22/08/2026
পুরাণ পরিচয়
#পুরাণ_পর্ব -২
সনাতন ধর্মে পুরাণের স্থানটা আসলে কোথায়? পুরাণ কি আসলেই মান্য? পুরাণ কি আদৌ "সম্মান" করার যোগ্য? সনাতন ধর্মে বেদের মত জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও কেনো পুরাণের মত "অবৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী"-র প্রচলন হয়েছে? - এরকম হাজারো প্রশ্ন আছে আমাদের মনে। কেউ কেউ পুরাণ কে এক বাক্যে অস্বীকার করে দেই, কেউ কল্পকাহিনীর মোড়কে পেঁচিয়ে পুরাণকে পাঠিয়ে দেই রূপকথার দেশে। কেউ তো আবার বলি পুরাণ বেদবিরুদ্ধ গ্রন্থ!! পুরাণের প্রকৃত পরিচয় নিয়েই হবে আজকের আলোচনা।
প্রথমেই জানা যাক “পুরাণ” নামের অর্থ কী -
নিরুক্ত (৩/১৯/২৯) অনুসারে,
পুরাণং কস্মাত্ (পুরাণ নাম কোথা থেকে হলো?) -
পুরা নবং ভবতি। (প্রাচীনকালে এটি নতুন ছিলো।)
অর্থাৎ, এখন যা পুরাণ, পুরাকালে তাই ছিলো নব বা নতুন। পুরা ও নব – এই শব্দদ্বয়ের মিলনে “পুরাণ” শব্দের নিষ্পত্তি। পুরা+নব= পুরানব = পুরাণ।
আধুনিক পন্ডিতদের মতে, ইতিহাস হল অপেক্ষাকৃত নিকট অতীত ঘটনা আর পুরাণ হলো সুদূর অতীত ঘটনা। বিভিন্ন রাজা বা ঋষির বংশ ও কার্যকলাপ, সৃষ্টি তত্ত্ব, ধর্ম তত্ত্ব, আচার বিচার ইত্যাদির আলোচনা নিয়েই পুরাণ। পুরাণের আরও সুনির্দিষ্ট বর্ণনা বিষ্ণুপুরাণের ৩য় অংশ, ৬ষ্ঠ অধ্যায়, শ্লোক- ১৫ তে পাওয়া যায়।
“আখ্যানৈশ্চাপ্যুপাখ্যনৈর্গাথাভিদ্বিজসত্তমা।
পুরাণসংহিতাং চক্রে পুরাণার্থ-বিশারদঃ।।“
অর্থাৎ, পুরাণার্থবিশারদ আখ্যান, উপাখ্যান, গাথা এবং কল্পশুদ্ধিসহ পুরাণসংহিতা রচনা করেন। আখ্যান বলতে বুঝায়, কোনো ঘটনা যা কেউ প্রত্যক্ষ দর্শন করার পর অপরকে বর্ণনা করে। উপাখ্যান বলতে, পরের কাছে শোনা কোনো ঘটনা অপরকে বর্ণনা করা। আর গাথা হল পিতৃপুরুষদের কথা বা পুরাতন কোনো ঘটনা যা মনে রাখার জন্য লোক মুখে শ্লোক আকারে প্রচলিত।
কৌটিল্যের বিখ্যাত “অর্থশাস্ত্র”- তে একত্রে পুরাণ ও ইতিবৃত্তের উল্লেখ পাওয়া যায়।
অর্থশাস্ত্র (১.৫.৩),
“(…..)পশ্চিমমিতিহাস শ্রবণে। পুরাণমিতিবৃত্তমাখ্যায়িকোদাহরণং ধর্মশাস্ত্রমর্থশাস্ত্রং চেতীতিহাসঃ(…..)।”
অর্থাৎ, দিনের শেষভাগে (রাজপুত্র) ইতিহাসশ্রবণের শিক্ষা নেবেন। পুরাণ, ইতিবৃত্ত, আখ্যায়িকা, উদাহরণ মানবাদি ধর্মশাস্ত্র এবং (বার্হস্প্যানি-) অর্থশাস্ত্র- এই গ্রন্থগুলি ইতিহাস-পদের দ্বারা প্রতিপাদ্য।
অর্থশাস্ত্র (৫.৬.১২),
“মুখ্যৈরবগৃহীতং বা রাজানং তৎপ্রিয়াশ্রিতঃ।
ইতিহাসপুরাণাভ্যাং বোধয়েদর্থশাস্ত্রবিৎ ॥ “
অর্থাৎ, মাতুলাদি মুখ্যগণের দ্বারা বশীভূত রাজাকে অর্থশাস্ত্রবেত্তা অর্থাৎ পুরুষার্থপ্রতিপাদক শাস্ত্রে অভিজ্ঞ অমাত্য রাজার প্রিয়জনসমূহের আশ্রয়ে অবস্থান করে (রামায়ণ-মহাভারত প্রভৃতি) ইতিহাস ও পুরাণসাহিত্য থেকে (ধর্ম ও অর্থের তত্ত্ব) রাজাকে শিক্ষা দেবেন।
পুরাণের লক্ষণ কি কি?
