28/04/2026
উম্মাহর ঐক্যের নামে রাফেযীদের তোষণ: জাকির নায়েকের বিভ্রান্তিকর অবস্থানের জবাব
আপনি যদি জানতে চান কেন মুসলিমরা আজ আল্লাহ থেকে বিমুখ, তবে তাদের দিকে তাকান যারা তথাকথিত ‘মুসলিম স্কলার’ হিসেবে জনপ্রিয়। উত্তরটি আপনি নিজেই পেয়ে যাবেন; কারণ তারা মানুষকে সেই দিকে ডাকে না, যেদিকে আল্লাহর রাসুল ﷺ আহ্বান করেছেন।
প্রথমেই বলে রাখি, জাকির নায়েক সাহেব একজন পথভ্রষ্ট দা’ঈ এবং তিনি সালাফী নয়, আর না তিনি কখনো সালাফী হওয়ার দাবি করেন। বরং তার বিশ্বাস হলো সালাফীরা শতভাগ হকের ওপর নেই। তাছাড়া, উক্ত ব্যক্তির অসংখ্য মারাত্মক আকীদাহগত বিভ্রান্তি রয়েছে যেগুলো স্পষ্ট কুফর পর্যন্ত পৌঁছে দেয়; এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা অন্যদিন করা যাবে।
এখন আসি মূল কথায়, জাকির নায়েক সাহেব সম্প্রতি একটি পডকাস্টে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন যার মধ্যে ইরান যুদ্ধের ইস্যু নিয়েও আলোচনা করেন। এখানে আমরা খুবই সংক্ষেপে তার কিছু বিভ্রান্তির খণ্ডন করার চেষ্টা করব, ইন শা আল্লাহ।
১. দাবি: “আমাদের ও তাদের মাঝে মতভেদ আছে, কিন্তু এখন তা ভুলে যাওয়া উচিত এবং তাদের সাথে ঐক্য করা উচিত।”
ইসলামের মূল ভিত্তি হলো ‘আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা’ (আল্লাহর জন্য ভালোবাসা ও আল্লাহর জন্য ঘৃণা)। রাফেযী শিয়াদের সাথে আমাদের বিরোধ কেবল শাখা-প্রশাখায় নয়, বরং তা আকীদাহগত (যেমন: কুরআন বিকৃতির বিশ্বাস, সাহাবীদের তাকফীর, ইমামতকে নবুয়তের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা)। শরীয়তের মূল হলো আকীদাহ, আর আকীদাহ নিয়ে মতভেদ হলে তা “ভুলে যাওয়া” বৈধ না। আকীদাহগত বিচ্যুতি রেখে রাজনৈতিক ঐক্যের ডাক দেওয়া সালাফদের মানহাজ পরিপন্থী।
আল্লাহ ﷻ বলেন:
«ولا تلبسوا الحق بالباطل وتكتموا الحق وأنتم تعلمون»
“আর তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে বুঝে সত্য কে গোপন করো না।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত ৪২]
২. দাবি: “আমাদের ও তাদের মতভেদ সাহাবীদের মতভেদের মতোই।”
এটি একটি চরম বিভ্রান্তিকর তুলনা। জাকির নায়েক সাহেবের কীভাবে এমন দুঃসাহস হয় যে, তিনি মানবজাতির সর্বোত্তম দলের সঙ্গে সবচেয়ে নিকৃষ্ট সৃষ্টি রাফেযীদের তুলনা করেন?! সাহাবীদের মধ্যকার মতভেদ ছিল ইজতিহাদী, যা ছিল ইনসাফের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু রাফেযীদের সাথে আমাদের বিরোধ হলো দ্বীনের মৌলিক বিষয়ে এবং হকের সাথে বাতিলের। তারা আমাদের কুরআন অস্বীকার করে এবং বিকৃত বলে। তারা আবু বকর, উমর, আয়েশা সহ অধিকাংশ সাহাবী رضي الله عنهم وارضاهم-কে কাফির মনে করে। সাহাবীরা কি একে অপরকে কাফির বলতেন? কখনোই না।
