংবা সুইচব্লেড ৬০০-এর মতো স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্রগুলোর ব্যবহার প্রমাণ করে যে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্র এখন আর মানুষের সিদ্ধান্ত ও যুদ্ধনীতির ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং তা ক্রমশ অ্যালগরিদমের নিষ্ঠুর হিসাব-নিকাশে বন্দি হয়ে পড়ছে।
জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বা সিপ্রির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করছে যে, যুদ্ধের এই যান্ত্রিকীকরণ বেসামরিক মানুষের সুরক্ষাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলছে। যন্ত্রের ভুল করার উচ্চ প্রবণতা এবং পক্ষপাতদুষ্ট ডেটা যখন জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তা আর নিখুঁত আক্রমণ থাকে না, বরং তা রূপ নেয় নির্বিচার গণহত্যায়।
ল্যাভেন্ডার সিস্টেম গাজার প্রায় ৩৭,০০০ ফিলিস্তিনি পুরুষকে সম্ভাব্য টার্গেট হিসেবে চিহ্নিত করেছিল, যার ভুলের হার ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। এর চেয়েও ভয়ংকর হলো 'হোয়্যার্স ড্যাডি' নামক ট্র্যাকিং সিস্টেম। এটি চিহ্নিত ব্যক্তিরা পরিবারসহ নিজ বাড়িতে না ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করত এবং তারা ঘরে ঢোকা মাত্রই পুরো বাড়ি লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হতো। ফলে একজন টার্গেটের সাথে তার পুরো পরিবার, নারী ও শিশুরা নিহত হতো।
সবচেয়ে বড় সংকটের জায়গা হলো, এই প্রযুক্তিগুলো মানুষের বিচারবুদ্ধিকে আড়াল করে যুদ্ধের আইনি ও নৈতিক জবাবদিহিতাকে ধোঁয়াশাময় করে তুলছে। যন্ত্রের এই অনিয়ন্ত্রিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা যদি এখনই আন্তর্জাতিক আইনের কঠোর বেড়াজালে বাঁধা না যায়, তবে যুদ্ধক্ষেত্রের ন্যূনতম মানবিক শিষ্টাচারটুকুও চিরতরে হারিয়ে