Islamic Encyclopedia Research Council

Call Directions Website Contact the place of worship

Islamic Encyclopedia Research Council It is an organization to research Qur'an, Hadith, Seerat, Fiqh, History. It is an Islamic Research Center

05/09/2026

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের পিতামাতা কি জাহান্নামী?

ইমাম আবু হানীফার প্রতি অভিযোগ করে বলা হয় যে, তিনি আল-ফিকহুল আকবার-এ বলেছেন, নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতামাতা জাহান্নামী বা জাহান্নামে যাবে। এটা বলা দূষণীয়। কারণ, এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কষ্ট পান।

এর উত্তর হল, ওয়াহবী সুলাইমান বলেন, আমি মদীনা মুনাওয়ারায় -সেখানে অবস্থানকারীর উপর সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক- শাইখুল ইসলাম আরেফ হেকমত পাঠাগারে আল-ফিকহুল আকবার-এর পাণ্ডুলিপিতে দেখেছি এবং তা পাঠ করেছি। কিন্তু সেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পিতামাতা কুফরের উপর মারা গিয়েছেন তা পাইনি। বরং সেখানে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতামাতা কুফরের উপর মারা যাননি। এই শব্দটিই প্রাধান্য পায়- আর এর অর্থ স্পষ্ট- অতঃপর তিনি বলেন, ‘আবু তালেব কাফের হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।’ যদি কুফরটি সকলেরই গুণ হত তাহলে তিনি -মাআযাল্লাহ বা আল্লাহর আশ্রয় চাই- বলতেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতামাতা ও আবু তালেব কুফরের উপর মারা গিয়েছেন। আর আল-ফিকহুল আকবার-এর কিছু সংখ্যায় যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতামাতা কুফরের প্রতি সম্পৃক্তকরণ পাওয়া যায়, তা প্রথম অনুলিপিকারী থেকে ভুল হয়েছে। অতঃপর অন্যান্য অনুলিপিকারীগণ তার অনুসরণ করেছেন। এর কারণ হল, অনুলিপিকারী নাÑবোধক শব্দ ‘মা’ কে দুই বার পেয়েছেন বা مَا مَاتَا -মা মাতা বা তারা দুইজন পিতামাতা মারা যান নি, এটাকে তিনি দুইবার পুনরাবৃত্তি মনে করে বিলুপ্ত করে দিয়েছেন। ফলে, বিবৃতি ভিন্ন হয়ে হয়েছে বা পিতামাতা কুফরের উপর মারা গিয়েছেন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। [ইমাম যাহেদ আল-কাউসারী মনে করেন, মূল বিবৃতি হল, مَاتَا عَلَى الْفِطْرَةِ বা তারা -পিতামাতা- প্রকৃতির উপর মারা গিয়েছেন। আর এটাই নিকটবর্তী।]

অনেক অনুলিপিকারী পাণ্ডুললিপিতে লেখা খারাপ থাকা অথবা তার নিজের লেখা খারাপ থাকার কারণে অথবা যিনি কিতাব তাহকীক করেন তার ভাল জ্ঞান না থাকার কারণে অনেক মুদ্রিত কিতাবের বিবৃতিতে ভুল দেখা যায়।

আবু বকর ইবনুল আরাবীকে -তিনি মালেকী মাযহাবের একজন ইমাম- এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল যে বলে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতামাতা জাহান্নামে। উত্তর দিলেন, যে ব্যক্তি এটা বলে সে অভিশপ্ত। আল্লাহ বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ

-‘যারা আল্লাহ ও তার রাসূলকে কষ্ট দেয় আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে অভিশম্পাত করেন।’ [আল-আহযাবঃ ৫৭]

তিনি বলেন, এর চেয়ে আমি কোনো কিছু ধৃষ্টতা মনে করি না যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিত জাহান্নামী।

ইবনে আসাকের তার ইতিহাসে উল্লেখ করেন, ইয়াহইয়া বিন আব্দুল মালিক বিন আবু গনিয়্যাহ বলেন, আমাদেরকে নওফেল বিন আল-ফুরাত -তিনি উমর বিন আব্দুল আযীযÑএর প্রশাসক ছিলেন- বলেন, শামদেশের রচয়িতাদের মধ্যে থেকে এক ব্যক্তি তার কাছে বিশ্বস্ত ছিলেন। তিনি শাম শহরে একজন লোককে প্রশাসক নিযুক্ত করলেন যার পিতা মান্নানিয়া দ্বারা ওজন করত। এই সংবাদ উমর বিন আব্দুল আযীয-এর কাছে পৌঁছল। তিনি বললেন, কে আপনাকে মুসলমিদের অঞ্চলে এমন ব্যক্তিকে প্রশাসক নিযুক্ত করতে বলেছে যার পিতা মান্নানিয়া দ্বারা ওজন করত? তিনি বললেন, আমিরুল মো‘মিনীনকে আল্লাহ সঠিক করুন, তার পিতা কেমন ছিল সে দায়ভার আমার উপর নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতা মুশরিক ছিলেন। উমর বললেন, আহ! অতঃপর চুপ থাকলেন। অতঃপর মাথা উঠালেন এবং বললেন, আমি কি তার জিহ্বা কাটব? আমি কি তার হাত-পা কাটব? আমি কি তাকে ঘাড়ে আঘাত করব? অতঃপর তিনি বললেন, এটা কি আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সমতা করলেন? যতদিন জীবিত থাকবেন কোনো দায়িত্ব পাবে না। [তারিখে দেমশক, ইবনে আসাকের, ৪৫/২২২।]

আল-হাকেম একটি হাদিস বর্ণনা করেন যেটাকে তিনি সহিহ বলেছেন তবে যাহাবী একজন রাবি তথা ওসমানকে যয়ীফ বলেছেন। হাদিসটি হল, ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার পিতামাতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। তিনি বলেন, আমি আমার রবকে তাদের ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞাসা করিনি যে তিনি আমাকে তাদের ব্যাপারে কিছু দিবেন- আমি আমার রবকে তাদের ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞাসা করিনি যে, তিনি আমাকে দিবেন। তবে আমি সেদিন মাকাম মাহমুদ বা প্রশংসিত স্থানে অবস্থান করব। [আল-মুসতাদরাক, আলÑহাকেম, ২/৩৯৬, হাদিস নং ৩৩৮৫।]

এ হাদিসটিকে হাদিস বিশারদগণ উল্লেখ করেছেন এবং এটাকে সত্যায়ন করেছেন। বরং এর দ্বারা তারা পিতামাতার মুক্তির ব্যাপারে প্রমাণ দিয়েছেন। তারা হলেন, ইমাম সুহাইলী, সুয়ূতী এবং কিরাফী।

