25/06/2026
ভগবান বিষ্ণুর বামন অবতার এবং মা গঙ্গার দিব্য উৎপত্তি —
সনাতন ধর্মে, মা গঙ্গা শুধু একটি নদী নন, বরং ভগবান বিষ্ণুর চরণ থেকে উৎপন্ন এবং ভগবান শিবের জটায় অধিষ্ঠিত এক দিব্য শক্তি। তাঁর উৎপত্তি এবং পৃথিবীতে অবতরণের কাহিনী ঈশ্বরের দুটি মহান রূপ — বিষ্ণু এবং শিবের সাথে যুক্ত। মা গঙ্গা একদিকে ভগবান বিষ্ণুর চরণ থেকে উৎসারিত “বিষ্ণুপদী”, অন্যদিকে ভগবান শিবের জটায় স্নেহভরে ধারণকৃত দেবী হিসেবে পূজিতা। তিনি পবিত্রতা, করুণা, মুক্তি এবং সৃষ্টির রক্ষণকারী ও রূপান্তরকারী দিব্য শক্তির মহাসমন্বয়ের প্রতীক।
মা গঙ্গার উৎপত্তি ভগবান বিষ্ণুর চরণ থেকে, তিনি ভগবান শিবের জটায় বাস করতেন এবং রাজা ভগীরথের তপস্যার মাধ্যমে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তাই বলা হয় গঙ্গা হলেন বিষ্ণুর কৃপা, শিবের আশ্রয় এবং পৃথিবীর মোক্ষদাত্রী মাতা।
প্রাচীনকালে মহাবলী নামে এক শক্তিশালী অসুর রাজা ছিলেন। তিনি শুধু অত্যন্ত শক্তিশালীই ছিলেন না, বরং একজন মহান দাতা এবং গুণী ব্যক্তিও ছিলেন। তিনি অসংখ্য যজ্ঞ সম্পাদন করেন এবং ঘোষণা করেন, "আমার দ্বার থেকে কোনো আবেদনকারী খালি হাতে ফিরবে না।"
তাঁর ক্রমবর্ধমান শক্তিতে দেবতারা শঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং সুরক্ষার জন্য ভগবান বিষ্ণুর কাছে প্রার্থনা করেন। দেবতাদের রক্ষা করার জন্য, ভগবান বিষ্ণু বামন নামক এক বালক ব্রাহ্মণের রূপ ধারণ করে মহাবলীর যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হলেন।
বামন বিনীতভাবে মহাবলীকে সম্বোধন করে বললেন, "মহারাজ ! আমি দান হিসেবে কেবল তিন পা ভূমি চাই।"
মহাবলীর গুরু শুক্রাচার্য বুঝতে পারলেন যে ইনি কোনো সাধারণ বালক নন, স্বয়ং ভগবান বিষ্ণু। তিনি মহাবলীকে এই দান করতে বারণ করলেন, কিন্তু "আমি তো কথাই দিয়েছি," এই বলে মহাবলী দানটি গ্রহণ করলেন।
দান গ্রহণ করার পর, ভগবান বামন এক বিশাল রূপ ধারণ করলেন — তাঁর প্রথম পদক্ষেপে সমগ্র পৃথিবী আবৃত হলো, এবং দ্বিতীয় পদক্ষেপে তিনি সমগ্র আকাশ পরিমাপ করলেন। এখন তৃতীয় পদক্ষেপের জন্য আর কোনো জায়গা রইল না।
তখন মহাবলী বিনীতভাবে মাথা নত করে বললেন, "প্রভু ! আপনার তৃতীয় পদক্ষেপ আমার মাথায় রাখুন।" প্রভু তাঁকে পাতালে নির্বাসিত করলেন, কিন্তু তাঁর ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে অমরত্বের বর দিলেন।
