06/03/2025
মানবসৃষ্টি
يَخْرُجُ مِنْ بَيْنِ الصُّلْبِ وَالتَّرَائِبِ
শব্দার্থঃ يَخْرُجُ = বের হয়। مِنْ = থেকে।بَيْنِ = মধ্যবর্তী। الصُّلْبِ = মেরুদণ্ড। وَ = ও, এবং। التَّرَائِبِ = বুক, বক্ষপঞ্জর বা বুকে হার পরিধানের স্থান।
অর্থঃ যা নির্গত হয় মেরুদণ্ড ও বক্ষপঞ্জরের মধ্য থেকে। [আয়াত ৭]
তাৎপর্যঃ
এটা একটি জীববিজ্ঞান বিষয়ক আয়াত যা মানবসৃষ্টি সংক্রান্ত। এ ব্যাপারে তৎকালীন আরবদের কোনো জ্ঞান ছিল না। এমনকি রাসূলুল্লাহ স.ও জানতেন না। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁকে স. জানিয়েছেন। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তৎকালীন মুফাসসিরগণ তাদের জ্ঞান অনুযায়ী ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। কিন্তু এ আয়াত দ্বারা মূলত কী বোঝানো হয়েছে সে বিষয়ে আধুনিক বিজ্ঞান কী বলে তা জানব। তবে তার আগে পূর্ববর্তী মুফাসসিরগণ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় কী বলেছেন তা সংক্ষিপ্তাকারে আলোচনা করছি। এ বিষয়ে অনেক মতামত আছে কিন্তু আমি সব উল্লেখ করছি না। আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোনটা উদ্দেশ্য সেদিকেই আমি বেশি দৃষ্টিপাত করব।
يَخْرُجُ : বের হয় বা পানি বের হয়।
الصُّلْبِ : মেরুদণ্ড বা পৃষ্ঠদেশের হাড়।
التَّرَائِبِ : হাড়সমূহ বা বুকের পাঁজরের হাড়। এর একবচন হল اَلتَّرِيبَةُ। উদ্দেশ্য হল, বুক বা হার পরিধানের স্থান বা বুকের উপরিভাগের ডানপাশের চারটি হাড় এবং বামপাশের চারটি হাড়। اَلتَّرَائِبُ বলে নারীর বুককে উদ্দেশ্য করা হত তৎকালীন যুগে। কিন্তু এ শব্দটি পুরুষের বেলাতেও প্রযোজ্য।
اَلصُّلْبِ ও اَلتَّرَائِبِ শব্দদ্বয়ের তাৎপর্যঃ
ব্যাখ্যাতাগণ এই اَلصُّلْبِ ও اَلتَّرَائِبِ শব্দদ্বয়ের ব্যাখ্যায় মতভেদ করেছেন। এক মত হল, اَلصُّلْبُ বা মেরুদণ্ড বলতে উদ্দেশ্য হল, পুরুষের মেরুদণ্ড। আর اَلتَّرَائِبُ বলতে উদ্দেশ্য হল, নারীর বুক। তা হলে অর্থ দাঁড়ায়, যে পানি নির্গত হয় পুরুষের মেরুদণ্ড থেকে এবং নারীর বুক থেকে। অর্থাৎ- যে পানি বা বীর্য [পুরুষের শুক্রাণু ও নারীর ডিম্বাণু] দ্বারা সন্তান সৃষ্টি হয়, তা পুরুষের পিঠ বা মেরুদণ্ড থেকে নির্গত হয়, এবং নারীর বুক থেকে নির্গত হয়। কিন্তু এ মতটি শুদ্ধ নয়। যদি তাই হত, তাহলে আল্লাহ مِنْ بَيْنِ الصُّلْبِ وَالتَّرَائِبِ না বলে مِنَ الصُّلْبِ وَالتَّرَائِبِ বলতেন। مِنْ بَيْنِ الصُّلْبِ وَالتَّرَائِبِ মানে পৃষ্ঠ ও বক্ষপঞ্জরের মধ্য থেকে। আর مِنَ الصُّلْبِ وَالتَّرَائِبِ মানে পৃষ্ঠ বা মেরুদণ্ড ও বুক থেকে।