একটি হাদিস বর্ণনা করা হয়ে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতামাতাকে ঈমান আনয়নের জন্য জীবিত করা হয়। তারা ঈমান আনয়ন করেন এবং অতঃপর মৃত্যুবরণ করেন। তবে এটার ভিত্তি নেই। তবে সারকথা হল, তারা উভয়েই আহলে ফাতরার লোক ছিলেন। আর হাদিসে কুদসীতে আছে যে, চার প্রকার লোক হাশরের ময়দানে আল্লাহর কাছে আপত্তি করবে। তন্মধ্যে এক প্রকার হল আহলে ফাতরার লোক। হাদিসটি হলঃ আল-আসওয়াদ বিন সারী’ রাদ্বিয়াল্লাহ আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘চার প্রকার ব্যক্তিকে কিয়ামত দিবসে উপস্থিত করা হবে। একজন বধির যে কিছু শুনতে পেত না, দ্বিতীয়জন নির্বোধ বা পাগল, তৃতীয়জন বয়সের ভাড়ে ন্যুব্জ যে কিছু বুঝতে পারত না, চতুর্থজন যে ফাতরা বা মধ্যবর্তী বিরতীতে মারা গেছে -অর্থাৎ এক রাসূল বা নবীর মৃত্যুর পর অপর নবী বা রাসূল আসার আগ পর্যন্ত ইসলামের দাওয়াত না পেয়ে এবং সত্য জানতে না পেরে মারা গেছে। বধির বলবে, হে আমার রব! ইসলাম এসেছিল কিন্তু আমি কিছু শুনতে পেতাম না। নির্বোধ বা পাগল বলবে, হে আমার রব! ইসলাম এসেছিল কিন্তু বাচ্চারা আমার প্রতি পাথর, কংকর ও গোবর ইত্যাদি ছুঁড়ে মারত (ফলে ইসলাম সম্পর্কে আমি কিছু জানতে পরতাম না)। বয়সের ভারে ন্যুব্জ ব্যক্তি বলবে, হে আমার রব! ইসলাম এসেছিল অথচ আমি কিছুই বুঝতাম না। আর যে ব্যক্তি দুই নবী বা রাসূলের বিরতীতে মারা গেছে সে বলবে, হে আমার রব! আমার কাছে কোনো রাসূল আসেনি। তিনি তাদেরকে অনুসরণ করানোর জন্য তাদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নেবেন। অতঃপর তিনি তাদের কাছে নির্দেশ পাঠাবেন যে তোমরা জাহান্নামে প্রবেশ কর।’ তিনি (রাসূল) বলেন, ‘ঐ জাতের কসম যার হাতে মুহাম্মদের জান, যদি তারা জাহান্নামে প্রবেশ করে তাহলে তারা তা শীতল ও শান্তিময় পাবে।’ [মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং ১৬৩৪৩।]

হাদিসটির সনদ যয়ীফ, তবে হাদিসটি হাসান। কেননা, হাদিসটির কিছু শাহেদ আছে যা শায়খ নাসের উদ্দীন আলবানী সিলসিলা সহিহায় ১৪৩৪ নং এ উল্লেখ করেছেন। সুতরাং, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতামাতা ও দাদা যেহেতু ফাতরা বা দুই নবীর মধ্যবর্তী সময়ে মারা গেছেন, তাহলে তারা পরকালে সুযোগ পাবেন।

তবে সহিহ মুসলিম একটি হাদিস বর্ণনা করেন, যেখানে আছে, এক ব্যক্তি এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে রাসূলুল্লাহ, আমার পিতা কোথায়? তিনি বললেন, জাহান্নামে। তিনি যখন পশ্চাদ্ধাবন করলেন, তিনি বা রাসূলুল্লাহ বললেন, আমার পিতা এবং তোমার পিতা জাহান্নামে। [সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২০৩/৩৪৭।]

এ হাদিসটি উপরোক্ত হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক হচ্ছে। এর উত্তরে বলা যায়, এ হাদিসটি তিনি যখন বলেছেন হয়তো তখন বা তার আগে আল্লাহ তাঁকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জানাননি যে আহলে ফাতরার ব্যাপারে কী করা হবে। পরে আল্লাহ তাকে জানিয়েছেন যে পরকালে তাদেরকে সুযোগ দেয়া হবে। অথবা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম তার পিতা জাহান্নামী বলার আরেকটি কারণ হতে পারে যে, তিনি যখন আল্লাহর কাছে তার পিতার জন্য ইসতেগফার করার অনুমতি চেয়েছিলেন, আল্লাহ তাকে অনুমতি দেননি। এ কারণে, তিনি ধারণা করেছেন তার পিতা জাহান্নামী। আবার, এটাকে অনেকে প্রমাণ উপস্থাপন করেন যে, তাঁর পিতা মুশরিক ছিলেন।

এখানে একটি প্রশ্ন আসতে পারে, আল্লাহ কেন তাকে তার পিতার জন্য ইসতেগফার করতে দেননি? এর উত্তরে বলা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসতেগফার করবেন নিজের জন্য এবং তাঁর উম্মতদের জন্য। তবে যারা তারা উম্মত নয় তাদের জন্য তিনি ইসতেগফার করবেন না এবং পরকালে তার উম্মত ব্যতীত অন্য একত্ববাদীদেরকে জাহান্নামে দেখলেও তাদের জন্য সুপারিশ করতে পারবেন না। কারণ, তিনি সুপারিশ করতে যাচনা করবেন তবে আল্লাহ তাকে তার অনুমতি দিবেন না। বরং তিনি বলবেন, এটা তোমার প্রতি নয়। তারা আমার একত্ববাদের প্রতি ঈমান এনেছে। আমিই তাদেরকে মুক্তি দিব। যেমন হাদিসে কুদসীর শেষাংশে বর্ণিত হয়েছেঃ …‘অতঃপর আমি চতুর্থবার ফিরব এবং উক্ত বাক্য দ্বারা তার প্রশংসা করব। অতঃপর তার সেজদায় লুটিয়ে পড়ব। বলা হবে, হে মুহাম্মদ! মাথা উঠাও। বল, শোনা হবে। চাও, দেয়া হবে। সুপারিশ কর, কবুল করা হবে। আমি বলব, হে আমার রব! যারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলেছে তাদের ব্যাপারে আমাকে অনুমতি দিন। তিনি বলবেন, আমার ইজ্জত, বড়ত্ব, মহত্ত¡ ও সম্মানের কসম! যে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলেছে অবশ্যই আমি তাকে বের করব।’[সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৭০৭২, ও সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৩২৬-১৯৩।]

অর্থাৎ-“আমার ইজ্জত, বড়ত্ব, মহত্ত¡ ও সম্মানের কসম! যে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলেছে অবশ্যই আমি তাকে বের করব” – এ অংশটুকু দ্বারা এটা স্পষ্ট যে যাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেনি, ইসলাম সম্বন্ধে কিছু জানে না তবে প্রকৃতিকে গবেষণা করে এতটুকু বুঝতে সক্ষম হয়েছেন যে, এ নিখিল বিশ্বের কোনো স্রষ্টা আছে। মৃত্যু অবধি সে এ বিশ্বাসেই অটল ছিল এবং একত্ববাদের ওপর তার মৃত্যু হয়েছে তাহলে কিয়ামত দিবসে স্বয়ং আল্লাহ তাকে মুক্তি দেবেন এবং এদের জাহান্নাম থেকে বের করার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো কর্তৃত্ব থাকবে না। [সহিহ হাদিসে কুদসী, কামারুজ্জামান বিন আব্দুল মালেক, পৃষ্ঠা ১১৩।]

আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্বপুরুষগণের ব্যাপারে অনেকে বলেন যে, তারা কেউ মুশরিক ছিলেন না। তারা একত্ববাদের বিশ্বাসী ছিলেন। যেমন ইমাম রাযী বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আমি পবিত্র পিঠ থেকে পবিত্র জঠরে স্থানান্তরিত হয়ে আসছিলাম।’ আর আল্লাহ বলেন,

إِنَّمَا الْمُشْرِكُونَ نَجَسٌ

-‘মুশরিকরা নাপাক।’ [তওবাঃ ২৮] এটা অত্যাবশ্যক করে যে, তাঁর দাদা ও নানাদের পূর্বপুরুষ মুশরিক ছিলেন না।’[তাফসীর রাযী, ১৩/৩৩।]

হাদিসটি হল, ইকরিমা থেকে বর্ণিত, ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আমার পিতামাতা অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়নি। আর আল্লাহ আমাকে পবিত্র পৃষ্ঠ থেকে পবিত্র জঠরে স্বচ্ছ ও শৃঙ্খলিত অবস্থায় পরিবর্তন করে এনেছেন। আর যখন শাখা-প্রশাখা হয়েছে, আমি উত্তম শাখায় থেকেছি।’[দালায়েলুন নবুওয়াহ, আবু নুয়াইম আল-ইসপাহানী, ১/১১Ñ১২।]