ইমাম আশ-শাফি’ঈ رحمه الله বলেন:
«لم أر أحدا من أصحاب الأهواء أكذب في الدعوى، ولا أشهد بالزور من الرافضة»
“আমি প্রবৃত্তিপূজারীদের মধ্যে রাফেযীদের চেয়ে বেশি মিথ্যা দাবিদার এবং তাদের চেয়ে বেশি মিথ্যা সাক্ষ্যদানকারী আর কাউকেও দেখিনি।” [ইবনু বাত্তাহ ‘আল-ইবানাহ আল-কুবরা’-তে (২/৫৪৫), এবং আল-লালাকাই ‘শারহ উসূল ই‘তিকাদ আহলিস সুন্নাহ’-তে (৮/৪৫৭) বর্ণনা করেছেন]
৩. দাবি: “আমাদের এখন তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে, কারণ তারাও মুসলিম।”
রাফেযীদের আকীদাহ অনুযায়ী তারা দৃঢ় বিষাস করে যে, তাদের ইমামরা গায়িবের খবর জানেন এবং তারা নিষ্পাপ—যা স্পষ্ট শিরক। তাদের অন্যতম আকীদাহ হলো আমাদের কাছে থাকা এই কুরআন বিকৃত এবং আল্লাহর কালাম নয়। তারা আমাদের সমস্ত হাদীস অস্বীকার করে। তারা আবু বকর ও উমর সহ অধিকাংশ সাহাবী رضي الله عنهم وارضاهم-কে কাফির মনে করে। আর এই কারণে, সালাফগন রাফেযীদের মুসলিম উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত মনে করতেন না এবং তাদের তাকফির করতেন।
ইমাম আল-বুখারী رحمه الله বলেন:
«ما أبالي صليت خلف الجهمي والرافضي، أم صليت خلف اليهود والنصارى، ولا يسلم عليهم، ولا يعادون، ولا يناكحون، ولا يشهدون، ولا تؤكل ذبائحهم»
“আমি জাহমি ও রাফেযীদের পিছনে সালাত আদায় করা এবং ইহুদি ও নাসারাদের (খ্রিস্টানদের) পিছনে সালাত আদায় করার মধ্যে কোনো পার্থক্য করি না। তাদেরকে সালাম দেওয়া যাবে না, তারা অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া যাবে না, তাদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া যাবে না, তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না এবং তাদের জবেহ করা পশুর গোশত খাওয়া যাবে না।” [খালকু আফ’আলিল ‘ইবাদ, পৃষ্ঠা ১২৫]
৪. দাবি: “সাহাবীরা তাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন।”
এটি ইতিহাসের চরম বিকৃতি। সাহাবীদের যুগে বর্তমানের এই রাফেযীদের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। বরং আলী رضي الله عنه وارضاه এই রাফেযীদের পূর্বপুরুষ ‘আব্দুল্লাহ ইবনু সাবা-এর অনুসারীদের আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছেন।
عن عكرمة أن عليا رضي الله عنه حرق قوما، فبلغ ابن عباس فقال: لو كنت أنا لم أحرقهم لأن النبي صلى الله عليه وسلم قال: «لا تعذبوا بعذاب الله»، ولقتلتهم كما قال النبي صلى الله عليه وسلم: «من بدل دينه فاقتلوه».