সর্গশ্চ প্রতিসর্গশ্চ বংশো মন্বন্তরানি চ।
বংশানুচরিতং চেতি পুরাণং পঞ্চলক্ষণম্।। বায়ুপুরাণ (৪/১০)
পুরাণের প্রাথমিক পাঁচটি লক্ষণ আছে। সর্গ, প্রতিসর্গ, মন্বন্তর, বংশ, বংশানুচরিত। যেকোনো পুরাণেই এই পাঁচটি লক্ষণ থাকতে হবে। এছাড়া বিষ্ণুপুরাণ (৩/৭/২৫), গরুড় পুরাণ (২২৭/১৪)-এও একই লক্ষনের কথা উল্লেখ আছে। ভাগবত পুরাণ (১২/৭/১১-১৯) অনুসারে লক্ষণ গুলো নিয়ে সংক্ষেপে বলা যেতে পারে ।
১. সর্গ - যখন মূল প্রকৃতিতে লীন গুণ ক্ষুব্ধ হয় তখন মহত্তত্ত্বের উৎপত্তি হয়ে থাকে। মহত্তত্ত্ব থেকে তামস, রাজস এবং সাত্ত্বিক, তিন রকমের অহংকার সৃষ্টি হয়। ত্রিবিধ অহংকার থেকে পঞ্চতন্মাত্রা, ইন্দ্রিয় এবং বিষয়সকলের উৎপত্তি হয়। এই উৎপত্তি পরম্পরার নাম 'সর্গ'।
২. প্রতিসর্গ - পরমেশ্বরের অনুগ্রহে সৃষ্টির সামর্থ্য প্রাপ্ত করে মহত্তত্বাদি পূর্ব কর্মানুসারে সদসৎ বাসনার প্রাধান্যানুসারে এই শরীরাত্মক জীবের উপাধি সৃষ্টি করেন, ঠিক সেইভাবেই যেমন এক বীজ থেকে অন্য বীজ উৎপন্ন হয়। এটিকে ‘প্রতিসর্গ’ বা ‘বিসর্গ' বলা হয়।
৩. বংশ - ব্রহ্মাদ্বারা যত রাজার সৃষ্টি হয়েছে, তাদের ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমানকালের সন্তান পরম্পরার নাম 'বংশ'।
৪. বংশানুচরিত - রাজাদের ও তাঁদের বংশধরদের নাম, জীবনী ও কাহিনী নিয়ে 'বংশানুচরিত'।
৫. মন্বন্তর - মনু, দেবতা, মনুপুত্র, ইন্দ্র, সপ্তর্ষি এবং ভগবানের অংশাবতার- এই ছয় বিষয়ের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত সময়কে 'মন্বন্তর' বলে।
তবে এই পাঁচটি লক্ষণ ছাড়াও মহাপুরাণ গুলোতে আরও অন্য পাঁচটি লক্ষনের কথাও পাওয়া যায়।
সর্গোহস্যাথ বিসর্গশ্চ বৃত্তী রক্ষান্তরাণিচ।
বংশ বংশানুচরিতং সংস্থা হেতুরপাশ্রয়ঃ
দশভির্লক্ষণৌর্যুক্তং পুরাণং তদ্বিদো বিদুঃ
কেচিত্পঞ্চবিধং ব্রহ্মমন্ মহদল্পব্যবস্থ্যয়া ।। ভাগবত পুরাণ (১২/৭/৯-১০)
অর্থাৎ, পুরাণের পারদর্শী বিদ্বানদের মতে পুরাণের দশ লক্ষণ হয়ে থাকে। লক্ষণসকল এইরূপ -সর্গ, বিসর্গ, বৃত্তি, রক্ষা, মন্বন্তর, বংশ, বংশানুচরিত, সংস্থা (প্রলয়), হেতু এবং অপাশ্রয়। প্রাথমিকভাবে পুরাণের লক্ষণ পাঁচটি হলেও মহাপুরাণের বিষয়বস্তু বিস্তার করলে দশটি লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়।
বাকী পাঁচটি লক্ষণ সম্পর্কে বলা যায়-
৬. বৃত্তি – চর প্রাণীদের জীবন নির্বাহ সামগ্রী এবং জীবনধারণের উপায়-বিধি বর্ণনা হলো ‘বৃত্তি’।
৭. রক্ষা – শ্রীভগবান যুগে যুগে পশু-পক্ষী, মানব, ঋষি, দেবতাদির রূপে অবতার গ্রহণ করে বহু লীলা সম্পাদন করে থাকেন। এই অবতার গ্রহণকালে তিনি বেদধর্ম বিরোধীদের সংহারও করে থাকেন। তাঁর এই অবতারলীলা বিশ্বের রক্ষা হেতু হয়ে থাকে তাই তা 'রক্ষা' বলে পরিচিত।