ইমাম কুরতুবী আল-হাসান থেকে বর্ণনা করেন, ‘পানি যা বের হয় পুরুষের পৃষ্ঠ ও বক্ষপঞ্জর থেকে, এবং নারীর পৃষ্ঠ ও বক্ষপঞ্জর থেকে।’( ) আল-হাসান-এর কথার তাৎপর্য হল, তা নির্গত হয় একটি দেহ থেকে তথা পুরুষের দেহ থেকে এবং নারীর দেহ থেকে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল দেহ। কারণ, بَيْنِ শব্দটি ইঙ্গিত দেয়, এটা বের হয় এমন স্থান থেকে যেটা দুইটি বস্তুর মাঝে। আর একজন মানুষের মূল দেহ হল তার পিঠ ও বুক। এ-দু’টির সমন্বয়ে গঠিত হয় তার দেহ। অর্থাৎ- পানি বের হয় দেহ থেকে। তাহলে, এখানে প্রশ্ন আসে, আয়াতে مَاءٌ বা পানি একবচন উল্লেখিত হয়েছে। অথচ দ্বিবচন উল্লেখ করা প্রয়োজন ছিল। উত্তর হল, পুরুষ ও নারীর পানি মিলে একাকার হওয়ার ফলে তা একপানিতে রূপান্তরিত হয়েছে। সুতরাং এক পানিতে রূপলাভ করেছে।
এখন প্রশ্ন হল, নারীর পানি বলতে কোন পানি উদ্দেশ্য? যদি বলা হয়, মিলনকালে যে পানি বের হয় তা, তাহলে এটা আধুনিক বিজ্ঞান কর্তৃক ভুল প্রমাণিত হয়। কারণ, রতিক্রিয়ার সময় নারীর যে পানি বের হয় তা হল কামরস; তা প্রাথমিক পর্যায়ে নির্গত হোক অথবা চরমপুলকের সময় নির্গত হোক। এটা তাকে কেবল আনন্দই দেয়। এর সাথে বাচ্চা জন্মদানের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। পরন্তু, সেটা পুরুষের মত সবেগে নির্গত হয় না। তা বেয়ে বেয়ে পড়ে।
উত্তরকালে, আধুনিক বিজ্ঞানের শারীরবিজ্ঞানের সার্বিক আবিষ্কারের ফলে আমরা জানি যে, সন্তান সৃষ্টি হয় পুরুষের শুক্রাণু ও নারীর ডিম্বাণু থেকে। পুরুষের শুক্রাণু যেটা অÐকোষের মাধ্যমে তৈরি হয়ে বীর্যথলিতে অবস্থান করে। শুক্রাণুর পরিমাণ থাকে মাত্র ৩ শতাংশ, আর বীর্যবৎ পানি থাকে ৯৭ শতাংশ। অতঃপর তা রতিক্রিয়ার সময় বীর্যের সাথে নির্গত হয়। এই বীর্যথলিটি অবস্থান করে পৃষ্ঠদেশ ও বক্ষপঞ্জরের মধ্যে বা একটি দেহে। তাহলে, সবেগে পানি স্খলিত হওয়ার বিষয়টি হল, যা সবেগে নির্গত হয় বীর্যথলি থেকে, যে বীর্যথলিটি অবস্থান করে একটি দেহে তথা পৃষ্ঠদেশ ও বক্ষপঞ্জরের মধ্যে। পক্ষান্তরে, নারীর ডিম্বাণু তৈরি হয় ডিম্বাশয়ে ডিম্বোস্ফটনের মাধ্যমে। পুরুষের পানি সবেগে নির্গত হওয়া অনুধাবনীয়। কিন্তু নারীর ডিম্বাণুর বিষয়টি পুরুষের পানির মত নয়। তাহলে, কোরআনে কি কেবল পুরুষের কথাই বলেছে নাকি নারীর বিষয়টিও এর অন্তর্ভুক্ত, অথচ মানবসৃষ্টিতে উভয়েরই ভূমিকা রয়েছে?
