23/05/2026
ভগবান সূর্য নারায়ণ: বৈদিক ও উপনিষদীয় দৃষ্টিতে ব্রহ্মতত্ত্বের এক প্রত্যক্ষ প্রতীক
সনাতন ধর্মে সূর্যকে আমরা ‘প্রত্যক্ষ দেবতা’ ও ‘জগতের চক্ষু’ বলে জানি। গায়ত্রী মন্ত্র দ্বিজদের নিত্যপাঠ্য। কিন্তু শাস্ত্রের গভীর পর্যালোচনায় দেখা যায়, সূর্য কেবল জ্যোতির্ময় দেবতা নন; তাকে বহু ক্ষেত্রে ব্রহ্মতত্ত্বের প্রত্যক্ষ প্রকাশ বা উপাসনার প্রতীকরূপেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই লেখায় শাস্ত্রের বিভিন্ন স্তরের প্রমাণ উপস্থাপন করা হবে – যেখানে বেদ ও উপনিষদের মন্ত্র থেকে শুরু করে পুরাণ ও পরবর্তী স্তোত্রপরম্পরা পর্যন্ত সূর্যের মহিমা বর্ণিত হয়েছে।
১. বেদের সাক্ষ্য ও শ্রুতি প্রমাণ
ঋগ্বেদ ১.১৬৪.৪৬ – একমেবাদ্বিতীয়ম্ ভাবনার ভিত্তি
“একং সদ্ বিপ্রা বহুধা বদন্তি” – পরম সত্তা এক; পণ্ডিতেরা তাঁকে নানা নামে ডাকেন – কেউ অগ্নি, কেউ বায়ু, কেউ যম। এই মন্ত্রটি সনাতন দর্শনের অদ্বৈত ভাবনার প্রাচীনতম ভিত্তি। একই সাথে স্বগুণ ব্রহ্মের প্রকাশ যে কেবল নির্দিষ্ট নাম বা ভাবে সীমাবদ্ধ নেই তাঁরও জোরদার প্রমাণ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত ।
সূর্য বিশ্বের আত্মা ভাব আমরা দেখি ঋগ্বেদের ১.১১৫.১ মন্ত্রে , যেখানে ঘোষণা করা হয়েছে – “সূর্য আত্মা জগতস্তস্থুষশ্চ”। অর্থাৎ সূর্য স্থাবর ও জঙ্গম – সমগ্র জগতের আত্মাস্বরূপ। এই মন্ত্রটি বৈদিক সাহিত্যে সূর্যকে কেবল দেবতা না বলে বিশ্বাত্মা হিসেবে চিহ্নিত করার ভিত্তি। যা পরবর্তী বৈদান্তিক ভাষ্যগুলোতে এই মন্ত্রের ব্যাখ্যায় সূর্যকে অন্তর্যামী চৈতন্যের প্রতীক রূপে দেখা হয়েছে।
গায়ত্রী মন্ত্র ও ‘ভর্গ’ তত্ত্ব (ঋগ্বেদ ৩.৬২.১০) – “তৎ সবিতুর্বরেণ্যং ভর্গো দেবস্য ধীমহি। ধিয়ো যো নঃ প্রচোদয়াৎ”। ‘সবিতা’ হলো সূর্যের প্রসবকারী সত্ত্বারূপী দিক। ‘ভর্গ’ শব্দের অর্থ তেজ। বৈদান্তিক ব্যাখ্যায় ‘ভর্গ’ শব্দকে ‘ব্রহ্মতেজ’ বা দিব্য আলো বলে বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ গায়ত্রী মন্ত্রের ধ্যান কেবল সূর্যের জ্যোতির নয়, বরং সেই পরম ব্রহ্মের তেজেরই ধ্যান। এই কারণেই গায়ত্রী জপকে ব্রহ্মোপাসনার একটি রূপ গণ্য করা হয়।
একই সত্তার বহুরূপ প্রকাশ - শুক্ল যজুর্বেদের ৩২.১ মন্ত্রে বলা হয়েছে – “তদেবাগ্নিস্তদাদিত্যস্তদ্বায়ুস্তদু চন্দ্রমাঃ”। অর্থাৎ একই ‘তৎ’ (পরম সত্তা) অগ্নি, আদিত্য (সূর্য), বায়ু ও চন্দ্ররূপে প্রকাশিত। সায়ানাচার্যে মতো বৈদান্তিক ও ভাষ্যকারদের ব্যাখ্যায় এই মন্ত্রকে বহুরূপে এক সত্তার প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়। সূর্য এদের মধ্যে প্রধান ও প্রত্যক্ষতম।