তবে এই হাদিসটির সনদের ব্যাপারে নাসিরুদ্দীন আলবানী বলেন, ‘দুর্বল। আর ইকরিমার পরে যারা আছে তাদেরকে আমি চিনি না।’ [এরওয়াউল গালীল, নাসিরুদ্দীন আলবানী, ৬/৩৩১Ñ৩৩২।]

ইমাম শওকানী বলেন, ‘এটা মওদ্বু বা জাল। এটাকে ঘটনা বর্ণনাকারীরা বানিয়েছে।’[আল-ফাওয়ায়েদুল মাজমুআ‘হ, ইমাম শওকানী, পৃষ্ঠা ৩২০।]

সুতরাং, এ হাদিসটিকেও প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না। আর দুই ফাতরার মধ্যবর্তী সময়ে যারা মারা গিয়েছে তাদের মধ্যে যাদের কাছে ইবরাহীমী দাওয়াত পৌঁছেছে তারপরও তারা মূর্তিপূজা ও শিরকে লিপ্ত ছিল তারা জাহান্নামে যাবে। আর যাদের কাছে ইবরাহীমী দাওয়াত পৌঁছেনি এবং তারা একত্ববাদের বিশ্বাসেও অটল থাকেনি বরং শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে নানা শিরকযুক্ত কাজে লিপ্ত হয়েছে, এরা পরকালে দাবি উত্থাপন করতে পারবে যে, তাদের কাছে দাওয়াত পৌঁছেনি। ফলে, তাদেরকে কিয়ামত দিবসে জাহান্নামে ঝাঁপ দিতে বলা হবে। তবে মক্কায় ইবরাহীমী দাওয়াত বলবৎ থাকার সম্ভাবনা শতভাগ। কারণ, সেখানে ইসমাঈল আলাহিস সালাম ও তার পুত্রদের বসবাস চলে আসছিল। আর তারা বংশ পরম্পরায় সেখানে ইবরাহীমী দাওয়াতকে চলমান রেখে থাকবেন সেটাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। কারণ, যেহেতু লোকেরা বিভিন্ন স্থান থেকে মক্কায় হজ্জ করতে আসতেন। তবে লোকদের মাঝে শয়তান মূর্তিপূজা প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিল। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে ইসলাম আগমনের পূর্বে মক্কায় বসবাসকারী যারা মূর্তিপূজায় লিপ্ত ছিল তারা পরকালে আপত্তি করার সুযোগ পাবে না। আবার, এমনও হতে পারে যে, লোকেরা মক্কায় হজ্জ করতে আসত বটে তবে কালের আবর্তনে শয়তান তাদের মাঝে একত্ববাদের শিক্ষা নিষ্প্রভ করে তাদের মাঝে মূর্তিপূজা প্রবেশ করিয়েছিল। সূতরাং, এই দুইটি অবস্থার মধ্যে যদি মূর্তিপূজা প্রচলিত থাকা সত্তে¡ও একত্ববাদের দাওয়াত অবশিষ্ট থেকে থাকে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতামাতা ও পূর্বপুরুষগণ একত্ববাদে বিশ্বাসী হয়ে থাকেন তাহলে তারা মুক্তি পাবেন। আর যদি সমাজ থেকে একত্ববাদের বিশ্বাস অপসারিত হয়ে থাকে এবং তারা বংশ পরম্পরায় একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন এবং মূর্তিপূজা করতেন না, তাহলেও তারা মুক্তি পাবেন। আর যদি একত্ববাদের বিশ্বাস নিষ্প্রভ হয়ে থাকে এবং তারা মূর্তিপূজায় লিপ্ত থেকে থাকেন তাহলে পরকালে তারা আহলে ফাতরা হিসেবে আপত্তি জানাতে পারবেন। কারণ, আল্লাহ তায়ালা রাসূল প্রেরণ করা ব্যতীত কোনো জাতিকে শাস্তি দেন না। যেমন তিনি বলেন,

وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولًا

-‘আর আমরা শাস্তি প্রদানকারী নই যতক্ষণ না আমরা রাসূল প্রেরণ করি।’ [আল-ইসরাঃ ১৫]।

তবে ইমামিয়াদের মত হল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্বপুরুষগণ একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

শুক্রবার বিষয়ক হাদিসমূল হাদিস:«مَنْ غَسَّلَ وَاغْتَسَلَ، وَبَكَّرَ وَابْتَكَرَ، وَمَشَى وَلَمْ يَرْكَبْ، وَدَنَا مِنَ ال...
28/08/2026

শুক্রবার বিষয়ক হাদিস
মূল হাদিস:
«مَنْ غَسَّلَ وَاغْتَسَلَ، وَبَكَّرَ وَابْتَكَرَ، وَمَشَى وَلَمْ يَرْكَبْ، وَدَنَا مِنَ الْإِمَامِ فَاسْتَمَعَ وَلَمْ يَلْغُ، كَانَ لَهُ بِكُلِّ خُطْوَةٍ عَمَلُ سَنَةٍ أَجْرُ صِيَامِهَا وَقِيَامِهَا»
অনুবাদ:
"যে ব্যক্তি জুমার দিনে গোসল করাল ও নিজে গোসল করল, সূর্যোদয়ের পরপরই বা দিনের শুরুতেই মসজিদে গেল এবং প্রথম খুতবা থেকেই উপস্থিত থাকল, হেঁটে মসজিদে গেল (কোনো বাহনে চড়ল না), ইমামের কাছাকাছি বসল, মনোযোগ দিয়ে খুতবা শুনল এবং কোনো অনর্থক কাজ বা কথা বলল না—তার প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে এক বছর সিয়াম (রোজা) ও রাত জেগে সালাত আদায়ের (কিয়াম) সওয়াব লেখা হয়।"
শব্দার্থ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা:
• «مَنْ غَسَّلَ وَاغْتَسَلَ» (গোসল করাল ও নিজে গোসল করল):
o কেউ কেউ বলেছেন: এর অর্থ মাথার চুল ভালোভাবে ধৌত করা ও পুরো শরীর গোসল করা।
o আবার অনেকে বলেছেন: এর অর্থ নিজ স্ত্রীকে সহবাসের মাধ্যমে গোসলে বাধ্য করা এবং নিজে গোসল করা, যাতে মন সম্পূর্ণ শান্ত থাকে এবং দৃষ্টি সংযত থাকে।
• «وَبَكَّرَ وَابْتَكَرَ» (আগেভাগে গেল ও শুরুতেই পৌঁছাল):
o বুকুর (بُكُور): একদম সকালে বা জুমার সময়ের শুরুতেই বের হওয়া। এর আরেকটি অর্থ গ্রহণ করা হয় যে, যে ব্যক্তি মসজিদে যাওয়ার সময় দান করল বা নামাযের আগে দান করল।
o ইবতিকার (ابْتِكَار): খুতবার একদম শুরু থেকেই উপস্থিত থাকা। (তাগিদ ও গুরুত্ব বোঝাতে দুটো শব্দ একসাথে ব্যবহৃত হয়েছে)।
• «وَمَشَى وَلَمْ يَرْكَبْ» (হেঁটে গেল, সওয়ার হলো না):
o কোনো বাহনে না চড়ে পায়ে হেঁটে মসজিদে যাওয়া, যাতে তা নম্রতার প্রতীক হয় এবং পদক্ষেপের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
• «وَدَنَا مِنَ الْإِمَامِ» (ইমামের নিকটে বসল):
o সামনের কাতারে ইমামের কাছাকাছি বসা, যাতে কোনো বাধা ছাড়াই স্পষ্ট খুতবা শোনা যায়।
• «فَاسْتَمَعَ وَلَمْ يَلْغُ» (মনোযোগ দিল ও অনর্থক কাজ করল না):
o পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা এবং কথা বলা, মোবাইল চালানো বা জিকির/তাসবিহ নিয়েও ব্যস্ত থাকার মতো কোনো অনর্থক কাজ না করা।
প্রতিদান ও শিক্ষা:
যে ব্যক্তি এই পাঁচটি শর্ত (উত্তমরূপে গোসল, সকালেই গমন, হেঁটে যাওয়া, ইমামের কাছে বসা এবং মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা) পূরণ করবে, তার বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে পুরো এক বছরের নফল রোজা ও এক বছরের রাত জেগে সালাত আদায়ের সওয়াব দেওয়া হবে। এটি সুন্নাহর বর্ণিত সবচেয়ে মহিমান্বিত ও বড় সওয়াবের একটি কাজ।