চলুন, দেখি আধুনিক বিজ্ঞান কী বলে। পুরুষের বিষয়টি পরিষ্কার ও বোধগম্য। চলুন, দেখা যাক নারীর ডিম্বাণুর বিষয়। আমি একটি গ্রাফিয়ান ফলিকলের ডায়াগ্রাম বা নকশা উপস্থাপন করছি এবং অতঃপর তার ব্যাখ্যা প্রদান করছি। নকশাটি লক্ষ করুন যেমন ছবিতে দেয়া হয়েছে।
নারীর ডিম্বাশয়ে অনেক প্রাথমিক ফলিকল বা বীজকোষ তথা সন্তান সৃষ্টিকারী ডিম্বাণু বা পানি থাকে। পিটুইটারী থেকে হরমোন নিঃসৃত হয়ে একটি প্রাথমিক বীজকোষ বা ফলিকলকে পরিপক্ক করে। একটি পরিপক্ক বীজকোষকে graafian follicle বলে। এই গ্রাফিয়ান ফলিকল ডিম্বাণুকে নিজের মধ্যে সযত্নে ধারণ করে। এটি একটি মাত্র ডিম্বাণু ধারণ করে। একটি ফলিকলকে আল্লাহ তায়ালা ডিম্বাশয়ে অতি যত্নে গড়ে তোলেন। এটা অনেকগুলো স্তর বা layer দ্বারা সুরক্ষিত থাকে। আবার তেমনি ডিম্বাণু বা o**m কয়েকটি স্তর দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে।
যেসব স্তর দ্বারা গ্রাফিয়ান ফলিকল পরিবেষ্টিতঃ
থিকা এক্সটার্না (বাহ্যিক আবরণ), থিকা ইন্টার্না (এটা ইস্ট্রজেন বা স্ত্রী-হরমোন নির্গত করে), বেইজমেন্ট মেমব্রেন, গ্রানিউলোসা সেল (এটা পুরু আবরণ যা তরল নির্গত করে এবং এটাকে লিকুউয়র ফলিকুলি বলে যা গুহাকে পরিপূর্ণ রাখে) আর গুহাকে এন্ট্রাম বলে যা তরল দ্বারা পূর্ণ থাকে। এটা ডিম্বাণুকে রক্ষা করে। এই তরল পদার্থের পরে আরেকটি সেল আছে, তাকে বলে, কিউমিউলাস অপরাস সেলস (cumulus ophorus cells)। এসব মিলে গঠিত হয় একটি পরিপক্ক বীজকোষ বা গ্রাফিয়ান ফলিকল।
আর নারীর ডিম্বাণু যতক্ষণ পর্যন্ত গ্রাফিয়ান ফলিকলে অবস্থান করে তাকে সেকেণ্ডারী উসাইট বলে। এই সেকেণ্ডারী উসাইট হল ডিম্বাণু যা শুক্রাণু কর্তৃক নিষিক্ত হওয়ার জন্য পরিপক্ক।
এই লিকুউয়র ফলিকুলি বা তরল মিউকোপ্রোটিন (mucoprotein) এবং হায়েলিউরনিক এসিড (hyaluronic acid) ধারণ করে। এটা বা এন্ট্রাম ডিম্বাণুকে যান্ত্রিক হেঁচকা বা আকস্মিক গতি (mechanical jerk) থেকে সুরক্ষিত রাখে এবং দ্বিতীয়ত এটাকে গ্রাফিয়ান ফলিকলের স্তরের দিকে চাপ দিয়ে রাখে। কারণ, যখন এই ডিম্বাণু স্তর ভেদ করে নির্গত হয়ে ফ্যালোপিয়ান টিউবে যাবে তখন এটা সহজেই নির্গত হতে পারবে। আর ঋতুচক্রের তেরতম অথবা চৌদ্দতম দিনে নির্গত হয়। পিটুইটারী থেকে তৈরি লুটেইনাইযিং হরমোন (Luteinizing Hormone) সংক্ষেপে LH বলে। এটা ডিম্বস্ফোটনের আগে উদ্ভূত হয় এবং ডিম্বাণুকে নির্গত করে বা গ্রাফিয়ান ফলিকলের স্তরগুলোকে বিদীর্ণ করে। ফলে, ডিম্বাণু বের হয়ে ফ্যালোপিয়ান টিউবে গমন করে শুক্রাণু কর্তৃক নিষিক্ত হওয়ার জন্য। আর ডিম্বাণু যে ডিম্বাশয় থেকে কয়েকটি স্তর