03/09/2026
বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত কিন্তু বিতর্কিত বিষয় গুলোর একটি হলো ‘ধর্ম’। যার নামে না জানি কত যুদ্ধ, কত অভিযান চলে এসেছে, চলছে এবং হয়তো চলতেই থাকবে। তবে সংস্কৃতের এই 'ধর্ম' শব্দটির বিষয়ে যখনই ব্যাখ্যা করা হয় তখনই সেটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে 'ধৃ' ধাতু উল্লেখ করে বলা হয় যে, এর অর্থ হলো 'ধারণ করার যোগ্য হওয়া'। মানে যাহা কিছু ধারন করার যোগ্য তাহাই "ধর্ম"। আর এই সূত্র ধরেই ধর্মের ১০টি লক্ষণের কথা বলা হয়, যার অর্থ দাঁড়ায় এই ১০টি বিষয় ধারণ করার যোগ্য এবং এগুলো ধারণ করার পর যেকোনো ব্যক্তিকে 'ধার্মিক' বলা যেতে পারে।
মনুস্মৃতি (৬/৯২)
ধৃতিঃ ক্ষমা দমোऽস্তেয়ং শৌচমিন্দ্রিয়নিগ্রহঃ। ধীর্বিদ্যা সত্যমক্রোধো দশকং ধর্মলক্ষণম্॥
যার অর্থ:- ১. ধৃতি (ধৈর্য) ২. ক্ষমা (সহনশীলতা বা ক্ষমাশীলতা) ৩. দম (মনের সংযম বা আত্মনিয়ন্ত্রণ)
৪. অস্তেয় (অচৌর্য বা চুরি না করা) ৫. শৌচ (শারীরিক ও মানসিক পবিত্রতা) ৬. ইন্দ্রিয়নিগ্রহ (ইন্দ্রিয়কে বশীভূত রাখা) ৭. ধী (সদ্বুদ্ধি বা বিবেক) ৮. বিদ্যা (প্রকৃত জ্ঞান বা আত্মজ্ঞান) ৯. সত্য (সত্যবাদিতা) ১০. অক্রোধ (ক্রোধহীনতা বা রাগ না করা) এই ১০টি হলো ধর্মের মূল লক্ষণ।
কিন্তু লক্ষ্য করুন, প্রকৃতপক্ষে এগুলো সার্বিকভাবে ধর্মের লক্ষণ নয়, বরং ধার্মিক মানুষের লক্ষণ। মূলত এই ১০টি লক্ষণের মাধ্যমে আপনি ধর্মকে নয়, বরং ধার্মিক মানুষকে চিনতে পারবেন। অথবা বড়জোর বলা যেতে পারে যে, মানুষের ধারণ করার যোগ্য ধর্মের লক্ষণ এগুলো। তবে মনে রাখবেন, এগুলো কেবল মানবধর্মের লক্ষণ। অন্যান্য প্রজাতি যেমন পশু-পাখিদের মধ্যে এই লক্ষণগুলো দেখাই যেতে পারে না, আর না এই জড় জগৎকে এই লক্ষণগুলোর মাধ্যমে ধর্মের সংজ্ঞায় বাঁধা সম্ভব। তাহলে নিশ্চয়ই এটা ভাবছেন যে ধর্ম কে আমরা যারা মহাজাগতিক বলে মানি তবে কী সেটা মিথ্যা? চিন্তিত হবেন না, এখানে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই, কারণ এই শ্লোকটি কেবল এবং শুধুই মানুষের আচরণযোগ্য অর্থাৎ ধারণযোগ্য ধর্মের ১০টি লক্ষণের কথা বলা হয়েছে বাকিদের জন্য না। কিন্তু 'সনাতন' বা চিরন্তন- এর মতো বিশেষণে ভূষিত যে ধর্ম প্রতি অণু-পরমাণুতে ব্যাপ্ত বলা হয়, সেখানে পৌঁছাতে হলে আমাদের এর বৈজ্ঞানিক রূপটিকে সবার আগে বুঝতে হবে। তবে আমরা বুঝতে পারব আসলে "ধর্ম" শাশ্বত,সনাতন এবং মহাজাগতিক কিভাবে। তাহলে চলুন, জেনে নেওয়া যাক ধর্মের বৈজ্ঞানিক স্বরূপ।