প্রাথমিক আরবি ভাষা ও কোরআনের অর্থ অনুধাবন কোর্সএ কোর্সটি হল জেনারেল শিক্ষিতদের জন্য যারা আরবি ভাষা শিখতে চাচ্ছেন এবং কোর...
05/04/2026

প্রাথমিক আরবি ভাষা ও কোরআনের অর্থ অনুধাবন কোর্স
এ কোর্সটি হল জেনারেল শিক্ষিতদের জন্য যারা আরবি ভাষা শিখতে চাচ্ছেন এবং কোরআনের অর্থ অনুধাবন করতে চাচ্ছেন। আরবি ভাষা হল মুসলিমদের নৈতিক ভাষা। তাই এ ভাষা শেখার গুরুত্ব অপরিসীম। কোরআন বোঝার জন্য আরবি ভাষা শেখাও একটি এবাদত। এ কোর্স করার জন্য শিক্ষার্থীকে কোরআন শরীফ পড়া জানতে হবে। আরবি ভাষা শুরু থেকে শেখানো হবে এবং কোরআনের এর ব্যবহার দেখানো হবে। আর নামাযে অধিক পঠিত ত্রিশ পারার সূরাগুলোর প্রতিটি আয়াতের শব্দাবলীর অর্থ ভেঙ্গে ভেঙ্গে বোঝানো হবে, ইন শা আল্লাহ। আশাকরি এ কোর্সটি শিক্ষানবিশদের জন্য বেশ উপকারী হবে, ইন শা আল্লাহ।
কোর্সটি অনলাইন এবং অফলাইন হবে। অফলাইনের ক্ষেত্রে মহিলাদের পৃথক ব্যাচ রয়েছে। তবে অনলাইনের ক্ষেত্রে মহিলাদের পৃথক কোনো ব্যাচ নেই।
কোর্সের মেয়াদ: ৩ মাস।
কোর্স ফি: ৩০০০ টাকা।
ক্লাস: সকাল ৬:৩০-৭:৩০ (অফলাইন পুরুষ)
ক্লাস: রাত ৯:৩০-১০:৩০ (অনলাইন পুরুষ ও মহিলা)
ক্লাস: বিকেল: ৫:১৫-৬:১৫ বা আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত (অফলাইন মহিলা)
গুগল ফরম লিঙ্কঃ
https://forms.gle/RWLJ6VnQLqG2CiT2A
ভর্তিচ্ছুক ভাইদের প্রতি অনুরোধ, গুগল ফরমটি পূরণ করে
বিকাশ পার্সোনাল 01710909216
নগদ পার্সোনাল 01648453132 প্রদেয় অর্থ প্রদান করে আপনার রেজিস্ট্রি কনফার্ম করুন।

কোর্স পরিচালনায়ঃ
কামারুজ্জামান বিন আব্দুল মালেক আল-আযহারী
দাওরা হাদিসঃ জামিয়া আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।
বি.এ. অনার্স হাদিস ডিপার্টমেন্টঃ আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়
মাস্টার ও এম.ফিলঃ কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়
এম.ফিলের বিষয়ঃ উলূমুল হাদিস
যোগাযোগঃ
আল-মুসতাকবাল ইসলামিক ইনস্টিটিউট
বাড়ি # ৩৫, রোড # ১৭, সেক্টর # ১৪, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০।

আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা  আপনি কি আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আগ্রহী? আপনি কি আরবি ভাষা নিয়ে চিন্তিত? তাহলে আপন...
30/04/2025

আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা

আপনি কি আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আগ্রহী? আপনি কি আরবি ভাষা নিয়ে চিন্তিত? তাহলে আপনার জন্য রয়েছে তিনমাস মেয়াদি ইনটেন্সিভ কোর্স যেখানে আরবি ভাষা, হিওয়ার ও নাহু-সরফ শেখানো হবে যাতে দেরাসা খাসসায় তাহদীদে মুসতাওয়ায় ভালো ফলাফল করতে পারেন। তবে কোর্স করা বাধ্যতামূলক নয়। সকলের জন্য ভিসা ও যাবতীয় প্রসেসিং এর কাজে সহযোগিতা করা হয়।

কোর্স বিষয়ক তথ্যঃ
ক্লাস শুরুঃ ১৫/০৫/২৫ খ্রিঃ
সপ্তাহে পাঁচ দিন (শনি - বুধ)। প্রতিদিন দুই ঘণ্টা থেকে আড়াই ঘণ্টা, প্রয়োজনে তিন ঘণ্টা।
অনাবাসিক কোর্স ফিঃ দশ হাজার টাকা।
প্রতিমাসেই নতুন ব্যাচ।
কোরবানীর ঈদের পর থেকে আবাসিক সার্ভিস চালু হবে, ইন শা আল্লাহ।

কোর্স চলাকালীন সময়ে যাবতীয় প্রসেসিং চলতে থাকে এবং কোর্স শেষ হওয়া মাত্রই ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হয়। আর যারা এখানে কোর্স করবেন না তাদের জন্য যাবতীয় কার্যপ্রক্রিয়া শেষ করে দুই মাসের মধ্যে ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হয়। এবং সেখানে পৌঁছার পর বাসস্থান ও ভর্তির ব্যাপারে সহযোগিতা করা হয়।

যা লাগবেঃ
১। পাসপোর্ট।
২। কওমী মাদরাসার ছাত্রদের জন্য কমপক্ষে শরহে বেকায়ার সার্টিফিকেট লাগবে। আলিয়া মাদরাসার ছাত্রদের জন্য কমপক্ষে আলিম সার্টিফিকেট লাগবে। আর জেনারেল ছাত্রদের জন্য আলিম সমমান তথা উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট লাগবে।
৩। এছাড়াও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যেমন মেডিক্যাল চেকআপ, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স এবং অন্যান্য বিষয় প্রয়োজন অনুযায়ী।

কোর্স পরিচালনা, সার্বিক সহযোগিতা ও বিস্তারিত জানতেঃ
কামারুজ্জামান বিন আব্দুল মালেক আল-আযহারী
যোগাযোগঃ
আল-মুসতাকবাল ইসলামিক ইনস্টিটিউট
বাড়ি # ৩৫, রোড # ১৭, সেক্টর # ১৪, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০।
মোবাইলঃ 01648453132

মানবসৃষ্টিيَخْرُجُ مِنْ بَيْنِ الصُّلْبِ وَالتَّرَائِبِশব্দার্থঃ يَخْرُجُ = বের হয়। مِنْ = থেকে।بَيْنِ  = মধ্যবর্তী। الص...
06/03/2025

মানবসৃষ্টি

يَخْرُجُ مِنْ بَيْنِ الصُّلْبِ وَالتَّرَائِبِ

শব্দার্থঃ يَخْرُجُ = বের হয়। مِنْ = থেকে।بَيْنِ = মধ্যবর্তী। الصُّلْبِ = মেরুদণ্ড। وَ = ও, এবং। التَّرَائِبِ = বুক, বক্ষপঞ্জর বা বুকে হার পরিধানের স্থান।
অর্থঃ যা নির্গত হয় মেরুদণ্ড ও বক্ষপঞ্জরের মধ্য থেকে। [আয়াত ৭]