ভেদ করে নির্গত হয়, তা ঘটে সবেগে এবং সজোরে। এখানে নারীর কোনো কর্তৃত্ব থাকে না। আল্লাহ এটাকে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সবেগে নির্গত হওয়ার ক্ষমতা দিয়েছেন যেমন দিয়েছেন পুরুষের বীর্য নির্গত হওয়ার ক্ষেত্রে। পুরুষের বীর্যথলি থেকে সবেগে বীর্য নির্গত হওয়া এটা পুরুষ চাইলে অধিক গতিবেগে নির্গত করবে অথবা চাইলে কম গতিবেগে নির্গত করবে -এ ক্ষমতা তার হাতে নেই। এটা আপন গতিবেগে নির্গত হয়। কিন্তু মূত্র নির্গত করার ক্ষেত্রে পুরুষ চাইলে অধিক গতিবেগে অথবা শ্লথ গতিবেগে ত্যাগ করতে সক্ষম। তেমনি, নারীও তার ডিম্বাণুকে ডিম্বাশয় থেকে ইচ্ছেমতো দ্রুতগতিতে অথবা নিম্নগতিতে নির্গত করবে -এমন ক্ষমতা তার হাতে নেই। এটা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে আপন গতিবেগে ফ্যালোপিয়ান টিউবে নির্গত হয়।
আর ডিম্বাণুর স্তরগুলো হল, কোরোনা রেডিয়েটা (corona radiate cells), যোনা পেলিউসিডা (zona pelucida), পেরিভিটেলাইন স্পেইস (perivitelline space), পেরিভিটেলাইন ঝিল্লি অথবা প্লাজমা ঝিল্লি বা রক্তরস ঝিল্লি (perivitelline membrane or plasma membrane)। সেকেণ্ডারী উসাইট বা ডিম্বাণুর মধ্যভাগকে সাইটোপ্লাজম (cytoplasm) বলে। এটা দুইভাগে বিভক্ত। দেয়ালঘেঁষা অংশ কিছুটা ঘণ থাকে, তাকে এগ কোরটেক্স (egg cortex) অথবা এক্টোপ্লাজম (ectoplasm) বা জীবকোষের বহিরাবরণ বলে। আর মধ্যভাগে যে সাইটোপ্লাজম থাকে, তাকে ওপ্লাজম অথবা ভিটেলাস (ooplasm or vitellus) বা কুসুম বলে। এ দু’টো মিলে গঠিত হয় সাইটোপ্লাজম। এই ওপ্লাজম নিউক্লিয়াস ধারণ করে যাকে জার্মিনাল ভেসিকল (germinal vesicle) বলে। আর নিউক্লিওলাসের (nucleolus) মধ্যে আছে জার্মিনাল স্পট (germinal)।
বলা বাহুল্য যে, পুরুষের শুক্রাণু নারীর ফ্যালোপিয়ান টিউবে ২৪ ঘণ্টা থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত জীবিত থাকে। আর নারীর ডিম্বাণু ডিম্বস্ফোটনের পর ১২ ঘণ্টা থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত ফ্যালোপিয়ান টিউবে অপেক্ষা করে শুক্রাণু কর্তৃক নিষিক্ত হওয়ার জন্য।( )
আর এখানেই হাদিসের সত্যতা বেরিয়ে আসে। তা হল, রাসূলুল্লাহ স. যখন মদীনায় গেলেন, আব্দুল্লাহ বিন সালাম তাঁকে স. কয়েকটি প্রশ্ন করলেন। তন্মধ্যে একটি ছিল, কোন বস্তু সন্তানকে পিতার দিকে টানে, আর কোন বস্তু সন্তানকে মামার (মায়ের বংশ) দিকে টানে? রাসূলুল্লাহ স. এর উত্তরে বললেন, একজন পুরুষ যখন তার স্ত্রীর সাথে রতিক্রিয়া করে তখন যদি তার পানি প্রাধান্য পায় তাহলে সন্তান তার রূপলাভ করে বা তার সাদৃশ্য হয়। আর যদি স্ত্রীর পানি প্রাধান্য পায় তাহলে স্ত্রীর রূপলাভ করে বা তার সাদৃশ্য হয়।( )