ইকরিমাহ থেকে বর্ণিত যে, আলী رضي الله عنه এক সম্প্রদায়কে (আগুনে) পুড়িয়ে ফেললেন। এই সংবাদ যখন ইবনু আব্বাস رضي الله عنه-এর নিকট পৌঁছাল, তখন তিনি বললেন: “আমি যদি হতাম, তবে তাদেরকে পুড়িয়ে ফেলতাম না; কারণ নবী ﷺ বলেছেন— ‘তোমরা আল্লাহর শাস্তি (আগুন) দিয়ে কাউকে শাস্তি দিও না।’ বরং আমি তাদেরকে (তলোয়ার দিয়ে) হত্যা করতাম, যেমন নবী ﷺ বলেছেন— ‘যে ব্যক্তি তার দ্বীন পরিবর্তন করে, তাকে হত্যা করো’।” [আল-বুখারী ‘আল-সহীহ (৬৫২৪)’-তে বর্ণনা করেছেন]
ইবনু হাজার رحمه الله বলেন:
«وزعم أبو المظفر الإسفراييني في "الملل والنحل" أن الذين أحرقهم علي طائفة من الروافض ادعوا فيه الإلهية، وهم السبائية، وكان كبيرهم عبد الله بن سبأ يهوديا ثم أظهر الإسلام وابتدع هذه المقالة»
“আবু আল-মুযাফফার আল-ইসফরাইয়িনী তাঁর ‘আল-মিলাল ওয়ান নিহাল’ গ্রন্থে দাবি করেছেন যে, আলী رضي الله عنه যাদেরকে পুড়িয়েছিলেন তারা ছিল রাফেযীদের একটি দল যারা তাঁর ব্যাপারে ইলাহিয়্যাতের দাবি করেছিল। তারা ছিল মূলত ‘সাবায়িয়া’ সম্প্রদায়। তাদের প্রধান ছিল ‘আব্দুল্লাহ ইবনু সাবা, যে প্রথমে ইহুদি ছিল, পরে ইসলাম প্রকাশ করে এবং এই (ভ্রান্ত) মতবাদের উদ্ভাবন করে।” [ইবনু হাজার ‘ফাতহুল বারী (১২/২৭০)’-তে বর্ণনা করেছেন এবং এর সনদ ‘হাসান’ বলেছেন]
৫. দাবি: “ইরান একটি মুসলিম দেশ।”
উক্ত দাবির খণ্ডন আমরা উপরে করেছি এবং সালাফগণ রাফেযীদের কাফির মনে করতেন তা স্পষ্ট করেছি। ইরানের রাষ্ট্রীয় ধর্ম ও সংবিধান অনুযায়ী তারা রাফেযী মতবাদ প্রচার করে এবং তাদের নেতারা রাফেযী ইমাম।
৬. দাবি: “তারা মাজলুম, তাই তাদের পক্ষে থাকতে হবে।”
এটি একটি মিথ্যা ও ভ্রান্ত দাবি। ইরানী রাফেযীরা নিজেরাই জালেম এবং তারা লাখ লাখ নিরপরাধ মুসলিমকে হত্যা করেছে। তারা ইয়াহুদীদের চেয়ে অধিক পরিমাণে মুসলিমদের প্রতি জুলুম করেছে। তারা ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, লেবানন, ইয়ামেন সহ অনেক দেশে মুসলিমদের রক্তকে বৈধ করেছে। এমনকি তারা হারামাইন শারিফাইনেও হামলা চালিয়েছে। তারা কখনো মাজলুম নয়, বরং প্রকৃত পক্ষে মাজলুম হলো ওই মুসলিম দেশগুলো যেখানে এই ইরানী মাজুসিরা হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। মুসলিমরা কখনো ইয়াহুদী, ক্রুসেডার এবং রাফেযীদের কোনো একদলের পক্ষ নেয় না; বরং বাতিলের এই দলগুলো যখন একে অপরের বিরুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং পরস্পরকে ধ্বংস করে, তখন তাতে ইমানদারগণ আনন্দিত হয়।
৭. দাবি: “আল্লাহ ন্যায়পরায়ণ কাফির রাষ্ট্রকে সাহায্য করবেন, মুসলিম জালিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে।”
এই কথাটি শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ رحمه الله-এর একটি উক্তির খণ্ডিত ও ভুল ব্যাখ্যা। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার জাগতিক ইনসাফের কথা বলেছিলেন। কিন্তু যখন ইসলামের আকীদাহ-কে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়, তখন তাগুত রাষ্ট্রকে হকের মানদণ্ড বানানো যায় না।
৮. দাবি: “কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক তাদের সাথে ঐক্য করতে হবে; আর এটাই কুরআন বলেছে এবং নবী, সাহাবী ও খুলাফায়ে রাশেদিন তাই করেছেন।”