বামন অবতার রূপে ভগবান বিষ্ণু যখন তাঁর ‘ত্রিবিক্রম’ নামক এক বিশাল বিশ্বরূপ ধারণ করেছিলেন এবং মাত্র তিনটি পদক্ষেপে সমগ্র মহাবিশ্ব পরিমাপ করেছিলেন, তখন তাঁর সেই পদ্মসম চরণ স্বর্গলোক ভেদ করে ঊর্ধ্বলোকে পৌঁছায়। সেই সময় তাঁর পদ্মচরণের পবিত্র নখ থেকে এক দিব্য জলধারা নির্গত হলো — এটাই ছিলেন মা গঙ্গা। এইভাবে — মা গঙ্গার উৎপত্তি ভগবান বিষ্ণুর চরণ থেকে, এই কারণেই তাঁকে বিষ্ণুপদী বলা হয়। মা গঙ্গা প্রকাশিত হয়ে মহাবিশ্বজুড়ে বিষ্ণুর দিব্য কৃপা বহন করে সমগ্র সৃষ্টিজগতে প্রবাহিত হতে থাকে।
অনেক যুগ পরে, রাজা ভগীরথ তাঁর পূর্বপুরুষদের মুক্তির জন্য মা গঙ্গাকে পৃথিবীতে আনার সংকল্প করলেন। তিনি কঠোর তপস্যা করেন। তাঁর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে গঙ্গা পৃথিবীতে অবতরণে সম্মত হলেও, তাঁর প্রবল গতিবেগ এতটাই তীব্র ছিল যে পৃথিবীর ধ্বংস নিশ্চিত ছিল।
ভগীরথের অনুরোধে করুণাময় ভগবান শিব মা গঙ্গাকে তাঁর জটাজুটে ধারণ করেন এবং তাঁর অপরিসীম শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে কোমলভাবে পৃথিবীতে প্রবাহিত হওয়ার পথ করে দেন। তারপর, ভগবান শিবের জটা থেকে, গঙ্গা সাতটি ধারায় পৃথিবীতে প্রবাহিত হয়ে ভগীরথের পূর্বপুরুষদের মোক্ষ এনে দিলেন।
আমাদের পরম সৌভাগ্য যে এই মহাশক্তি, এই মোক্ষদায়িনী চৈতন্যময়ী দেবী, মানবকল্যাণার্থে নদীরূপে অবতীর্ণ হয়ে আমাদের স্পর্শ, দর্শন ও সেবার সুযোগ দান করেছেন। তাঁর স্নিগ্ধ সলিলে আজও প্রবাহিত হয় করুণা, পবিত্রতা ও মুক্তির অমৃতধারা।
আজ গঙ্গা দশহরা — দেবী গঙ্গার ভাগীরথীরূপে মর্ত্যলোকে অবতরণের পবিত্র তিথি। এই শুভক্ষণে আমরা করজোড়ে প্রণাম জানাই সেই শান্ত, স্নিগ্ধ, চৈতন্যময়ী ও মোক্ষপ্রদায়িনী মহাদেবীর চরণকমলে; যাঁর মাহাত্ম্য স্বয়ং ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরও স্তবগানে কীর্তন করে থাকেন।
মা গঙ্গে, আমাদের অন্তরকে পবিত্র করো, অহংকার ও অজ্ঞান দূর করো, এবং তোমার অক্ষয় কৃপাধারায় সমগ্র জগৎকে সিক্ত করে রাখো। জয় মা গঙ্গে।
শ্রীশ্রীগঙ্গা প্রণাম মন্ত্র —
ॐ সদ্যোপাতক সংহন্ত্রী সদ্যোদুঃখ বিনাশিনী। সুখদা মোক্ষদা গঙ্গা গঙ্গয়ৈ পরমাগতি॥
যিনি তৎক্ষণাৎ পাপ হরণ করেন, দুঃখ বিনাশ করেন, সুখদাত্রী মোক্ষদাত্রী গঙ্গা, সেই গঙ্গাই আমার পরম গতি।
সকলকে দশহরা গঙ্গা পূজার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই৷
জয় মা গঙ্গা
(সংগৃহীত)
#গুরদেব #প্রভুপাদ