স্মর্তব্য যে, এ প্রশ্নটি উম্মে সুলাইমও রাসূলুল্লাহ স. কে করে করেছিলেন যেটা সহিহ মুসলিম বর্ণনা করেছে। হাদিসে বাবা অথবা মায়ের মতো বলতে উদ্দেশ্য হল, তাদের পরিবারের কারো মতো হওয়া। সাদৃশ্য বলতে চারটি রূপ হয়। একঃ ছেলে হোক অথবা মেয়ে হোক, চেহারার সাদৃশ্য বাবার মতো বা বাবার পরিবারের অন্য কারো মতো। দুইঃ অথবা মায়ের মতো বা মায়ের পারিবারের কারো মতো। তিনঃ সন্তান ছেলে হয়ে পুংলিঙ্গ হওয়ার দ্বারা লিঙ্গের ক্ষেত্রে বাবার সাদৃশ্য লাভ করে। চারঃ সন্তান মেয়ে হয়ে স্ত্রীলিঙ্গ হওয়ার দ্বারা লিঙ্গের ক্ষেত্রে মায়ের সাদৃশ্য লাভ করে।
রাসূলুল্লাহ স. যে উত্তর দিয়েছেন তা হল প্রথম দুই প্রকারের সাথে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ- সন্তানের চেহারার মিল। যেমন, আমরা কোনো বাচ্চাকে দেখে বলি, ছেলে হোক অথবা মেয়ে হোক, বাবার মতো হয়েছে দেখতে, অথবা মায়ের মতো হয়েছে দেখতে। হাদিসের এ বাণীর সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কার মিলে যাচ্ছে। তা হল, যদি নারীর ডিম্বস্ফোটন আগে ঘটে এবং ডিম্বাণু ফ্যালোপিয়ান টিউবে এসে শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করে, অতঃপর যদি রতিক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং কোনো শুক্রাণু উক্ত ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করে তাহলে এক্ষেত্রে সন্তানের চেহারা হবে মায়ের মতো অথবা মায়ের পরিবারের কারো মতো। কারণ, নারীর ডিম্বাণু আগে নির্গত হয়েছে। পক্ষান্তরে, রতিক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর যদি শুক্রাণু ফ্যালোপিয়ান টিউবে আগে অবস্থান করে এবং অতঃপর নারীর ডিম্বস্ফোটনের মাধ্যমে ডিম্বাণু ফ্যালোপিয়ান টিউবে এসে শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হয় তাহলে সন্তানের চেহারা হবে পিতার মতো বা পিতার পরিবারের কারো মতো। কারণ, পিতার শুক্রাণু ফ্যালোপিয়ান টিউবে আগে অবস্থান করেছে বা ডিম্বাণুর উপর প্রাধান্য পেয়েছে।
কিন্তু তিন ও চার নং প্রকারের সাথে হাদিসের ব্যাখ্যা সামঞ্জস্যশীল নয়। কারণ, পুরুষের এক্স ক্রোমোজম অথবা ওয়াই ক্রোমোজম যার ফলে সন্তান ছেলে অথবা মেয়ে হয়, তার সাথে পানি আগে নির্গত হওয়া অথবা পরে নির্গত হওয়ার সাথে কোনো সম্পর্ক নাই। কারণ, বিষয়টি এমন নয় যে, ডিম্বস্ফোটনের আগে যদি পুরুষের পানি নির্গত হয় তাহলে ফ্যালোপিয়ান টিউবে ওয়াই ক্রোমোজম অবস্থান করবে যারফলে সন্তান ছেলে হবে, আর পরে হলে এক্স ক্রোমোজম অবস্থান করবে যারফলে সন্তান মেয়ে হবে।