সূর্য অগ্নি ও প্রাণের উৎস - ঐতরেয় ব্রাহ্মণের প্রথম অধ্যায়ে বলা হয়েছে যে, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টির পর সর্বপ্রথম অগ্নি উৎপন্ন হয়, এবং সেই অগ্নির তেজ থেকেই সূর্যের উৎপত্তি। অগ্নি ও সূর্যকে একই তেজের দুই রূপ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। পরবর্তী বেদান্ত ব্যাখ্যায় এই তেজকে ব্রহ্মতেজ বলে উল্লেখ করা হয়।
ছান্দোগ্য উপনিষদের ১.৬.৬ মন্ত্রে বলা হয়েছে – “আদিত্যো ব্রহ্মেত্যাদেশঃ” – অর্থাৎ ‘আদিত্যই ব্রহ্ম’ – এই উপদেশ। আরও স্পষ্ট করে ৩.১৯.১ মন্ত্রে বলা হয়েছে – “আসৌ ব আ আদিত্যো ব্রহ্ম” – অর্থাৎ এই যে আকাশের সূর্য, তিনি ব্রহ্ম। বৈদান্তিক ভাষ্যগুলোতে এই উক্তিগুলোকে সগুণ ব্রহ্মের উপাসনার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ দৃশ্যমান সূর্যকে অবলম্বন করে অদৃশ্য ব্রহ্মে পৌঁছানোর পথ।
মৈত্রী উপনিষদের ৬.৩৫ মন্ত্রে বলা হয়েছে – “যোঽসাবাসৌ আদিত্যে পুরুষঃ সোহসাবহমস্মি”। অর্থাৎ আদিত্যের মধ্যে যে পুরুষ (চৈতন্যস্বরূপ) বিরাজমান, তিনিই আমি। এটি ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ মহাবাক্যের সূর্য সংস্করণ। এখানে উপাসনার চূড়ান্ত অবস্থা বর্ণিত – যেখানে উপাসক নিজেকে সূর্য ও ব্রহ্ম থেকে পৃথক মনে করেন না। এই মন্ত্রটি সর্বসম্মত।
এছাড়াও সূর্যোপনিষদ প্রচলিত সংস্করণে প্রথম মন্ত্রে বলা হয়েছে – ওঁ সূর্যদেবো ব্রহ্ম। সূর্যদেবো বিষ্ণুঃ। সূর্যদেবো রুদ্রঃ। সূর্যদেবঃ সাক্ষান্নারায়ণঃ।” দ্বিতীয় মন্ত্রে – “সূর্যাত্মকমিদং সর্বং। সূর্যাদেব নান্যদস্তি।” পঞ্চম মন্ত্রে – “সূর্যএব পরং ব্রহ্ম। সচ্চিদানন্দমাত্রম্।”
তাঁরপরে কঠোপনিষদের সেই ২.২.১১ মন্ত্রটি যা অত্যন্ত বিখ্যাত – “ন তত্র সূর্যো ভাতি ন চন্দ্রতারকং নেমা বিদ্যুতো ভান্তি কুতোঽয়মগ্নিঃ। তমেব ভান্তমনুভাতি সর্বং তস্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি॥”
অর্থাৎ সেই ব্রহ্ম-সত্তায় সূর্য ভাসেন না, চন্দ্র-তারাও না, বিদ্যুৎও না, অগ্নি তো দূরের কথা। যিনি ভাসেন, তাঁর পশ্চাতে সব ভাসে; তাঁর আলোয় এই সব আলোকিত। এই মন্ত্র সূর্যকে ব্রহ্মের আলোর অধীনস্থ করলেও, সৌর উপাসনা পদ্ধতিতে সূর্যকে সেই ব্রহ্মের প্রত্যক্ষতম প্রতীক ও উপাস্য বিগ্রহ হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
তাঁর পরে আসে তৈত্তিরীয় আরণ্যকের ১০.১.১ মন্ত্রটি যা সূর্যগায়ত্রী নামে পরিচিত – “ওঁ আসাবাদিত্যো ব্রহ্মেতি ব্রহ্ম”। অর্থাৎ ওঁ, এই সূর্যই ব্রহ্ম, তিনি ব্রহ্ম। ‘ইতি ব্রহ্ম’ শব্দের পুনরাবৃত্তি জোর দিয়ে বোঝাচ্ছে যে এতে কোনো সংশয় নেই। এই মন্ত্র প্রতিদিনের সন্ধ্যোপাসনায় ব্যবহৃত হয়।