ধর্ম হলো সেই বিষয় যা জানা, বোঝা বা আচরণে আনার পর মানুষের মধ্যে সেই ১০টি লক্ষণ প্রকাশ পায়। ধর্মকে মুক্তির দিকে যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
মীমাংসা দর্শনের প্রথম সূত্রের (১/১/১) প্রারম্ভেই মহর্ষি জৈমিনী লিখেছেন "অথাাতো ধর্মজিজ্ঞাসা"। অর্থাৎ, এখন ধর্মকে জানার জিজ্ঞাসা করো। কারণ এই বিষয়টিকে না জেনে মোক্ষ বা মুক্তির দিকে যাওয়া সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় বোঝা প্রয়োজন যে, মানুষ ধর্ম নামক সেই বিষয়টিকে জেনে নিজের মুক্তি বা মোক্ষের যাত্রা এগিয়ে নিয়ে যাক বা না যাক, কিন্তু সেই বিষয়টিকে ঋষি-মুনিরা বারবার জানার যোগ্য কেন বলেছেন? কারণ এটুকু তো স্পষ্ট যে, সেই ১০টি লক্ষণ "ধর্ম" নামক বিষয় নিজে নয়, বরং সেই বিষয়টিকে জানার পর মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া লক্ষণ বা বহিঃপ্রকাশ মাত্র। তাহলে সেই ধর্ম আসলে কী, যা জানার পর এই লক্ষণগুলো অর্জন করতে হয়?
সেই ধর্ম হলো সনাতন। সেই ধর্ম হলো শাশ্বত যা প্রকৃতির প্রতিটি ঘটনার মধ্যে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। ফুলের রসায়নে, ওপর থেকে পড়া বলের পদার্থবিজ্ঞানে, মহাবিশ্বের প্রতিটি নিয়মে এবং নিয়মের পেছনে কাজ করা নিয়মগুলোতে ধর্ম বিদ্যমান। এই জড় জগতের বিজ্ঞান এবং আত্মার আধ্যাত্মিকতা অর্থাৎ "পৃথিবী তত্ত্ব থেকে শুরু করে ঈশ্বর পর্যন্ত" কাজ করা প্রতিটি তথ্যের পেছনের সত্যই হলো ধর্ম। মৌলিক বল বা শক্তিগুলো থেকে শুরু করে পরমাণুর ভেতরের প্রতিটি প্রতিক্রিয়ার পেছনের মূল নীতিগুলোই হলো ধর্ম। আপনার পর্যন্ত এই লেখার মাধ্যমে যে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে এবং এই অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা মৌলিক নিয়মগুলোই হলো ধর্ম। আমরা যে নিয়মগুলো জানার চেষ্টা করছি, সেই নিয়মগুলোর পেছনেও কাজ করে যাওয়া অব্যক্ত উপাদানই হলো ধর্ম। ধর্মের অর্থ কোনো নৈতিক মূল্যবোধ, নীতিশাস্ত্র বা মানুষকে দেওয়া কোনো আচরণগত উপদেশ নয়, বরং মানুষের চামড়ার নিচে ঘটে চলা অনুভূতির পেছনের সত্য হলো ধর্ম। মানুষের শরীর ও আত্মায় কাজ করা সেই মূল নীতিগুলোই হলো ধর্ম, যা প্রতিটি মানুষের ওপর প্রযোজ্য হয়।
