26/05/2026
বসরার সেই রাতে বৃষ্টি পড়ছিল। ছোট্ট একটি ঘরে একটি মোমবাতি জ্বলছে। সেই আলোতে একজন মানুষ বসে আছেন — চোখ বন্ধ, ঠোঁট নড়ছে। কাছে গেলে শোনা যেত — তিনি কাঁদছেন। শব্দ করে নয়, ভেতরে ভেতরে। এই মানুষটির নাম হাসান আল-বাসরী। বসরার মানুষ তাঁকে চেনে — কিন্তু এই রাতের কান্নার কথা কেউ জানে না।
হাসান আল-বাসরী রাহিমাহুল্লাহর জন্ম হয়েছিল মদিনায়, ৬৪২ সালে। তাঁর মায়ের নাম খায়রা — তিনি ছিলেন উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহার খাদেমা। ছোটবেলায় উম্মু সালামার ঘরে বড় হয়েছেন। সাহাবীদের দেখেছেন চোখের সামনে। হযরত উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার তাঁকে দোয়া করেছিলেন — ছোট্ট শিশু হাসানের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, “হে আল্লাহ, এই ছেলেকে দ্বীনের গভীর বোঝাপড়া দাও এবং মানুষ যেন তাঁকে ভালোবাসে।” ইমাম যাহাবী লিখেছেন — উমারের সেই দোয়া কবুল হয়েছিল।
কিন্তু এই গল্পটি শুরু হয় হাসান আল-বাসরীর জীবনের একটি বিশেষ রাত থেকে। তিনি তখন বসরায়। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। সারা বসরা তাঁকে চেনে — তাঁর মজলিসে হাজারো মানুষ আসেন, তাঁর একটি কথায় মানুষ কাঁদে, তাঁর উপদেশে জীবন বদলে যায়। কিন্তু সেই রাতে তিনি একা বসে আছেন এবং কাঁদছেন।
পরদিন সকালে তাঁর এক ঘনিষ্ঠ ছাত্র এলেন — মালিক ইবনে দিনার। ইমাম যাহাবী লিখেছেন, মালিক ইবনে দিনার ছিলেন হাসান আল-বাসরীর সবচেয়ে প্রিয় ছাত্রদের একজন। তিনি উস্তাদের চোখ দেখে বুঝলেন — রাতে ঘুম হয়নি, কাঁদেছেন। জিজ্ঞেস করলেন — “কী হয়েছে?” হাসান আল-বাসরী কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। তারপর বললেন — “বসো।”
মালিক বসলেন। হাসান আল-বাসরী বললেন — “গতকাল মজলিসে আমি একটি কথা বলেছিলাম। মানুষ কাঁদল, প্রশংসা করল। ঘরে ফিরে রাতে যখন একা বসলাম — তখন নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম। আমি যা বললাম, সেটা কি আমি নিজে মানি? আমার জীবনে কি সেটা আছে?” মালিক চুপ করে শুনছেন। হাসান আল-বাসরী বললেন — “উত্তর পেলাম না। সেই ভয়েই সারারাত কাঁদলাম।”
মালিক ইবনে দিনার বললেন — “কিন্তু শায়খ, আপনি তো সত্য কথাই বলেছেন।” হাসান আল-বাসরী বললেন — “সত্য কথা বলা আর সত্য কথা জীবনে আনা এক জিনিস নয়। যে কেবল বলে কিন্তু করে না — সে মানুষকে আলো দেখায় কিন্তু নিজে অন্ধকারে থাকে। এই অবস্থা আমি চাই না।” একটু থামলেন। তারপর বললেন — “তাই আমি ভয় পাই। প্রতিটি মজলিসের পরে ভয় পাই।”
মালিক ইবনে দিনার পরে এই ঘটনা তাঁর ছাত্রদের বলতেন। বলতেন — “সেই দিন আমি বুঝলাম — হাসান আল-বাসরী কেন এত বড়। বড় হওয়ার কারণ তাঁর ইলম নয়, তাঁর বাগ্মিতা নয় — বড় হওয়ার কারণ হলো তিনি প্রতিটি রাতে নিজেকে প্রশ্ন করতেন।”
