25/01/2022
শাহবাগে “ক তে কাদের মোল্লা, তুই রাজাকার তুই রাজাকার” বলে শ্লোগান দেয়া মেয়েটা একদিন ধুপ করে প্রেমে পড়ে গেল। কার প্রেমে পড়লো জানেন? স্কুলের সামনের লাইব্রেরিতে পত্রিকায় মুড়িয়ে কিশোর কণ্ঠ দিয়ে যাওয়া ছেলেটার। ছেলেটার গায়ের রঙ ফর্সা, থুতনিতে হাল্কা দাঁড়ি আছে। ঠোঁটের আগায় সবসময় হাসি লেগে থাকে। সে যখন কথা বলে, লোকজন তন্ময় হয়ে শোনে। এই গুণটাই বোধহয় মেয়েটাকে টানে। অথচ, ছেলেটা যা কিছুই বলে কোনোটাই মেয়েটার পছন্দ না। ছেলেটা বলে, কাদের মোল্লা নাকি একজন ভালো মানুষ, তাকে নাকি প্রহসন করে মারা হয়েছে! মেয়েটার গা জ্বলে যায়, খানিকটা রাগে আর বাকিটা রোদে। কসাই কাদের কী করে ভালো মানুষ হয়? ভরা কোলাহলে শ্লোগান দিয়ে উঠতে ইচ্ছে হয় মেয়েটার। কিন্তু পারে না। প্রেম তার গলা রুদ্ধ করেছে।
রোজ ছেলেটাকে একটু একটু করে আরো বেশি ভালোবেসে ফেলে মেয়েটা। ছেলেটার চলনবলন ভালো। সিগারেট খায় না। মদ, গাঁজা তো ছোঁয়ার কথা না মোটেই। আজান হলেই মসজিদে ছোটে। কারো সাথে ঝগড়াঝাটি করে না। মেয়েটা মনে মনে ভাবে, ও একাই কি এমন? ওর দল তো রগ কাটে, কখনো ঝামেলা হলে ওর পিছু নিয়ে গিয়ে দেখবো কি? ও যে কাটে না, তার কী গ্যারান্টি? নাহ, ওকে দেখে এমনটা মনে হয় না। শুভ্র সুন্দর একটা ছেলে। ভদ্র। এমন জামাই নিয়ে গেলে নির্ঘাৎ বাবা আনন্দে শহীদ হয়ে যাবেন। মেয়েটার মনে নানারকম স্বপ্ন আনাগোনা করে। আবার এক অজানা ভয়, শঙ্কা তাকে চেপে ধরে। সে আমায় পছন্দ করবে? আমি তো ওর মনের মত নই! হিজাবও পরি না, নামাজের সময় হলেও নিঃসাড় পড়ে থাকি, ছেলেদের সাথে ঘুরে বেড়াই, ওর প্রিয় নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই! আবার নিজেকে অভয় দেয় মেয়েটা। কেন পারবে না পছন্দ করতে? ওর অনেক জিনিসও তো আমি পছন্দ করি না। ও যেই দল করে, উগ্রবাদী চিন্তা লালন করে, ওর পাকিস্তানপ্রীতি, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মিথ্যাচার, কতো কী! সেসব আমি মেনে নিলে ও কেন মেনে নেবে না?
মেয়েটা ডায়রিতে খসখস লিখে যায়।
❝একটা ছেলেকে ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি। এই কথাটা আগে লিখছি, কারণ এটা গুরুত্বপূর্ণ। বাকিগুলো যাতে ভালোবাসাকে ছাপিয়ে না যায়, তাই গুরুত্বপূর্ণ। ছেলেটা শিবির করে। খুব ভোরে সানশাইন লাইব্রেরীতে খবরের কাগজে মুড়িয়ে কিশোর কণ্ঠ দিয়ে যায়। কিশোর কণ্ঠ খারাপ বই না, কিন্তু স্বাধীনতা বিরোধীদের বই তো! ছেলেটার হাসি সুন্দর, কথা সুন্দর। সে যখন কথা বলে, আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনি। সেদিন বলছিলো–'বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনের সূর্য সন্তানদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছে ফ্যাসিস্ট সরকার।' আমি সেই সময় তার চেহারায় সূর্যের আলোর ঝিকিমিকি খেলা দেখছিলাম। আচ্ছা, আমি কি বোকা? নাকি আমি প্রেমে পাগল হয়ে গেছি! টিএসসিতে যখন সেতু, আকিব, রীতুদের সাথে বসবো, আমি কি আর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জোর গলায় কথা বলতে পারবো? আমি কি ঘোর পাপ করছি? ভালোবাসা কি পাপ?❞
..
বেশ কয়েক মাস পর। মেয়েটা আবার ডায়রী লিখতে বসেছে। তোর চোখভর্তি পানি। নিজেকে নিজে বারবার বলছে, “আমার মত মেয়েরা কখনো কাঁদে না, আমি কেন কাঁদছি! এই বেহায়া ভালোবাসা আমাকে কোথায় নিয়ে এলো!”
ডায়রিতে পুনরায় কলম চলে খসখস করে।
❝আমি একটা ছেলেকে ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি। ছেলেটা শিবির করে। স্বাধীনতাবিরোধী দল। মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি। তারপরও আমি তাকে ভালোবাসি। পাগলের মত ভালোবাসি। এখন আমি সেই ছেলেটির জন্য কাঁদছি। তাকে পুলিশ গুলি করেছে। শুনেছি অবস্থা আশঙ্কাজনক। কেন যেতে হলো তাকে? এই মিছিলে না গেলেও তো হত, বলুন? কাদের মোল্লার কী হবে না হবে তাতে তার কী? তার জীবন মূল্যবান না? তার নিজের কাছে নিজের জীবনের মূল্য নেই। কিন্তু আমার কাছে তো আছে। আমি তার জন্য কাঁদছি, অঝোরে কাঁদছি। এই কষ্টটুকুর কথা তার কাছে কে পৌঁছে দেবে? সে এর আগেও দু'বার জেল খেটেছে। বের হওয়ার পর আমি বেশ কয়েকমাস তাকে খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখেছি। শিবিরের ছেলেদের খুব মারে রিমান্ডে, এমনটা শুনেছি। আগে শুনে তৃপ্তি পেতাম, ওকে দেখার পর সহ্য করতে পারিনা। ভালোবাসা একটা ব্যাধি। ও এখন কেমন আছে? ও কি বাঁচবে? আরেকবার কি ওকে দেখবো? ওকে দেখার জন্য আমার চোখ জ্বলে যাচ্ছে। আজ সেতু, আকিব, রীতুরা ফোন করেছিলো। গণজাগরণে যেতে। আমি যেতে পারিনি। আমি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারিনা এখন আর। ভালোবাসা আমার মেরুদণ্ড ক্ষয় করে ফেলেছে।❞
#কাছে_আসার_গল্প_৩
আসিফ মাহমুদ
Asif Mahmud