তাহলে আল্লাহ তায়ালা পৃষ্ঠদেশ ও বক্ষপঞ্জরের মধ্যে থেকে যা বের হয় না বলে যা বের হয় বীর্যথলি থেকে এবং যা বের হয় ডিম্বাশয় থেকে বলতে পারতেন। তিনি তা না বলে বলেছেন যা নির্গত হয় পৃষ্ঠ ও বক্ষপঞ্জরের মধ্যে থেকে বা একটি দেহ থেকে, এমন বলেছেন কেন? এখানে বিষয়টিকে ভিন্নভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তা হল, রতিক্রিয়ার সময় যখন বীর্য নির্গত হয়, তখন পুরুষ বলতে পারে না এটা মূলত কোথা থেকে নির্গত হয়। এর আনন্দ সারাদেহ জুড়ে বিস্তৃত হয়। আর এজন্যই রতিক্রিয়া সম্পন্ন করার পর সারাদেহ ধৌত করাকে ফরজ করা হয়েছে।
পক্ষান্তরে, নারীর ডিম্বস্ফোটন হওয়ার পর তার দেহেও কিছু পরিবর্তন ঘটে। যেমনঃ
একঃ দেহের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা কিছুটা কমে যায়। আর এটা ঘটে থাকে প্রোজেস্ট্রন হরমোনের পরিবর্তনের কারণে।
দুইঃ তার কণ্ঠ একটু ভারী শোনায়।
তিনঃ তার দেহ থেকে একপ্রকার ঘ্রাণ নিঃসৃত হয়।
চারঃ অনুভূতিশক্তি স্পর্শকাতর হয়। বিশেষ করে, স্পর্শ করা ও দৃষ্টিশক্তি।
পাঁচঃ সে সুগন্ধিত পুরুষের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে।
ছয়ঃ যোনিপথ ঈষৎ স্বচ্ছ ও সাদাটে হয়।
সাতঃ নারী তার পেটে কিছুটা খিঁচুনী অনুভব করে।
আটঃ যৌনমিলনে আগ্রহ বোধ করে।
নয়ঃ ঋতু ব্যতীতও এমনি রক্ত পড়তে পারে অথবা সাদা¯স্রাব নির্গত হতে পারে। কারণ, হরমোনের পরিবর্তন ঘটে।
দশঃ স্তন স্ফীত, ভারী হয়। হালকা ব্যথা অনুভূত হয় এবং স্পর্শে তা ঈষৎ নরম ও কোমল অনুভূত হয়।
এগারঃ গর্ভাশয়ে কিছুটা স্ফীতি ভাব অনুভব করে।
বারঃ কিছুটা ক্লান্তি ও ঝিমুনী অনুভূত হয়।( )
নারীর ডিম্বস্ফোটন বিষয়টিও তার সারাদেহে প্রভাব বিস্তার করে। তাই উক্ত পানি মনে হয় যেন সারাদেহ থেকেই নির্গত হয়। এখন আরেকটি প্রশ্ন হল, এ বিষয়টি নিয়ে আল্লাহ মানুষকে গবেষণা করতে বলেছেন কেন? আধুনিক বিজ্ঞানের মাধ্যমে বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট হয়ে গেছে। গবেষণা করার কারণ দুইটি। একঃ একজন মানুষের সৃষ্টি অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এসেছে। সুতরাং, তার পুনরুজ্জীবিত হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। দ্বিতীয়তঃ সাধারণভাবে দেখা যায় শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর সংমিশ্রণে সন্তানের জন্ম। সহজেই বলা যায়, বাবা-মার রতিক্রিয়ায় সন্তানের জন্ম। কিন্তু এখানে বিষয়টি আরো গভীরভাবে প্রোথিত। বাবা-মা’র দৈহিক মিলনে সন্তানের জন্ম বিষয়টি সহজবোধ্য ও স্পষ্ট। কিন্তু কথা হল, যে পানি নির্গত