ব্যাকরনিক দিক থেকে দেখলেও ‘সূর্য’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি – ‘সু’ ধাতু থেকে, যার অর্থ প্রসব করা বা চালিত করা। সেই সূত্রে ‘সূর্য’ অর্থ – যিনি সমস্ত কিছু প্রসব করেন ও গতিশীল রাখেন। নিরুক্তকার যাস্ক (নিরুক্ত ১২.২০) বলেছেন – “সূর্যো ভবতি সর্বস্য প্রসবিতৃ” – সূর্য সবকিছুর প্রসবকারী। ‘আদিত্য’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি – ‘অদিতি’ থেকে, যার অর্থ বন্ধনহীনতা, সীমাহীনতা। ‘আদিত্য’ অর্থ – যিনি সীমাহীন ও সর্বব্যাপী। এটি ব্রহ্মেরই লক্ষণ। ‘সবিতা’ মানে প্রসবকারী, ‘ভর্গ’ মানে দীপ্ত তেজ – বৈদান্তিক ব্যাখ্যায় ব্রহ্মতেজ। এই শব্দগত বিশ্লেষণ সূর্যকে সৃষ্টির মূল কারণ ও চৈতন্যস্বরূপের কাছাকাছি নিয়ে আসে।
২। পুরাণ ও ধর্মশাস্ত্রে সূর্য
শুরু করছি আমাদের সবার প্রিয় আদিত্য হৃদয়ম্ স্তোত্র দিয়ে বাল্মীকি রামায়ণের যুদ্ধকাণ্ডের অন্তর্গত। ঋষি অগস্ত্য যুদ্ধক্ষেত্রে রামকে এই স্তোত্রটি শেখান। সেখানে স্পষ্ট উক্তি – “এষ ব্রহ্মা চ বিষ্ণুশ্চ শিবঃ স্কন্দঃ প্রজাপতিঃ”। অর্থাৎ তিনিই ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, স্কন্দ ও প্রজাপতি। এই স্তোত্রটি সূর্যের মধ্যে সমস্ত দেবতার সমাবেশ দেখায় এবং সূর্যকে পরমব্রহ্মের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। স্তোত্রটির প্রামাণ্যতা ও অখণ্ডতা সর্বজনস্বীকৃত।
বিষ্ণু পুরাণের দ্বিতীয় অংশের অষ্টম অধ্যায়ে সূর্যকে বিষ্ণু বা নারায়ণের প্রকাশরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে সূর্যমণ্ডলের মধ্যে বিষ্ণুশক্তির অবস্থান এবং সূর্যের সর্বদেবময় রূপের ধারণা পাওয়া যায়। পরবর্তী সৌর ও বৈষ্ণব পরম্পরায় এই ভাবধারা “সূর্য নারায়ণ” ধারণাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে।
শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণে সূর্যকে বিশ্বজীবনের ধারক, কালচক্রের নিয়ন্তা এবং ভগবানের দৃশ্যমান শক্তিরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। বিশেষত পঞ্চম স্কন্ধে সূর্যমণ্ডল, তার গতি ও জগতের উপর তার প্রভাবের বিশদ আলোচনা পাওয়া যায়। যদিও ভাগবতে সূর্যকে সরাসরি ‘পরব্রহ্ম’ বলা হয়নি, তথাপি তাঁকে বিশ্বব্যাপী চৈতন্য ও ঈশ্বরীয় শক্তির এক প্রত্যক্ষ প্রকাশরূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের সৌর-মাহাত্ম্য বর্ণনাকারী অংশে সূর্যকে পরম জ্যোতি ও ব্রহ্মস্বরূপ বলে বন্দনা করা হয়েছে। নির্দিষ্ট শ্লোকের পরিবর্তে পুরাণের সামগ্রিক বর্ণনার ভিত্তিতে এই উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে।একই ভাবে কূর্মপুরাণের পূর্বভাগে সূর্যকে ‘বিশ্বাত্মা’ ও ‘সর্বগত’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে – যিনি আত্মা, তিনিই সূর্যরূপে বিরাজমান। এটি সূর্য ও ব্রহ্মের অভেদের ইঙ্গিত দেয়।
৩। বিবিধ স্ত্রোত্র ও মান্য আচার্যের উক্তি
