17/04/2026
জুমাবারে করণীয় দশটি আমল
জুমার সালাত সম্মিলিত ইবাদত। মুসলিমরা প্রত্যেক শুক্রবার যুহরের সালাতের পরিবর্তে আদায় করে থাকেন। এ দিনে করণীয় :
১. নখ কাটা
২. সুরা কাহাফ তিলাওয়াত করা
৩. দুয়া করা
৪. গোসল করা
৫. পরিচ্ছন্ন ও উত্তম কাপড় পরা, মিসওয়াক করা এবং সুগন্ধি ব্যবহার করা।
৬. আগে আগে মসজিদে যাওয়া
৭. জুমার সালাত আদায় করা
৮. রাসুলের ওপর প্রচুর দরুদ পড়া
৯. মসজিদে হেঁটে যাওয়া
১০. মনোযোগসহ কান লাগিয়ে জুমার খুতবা শোনা
↓↓
১. নখ কাটা
আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, ‘পাঁচটি জিনিস মানুষের স্বভাবজাত (ফিতরাতগত) বিষয়—১. খতনা করা ২. ক্ষৌরকার্য করা (নাভির নিচের অবাঞ্ছিত লোম পরিষ্কার করা) ৩. গোঁফ ছোট করা ৪. নখ কাটা ৫. বাহুর নিচের বা বগলের লোম পরিষ্কার করা।
২. সুরা কাহাফ তিলাওয়াত করা
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ পড়বে তার জন্য এক জুমা থেকে আরেক জুমা পর্যন্ত আলোকোজ্জ্বল হবে। [আল-হাকিম, ইমাম আল-আলবানির সহিহ বলেছেন]
৩. দুয়া করা
এই সুবর্ণ সুযোগটি মিস করবেন না! শুক্রবার অর্থাৎ জুমার দিনে এমন একটি বিশেষ সময় রয়েছে যখন আল্লাহ বান্দার ডাকে সাড়া দেন এবং সব দুয়া কবুল করেন। সমস্ত প্রশংসা ও মাহাত্ম্য আল্লাহর। আল্লাহ সপ্তাহের অন্য দিনগুলোর ওপর এই দিনটিকে যে মর্যাদা দান করেছেন এটা তারই অংশ।
আবু হুরাইরাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমার দিনকে উল্লেখ করে বললেন—এই দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, যে মূহুর্তে কোনো মুসলিম বান্দা দাঁড়িয়ে সালাত পড়া অবস্থায় আল্লার কছে কোনো কিছু চাইলে তিনি অবশ্যই সেটা দান করেন। আর তিনি হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে বুঝিয়ে দিলেন যে, সে মুহূর্তটি খুবই সংক্ষিপ্ত। [বুখারি : ৯৩৫; মুসলিম : ৮৫২]
ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) নিচের হাদিসের পরিপ্রেক্ষিতে বলেছেন যে, জুমার দিনে দুয়া কবুলের সঠিক সময়টি হলো আসরের পর থেকে মাগরিবের সালাতের আগপর্যন্ত।
'জুমার দিনে ১২টি ঘন্টা রয়েছে। এর মাঝে এমন একটি ঘন্টা রয়েছে যে সময় কোনো মুসলিম বান্দা আল্লাহর কাছে কোনো কিছু চাইলে আল্লাহ তাকে সেটি দান করে থাকেন। অতএব, তোমরা আসরের (সালাত) পর শেষ সময়ে সেটি তালাশ করো।’ [সুনানু আবি দাউদ, সুনানুন নাসায়ি]
৪. গোসল করা
উত্তমভাবে গোসল করার মাধ্যমে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা। রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—যে ব্যক্তি জুমায় উপস্থিত হতে চায়, সে যেন গোসল করে নেয়।’ [সহিহ মুসলিম]। এই হাদিস ও পূর্বোল্লেখিত হাদিসগুলোর দিকে লক্ষ করলে বোঝা যায়, সাধারণভাবে গোসল করা ছাড়াও পানি ব্যবহারের মাধ্যমে উত্তমভাবে পবিত্রতা অর্জন করা প্রয়োজন।
৫. উত্তম পোশাক পরা, মিসওয়াক করা এবং সুগন্ধি ব্যবহার করা
ওই দিনকে স্মরণে রাখুন, যে দিন বিশাল কোনো উপলক্ষকে কেন্দ্র করে আপনি আপনার সমস্ত দেহাবয়বকে সবদিক থেকে পরিচ্ছন্ন-পরিমার্জিত করতে রেস্টরুমে ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যয় করেছেন এবং হরেক রকমের সুগন্ধি ব্যবহার করেছেন। অবিকল সেভাবে সে দিনের মতোই জুমার জন্য প্রস্তুত হওয়া উচিত। নিজেকে পবিত্র করুন, সুনানুল ফিতরা অর্থাৎ নখ কাটা থেকে বাহুর নিচের লোম পরিষ্কার করা, নাভির নিচের অবাঞ্চিত লোম অপসারণ, বেশি বেশি সুগন্ধি ব্যবহার এবং অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রে নিশ্চিত ও যত্নবান হোন। নিশ্চিত হয়ে নিন, আপনার জুমার পোশাকটি যেন উত্তম, দাগহীন হয়। সেটি যেন আঁটসাঁট কিংবা ২ দিন আগের পরিহিত কোনো পোশাক বা রঙিন ও গোটানো কোনো পোশাক না হয়। এ ছাড়াও মুখের পরিচ্ছন্নতার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিন। দাঁত ব্রাশ করতে প্রস্তাবিত চারটি মিনিট ব্যয় করুন। এলকোহলমুক্ত মাউথওয়াশ ব্যবহার করুন। মিসওয়াক করুন। সারকথা, এই দিনটিতে আপনি যথাযথ পূর্ণ পবিত্রতা অর্জন করে নিন।