তাৎপর্যঃ
এটা একটি জীববিজ্ঞান বিষয়ক আয়াত যা মানবসৃষ্টি সংক্রান্ত। এ ব্যাপারে তৎকালীন আরবদের কোনো জ্ঞান ছিল না। এমনকি রাসূলুল্লাহ স.ও জানতেন না। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁকে স. জানিয়েছেন। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তৎকালীন মুফাসসিরগণ তাদের জ্ঞান অনুযায়ী ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। কিন্তু এ আয়াত দ্বারা মূলত কী বোঝানো হয়েছে সে বিষয়ে আধুনিক বিজ্ঞান কী বলে তা জানব। তবে তার আগে পূর্ববর্তী মুফাসসিরগণ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় কী বলেছেন তা সংক্ষিপ্তাকারে আলোচনা করছি। এ বিষয়ে অনেক মতামত আছে কিন্তু আমি সব উল্লেখ করছি না। আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোনটা উদ্দেশ্য সেদিকেই আমি বেশি দৃষ্টিপাত করব।
يَخْرُجُ : বের হয় বা পানি বের হয়।
الصُّلْبِ : মেরুদণ্ড বা পৃষ্ঠদেশের হাড়।
التَّرَائِبِ : হাড়সমূহ বা বুকের পাঁজরের হাড়। এর একবচন হল اَلتَّرِيبَةُ। উদ্দেশ্য হল, বুক বা হার পরিধানের স্থান বা বুকের উপরিভাগের ডানপাশের চারটি হাড় এবং বামপাশের চারটি হাড়। اَلتَّرَائِبُ বলে নারীর বুককে উদ্দেশ্য করা হত তৎকালীন যুগে। কিন্তু এ শব্দটি পুরুষের বেলাতেও প্রযোজ্য।

اَلصُّلْبِ ও اَلتَّرَائِبِ শব্দদ্বয়ের তাৎপর্যঃ
ব্যাখ্যাতাগণ এই اَلصُّلْبِ ও اَلتَّرَائِبِ শব্দদ্বয়ের ব্যাখ্যায় মতভেদ করেছেন। এক মত হল, اَلصُّلْبُ বা মেরুদণ্ড বলতে উদ্দেশ্য হল, পুরুষের মেরুদণ্ড। আর اَلتَّرَائِبُ বলতে উদ্দেশ্য হল, নারীর বুক। তা হলে অর্থ দাঁড়ায়, যে পানি নির্গত হয় পুরুষের মেরুদণ্ড থেকে এবং নারীর বুক থেকে। অর্থাৎ- যে পানি বা বীর্য [পুরুষের শুক্রাণু ও নারীর ডিম্বাণু] দ্বারা সন্তান সৃষ্টি হয়, তা পুরুষের পিঠ বা মেরুদণ্ড থেকে নির্গত হয়, এবং নারীর বুক থেকে নির্গত হয়। কিন্তু এ মতটি শুদ্ধ নয়। যদি তাই হত, তাহলে আল্লাহ مِنْ بَيْنِ الصُّلْبِ وَالتَّرَائِبِ না বলে مِنَ الصُّلْبِ وَالتَّرَائِبِ বলতেন। مِنْ بَيْنِ الصُّلْبِ وَالتَّرَائِبِ মানে পৃষ্ঠ ও বক্ষপঞ্জরের মধ্য থেকে। আর مِنَ الصُّلْبِ وَالتَّرَائِبِ মানে পৃষ্ঠ বা মেরুদণ্ড ও বুক থেকে।
ইমাম কুরতুবী আল-হাসান থেকে বর্ণনা করেন, ‘পানি যা বের হয় পুরুষের পৃষ্ঠ ও বক্ষপঞ্জর থেকে, এবং নারীর পৃষ্ঠ ও বক্ষপঞ্জর থেকে।’( ) আল-হাসান-এর কথার তাৎপর্য হল, তা নির্গত হয় একটি দেহ থেকে তথা পুরুষের দেহ থেকে এবং নারীর দেহ থেকে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল দেহ। কারণ, بَيْنِ শব্দটি ইঙ্গিত দেয়, এটা বের হয় এমন স্থান থেকে যেটা দুইটি বস্তুর মাঝে। আর একজন মানুষের মূল দেহ হল তার পিঠ ও বুক। এ-দু’টির সমন্বয়ে গঠিত হয় তার দেহ। অর্থাৎ- পানি বের হয় দেহ থেকে। তাহলে, এখানে প্রশ্ন আসে, আয়াতে مَاءٌ বা পানি একবচন উল্লেখিত হয়েছে। অথচ দ্বিবচন উল্লেখ করা প্রয়োজন ছিল। উত্তর হল, পুরুষ ও নারীর পানি মিলে একাকার হওয়ার ফলে তা একপানিতে রূপান্তরিত হয়েছে। সুতরাং এক পানিতে রূপলাভ করেছে।
এখন প্রশ্ন হল, নারীর পানি বলতে কোন পানি উদ্দেশ্য? যদি বলা হয়, মিলনকালে যে পানি বের হয় তা, তাহলে এটা আধুনিক বিজ্ঞান কর্তৃক ভুল প্রমাণিত হয়। কারণ, রতিক্রিয়ার সময় নারীর যে পানি বের হয় তা হল কামরস; তা প্রাথমিক পর্যায়ে নির্গত হোক অথবা চরমপুলকের সময় নির্গত হোক। এটা তাকে কেবল আনন্দই দেয়। এর সাথে বাচ্চা জন্মদানের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। পরন্তু, সেটা পুরুষের মত সবেগে নির্গত হয় না। তা বেয়ে বেয়ে পড়ে।
উত্তরকালে, আধুনিক বিজ্ঞানের শারীরবিজ্ঞানের সার্বিক আবিষ্কারের ফলে আমরা জানি যে, সন্তান সৃষ্টি হয় পুরুষের শুক্রাণু ও নারীর ডিম্বাণু থেকে। পুরুষের শুক্রাণু যেটা অÐকোষের মাধ্যমে তৈরি হয়ে বীর্যথলিতে অবস্থান করে। শুক্রাণুর পরিমাণ থাকে মাত্র ৩ শতাংশ, আর বীর্যবৎ পানি থাকে ৯৭ শতাংশ। অতঃপর তা রতিক্রিয়ার সময় বীর্যের সাথে নির্গত হয়। এই বীর্যথলিটি অবস্থান করে পৃষ্ঠদেশ ও বক্ষপঞ্জরের মধ্যে বা একটি দেহে। তাহলে, সবেগে পানি স্খলিত হওয়ার বিষয়টি হল, যা সবেগে নির্গত হয় বীর্যথলি থেকে, যে বীর্যথলিটি অবস্থান করে একটি দেহে তথা পৃষ্ঠদেশ ও বক্ষপঞ্জরের মধ্যে। পক্ষান্তরে, নারীর ডিম্বাণু তৈরি হয় ডিম্বাশয়ে ডিম্বোস্ফটনের মাধ্যমে। পুরুষের পানি সবেগে নির্গত হওয়া অনুধাবনীয়। কিন্তু নারীর ডিম্বাণুর বিষয়টি পুরুষের পানির মত নয়। তাহলে, কোরআনে কি কেবল পুরুষের কথাই বলেছে নাকি নারীর বিষয়টিও এর অন্তর্ভুক্ত, অথচ মানবসৃষ্টিতে উভয়েরই ভূমিকা রয়েছে?
চলুন, দেখি আধুনিক বিজ্ঞান কী বলে। পুরুষের বিষয়টি পরিষ্কার ও বোধগম্য। চলুন, দেখা যাক নারীর ডিম্বাণুর বিষয়। আমি একটি গ্রাফিয়ান ফলিকলের ডায়াগ্রাম বা নকশা উপস্থাপন করছি এবং অতঃপর তার ব্যাখ্যা প্রদান করছি। নকশাটি লক্ষ করুন যেমন ছবিতে দেয়া হয়েছে।
নারীর ডিম্বাশয়ে অনেক প্রাথমিক ফলিকল বা বীজকোষ তথা সন্তান সৃষ্টিকারী ডিম্বাণু বা পানি থাকে। পিটুইটারী থেকে হরমোন নিঃসৃত হয়ে একটি প্রাথমিক বীজকোষ বা ফলিকলকে পরিপক্ক করে। একটি পরিপক্ক বীজকোষকে graafian follicle বলে। এই গ্রাফিয়ান ফলিকল ডিম্বাণুকে নিজের মধ্যে সযত্নে ধারণ করে। এটি একটি মাত্র ডিম্বাণু ধারণ করে। একটি ফলিকলকে আল্লাহ তায়ালা ডিম্বাশয়ে অতি যত্নে গড়ে তোলেন। এটা অনেকগুলো স্তর বা layer দ্বারা সুরক্ষিত থাকে। আবার তেমনি ডিম্বাণু বা o**m কয়েকটি স্তর দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে।

