23/06/2026
প্রাচীন ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞান!!
১৭৯৩ সালের দিকের কথা বলছি, ডাক্তার স্কট নামের একজন চিকিৎসক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্যাপ্টেন আরভাইনের কাছ থেকে এক অদ্ভুত গল্প শুনলেন। তখন চৌর্যবৃত্তিসহ বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি হিসেবে অপরাধীদের নাক কেটে দেওয়া খুব প্রচলিত সাজা ছিলো। ফলে ভুক্তভোগীকে আজীবন এই লজ্জা বয়ে নিয়ে বেড়াতে হতো। কিন্তু ক্যাপ্টেন আরভাইন জানালেন, পুনের ‘কুমার’ সম্প্রদায়ের ভেতর এমন কিছু মানুষ আছেন যারা নিখুঁতভাবে কাটা নাক সাড়িয়ে দিতে পারে। তবে এই জ্ঞান নিজেদের নিজস্ব উদ্ভাবন নয় বরং হু বছর ধরে বংশপরম্পরায় অর্জন করেছে এই জ্ঞান। কবে কে উদ্ভাবন করেছিলো এই পদ্ধতি, তারা নিজেরাও জানে না!
এর সমাধান আছে মহর্ষি সুশ্রুত রচিত সুশ্রুত সংহিতায়। তিনি ছিলেন শল্যচিকিৎসার জনক এবং তাঁর রচিত গ্রন্থে (সুশ্রুত সংহিতা) ৩০০+ অস্ত্রোপচারের সরঞ্জামের বর্ণনা রয়েছে। অর্থাৎ মহর্ষি সুশ্রুতের এই জ্ঞানই বংশ পরম্পরায় ধরে রেখেছিলো পুনের কুমার সম্প্রদায়। মহর্ষি সুশ্রুতের বিশাল একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা আছে Royal Australian College of Surgeons (RACS) in Melbourne এর ক্যাম্পাসে। সেখানে স্পষ্ট করে লিখা আছে Father of Surgery.
তবে প্রাচীন ভারতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই উৎকর্ষতা কিন্তু মহর্ষি সুশ্রুতের সময়কালের (৬০০ বিসিই) বহু পূর্বেই শুরু হয়েছিল। বেদ ও পুরাণে ভ্রুণতত্ত্ব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া রয়েছে।
ভ্রুণতত্ত্বঃ
পুং-জনন কোষ (শুক্রাণু) ও স্ত্রীজনন কোষ (ডিম্বাণু) এর নিষেকের ফলে ভ্রূণের উৎপত্তি, বিকাশ ও পূর্ণতা লাভের ফলে নারীর গর্ভে (Womb) শিশুর যে জন্মপ্রক্রিয়া আধুনিক বিজ্ঞানে তাই-ই ভ্রূণতত্ত্ব হিসেবে পরিচিত।
ঋগবেদীয় ঐতরেয় উপনিষদের দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম খণ্ডের প্রথম মন্ত্রে (২/১/১) মহর্ষি মহিদাস বলেছেন,
"পুরুষে হ বা অরমাদিতো গর্ভো ভবতি যদেতদ্রেতঃ।
তদেতৎ সর্বেভ্যঃ অঙ্গেভ্যস্তেজঃ সম্ভূতমাত্মন্যেবাত্মানং বিভর্তি।
তদ্যতা স্ত্রিয়াং সিঞ্চত্যথৈনৎ জনয়তি। তদস্য প্রথমং জন্ম।।"
সরলার্থঃ জীব প্রথমে পুরুষ শরীরেই গর্ভ (বীজ) রূপে থাকে। পুরুষ দেহের শুক্রাণুই সে-ই গর্ভ এবং ইহা (শুক্রাণু) পুরুষ দেহের সমস্ত অবয়ব হতে উৎপন্ন তেজ। পুরুষ যখন এই শুক্রাণু স্ত্রীর দেহে সিঞ্চন করে তখন ইহাই নারীর গর্ভাশয়ে ভ্রূণ জন্ম দেয়৷ তাই পুরুষের শুক্রাণু নির্গমনই জীবের প্রথম জন্ম৷