আবু সায়িদ আল-খুদরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—শুক্রবারে (জুমা) প্রত্যেক সাবালক মুসলিমের ওপর গোসল এবং মিসওয়াক দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করা ওয়াজিব ও সাধ্যমতো সুগন্ধি ব্যবহার করা উচিত। [সহিহ বুখারি]
৬. আগে আগে মসজিদে যাওয়া
না, খতিব মসজিদে প্রবেশ করার ১০ মিনিট আগের কথা আমি এখানে বলছি না। প্রকৃতপক্ষে আগে আগে যাওয়ার অর্থ হলো দুই বা তিন ঘন্টা আগে গিয়ে উপস্থিত হওয়া। মসজিদ যদি খুব বেশি দূরে না হলে হেঁটেই মসজিদে যাওয়ার চেষ্টা করুন। সবার আগে গিয়ে মসজিদে উপস্থিত হতে চেষ্টা করুন আর এ হাদিখানা স্মরণ করুন, ‘জুমার দিন মসজিদের দরজায় মালাইকা অবস্থান করেন এবং ক্রমানুসারে পূর্বে আগমনকারীদের নাম লিখতে থাকেন। যে সবার আগে আসে সে ওই ব্যক্তির মতো, যে একটি উট কুরবানি করে। যে ব্যক্তি দ্বিতীয় মুহূর্তে গেল, সে যেন একটি গাভি কুরবানি করল। যে ব্যক্তি তৃতীয় মুহূর্তে গেল, সে যেন শিংওয়ালা একটি মেষ কুরবানি দিলো। যে ব্যক্তি চতুর্থ মুহূর্তে গেল, সে যেন একটি মুরগি কুরবানি (সাদাকাহ) করল। যে ব্যক্তি পঞ্চম মুহূর্তে গেল, সে যেন একটি ডিম কুরবানি (সাদাকাহ) করল। পরে ইমাম যখন (সালাতের উদ্দেশ্যে) বের হয়ে পড়েন, তখন মালাকরা সালাতে উপস্থিত হয়ে খুতবা শুনতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।’ [সহিহ বুখারি]
৭. জুমার সালাত আদায় করা
আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদারেরা, জুমার দিন যখন সালাতের আহ্বান জানানো হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে (মসজিদে) এগিয়ে যাও এবং বেচাকেনা ছেড়ে দাও। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা জানতে। [সুরা জুমুআহ, ৬২: ৯]
৮. রাসুলের ওপর প্রচুর দরুদ পড়া
রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হচ্ছে জুমার দিন। এই দিনে আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং এই দিনেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। এই দিনেই শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে এবং এই দিনেই সমগ্র সৃষ্টি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলবে। সুতরাং এই দিন তোমরা আমার ওপর বেশি বেশি দরূদ পড়ো। কারণ, তোমাদের দরূদ আমার কাছে পেশ করা হয়।’ উপস্থিত সাহাবা কিরাম বললেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ, আপনি মাটিতে পরিণত হয়ে যাওয়ার পর আমাদের দরুদ কীভাবে আপনার কাছে পেশ করা হবে?’ তিনি বললেন—আল্লাহ নবিদের দেহ খেয়ে ফেলা মাটির ওপর হারাম করে দিয়েছেন। [সুনানু আবি দাউদ : ১০৪৭; ইমাম ইবনুল কাইয়িম ও শাইখ আল-আলবানি সহিহ বলেছেন]
৯. মসজিদে হেঁটে যাওয়া
মসজিদে হেঁটে যাওয়ার বিনিময়স্বরূপ একদিকে প্রতি পদক্ষেপের জন্য সাওয়াব পাওয়া যায় এবং অন্যদিকে গুনাহ মাফ হয়। এ বিষয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথাকে আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এভাবে বলেছেন,
‘যে ব্যক্তি নিজ ঘরে পবিত্রতা অর্জন করে (ওযু) এবং যেকোনো একটি আল্লাহর ঘরের দিকে ফরয সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে হেঁটে যায়, তার প্রথম পদক্ষেপে গুনাহ মাফ করে দেয়া হয় এবং দ্বিতীয় পদক্ষেপে মর্যাদা (জান্নাতে) বৃদ্ধি করে দেয়া হয়।’ [সহিহ মুসলিম]
১০. মনোযোগসহ কান লাগিয়ে জুমার খুতবা শোনা
ইমাম খুতবা দেয়ার সময় কেউ যদি কাউকে বলে, চুপ করুন, তবে সেও অনর্থক কাজ করল। [সহিহ মুসলিম, সহিহ বুখারি]