৮. সংস্থা – প্রলয় বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এক স্বাভাবিক ঘটনা। প্রলয় চার রকমের হয়ে থাকে যেমন নৈমিত্তিক, প্রাকৃতিক, নিত্য ও আত্যন্তিক। এই প্রলয়ই ‘সংস্থা’ হিসেবে বর্ণিত।
৯. হেতু – পুরাণসকলের লক্ষণরূপে ব্যক্ত 'হেতু' বস্তুত জীব; কারণ বাস্তবে জীবই সর্গ-বিসর্গ আদির হেতু এবং সেই অবিদ্যার হেতু বহু ক্রিয়াকর্মে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে।
১০. অপাশ্রয় – পরমাত্মাকে উপলব্ধি করা। যে তত্ত্ব দ্বারা সৃষ্টি ও প্রলয় হয়, তাই অপাশ্রয় তত্ত্ব বা আশ্রয়, বা পরব্রহ্ম পরমাত্মা।
মূলত এগুলোই পুরাণের বিষয়বস্তু । তবে বাস্তবে পুরাণের আলোচ্য বিষয় শুধু এগুলোর মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো ছাড়াও পুরাণে ভূগোল, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, জ্যোতিষ, সামুদ্রিক শাস্ত্র, শারীরবিদ্যা, ব্যাকরণ, অলংকার, ছন্দ, বাস্তুবিদ্যা, শিল্প, মন্দির-বিগ্রহ নির্মাণ, চিকিৎসাবিদ্যা, পশুচিকিৎসা, বৃক্ষ-আয়ুর্বেদ, অস্ত্রবিদ্যা, রত্নবিজ্ঞান, উপাসনা পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয় আলোচিত হয়েছে। পুরাণে বর্ণিত অনেক বিদ্যা, যেমন, অনুলেপন বিদ্যা, অস্ত্রাগম বিদ্যা ইত্যাদি বর্তমান যুগে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। সামনের দিনে হয়ত স্বেচ্ছারূপধারিণীবিদ্যা, সর্বভূতরুতবিদ্যা, জালন্ধরীবিদ্যা, দেবভূতবিদ্যা বা বজ্রবাহনিকাবিদ্যার মত বিষয়গুলোর সত্যতা নিয়েও কারো সন্দেহ থাকবে না।
অনেকে আবার ব্রাহ্মণ গ্রন্থকেই পুরাণ বলে প্রচারের চেষ্টা করে থাকে, কিন্তু এই দাবি নিতান্তই অমূলক। পুরাণের বিষয়বস্তু, উদ্দেশ্য, লক্ষণ প্রভৃতি কিছুই ব্রাহ্মণ গ্রন্থের সাথে মিলে না। ব্রাহ্মণ গ্রন্থের নিজস্ব পৃথক বিষয়বস্তু, বৈশিষ্ট্য আছে, যা সামনে আলোচিত হবে। তাছাড়া আমরা এখন পর্যন্ত দেখে এসেছি পুরাণের সাথে সবসময় ইতিহাস কথাটি যুক্ত থাকে। স্বয়ং ব্রাহ্মণগ্রন্থেই যে পুরাণ-ইতিহাসের কথা উল্লেখ আছে, তাও আমরা একটু পরে দেখবো। এছাড়া মহাভারতেও পুরাণ বলতে ১৮ মহাপুরাণকে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ১৮ মহাপুরাণ ছাড়াও আরো আছে ১৮ উপপুরাণ, ১৮ ঔপপুরাণ এবং আরো অনেক স্থলপুরাণ ও কুলপুরাণ। এখন পর্যন্ত যতগুলো পুরাণ বা পুরাণ বিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, তার চেয়ে বিপুল সংখ্যক গ্রন্থ এখনো অপ্রকাশিত এবং শুধুমাত্র হস্তলিখিত অবস্থায় আছে।
ব্রাহ্মণ গ্রন্থের লক্ষন কি কি?