হয় পুরুষের দেহ থেকে এবং নারীর দেহ থেকে, সেই নির্গমন প্রক্রিয়ায় পুরুষেরও হাত নেই-নারীরও হাত নেই। যদি নির্গমন বন্ধ হয়ে যায় তারা কেউ-ই তা নির্গত করতে সক্ষম হবে না। কিন্তু আল্লাহ এটা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে নির্গত হওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। সুতরাং, সন্তান জন্মদানে বাবা-মা’র ভূমিকাও এক্ষেত্রে ক্ষীণ হয়ে দেখা দেয়। এখানে বাবা-মা’র ইন্দ্রিয় সম্ভোগটাই লাভ। এখানে পর্যবেক্ষণযোগ্য বিষয় হল, যে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে পানি দ্বারা সন্তান জন্মদানের ব্যবস্থা করেছেন, সেই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতেই তাকে পরকালে পুনরায় জীবনদান করা হবে। পানি যেমন এÑদুনিয়ায় মানবজন্মের জন্য বীজকোষ, তেমনি পুচ্ছাস্থি (coccyx) হল পরকালে পুনরুজ্জীবনলাভের বীজকোষ।
এখানে আরেকটি প্রশ্ন দেখা দেয়, পানি বা শুক্রাণু ও ডিম্বাণু পুরুষ ও নারীর -উভয়েরই। তাহলে পূর্বের আয়াতে مَاءٌ বা পানি শব্দটি একবচন উল্লেখ করা হল কেন? এর উত্তর হল, আয়াতে مَاءٌ বা পানি শব্দটি نَكِرَةٌ বা অনির্দিষ্ট। এর অধীন একাধিক অন্তর্ভুক্ত। আর উক্ত আয়াতে আরেকটি উত্তর অতিক্রান্ত হয়েছে।
এ ব্যাখ্যাটি হল যদি يَخْرُجُ ক্রিয়ারفَاعِلٌ বা কর্তৃকারক مَاءٌ دَافِقٌ বা বেগবান পানি হয়। কিন্তু ড. মুহাম্মাদ আল-বার এখানে ভিন্ন একটি ব্যাখ্যা প্রদানের প্রয়াস পেয়েছেন। তিনি يَخْرُجُ ক্রিয়ারفَاعِلٌ বা কর্তৃকারক مَاءٌ دَافِقٌ বা বেগবান পানিকে গ্রহণ করেননি। তিনি উক্ত ক্রিয়ার কর্তৃকারক সাব্যস্ত করেছেন ইনসান বা মানুষকে। কারণ, পরের আয়াতে আল্লাহ বলেন, إِنَّهُ عَلَى رَجْعِهِ لَقَادِرٌ -অর্থাৎ- নিশ্চয় তিনি তাকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। এখানে رَجْعِهِ এর هِ সর্বনামটির আরোপ হল ইনসান বা মানুষ। সুতরাং يَخْرُجُ ক্রিয়ারفَاعِلٌ বা কর্তৃকারক হল মানুষ। এখানে বেগবান পানি কর্তৃকারক হবে না। তখন এর তাৎপর্য হবে, মানুষ হল দুই প্রজাতি। পুরুষ ও নারী। অর্থাৎ- মানুষ যেন দৃষ্টি দেয় বা গবেষণা করে তাকে কোন বস্তু থেকে কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুরুষ ও নারী হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাকে পুরুষ অথবা নারী হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে জনন-সম্বন্ধনীয় পানি থেকে (ge***al water)। পুরুষের বীর্য তৈরি হয় অণ্ডকোষে, এবং নারীর ডিম্বাণু তৈরি হয় ডিম্বাশয়ে। এই অণ্ডকোষ এবং ডিম্বাশয় জননেন্দ্রিয় চক্র থেকে তৈরি হয় যা ভ্রæণের