কিন্তু এই ঘটনার কিছুদিন পরে আরেকটি মুহূর্ত এলো — যা ইমাম যাহাবী আলাদাভাবে লিখেছেন। হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ তখন ইরাকের শাসক। নিষ্ঠুর, রক্তপিপাসু — তাঁর নাম শুনলে মানুষ কাঁপে। হাজ্জাজ একবার হাসান আল-বাসরীর কথা শুনলেন — যে তিনি তাঁর জুলুমের সমালোচনা করেছেন মজলিসে। হাজ্জাজ রাগে অগ্নিশর্মা হলেন। সৈন্য পাঠালেন — হাসান আল-বাসরীকে ধরে আনতে।
সৈন্যরা এলো। হাসান আল-বাসরী তখন মজলিসে বসে আছেন। সৈন্যরা ঢুকল। সবাই বুঝল কী হতে চলেছে। মজলিসে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু হাসান আল-বাসরী উঠলেন না, কাঁপলেন না, চেহারার রং বদলাল না। শুধু ঠোঁট নাড়লেন — নিজের মনে কিছু পড়লেন। তারপর সৈন্যদের দিকে তাকালেন। সৈন্যরা তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল।
সৈন্যদের নেতা এগিয়ে এলো। হাসান আল-বাসরীর সামনে দাঁড়াল। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল — কিন্তু বলতে পারল না। পরে সেই সৈন্য বলেছিল — “আমি অনেক মানুষকে ভয় দেখিয়েছি। কিন্তু সেদিন সেই বৃদ্ধের চোখের দিকে তাকিয়ে আমার ভেতরে কী হলো বুঝতে পারলাম না। মনে হলো — এই মানুষকে ভয় দেখানো সম্ভব নয়।”
সৈন্যরা ফিরে গেল। হাজ্জাজকে বলল — “আমরা যেতে পারলাম না।” হাজ্জাজ অবাক হলেন। জিজ্ঞেস করলেন — “কেন?” সৈন্যরা বলল — “তাঁর চোখে এমন কিছু ছিল যা আমাদের থামিয়ে দিল।” হাজ্জাজ কিছু বললেন না। ইমাম যাহাবী লিখেছেন — হাজ্জাজ আর কখনো হাসান আল-বাসরীর দিকে হাত বাড়ানোর সাহস করেননি।
পরে মালিক ইবনে দিনার জিজ্ঞেস করলেন — “শায়খ, সেদিন সৈন্যরা আসার সময় আপনি কী পড়েছিলেন?” হাসান আল-বাসরী বললেন — “বলছি। কিন্তু আগে বলো — আমাকে কি ভয় পেতে দেখেছিলে?” মালিক বললেন — “না।” হাসান আল-বাসরী বললেন — “আমি ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু আল্লাহর ভয় পেয়েছিলাম — হাজ্জাজের ভয় নয়। যে আল্লাহকে ভয় পায়, আল্লাহ তার থেকে সব ভয় সরিয়ে দেন। আমি শুধু এটাই পড়েছিলাম — ‘হাসবুনাল্লাহু ওয়া নিমাল ওয়াকিল।’”
ইমাম যাহাবী সিয়ারু আলামিন নুবালায় লিখেছেন — “হাসান আল-বাসরী ছিলেন তাঁর যুগের সবচেয়ে বড় বক্তা, সবচেয়ে গভীর চিন্তার আলেম এবং সবচেয়ে বেশি আল্লাহভীরু মানুষ — কিন্তু সেই ভয় ছিল কেবল আল্লাহর। মানুষের ভয় তাঁর কাছে ছিল না বললেই চলে। এই কারণেই মানুষ তাঁকে সম্মান করত — কারণ যে আল্লাহকে ভয় পায়, পৃথিবীর আর কিছু তাঁকে দমাতে পারে না।”
হাসান আল-বাসরী ৭২৮ সালে ইন্তেকাল করলেন। বয়স হয়েছিল ছিয়াশি বছর। মৃত্যুর রাতে বসরার আকাশে তারা ছিল। ঘরে কেউ ছিল না — তিনি একাই ছিলেন। যেভাবে সারাজীবন রাত কাটিয়েছেন — আল্লাহর সাথে একা, কাঁদতে কাঁদতে। শেষ রাতটাও সেভাবেই গেল।
সূত্র: সিয়ারু আলামিন নুবালা — ইমাম শামসুদ্দিন যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ
(খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫৬৩-৫৮৮ — ইমাম হাসান আল-বাসরীর জীবনী অধ্যায়)