ব্রাহ্মণ গ্রন্থের লক্ষণ সম্পর্কে জানার আগে সংক্ষেপে ব্রাহ্মণ গ্রন্থের বেদত্ব সম্পর্কে জেনে নেই। বেদের দুটি অংশ, কর্মকান্ড ও জ্ঞানকান্ড। এর মধ্যে কর্মকান্ডের অন্তর্গত সংহিতা বা মন্ত্র ও ব্রাহ্মণ । আপস্তম্ব শ্রৌতসূত্রে (২৪/১/৩১) – “মন্ত্রব্রাহ্মণয়োর্বেদনামধেয়ম”। অর্থাৎ, মন্ত্র ও ব্রাহ্মণ নিয়েই বেদ। পূর্বমীমাংসাসূত্রে (২/১/৩৩) জৈমিনি বলেছেন, “শেষে ব্রাহ্মণশব্দঃ'” অর্থাৎ বেদের মন্ত্রভাগ ব্যতীত শেষ অর্থাৎ অবশিষ্ট অংশের নাম ব্রাহ্মণ। এই প্রসঙ্গে ডঃ যোগীরাজ বসুর “বেদের পরিচয়” গ্রন্থের কিছু অংশ উদ্ধৃত করা হলো-
“দয়ানন্দ সরস্বতী প্রমুখ কেহ কেহ বলেন সংহিতা বা মন্ত্রভাগের বেদত্ব আছে, ব্রাহ্মণের বেদত্ব নাই। অর্থাৎ বেদ বলিতে সংহিতা বা মন্ত্র বুঝায়, ব্রাহ্মণ বুঝায় না। কিন্তু এই মত যুক্তিযুক্ত নহে। পূর্বাচার্যগণ ব্রাহ্মণের বেদত্ব স্পষ্টভাষায় স্বীকার করিয়া গিয়াছেন। পূর্বমীমাংসাসূত্রে জৈমিনি ব্রাহ্মণের লক্ষণ করিয়াছেন, 'শেষে ব্রাহ্মণশব্দঃ' অর্থাৎ বেদের মন্ত্রভাগ ব্যতীত শেষ অর্থাৎ অবশিষ্ট অংশের নাম ব্রাহ্মণ। এই সূত্রে ব্রাহ্মণের বেদত্ব সুপ্রতিপন্ন। অধিকন্তু বেদের কর্মকাণ্ড লইয়া পূর্বমীমাংসা দর্শন রচিত। এই দর্শনের যতগুলি অধিকরণ, সমস্ত ব্রাহ্মণগ্রন্থের বিষয় ও প্রবচনাদি লইয়া রচিত, সংহিতা প্রবচন লইয়া রচিত নহে। অতএব দয়ানন্দ সরস্বতী যে ব্রাহ্মণের বেদত্ব অস্বীকার করিয়াছেন তাহা সমীচীন ও যুক্তিযুক্ত নহে।“ ( ডঃ যোগীরাজ বসু, বেদের পরিচয়, ব্রাহ্মণ গ্রন্থের বেদত্ব, পৃষ্ঠা-১৪ )
এবার ব্রাহ্মণ গ্রন্থের লক্ষনে আসা যাক। মহর্ষি আপস্তম্বের মতে— “কর্মচোদনা ব্রাহ্মণানি” । অর্থাৎ, যাগযজ্ঞাদি কর্মের নির্দেশমূলক শাস্ত্রই ব্রাহ্মণ। তাঁর মতে মুখ্যতঃ ছয়টি বিষয় ব্রাহ্মণে আলোচিত- বিধি, অর্থবাদ, নিন্দা, প্রশংসা পুরাকল্প ও পরকৃতি।
১. বিধি - বিশেষ বিশেষ কর্ম অনুষ্ঠানের জন্য যে নির্দেশ রয়েছে তাই বিধি। যেমন, স্বর্গ কামনায় অগ্নিহোত্র যজ্ঞ বা বৃষ্টি কামনায় যজ্ঞ ইত্যাদি বিধিবাক্য। যার দ্বারা কর্তব্যরূপে বিধানের জ্ঞান পাওয়া যায় তাকেই বিধি বলা হয়।
২. অর্থবাদ - নিছক বর্ণনামূলক বা প্রশংসামূলক বা অলঙ্কারমূলক বাক্যগুলিকেই অর্থবাদ বলে। এসব বাক্য কোন কর্মের প্রতিপাদক বা বিধি নয়; এগুলি নিছক প্রশংসা বা অর্থবাদ। অর্থবাদগুলোয় যজ্ঞফলের প্রশংসা বা প্রশস্ততা করলে মানুষের প্রবৃত্তি বর্ধিত হয় এবং মানুষের শক্তি বর্ধিত হলে বিধিশক্তিও অব্যাহত থাকে। এই কারণে অর্থবাদগুলো বিধিশক্তির উত্তেজক। অর্থবাদ মন্ত্রগুলোর যজ্ঞীয়বিধান থেকে বিচ্ছিন্নভাবে কোনো স্বতন্ত্র তাৎপর্য বা সার্থকতা নেই। এগুলো একধরনের অলঙ্কারমূলক অতিশয়োক্তিমূলক বাক্য; যার দ্বারা বিধিকেই পুষ্ট করা হয়।