যেসব স্তর দ্বারা গ্রাফিয়ান ফলিকল পরিবেষ্টিতঃ
থিকা এক্সটার্না (বাহ্যিক আবরণ), থিকা ইন্টার্না (এটা ইস্ট্রজেন বা স্ত্রী-হরমোন নির্গত করে), বেইজমেন্ট মেমব্রেন, গ্রানিউলোসা সেল (এটা পুরু আবরণ যা তরল নির্গত করে এবং এটাকে লিকুউয়র ফলিকুলি বলে যা গুহাকে পরিপূর্ণ রাখে) আর গুহাকে এন্ট্রাম বলে যা তরল দ্বারা পূর্ণ থাকে। এটা ডিম্বাণুকে রক্ষা করে। এই তরল পদার্থের পরে আরেকটি সেল আছে, তাকে বলে, কিউমিউলাস অপরাস সেলস (cumulus ophorus cells)। এসব মিলে গঠিত হয় একটি পরিপক্ক বীজকোষ বা গ্রাফিয়ান ফলিকল।
আর নারীর ডিম্বাণু যতক্ষণ পর্যন্ত গ্রাফিয়ান ফলিকলে অবস্থান করে তাকে সেকেণ্ডারী উসাইট বলে। এই সেকেণ্ডারী উসাইট হল ডিম্বাণু যা শুক্রাণু কর্তৃক নিষিক্ত হওয়ার জন্য পরিপক্ক।
এই লিকুউয়র ফলিকুলি বা তরল মিউকোপ্রোটিন (mucoprotein) এবং হায়েলিউরনিক এসিড (hyaluronic acid) ধারণ করে। এটা বা এন্ট্রাম ডিম্বাণুকে যান্ত্রিক হেঁচকা বা আকস্মিক গতি (mechanical jerk) থেকে সুরক্ষিত রাখে এবং দ্বিতীয়ত এটাকে গ্রাফিয়ান ফলিকলের স্তরের দিকে চাপ দিয়ে রাখে। কারণ, যখন এই ডিম্বাণু স্তর ভেদ করে নির্গত হয়ে ফ্যালোপিয়ান টিউবে যাবে তখন এটা সহজেই নির্গত হতে পারবে। আর ঋতুচক্রের তেরতম অথবা চৌদ্দতম দিনে নির্গত হয়। পিটুইটারী থেকে তৈরি লুটেইনাইযিং হরমোন (Luteinizing Hormone) সংক্ষেপে LH বলে। এটা ডিম্বস্ফোটনের আগে উদ্ভূত হয় এবং ডিম্বাণুকে নির্গত করে বা গ্রাফিয়ান ফলিকলের স্তরগুলোকে বিদীর্ণ করে। ফলে, ডিম্বাণু বের হয়ে ফ্যালোপিয়ান টিউবে গমন করে শুক্রাণু কর্তৃক নিষিক্ত হওয়ার জন্য। আর ডিম্বাণু যে ডিম্বাশয় থেকে কয়েকটি স্তর ভেদ করে নির্গত হয়, তা ঘটে সবেগে এবং সজোরে। এখানে নারীর কোনো কর্তৃত্ব থাকে না। আল্লাহ এটাকে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সবেগে নির্গত হওয়ার ক্ষমতা দিয়েছেন যেমন দিয়েছেন পুরুষের বীর্য নির্গত হওয়ার ক্ষেত্রে। পুরুষের বীর্যথলি থেকে সবেগে বীর্য নির্গত হওয়া এটা পুরুষ চাইলে অধিক গতিবেগে নির্গত করবে অথবা চাইলে কম গতিবেগে নির্গত করবে -এ ক্ষমতা তার হাতে নেই। এটা আপন গতিবেগে নির্গত হয়। কিন্তু মূত্র নির্গত করার ক্ষেত্রে পুরুষ চাইলে অধিক গতিবেগে অথবা শ্লথ গতিবেগে ত্যাগ করতে সক্ষম। তেমনি, নারীও তার ডিম্বাণুকে ডিম্বাশয় থেকে ইচ্ছেমতো দ্রুতগতিতে অথবা নিম্নগতিতে নির্গত করবে -এমন ক্ষমতা তার হাতে নেই। এটা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে আপন গতিবেগে ফ্যালোপিয়ান টিউবে নির্গত হয়।
আর ডিম্বাণুর স্তরগুলো হল, কোরোনা রেডিয়েটা (corona radiate cells), যোনা পেলিউসিডা (zona pelucida), পেরিভিটেলাইন স্পেইস (perivitelline space), পেরিভিটেলাইন ঝিল্লি অথবা প্লাজমা ঝিল্লি বা রক্তরস ঝিল্লি (perivitelline membrane or plasma membrane)। সেকেণ্ডারী উসাইট বা ডিম্বাণুর মধ্যভাগকে সাইটোপ্লাজম (cytoplasm) বলে। এটা দুইভাগে বিভক্ত। দেয়ালঘেঁষা অংশ কিছুটা ঘণ থাকে, তাকে এগ কোরটেক্স (egg cortex) অথবা এক্টোপ্লাজম (ectoplasm) বা জীবকোষের বহিরাবরণ বলে। আর মধ্যভাগে যে সাইটোপ্লাজম থাকে, তাকে ওপ্লাজম অথবা ভিটেলাস (ooplasm or vitellus) বা কুসুম বলে। এ দু’টো মিলে গঠিত হয় সাইটোপ্লাজম। এই ওপ্লাজম নিউক্লিয়াস ধারণ করে যাকে জার্মিনাল ভেসিকল (germinal vesicle) বলে। আর নিউক্লিওলাসের (nucleolus) মধ্যে আছে জার্মিনাল স্পট (germinal)।
বলা বাহুল্য যে, পুরুষের শুক্রাণু নারীর ফ্যালোপিয়ান টিউবে ২৪ ঘণ্টা থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত জীবিত থাকে। আর নারীর ডিম্বাণু ডিম্বস্ফোটনের পর ১২ ঘণ্টা থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত ফ্যালোপিয়ান টিউবে অপেক্ষা করে শুক্রাণু কর্তৃক নিষিক্ত হওয়ার জন্য।( )
আর এখানেই হাদিসের সত্যতা বেরিয়ে আসে। তা হল, রাসূলুল্লাহ স. যখন মদীনায় গেলেন, আব্দুল্লাহ বিন সালাম তাঁকে স. কয়েকটি প্রশ্ন করলেন। তন্মধ্যে একটি ছিল, কোন বস্তু সন্তানকে পিতার দিকে টানে, আর কোন বস্তু সন্তানকে মামার (মায়ের বংশ) দিকে টানে? রাসূলুল্লাহ স. এর উত্তরে বললেন, একজন পুরুষ যখন তার স্ত্রীর সাথে রতিক্রিয়া করে তখন যদি তার পানি প্রাধান্য পায় তাহলে সন্তান তার রূপলাভ করে বা তার সাদৃশ্য হয়। আর যদি স্ত্রীর পানি প্রাধান্য পায় তাহলে স্ত্রীর রূপলাভ করে বা তার সাদৃশ্য হয়।( )
স্মর্তব্য যে, এ প্রশ্নটি উম্মে সুলাইমও রাসূলুল্লাহ স. কে করে করেছিলেন যেটা সহিহ মুসলিম বর্ণনা করেছে। হাদিসে বাবা অথবা মায়ের মতো বলতে উদ্দেশ্য হল, তাদের পরিবারের কারো মতো হওয়া। সাদৃশ্য বলতে চারটি রূপ হয়। একঃ ছেলে হোক অথবা মেয়ে হোক, চেহারার সাদৃশ্য বাবার মতো বা বাবার পরিবারের অন্য কারো মতো। দুইঃ অথবা মায়ের মতো বা মায়ের পারিবারের কারো মতো। তিনঃ সন্তান ছেলে হয়ে পুংলিঙ্গ হওয়ার দ্বারা লিঙ্গের ক্ষেত্রে বাবার সাদৃশ্য লাভ করে। চারঃ সন্তান মেয়ে হয়ে স্ত্রীলিঙ্গ হওয়ার দ্বারা লিঙ্গের ক্ষেত্রে মায়ের সাদৃশ্য লাভ করে।
রাসূলুল্লাহ স. যে উত্তর দিয়েছেন তা হল প্রথম দুই প্রকারের সাথে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ- সন্তানের চেহারার মিল। যেমন, আমরা কোনো বাচ্চাকে দেখে বলি, ছেলে হোক অথবা মেয়ে হোক, বাবার মতো হয়েছে দেখতে, অথবা মায়ের মতো হয়েছে দেখতে। হাদিসের এ বাণীর সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কার মিলে যাচ্ছে। তা হল, যদি নারীর ডিম্বস্ফোটন আগে ঘটে এবং ডিম্বাণু ফ্যালোপিয়ান টিউবে এসে শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করে, অতঃপর যদি রতিক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং কোনো শুক্রাণু উক্ত ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করে তাহলে এক্ষেত্রে সন্তানের চেহারা হবে মায়ের মতো অথবা মায়ের পরিবারের কারো মতো। কারণ, নারীর ডিম্বাণু আগে নির্গত হয়েছে। পক্ষান্তরে, রতিক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর যদি শুক্রাণু ফ্যালোপিয়ান টিউবে আগে অবস্থান করে এবং অতঃপর নারীর ডিম্বস্ফোটনের মাধ্যমে ডিম্বাণু ফ্যালোপিয়ান টিউবে এসে শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হয় তাহলে সন্তানের চেহারা হবে পিতার মতো বা পিতার পরিবারের কারো মতো। কারণ, পিতার শুক্রাণু ফ্যালোপিয়ান টিউবে আগে অবস্থান করেছে বা ডিম্বাণুর উপর প্রাধান্য পেয়েছে।
কিন্তু তিন ও চার নং প্রকারের সাথে হাদিসের ব্যাখ্যা সামঞ্জস্যশীল নয়। কারণ, পুরুষের এক্স ক্রোমোজম অথবা ওয়াই ক্রোমোজম যার ফলে সন্তান ছেলে অথবা মেয়ে হয়, তার সাথে পানি আগে নির্গত হওয়া অথবা পরে নির্গত হওয়ার সাথে কোনো সম্পর্ক নাই। কারণ, বিষয়টি এমন নয় যে, ডিম্বস্ফোটনের আগে যদি পুরুষের পানি নির্গত হয় তাহলে ফ্যালোপিয়ান টিউবে ওয়াই ক্রোমোজম অবস্থান করবে যারফলে সন্তান ছেলে হবে, আর পরে হলে এক্স ক্রোমোজম অবস্থান করবে যারফলে সন্তান মেয়ে হবে।
তাহলে আল্লাহ তায়ালা পৃষ্ঠদেশ ও বক্ষপঞ্জরের মধ্যে থেকে যা বের হয় না বলে যা বের হয় বীর্যথলি থেকে এবং যা বের হয় ডিম্বাশয় থেকে বলতে পারতেন। তিনি তা না বলে বলেছেন যা নির্গত হয় পৃষ্ঠ ও বক্ষপঞ্জরের মধ্যে থেকে বা একটি দেহ থেকে, এমন বলেছেন কেন? এখানে বিষয়টিকে ভিন্নভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তা হল, রতিক্রিয়ার সময় যখন বীর্য নির্গত হয়, তখন পুরুষ বলতে পারে না এটা মূলত কোথা থেকে নির্গত হয়। এর আনন্দ সারাদেহ জুড়ে বিস্তৃত হয়। আর এজন্যই রতিক্রিয়া সম্পন্ন করার পর সারাদেহ ধৌত করাকে ফরজ করা হয়েছে।