পৃষ্ঠদেশ ও বক্ষপঞ্জরের মাঝে বা বক্ষপঞ্জরের হাড়ের নিচে এবং কিডনির উপরে অবস্থান করে। অতঃপর ভ্রæণের বয়সের সপ্তম মাসের শেষের দিকে অণ্ডকোষ ও ডিম্বাশয় সেখান থেকে আস্তে আস্তে নিচের দিকে অবতরণ করে। পরে, পুরুষের অণ্ডকোষ শরীরের বহিরাংশে স্থাপিত হয় এবং নারীর ডিম্বাশয় পেটের ভিতরেই নিম্নদেশে অবস্থান করে। এতদসত্তে¡ও, এই অণ্ডকোষ ও ডিম্বাশয় রক্ত, ¯স্নায়ুতন্ত্র ও লিম্ফ দ্বারা সমৃদ্ধ হয়, যেগুলোর মূল নিহিত থাকে পৃষ্ঠদেশ ও বক্ষপঞ্জরের মধ্যে। অণ্ডকোষ ও ডিম্বাশয়ের ধমনী মহাধমনী (Aorta) থেকে বয়ে আসে যেটা পৃষ্ঠদেশ ও বক্ষপঞ্জরের মধ্যে থাকে। অণ্ডকোষ ও ডিম্বাশয়ের শিরা যেমন পৃষ্ঠদেশ ও বক্ষপঞ্জরের মধ্যে থাকে, তেমনি এ-দু’টির পুষ্টিকর স্নায়ু (nourishing nerves) আসে সমষ্টি স্নায়ু থেকে যা যকৃতের নিচে পৃষ্ঠদেশ ও বক্ষপঞ্জরের মাঝে অবস্থান করে। তেমনিভাবে, lymphatic vessels-ও উক্ত স্থানে অবস্থান করে। সুতরাং এর পর আর সন্দেহ থাকল না যে, অণ্ডকোষ ও ডিম্বাশয় তাদের খাদ্য, রক্ত ও ¯স্নায়ু সংগ্রহ করে পৃষ্ঠদেশ ও বক্ষপঞ্জরের মধ্যে থেকে। অণ্ডকোষ ও ডিম্বাশয় যেমন পৃষ্ঠদেশ ও বক্ষপঞ্জরের মধ্যে থেকে নিচে নেমে এসেছে, ঠিক তেমনি পুরুষের শুক্রাণু ও নারীর ডিম্বাণু তৈরির উপাদানও উক্ত পৃষ্ঠদেশ ও বক্ষপঞ্জরের মধ্যে থেকে আসে।
আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, রতিক্রিয়ার সময় পুরুষের পানি সবেগে নির্গত হলেও, নারীর যে কামরস নির্গত হয় তা সবেগে নির্গত হয় না। তা বেয়ে পড়ে, এবং এর সাথে সন্তান জন্মদানের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। এটা কেবল যোনিপথকে পিচ্ছিল করে। যেটা সবেগে নির্গত হয় সেটা হল, পুরুষের শুক্রাণু বহনকারী বীর্য এবং নারীর ডিম্বাণু যেটা গ্রাফিয়ান ফলিকলে অবস্থান করে এবং পরিপক্ক হওয়ার পর তার স্তরগুলো বিদীর্ণ করে সবেগে নির্গত হয়ে ফ্যালোপিয়ান টিউবে এসে শুক্রাণু কর্তৃক নিষিক্ত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করে। আর দু’টি পানি তথা শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর সংযোজনে মিশ্রিত একক পানিতে রূপান্তরিত হয়ে ভ্রুণকোষে (zygote) রূপান্তরিত হয়।( )
সবেগে নির্গত পানির দু’টি ব্যাখ্যার সারকথা একই। তবে পরের আয়াতের কর্তৃকারকের ভিত্তিতে ব্যাখ্যায় পার্থক্য রয়েছে। তবে দু’টি ব্যাখ্যাতে ভিন্ন ধরনের তথ্য রয়েছে যা কোরআনের সর্বজনিনতার বার্তা বহন করে। যাইহোক, যাকে তিনি এত যত্ন করে সৃষ্টি করেছেন তাকে যদি পুনরুজ্জীবিত না করতে সক্ষম হন তাহলে তো তাঁর ¯স্রষ্টাত্বের ক্ষমতায় দুর্বলতা দেখা দেয়।