ধরা যাক, কবি বললেন, মুখ চন্দ্রের ন্যায়- তখন নিশ্চয়ই তিনি বলতে চাননি যে মুখটি চাঁদের মতো সাদা গোলক, বায়ুশুন্য, ধুলাবালি ও খানা-খন্দ যুক্ত এবং মুখটি পৃথিবীর চারপাশে প্রদক্ষিন করছে! কবি চাঁদের উপমা দিয়ে বলতে চেয়েছেন যে মুখটি স্নিগ্ধতা এবং সৌন্দর্যে চন্দ্রতুল্য। অবশ্যই তিনি বাড়িয়ে বলেছেন, কিন্তু এই অতিশয়োক্তি দোষের কিছু নয়। তবে, "অর্থবাদবাক্যানং শাস্ত্রার্থে প্রামান্যাং ন ভবতি "। অর্থাৎ, অর্থবাদ বাক্য গুলো কখনো শাস্ত্র বিচারে প্রমাণ হতে পারেনা। অর্থবাদের আড়ালে যেই তত্ত্ব থাকে, তার ওপরেই শাস্ত্রার্থ জন্মে।
৩. নিন্দা - বিরোধী মতের সমালোচনা, খন্ডন ও পরিহার করা হলো নিন্দা। এতে প্রতিপক্ষ দলের নিন্দা ও দোষ দেখানো হয়ে থাকে।
৪. প্রশংসা – স্তুতি। বিধেয় কর্মের স্তুতির মাধ্যমে উক্ত কর্মে প্রবৃত্তির জন্য যাজ্ঞিককে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে যে বাক্য, তাই প্রশংসা।
৫. পুরাকল্প - অতি প্রাচীনকালের কীর্তিকাহিনী বা প্রাচীনকালে যে সকল যজ্ঞ সম্পাদিত হয়েছিল সেগুলোর বর্ণনাকে "পুরাকল্প" বলা হয়েছে।
৬. পরকৃতি - পরের কৃতি বা কাজকে পরকৃতি বলা হয়। পরকৃতি দ্বারা যজ্ঞে অভিজ্ঞ পুরোহিতগনের কীর্তি, বিশ্রুত নৃপতিগনের যজ্ঞ, দান-দক্ষিনার কাহিনি বোঝানো হয়।
সায়ানাচার্যের মতে ব্রাহ্মনের লক্ষণ শুধু দুটি- বিধি ও অর্থবাদ, এবং বাকী চারটি লক্ষণ অর্থবাদের অন্তর্গত।
শাবরভাষ্য মতে, ব্রাহ্মণের আলোচ্য বিষয় দশটি- হেতু, নির্বচন, নিন্দা, প্রশংসা, পুরাকল্প, সংশয়, বিধি, পরক্রিয়া, উপমান, এবং ব্যবধারন কল্পনা।
সুতরাং, বোঝা যাচ্ছে পুরাণ ও ব্রাহ্মণ গ্রন্থের বিষয়, লক্ষণ ও উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ আলাদা। ব্রাহ্মণকে বেদ না বলে পুরাণ বলে প্রচার করা জ্ঞান ও বোধগম্যতার অভাবের কারনেই সম্ভব! সনাতন শাস্ত্র থেকে প্রকৃত পুরাণসমূহকে বাদ দেওয়ার এবং ব্রাহ্মণগ্রন্থকে জোর করে “পুরাণ” নামকরন করার চেষ্টা কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর দ্বারা নিজেদের দলীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার ব্যর্থ পদক্ষেপ মাত্র।
SPS শাস্ত্র গবেষণা কমিটি
Sanatan Philosophy and Scripture (SPS)