পক্ষান্তরে, নারীর ডিম্বস্ফোটন হওয়ার পর তার দেহেও কিছু পরিবর্তন ঘটে। যেমনঃ
একঃ দেহের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা কিছুটা কমে যায়। আর এটা ঘটে থাকে প্রোজেস্ট্রন হরমোনের পরিবর্তনের কারণে।
দুইঃ তার কণ্ঠ একটু ভারী শোনায়।
তিনঃ তার দেহ থেকে একপ্রকার ঘ্রাণ নিঃসৃত হয়।
চারঃ অনুভূতিশক্তি স্পর্শকাতর হয়। বিশেষ করে, স্পর্শ করা ও দৃষ্টিশক্তি।
পাঁচঃ সে সুগন্ধিত পুরুষের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে।
ছয়ঃ যোনিপথ ঈষৎ স্বচ্ছ ও সাদাটে হয়।
সাতঃ নারী তার পেটে কিছুটা খিঁচুনী অনুভব করে।
আটঃ যৌনমিলনে আগ্রহ বোধ করে।
নয়ঃ ঋতু ব্যতীতও এমনি রক্ত পড়তে পারে অথবা সাদা¯স্রাব নির্গত হতে পারে। কারণ, হরমোনের পরিবর্তন ঘটে।
দশঃ স্তন স্ফীত, ভারী হয়। হালকা ব্যথা অনুভূত হয় এবং স্পর্শে তা ঈষৎ নরম ও কোমল অনুভূত হয়।
এগারঃ গর্ভাশয়ে কিছুটা স্ফীতি ভাব অনুভব করে।
বারঃ কিছুটা ক্লান্তি ও ঝিমুনী অনুভূত হয়।( )