ভগবতপাদ শঙ্করাচার্যের বিরচিত‘ব্রহ্মজ্ঞানাবলীমালা’ স্তোত্রে আত্মাকে ‘সচ্চিদানন্দরূপ’, ‘পরমজ্যোতি’ ও ‘স্বয়ংজ্যোতি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। যদিও সেখানে সূর্যের সরাসরি উল্লেখ নেই, তথাপি বৈদান্তিক ব্যাখ্যায় এই আত্মজ্যোতি ও ব্রহ্মতেজের ধারণাকে সৌর প্রতীকের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা হয়েছে।
পরবর্তী সৌর স্তোত্রসাহিত্যে সূর্যকে ‘সকলভুবননেত্র’ ও ‘বিশ্বদীপ’ রূপে বন্দনা করা হয়েছে। প্রচলিত ‘সূর্য পঞ্জর স্তোত্রম্’-এর প্রথম শ্লোকে সূর্যকে সমগ্র জগতের চক্ষু ও বিশ্বপ্রদীপরূপে কল্পনা করা হয় — যা বৈদিক ‘সূর্য আত্মা জগতস্তস্থুষশ্চ’ ভাবনারই এক ভক্তিমূলক সম্প্রসারণ।
ভবিষ্য পুরাণের ব্রাহ্মপর্বে সূর্য সহস্রনামের বর্ণনা আছে। বিভিন্ন সংকলনে এই সহস্রনামে ‘পরব্রহ্মণে’, ‘ব্রহ্মরূপায়’, ‘সচ্চিদানন্দরূপায়’, ‘সর্বাত্মনে’, ‘নিরাকারায়’, ‘ওঁকারবাচ্যায়’ ও ‘বিশ্বরূপায়’ – এই নামগুলি সূর্যকে পরমব্রহ্মের প্রতীক হিসেবে বন্দনা করে।
---
৪। সৌর সম্প্রদায় ও সৌরদর্শন প্রসঙ্গ
প্রাচীনকালে সৌর সম্প্রদায় নামে একটি স্বতন্ত্র ধারা বিদ্যমান ছিল – যারা সূর্যকে পরমসত্তার প্রতীক বা উপাস্য দেবতা হিসেবে পূজা করত। এই সম্প্রদায়ের উল্লেখ মহাভারত, পুরাণ ও তন্ত্রগ্রন্থে পাওয়া যায়। প্রাচীনকালে মগধ, উজ্জয়িনী ও কাশ্মীরে সৌর মন্দির বিশেষভাবে বিখ্যাত ছিল। মুলতান ও কোণার্কের সূর্য মন্দির বিশ্ববিখ্যাত। বর্তমানে স্বতন্ত্র সৌর সম্প্রদায় অনেকটাই লুপ্ত, তবে গায়ত্রী জপ, সূর্যনমস্কার ও আদিত্য হৃদয়ম্-এর মাধ্যমে সৌর উপাসনা আজও জীবিত।
সৌর উপাসনাকে কেন্দ্র করে একটি স্বতন্ত্র ধর্মদর্শন ও সাধনাপদ্ধতি গড়ে উঠেছিল। এই দর্শনের মতে উপনিষদের ‘তত্ত্বমসি’ মহাবাক্য এখানে ‘সূর্য ত্বমসি’ রূপ নেয়। ভক্ত যখন সূর্যের ধ্যান করে, তখন সে নিজের আত্মার মধ্যেই সেই সূর্যকে দেখতে পায়। বাহিরের সূর্য আর ভেতরের আত্মা – একই সত্তার দুই রূপ।
তবে বর্তমানে প্রচলিত সৌর উপাসনার পদ্ধতির মধ্যে আছে:
- গায়ত্রী জপ – প্রতিদিন সকাল-দুপুর-সন্ধ্যায় সূর্যকে প্রণাম ও গায়ত্রী মন্ত্র জপ।
- সূর্যনমস্কার – বার বার প্রণাম করে সূর্যের বারোটি নাম (মিত্র, রবি, সূর্য, ভানু, খগ, পূষণ, হিরণ্যগর্ভ, মরীচি, আদিত্য, সাবিত্র, অর্ক, ভাস্কর) উচ্চারণ।
- পঞ্চদেবতার সৌর ধ্যান – সূর্যকে লাল ও সোনালি রঙের, হাতে পদ্ম ও চক্র ধারণকারী, সপ্ত অশ্বের রথে আরোহী রূপে কল্পনা করে ধ্যান।
- ত্রাটক যোগ – উদীয়মান সূর্যের দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে একাগ্রতা ও তৃতীয় নয়নের জাগরণ।
