16/06/2026
“যদি আল্লাহ সবকিছু জানেন ও সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান হন, তাহলে পৃথিবীতে এত অন্যায় কেন হয়?”
🌿 এই প্রশ্নের উত্তর ইসলামে অত্যন্ত স্পষ্ট। কিন্তু একটি বিষয় না বুঝলে উত্তরটাও বোঝা যাবে না। (এটি না বুঝলে তাকদীর, পরীক্ষা ও মানুষের দায়িত্ব কখনো পুরোপুরি বোঝা যাবে না)। সেটি হলো— আল্লাহর ইচ্ছা (মাশিয়াত) দুই প্রকার।
১. ইরাদাহ কাওনিয়্যাহ (সৃষ্টিগত বা বিশ্বজনীন ইচ্ছা) ও ২. ইরাদাহ শরইয়্যাহ (বিধানগত ইচ্ছা)।
১️.⃣ ইরাদাহ কাওনিয়্যাহ (الإرادة الكونية)
সৃষ্টিগত বা বিশ্বজনীন ইচ্ছা
এটি এমন ইচ্ছা, যা আল্লাহ নির্ধারণ করলে অবশ্যই ঘটবে। কেউ তা ঠেকাতে পারবে না।
এখানে মানুষের কোনো ক্ষমতা নেই।
উদাহরণ
🌙 জন্ম ও মৃত্যু
“প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।”
— সূরা আলে ইমরান, ৩:১৮৫
তুমি যত ধনী হও, যত ক্ষমতাবান হও, যত বড় ডাক্তারই হও না কেন—মৃত্যু একদিন আসবেই।
☀️ সূর্য ও চন্দ্রের গতি
“সূর্য তার নির্ধারিত স্থানের দিকে চলতে থাকে... আর চন্দ্রের জন্য আমি বিভিন্ন মঞ্জিল নির্ধারণ করেছি।”
— সূরা ইয়াসিন, ৩৬:৩৮-৩৯
মানুষ চাইলেও সূর্যকে থামাতে পারবে না, চাঁদের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারবে না।
⏳ কিয়ামত
“নিশ্চয়ই কিয়ামত আসবেই, এতে কোনো সন্দেহ নেই।”
— সূরা হজ্জ, ২২:৭
কিয়ামত হবেই। পৃথিবীর সব মানুষ একত্রিত হলেও এটি ঠেকাতে পারবে না।
এসবই আল্লাহর সৃষ্টিগত ইচ্ছা। যা তিনি ফয়সালা করেছেন, তা অবশ্যই ঘটবে।
২️. ⃣ ইরাদাহ শরইয়্যাহ (الإرادة الشرعية)
বিধানগত ইচ্ছা
এটি এমন বিষয়, যা আল্লাহ ভালোবাসেন, পছন্দ করেন এবং বান্দাদের করতে আদেশ করেন।
যেমন—
✅ ঈমান✅ সালাত✅ রোযা✅ সত্যবাদিতা✅ ন্যায়বিচার✅ দান-সদকা✅ পিতা-মাতার আনুগত্য
আল্লাহ বলেন,
“আল্লাহ বান্দাদের জন্য কুফরি পছন্দ করেন না।”
— সূরা আয-যুমার, ৩৯:৭
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে।
আল্লাহ কোনো কাজ পছন্দ না করলেও পরীক্ষার স্বার্থে তা ঘটতে দেন।
অর্থাৎ—
আল্লাহ চুরি পছন্দ করেন না, তবুও চুরি হতে দেন।
আল্লাহ ব্যভিচার পছন্দ করেন না, তবুও ব্যভিচার হতে দেন।
আল্লাহ শিরক ঘৃণা করেন, তবুও মানুষকে শিরক করার সুযোগ দেন।
কেন?
কারণ পৃথিবী পরীক্ষার স্থান।
🌍 দুনিয়া কেন পরীক্ষা?
আল্লাহ বলেন,
“যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করেন—তোমাদের মধ্যে কে কর্মে উত্তম।”
— সূরা আল-মুলক, ৬৭:২
আরও বলেন,
“আমি মানুষকে পথ দেখিয়েছি; এরপর সে হয় কৃতজ্ঞ হবে, নয়তো অকৃতজ্ঞ হবে।”
— সূরা আল-ইনসান, ৭৬:৩
যদি মানুষকে কোনো স্বাধীনতা না দেওয়া হতো, তাহলে পরীক্ষা অর্থহীন হয়ে যেত।
❌ চুরি
আল্লাহ চুরি নিষিদ্ধ করেছেন।
“চোর পুরুষ ও চোর নারী—তাদের হাত কেটে দাও।”
— সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৩৮
তাহলে চুরি হওয়া প্রমাণ করে না যে আল্লাহ চুরি ভালোবাসেন।
বরং প্রমাণ করে যে তিনি মানুষকে পরীক্ষা করছেন।
❌ ব্যভিচার ও ধর্ষণ
আল্লাহ বলেন,
“তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না।”
— সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩২
এটি স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা।
❌ হত্যা
আল্লাহ বলেন,
“যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে একজন মানুষকে হত্যা করে, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল।”
— সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৩২
খুন হওয়া মানে আল্লাহ খুন পছন্দ করেন—এ কথা বলা সম্পূর্ণ ভুল।
❌ শিরক ও মূর্তিপূজা
আল্লাহ বলেন,
“নিশ্চয়ই শিরক হলো মহা জুলুম।”
— সূরা লুকমান, ৩১:১৩
পৃথিবীতে শিরক হচ্ছে বলে আল্লাহ তা পছন্দ করেন—এমন নয়।
বরং তিনি এটিকে সবচেয়ে বড় গুনাহ বলেছেন।
❓ তাহলে আল্লাহ সঙ্গে সঙ্গে থামিয়ে দেন না কেন?