নারীর ডিম্বস্ফোটন বিষয়টিও তার সারাদেহে প্রভাব বিস্তার করে। তাই উক্ত পানি মনে হয় যেন সারাদেহ থেকেই নির্গত হয়। এখন আরেকটি প্রশ্ন হল, এ বিষয়টি নিয়ে আল্লাহ মানুষকে গবেষণা করতে বলেছেন কেন? আধুনিক বিজ্ঞানের মাধ্যমে বিষয়টি আরো সুস্পষ্ট হয়ে গেছে। গবেষণা করার কারণ দুইটি। একঃ একজন মানুষের সৃষ্টি অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এসেছে। সুতরাং, তার পুনরুজ্জীবিত হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। দ্বিতীয়তঃ সাধারণভাবে দেখা যায় শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর সংমিশ্রণে সন্তানের জন্ম। সহজেই বলা যায়, বাবা-মার রতিক্রিয়ায় সন্তানের জন্ম। কিন্তু এখানে বিষয়টি আরো গভীরভাবে প্রোথিত। বাবা-মা’র দৈহিক মিলনে সন্তানের জন্ম বিষয়টি সহজবোধ্য ও স্পষ্ট। কিন্তু কথা হল, যে পানি নির্গত হয় পুরুষের দেহ থেকে এবং নারীর দেহ থেকে, সেই নির্গমন প্রক্রিয়ায় পুরুষেরও হাত নেই-নারীরও হাত নেই। যদি নির্গমন বন্ধ হয়ে যায় তারা কেউ-ই তা নির্গত করতে সক্ষম হবে না। কিন্তু আল্লাহ এটা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে নির্গত হওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। সুতরাং, সন্তান জন্মদানে বাবা-মা’র ভূমিকাও এক্ষেত্রে ক্ষীণ হয়ে দেখা দেয়। এখানে বাবা-মা’র ইন্দ্রিয় সম্ভোগটাই লাভ। এখানে পর্যবেক্ষণযোগ্য বিষয় হল, যে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে পানি দ্বারা সন্তান জন্মদানের ব্যবস্থা করেছেন, সেই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতেই তাকে পরকালে পুনরায় জীবনদান করা হবে। পানি যেমন এÑদুনিয়ায় মানবজন্মের জন্য বীজকোষ, তেমনি পুচ্ছাস্থি (coccyx) হল পরকালে পুনরুজ্জীবনলাভের বীজকোষ।
এখানে আরেকটি প্রশ্ন দেখা দেয়, পানি বা শুক্রাণু ও ডিম্বাণু পুরুষ ও নারীর -উভয়েরই। তাহলে পূর্বের আয়াতে مَاءٌ বা পানি শব্দটি একবচন উল্লেখ করা হল কেন? এর উত্তর হল, আয়াতে مَاءٌ বা পানি শব্দটি نَكِرَةٌ বা অনির্দিষ্ট। এর অধীন একাধিক অন্তর্ভুক্ত। আর উক্ত আয়াতে আরেকটি উত্তর অতিক্রান্ত হয়েছে।
এ ব্যাখ্যাটি হল যদি يَخْرُجُ ক্রিয়ারفَاعِلٌ বা কর্তৃকারক مَاءٌ دَافِقٌ বা বেগবান পানি হয়। কিন্তু ড. মুহাম্মাদ আল-বার এখানে ভিন্ন একটি ব্যাখ্যা প্রদানের প্রয়াস পেয়েছেন। তিনি يَخْرُجُ ক্রিয়ারفَاعِلٌ বা কর্তৃকারক مَاءٌ دَافِقٌ বা বেগবান পানিকে গ্রহণ করেননি। তিনি উক্ত ক্রিয়ার কর্তৃকারক সাব্যস্ত করেছেন ইনসান বা মানুষকে। কারণ, পরের আয়াতে আল্লাহ বলেন, إِنَّهُ عَلَى رَجْعِهِ لَقَادِرٌ -অর্থাৎ- নিশ্চয় তিনি তাকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। এখানে رَجْعِهِ এর هِ সর্বনামটির আরোপ হল ইনসান বা মানুষ। সুতরাং يَخْرُجُ ক্রিয়ারفَاعِلٌ বা কর্তৃকারক হল মানুষ। এখানে বেগবান পানি কর্তৃকারক হবে না। তখন এর তাৎপর্য হবে, মানুষ হল দুই প্রজাতি। পুরুষ ও নারী। অর্থাৎ- মানুষ যেন দৃষ্টি দেয় বা গবেষণা করে তাকে কোন বস্তু থেকে কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুরুষ ও নারী হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাকে পুরুষ অথবা নারী হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে জনন-সম্বন্ধনীয় পানি থেকে (ge***al water)। পুরুষের বীর্য তৈরি হয় অণ্ডকোষে, এবং নারীর ডিম্বাণু তৈরি হয় ডিম্বাশয়ে। এই অণ্ডকোষ এবং ডিম্বাশয় জননেন্দ্রিয় চক্র থেকে তৈরি হয় যা ভ্রæণের পৃষ্ঠদেশ ও বক্ষপঞ্জরের মাঝে বা বক্ষপঞ্জরের হাড়ের নিচে এবং কিডনির উপরে অবস্থান করে। অতঃপর ভ্রæণের বয়সের সপ্তম মাসের শেষের দিকে অণ্ডকোষ ও ডিম্বাশয় সেখান থেকে আস্তে আস্তে নিচের দিকে অবতরণ করে। পরে, পুরুষের অণ্ডকোষ শরীরের বহিরাংশে স্থাপিত হয় এবং নারীর ডিম্বাশয় পেটের ভিতরেই নিম্নদেশে অবস্থান করে। এতদসত্তে¡ও, এই অণ্ডকোষ ও ডিম্বাশয় রক্ত, ¯স্নায়ুতন্ত্র ও লিম্ফ দ্বারা সমৃদ্ধ হয়, যেগুলোর মূল নিহিত থাকে পৃষ্ঠদেশ ও বক্ষপঞ্জরের মধ্যে। অণ্ডকোষ ও ডিম্বাশয়ের ধমনী মহাধমনী (Aorta) থেকে বয়ে আসে যেটা পৃষ্ঠদেশ ও বক্ষপঞ্জরের মধ্যে থাকে। অণ্ডকোষ ও ডিম্বাশয়ের শিরা যেমন পৃষ্ঠদেশ ও বক্ষপঞ্জরের মধ্যে থাকে, তেমনি এ-দু’টির পুষ্টিকর স্নায়ু (nourishing nerves) আসে সমষ্টি স্নায়ু থেকে যা যকৃতের নিচে পৃষ্ঠদেশ ও বক্ষপঞ্জরের মাঝে অবস্থান করে। তেমনিভাবে, lymphatic vessels-ও উক্ত স্থানে অবস্থান করে। সুতরাং এর পর আর সন্দেহ থাকল না যে, অণ্ডকোষ ও ডিম্বাশয় তাদের খাদ্য, রক্ত ও ¯স্নায়ু সংগ্রহ করে পৃষ্ঠদেশ ও বক্ষপঞ্জরের মধ্যে থেকে। অণ্ডকোষ ও ডিম্বাশয় যেমন পৃষ্ঠদেশ ও বক্ষপঞ্জরের মধ্যে থেকে নিচে নেমে এসেছে, ঠিক তেমনি পুরুষের শুক্রাণু ও নারীর ডিম্বাণু তৈরির উপাদানও উক্ত পৃষ্ঠদেশ ও বক্ষপঞ্জরের মধ্যে থেকে আসে।
আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, রতিক্রিয়ার সময় পুরুষের পানি সবেগে নির্গত হলেও, নারীর যে কামরস নির্গত হয় তা সবেগে নির্গত হয় না। তা বেয়ে পড়ে, এবং এর সাথে সন্তান জন্মদানের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। এটা কেবল যোনিপথকে পিচ্ছিল করে। যেটা সবেগে নির্গত হয় সেটা হল, পুরুষের শুক্রাণু বহনকারী বীর্য এবং নারীর ডিম্বাণু যেটা গ্রাফিয়ান ফলিকলে অবস্থান করে এবং পরিপক্ক হওয়ার পর তার স্তরগুলো বিদীর্ণ করে সবেগে নির্গত হয়ে ফ্যালোপিয়ান টিউবে এসে শুক্রাণু কর্তৃক নিষিক্ত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করে। আর দু’টি পানি তথা শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর সংযোজনে মিশ্রিত একক পানিতে রূপান্তরিত হয়ে ভ্রুণকোষে (zygote) রূপান্তরিত হয়।( )
সবেগে নির্গত পানির দু’টি ব্যাখ্যার সারকথা একই। তবে পরের আয়াতের কর্তৃকারকের ভিত্তিতে ব্যাখ্যায় পার্থক্য রয়েছে। তবে দু’টি ব্যাখ্যাতে ভিন্ন ধরনের তথ্য রয়েছে যা কোরআনের সর্বজনিনতার বার্তা বহন করে। যাইহোক, যাকে তিনি এত যত্ন করে সৃষ্টি করেছেন তাকে যদি পুনরুজ্জীবিত না করতে সক্ষম হন তাহলে তো তাঁর ¯স্রষ্টাত্বের ক্ষমতায় দুর্বলতা দেখা দেয়।

Address

House# 35, Road# 17, Sector# 14, Uttara
Dhaka
1230

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Islamic Encyclopedia Research Council posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Place Of Worship

Send a message to Islamic Encyclopedia Research Council:

Shortcuts

Share