অর্থাৎ শুক্রাণু যখন পুরুষ দেহ হতে নির্গত হয় তখনই জীবের প্রথম জন্ম হয় এবং তা নারীর দেহ সিঞ্চিত হলে ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হয়ে পূর্ণতা পায় এবং ভ্রূণের জন্ম হয়।
ভ্রূণের বিকাশঃ
আধুনিক ভ্রূণবিদ্যা অনুসারে ভ্রূণ বিকাশের ক্রমটা এরকমঃ
মুখ>ভোকাল কর্ড>নাক>চোখ>কান>ত্বক>হৃদপিণ্ড
ঐতেরেয় উপনিষদ এর প্রথম অধ্যয়ের প্রথম খণ্ডের ৪নং মন্ত্রটি দেখে নেয়া যাক।
"....যথান্ডম মুখাদ্বাগ (মুখাত্ বাক) বাচোহগ্নির্নাসিকে নিরভিদ্যেতাং নাসিকাভ্যাং প্রাণঃ প্রানাদ্বায়ুরক্ষিনী নিরভিদ্যেতামক্ষিভ্যাং চক্ষুশ্চ্ক্ষুষ আদিত্যঃ কর্ণৌ নিরভিদ্যেতাং কর্ণাভ্যাং শ্রোত্রং নিরভিদ্যত ত্বচো....হৃদয়ং নিরভিদ্যত হৃদয়া..."
অর্থাৎ, প্রথম মুখ বেরিয়ে এলো, মুখ থেকে বাক (Vocal cord) এর উত্পত্তি। এরপর নাসিকার দুটি ছিদ্র হলো (নাসারন্ধ্র, পরে চক্ষুর দুটি ছিদ্র প্রকট হলো। তারপর কর্ণের দুটি ছিদ্র বেরিয়ে এলো এবং এরপরেই চর্ম প্রকটিত হলো। তারপর হৃদয় (হৃদপিণ্ড) প্রকট হয়।
এই মন্ত্র হতে আমরা ক্রমটি পাই নিম্মরূপঃ
মুখ>বাক(Vocal cord)>নাক>চক্ষু>কান>ত্বক>হৃদপিণ্ড
আধুনিক বিজ্ঞান ও উপনিষদের মন্ত্রে ভ্রূণের বিকাশের ক্ষেত্রে একই ক্রম পরিলক্ষিত হয়। তাহলে প্রশ্ন হতে পারে হাজার বছর আগে মহর্ষি মহিদাস কোনরূপ বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ছাড়া গর্ভাশয়ে অবস্থিত ভ্রূণের বিকাশ নিয়ে কিভাবে নিরীক্ষণ করেছিলেন? আলট্রাসাউন্ড যন্ত্রের আবিস্কারও খুবই সাম্প্রতিক। ভ্রূণের উৎপত্তি ও বিকাশ নিয়ে আরও বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় মহর্ষি পিপ্পলদা রচিত অথর্ববেদীয় গর্ভোপনিষদে। জার্মান দার্শনিক পল ডুইসেন স্বামী বিবেকানন্দের বেদান্ত প্রচার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে যে ৬০ টি উপনিষদের জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন তার মধ্যে গর্ভোপনিষদও রয়েছে।
মার্কণ্ডেয় পুরাণের ১১শ অধ্যায়, শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের ৩য় স্কন্ধের ৩১তম অধ্যায় ও শিব পুরাণের ধর্ম সংহিতায় ৪২তম অধ্যায়ে ভ্রণের উৎপত্তি ও বিকাশ নিয়ে একদম স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে যা আধুনিক বিজ্ঞানের নিরীক্ষণের সাথে হুবহু মিলে যায়।
© অনিক কুমার সাহা
SPS শাস্ত্র গবেষণা কমিটি
SPS এর প্রকাশিতব্য "তত্ত্বদীপিকা"।
Sanatan Philosophy and Scripture (SPS)