একটু চিন্তা করো।
যদি—
চুরি করতে গেলেই হাত অবশ হয়ে যেত,
মিথ্যা বলতে গেলেই জিহ্বা বন্ধ হয়ে যেত,
খুন করতে গেলেই মানুষ পাথর হয়ে যেত,
ব্যভিচার করতে গেলেই শরীর অচল হয়ে যেত,
তাহলে কি পৃথিবীতে কোনো পরীক্ষা থাকত?
না।
তাহলে সবাই বাধ্য হয়ে ভালো মানুষ হতো।
তখন জান্নাত-জাহান্নাম, পুরস্কার-শাস্তি, হিসাব-নিকাশ—সবকিছুর অর্থই শেষ হয়ে যেত।
⏳ আল্লাহ সময় দেন
আল্লাহ বলেন,
“মানুষ তাদের জুলুমের কারণে যদি আল্লাহ সঙ্গে সঙ্গে পাকড়াও করতেন, তবে পৃথিবীতে কোনো প্রাণীকেই অবশিষ্ট রাখতেন না। কিন্তু তিনি তাদের নির্ধারিত সময় পর্যন্ত অবকাশ দেন।”
— সূরা আন-নাহল, ১৬:৬১
এটাই আল্লাহর অসীম দয়া।
তিনি সময় দেন—
যেন চোর তওবা করে,
যেন খুনি অনুতপ্ত হয়,
যেন পথভ্রষ্ট ব্যক্তি সত্যের দিকে ফিরে আসে।
🌱 একটি সহজ উদাহরণ
সরকার তোমাকে বিদ্যুৎ দিয়েছে।
তুমি সেই বিদ্যুৎ দিয়ে হাসপাতালের রোগী বাঁচাতে পারো।
আবার সেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করে কাউকে হত্যা করতেও পারো।
বিদ্যুৎ দেওয়ার কারণে কি খুনের দায় সরকারের?
না।
দায় অপরাধীর।
ঠিক তেমনি আল্লাহ তোমাকে—
হাত দিয়েছেন,
চোখ দিয়েছেন,
বুদ্ধি দিয়েছেন,
শক্তি দিয়েছেন,
সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছেন।
এখন তুমি সেই ক্ষমতা দিয়ে আল্লাহর ইবাদতও করতে পারো, আবার পাপও করতে পারো।
ক্ষমতা দেওয়া আর পাপকে ভালোবাসা—দুইটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
🌷 উপসংহার
আল্লাহর প্রথম ইচ্ছা (ইরাদাহ কাওনিয়্যাহ) হলো এমন বিষয় যা অবশ্যই ঘটবে—জন্ম, মৃত্যু, রিযিক, কিয়ামত ইত্যাদি।
আর দ্বিতীয় ইচ্ছা (ইরাদাহ শরইয়্যাহ) হলো এমন বিষয় যা আল্লাহ ভালোবাসেন ও আদেশ করেন—ঈমান, নেক আমল, ন্যায়বিচার, সত্যবাদিতা ইত্যাদি।
চুরি, খুন, ধর্ষণ, শিরক ও জুলুম আল্লাহর আদেশ নয়; বরং তিনি এসব নিষিদ্ধ করেছেন। কিন্তু মানুষের পরীক্ষা নেওয়ার জন্য এগুলো ঘটার সুযোগ দিয়েছেন।
“তোমাদের উপর যে বিপদ আসে, তা তোমাদের নিজেদের কৃতকর্মের ফল।”
— সূরা আশ-শুরা, ৪২:৩০
“নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি কোনো জুলুম করেন না; বরং মানুষ নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করে।”
— সূরা ইউনুস, ১০:৪৪
সুতরাং, আল্লাহ অন্যায়ের স্রষ্টা নন; বরং তিনি মানুষকে সত্য ও মিথ্যার পথ দেখিয়ে পরীক্ষা করছেন। আর এই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই হবে চূড়ান্ত বিচার—জান্নাত অথবা জাহান্নাম।