এটা একটি স্পট মিথ্যা কথা। কুরআন আমাদের ঐক্যের নির্দেশ দিয়েছে ‘হাবলুল্লাহ’ বা আল্লাহর রজ্জুর (কুরআন ও সুন্নাহ) ওপর। যেখানে রাফেযীরা কুরআন, সুন্নাহ ও এর প্রধান বাহক সাহাবীদের অস্বীকার করে, সেখানে তাদের সাথে ঐক্য করা মানে হলো দ্বীনের মূল রজ্জু ছিঁড়ে ফেলা।
আল্লাহ বলেন:
«واعتصموا بحبل الله جميعا ولا تفرقوا»
“আর তোমরা সকলে আল্লাহর রশি দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১০৩]
নবী ﷺ কখনোই কাফিরদের সাথে ঐক্য করেননি, বরং তাদের সতর্ক করেছেন এবং তাদের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। যখন পারস্যের অগ্নিপূজকদের সাথে রোমের যুদ্ধ হচ্ছিল, যা আল্লাহ সূরা রুমে উল্লেখ করেছেন:
«غلبت الروم [٢] فى أدنى الأرض وهم من بعد غلبهم سيغلبون [٣] فى بضع سنين لله الأمر من قبل ومن بعد ويومئذ يفرح المؤمنون [٤]»
“রোমানরা পরাজিত হয়েছে। কাছাকাছি অঞ্চলে; কিন্তু তারা তাদের এ পরাজয়ের পর শীঘ্রই বিজয়ী হবে, কয়েক বছরের মধ্যেই। আগের ও পরের সব ফয়সালা আল্লাহরই। আর সেদিন মুমিনগণ খুশী হবে।” [সূরা রুম, আয়াত ২-৪]
তখন নবী ﷺ (রোম ও পারস্যের যুদ্ধে) কোনো দলের পক্ষ নিয়ে তাদের সাহায্য করেননি কিংবা তাদের সহায়তায় কোনো বাহিনী প্রেরণ করেননি। বর্তমান ইরান যুদ্ধের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন; তাই রোমকদের বিজয়ে সাহাবীদের খুশি হওয়ার ঘটনা দিয়ে বর্তমান ইরানের বিজয়ে খুশি হওয়াকে বৈধ প্রমাণের সুযোগ নেই। কারণ, বর্তমান ইরান এবং ইয়াহুদীরা—উভয় পক্ষই ইসলামের ধ্বংস ও মূলোৎপাটন চায়।
৯. দাবি: “যারা ইরানের পক্ষে দাঁড়াচ্ছে না, তারা ইয়াহূদী-নাসারাদের ভয়ে ভীত।”
এটি একটি ‘ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল’ বা আবেগীয় প্রতারণা মাত্র। আহলুস সুন্নাহর অবস্থান কোনো রাষ্ট্রের ভয় কিংবা চাপের কারণে নয়, বরং দ্বীনের সুরক্ষা ও বিশুদ্ধ আকীদাহর খাতিরে। ইতিহাস সাক্ষী, তাতারীদের আক্রমণে মুসলিম উম্মাহর পতনে এবং বাগদাদের ধ্বংসযজ্ঞে রাফেযীদের বিশ্বাসঘাতকতাই প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল।
এমনকি আধুনিককালেও বিভিন্ন আঞ্চলিক যুদ্ধে তারা মুসলিমদের স্বার্থের বিপরীতে গিয়ে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে। যখন আরব মুসলিমরা ইহুদিদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত ছিল, তখন এই ইরানি রাফেযীরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইয়াহুদী-নাসারাদের স্বার্থ রক্ষা করছিল। তারা নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে বহুবার সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর সাথে আঁতাত করে মুসলিম উম্মাহর পিঠে ছুরিকাঘাত করেছে।
সুতরাং, সঠিক আকীদাহ-র ওপর অটল থাকাকে ‘ভীতি’ বলা চরম অজ্ঞতা ও ধৃষ্টতা ছাড়া কিছুই নয়। জাকির নায়েক সাহেবের এই বক্তব্যগুলো ইসলাম বিরোধী এবং মুসলিমের মাঝে ফিতনাহ সৃষ্টিকারী। উম্মাহর ঐক্যের দোহাই দিয়ে বিষাক্ত আকীদাহ সম্পন্ন অগ্নিপূজক রাফেযীদের-কে গ্রহণ করা মানে হলো ইসলামের শিকড় কেটে ফেলা।
আল্লাহ ﷻ এরকম ভ্রান্ত ব্যক্তিদের অনিষ্ট থেকে আমাদের রক্ষা করুন এবং তাদের অনিষ্ট তাদের দিকেই ফিরিয়ে দিন। আমরা মহান আল্লাহ ﷻ-এর নিকট দু’আ করি, তিনি যেন ইসলামের চিরশত্রু এই রাফেযী এবং ইয়াহুদী—উভয় গোষ্ঠীকেই সমূলে ধ্বংস করেন এবং তাদের ষড়যন্ত্র থেকে মুসলিম উম্মাহকে রক্ষা করেন।