তখন এতে কোনো পার্থক্য পড়ে না যে কথিত অর্থে সেই মানুষটি আস্তিক নাকি নাস্তিক, সে কোনো মত-পথ সম্প্রদায়কে মানছে কি মানছে না, কিংবা এই শাশ্বত ধর্মকে স্বীকার করছে কি করছে না। কারণ প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিটি শরীর ও আত্মার ওপর যে নিয়মগুলো কার্যকরী হচ্ছে, সেই নিয়মগুলোর নামই হলো ধর্ম। আর এখান থেকেই পার্থক্য তৈরি হয় ধর্মের আক্ষরিক নিয়মাবলী এবং ধর্মের মূল মর্মের মধ্যে। যা আমরা ঋষিদের এবং শ্রীকৃষ্ণের মতো ব্যক্তিত্বের জীবনে প্রত্যক্ষ দেখতে পাই।
এই কারণেই বহু সময় সাধারণ মানুষ ধর্মের তথাকথিত নিয়মাবলী মেনে চলেও 'অধর্মী' বলে গণ্য হয়, আবার ঋষিরা বা মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণ ধর্মের প্রচলিত সাধারণ নির্দেশাবলী থেকে সরে এসেও ধর্মের প্রতিষ্ঠা করেন।
ধর্মের এই গভীর ও মার্মিক রূপটি চিন্তাভাবনা করলে বোঝা যায় যে ধর্ম কীভাবে সনাতন। কীভাবে ধর্ম কখনো ধ্বংস হতে পারে না। ধার্মিক ব্যক্তি অবশ্যই ধ্বংস হতে পারে, কিন্তু ধর্ম কখনো নয়। পৃথিবীতে ধার্মিক অর্থাৎ ধর্মকে অনুসরণ করা মানুষের সংখ্যা কম-বেশি হতে পারে বা বিলুপ্তও হয়ে যেতে পারে, কিন্তু ধর্ম নিজে কখনো শেষ হতে পারে না। ধার্মিক তো দূরের কথা, যদি একজন মানুষও এই পৃথিবীতে বেঁচে না থাকে, তবুও ধর্ম থাকবে। এখান থেকেই ধর্মের সনাতন হওয়া প্রমাণিত হয়। তাই যখনই বলা হয় "ধর্মের রক্ষা করতে হবে", তখন বুঝতে হবে যে "ধর্মকে যারা মানছে সেই মানুষদের রক্ষা করতে হবে", প্রত্যক্ষ ধর্মকে নয়। অর্থাৎ ধর্মের রক্ষার প্রকৃত অর্থ হলো মানুষের মধ্যে যেন ধর্মের বোধ ও গ্রহণযোগ্যতা বেঁচে থাকে। কারণ ধর্ম এমন এক বিষয় যা প্রকৃতপক্ষে সনাতন, চিরন্তন ও শাশ্বত। তাকে মানা মানুষের সংখ্যা কমছে, বাড়ছে নাকি শেষ হয়ে যাচ্ছে তাতে ধর্মের কিছু যায় আসে না, ধর্ম সর্বদা মহাবিশ্বে একরসে বিদ্যমান থাকে।
এই প্রাকৃতিক ঘটনাটি ঠিক তেমনই কাজ করে যেমন সত্যের কখনো জয় বা পরাজয় হয় না, বরং সত্যভাষীর জয় বা পরাজয় হতে পারে। এই পৃথিবীতে সত্যবাদী মানুষের সংখ্যা কম বা বেশি হতে পারে, কিন্তু সত্য কখনো কম বা বেশি হয় না। সত্যবাদী অর্থাৎ সত্যকে বলা বা সমর্থন করার মতো মানুষের সংখ্যা কম-বেশি হতে পারে, কিন্তু সত্য নিজে কখনো পরিবর্তন হয় না। তা সর্বদা বিদ্যমান থাকে এবং সর্বদাই জয়ী হয়। তাই বিপদের প্রশ্নটি সত্যের ওপর নয়, বরং সত্যবাদী বা সত্যকে চর্চাকারী মানুষদের ওপর। আর ঠিক এভাবেই ধর্মের স্বরূপকে বোঝা উচিত। ধর্মের এই চিন্তাভাবনার পরই হয়তো আমরা বেদ ও ঋষিদের মূল ভাবনার আরও কিছুটা কাছাকাছি পৌঁছাতে পারব।
ধন্যবাদ।।
#ধর্ম #সনাতনধর্ম #ধর্মলক্ষণ #মনুস্মৃতি #বেদ #বৈদিকধর্ম #মীমাংসাদর্শন #ধর্মজিজ্ঞাসা