যোগশাস্ত্রে সূর্যকে প্রাণশক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। হঠযোগপ্রদীপিকা অনুসারে, পিঙ্গলা নাড়ি সৌরশক্তির বাহক এবং মণিপুর চক্র সূর্যের আবাস। সূর্যনমস্কার ও ত্রাটক ভগবান সূর্যের আধ্যাত্মিক চেতনাকে জাগ্রত করার জন্য বিধৃত। এগুলো সূর্যকে কেবল বাহ্যিক দেবতা না বলে অন্তরের চৈতন্যরূপে প্রতিষ্ঠিত করে।
৫। বিশ্বসাহিত্যে সূর্যের প্রাসঙ্গিকতা
শুধু ভারতীয় শাস্ত্রই নয়, প্রাচীন পারস্যের জরাথুস্ট্রবাদে সূর্যকে ‘আহুর মাজদা’র জ্যোতির প্রতীক মনে করা হতো। গ্রিক পৌরাণিক কাহিনিতে অ্যাপোলো ছিলেন আলো ও জ্ঞানের দেবতা। প্রাচীন মিসরে সূর্য দেবতা ‘রা’ কে সৃষ্টির মূল কারণ বলে পূজা করা হতো। তবে সনাতন ধর্মের বিশেষত্ব হলো – এখানে সূর্যকে কেবল দেবতা না বলে স্বয়ং ‘তৎ’ বা ‘ব্রহ্ম’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে, যা তাকে অনন্য মর্যাদায় আসীন করেছে।
বেদ ও উপনিষদের মন্ত্র, পুরাণের বর্ণনা, বা ভগবৎপাদ শঙ্করাচার্যের স্তোত্র এবং সৌর উপাসনা পদ্ধতি – সর্বত্র সূর্যকে পরমব্রহ্মের প্রত্যক্ষ প্রতীক বা বিশ্বাত্মার দৃশ্যমান রূপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি ‘আদিত্য’, ‘সবিতা’, ‘ভর্গ’, ‘আত্মা’ – প্রতিটি নামেই ব্রহ্মের দ্যোতনা বহন করেন। বেদ ও উপনিষদ (শ্রুতি) সর্বোচ্চ, পুরাণ ও ইতিহাস (স্মৃতি) দ্বিতীয় স্তরে, আর পরবর্তী স্তোত্র ও সম্প্রদায় গ্রন্থগুলি তৃতীয় স্তরে। তবু সব মিলিয়ে একটি স্পষ্ট ধারা ফুটে ওঠে – সূর্য নারায়ণ কেবল দেবতারুপী জগতের চক্ষু নন, তিনি সচ্চিদানন্দ পরমব্রহ্মের প্রত্যক্ষ প্রতীক।
ॐ সূর্যদেবায় নমঃ।
সম্পাদনা – শ্রী রবিন দে
(পঞ্চদেবতার ব্রহ্মত্ব সিরিজ চলবে , অনুমতি ব্যতীত অনুলিপি বর্জনীয়)
তথ্যসূত্র ও নির্দেশিত গ্রন্থাবলি
- ঋগ্বেদ ১.১১৫, ১.১৬৪, ৩.৬২, ১০.৯০
- শুক্ল যজুর্বেদ ৩২.১
- ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ১.১
- ছান্দোগ্য উপনিষদ ১.৬, ৩.১৯
- তৈত্তিরীয় আরণ্যক ১০.১
- মৈত্রী উপনিষদ ৬.৩৫
- কঠোপনিষদ ২.২
- সূর্যোপনিষদ (মুক্তিকা তালিকার ৩৯তম – প্রচলিত পাঠ)
- সূর্য পুরাণ (পদ্মপুরাণের সূর্যখণ্ড)
- ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ – সৌর-মাহাত্ম্য প্রসঙ্গ
- স্কন্দপুরাণ (সূর্য খণ্ড)
- কূর্মপুরাণ (পূর্বভাগ)
- শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ
- বিষ্ণু পুরাণ ২.৮ (প্রচলিত বর্ণনা)
- আদিত্য হৃদয়ম্ (বাল্মীকি রামায়ণ, যুদ্ধকাণ্ড)
- ভবিষ্য পুরাণ (ব্রাহ্মপর্ব – সূর্য সহস্রনাম প্রচলিত পাঠ)
- সৌর সম্প্রদায় ও উপাসনা প্রসঙ্গে: সৌর সংহিতা, সূর্যসিদ্ধান্ত (দার্শনিক ভূমিকা)
- আদি শঙ্করাচার্য – সূর্যপঞ্চরত্নম্ ও ব্রহ্মজ্ঞানাবলীমালা
- পাণিনি – অষ্টাধ্যায়ী (৩.১.১৪০ প্রসঙ্গে)
- যাস্ক – নিরুক্ত (১২.২০)
- হঠযোগপ্রদীপিকা (পিঙ্গলা নাড়ি ও মণিপুর চক্র প্রসঙ্গ)