07/06/2026
সূরা আল-আ'রাফ (৭), আয়াত ৩২-এর বাংলা অর্থ:
“বল, ‘আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যে সৌন্দর্য-শোভামণ্ডিত বস্তু এবং পবিত্র রিযিক সৃষ্টি করেছেন, তা কে হারাম করেছে?’ বল, ‘এসব দুনিয়ার জীবনে মুমিনদের জন্য; তবে কিয়ামতের দিনে তা হবে একান্তই তাদের জন্য।’ এভাবেই আমি জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য আয়াতসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করি।”
আয়াতের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা এমন লোকদের প্রতিবাদ করেছেন, যারা নিজেদের ইচ্ছামতো আল্লাহর হালাল করা জিনিসকে হারাম করে দেয়।
আয়াত থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়—
সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতা ইসলামে বৈধ ও প্রশংসনীয়।
সুন্দর পোশাক, পরিচ্ছন্নতা, সুগন্ধি এবং শালীন সাজসজ্জা আল্লাহর নিয়ামত।
পবিত্র ও হালাল রিযিক ভোগ করা বৈধ।
আল্লাহ মানুষের জন্য অসংখ্য হালাল খাদ্য ও জীবিকার ব্যবস্থা করেছেন।
হারাম-হালাল নির্ধারণের অধিকার একমাত্র আল্লাহর।
ব্যক্তিগত মতামত বা সামাজিক রীতিনীতি দিয়ে কোনো হালাল বিষয়কে হারাম ঘোষণা করা যায় না।
দুনিয়ায় নিয়ামত সবাই ভোগ করলেও আখিরাতে জান্নাতের পূর্ণ নিয়ামত কেবল মুমিনদের জন্য।
সংশ্লিষ্ট আয়াত
অন্যত্র আল্লাহ বলেন:
“হে আদম সন্তান! প্রত্যেক সালাতের সময় তোমরা তোমাদের সৌন্দর্য (পরিচ্ছন্ন পোশাক) গ্রহণ কর।” — আল-কুরআন
এই আয়াত ও তার পূর্ববর্তী আয়াত (৭:৩১) একত্রে ইসলাম যে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা শিক্ষা দেয়—অর্থাৎ পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্য, হালাল ভোগ এবং অপচয় থেকে বিরত থাকা—সেই বিষয়টি স্পষ্ট করে।
বিস্তারিত তাফসীর
সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত ৩২ — বিস্তারিত তাফসীর
আয়াত:
“বল, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যে সৌন্দর্য-শোভামণ্ডিত বস্তু এবং পবিত্র জীবিকা সৃষ্টি করেছেন, তা কে হারাম করেছে? বল, এগুলো দুনিয়ার জীবনে মুমিনদের জন্য, আর কিয়ামতের দিনে তো একান্তই তাদের জন্য হবে। এভাবেই আমি জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য আয়াতসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করি।”
— আল-কুরআন
আয়াতের পটভূমি (শানে নুযূল)
জাহেলি যুগে আরবদের মধ্যে এমন কিছু প্রথা চালু ছিল যেখানে তারা নিজেদের ইচ্ছামতো কিছু খাবার, পশু ও পোশাককে হারাম ঘোষণা করত। কেউ কেউ কাবা তাওয়াফের সময় পোশাক পরিধান করাকে নিষিদ্ধ মনে করত। আবার কিছু মানুষ মনে করত যে আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য সুন্দর পোশাক, সুস্বাদু খাবার বা দুনিয়ার ভোগ্যবস্তু ত্যাগ করাই উত্তম।
এই প্রেক্ষাপটে আল্লাহ ঘোষণা করেন যে, তিনি যে নিয়ামত মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন তা অন্য কেউ হারাম করার অধিকার রাখে না।
শব্দগত বিশ্লেষণ
১. "زِينَةَ اللَّهِ" (যীনাতাল্লাহ)
অর্থ: আল্লাহর প্রদত্ত সৌন্দর্য ও শোভা।
এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত—
সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন পোশাক
অলংকার
সুগন্ধি
বাসস্থান ও পরিবেশের সৌন্দর্য
শালীন ও বৈধ সাজসজ্জা
ইসলাম সৌন্দর্যের বিরোধী নয়। বরং পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যকে উৎসাহিত করে।
২. "الطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ"
অর্থ: পবিত্র, উত্তম ও হালাল জীবিকা।
যেমন—
হালাল খাদ্য
হালাল উপার্জন
বিশুদ্ধ পানীয়
বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য
আয়াতের মূল শিক্ষা
১. ইসলাম বৈরাগ্যবাদ সমর্থন করে না
কিছু ধর্মীয় দর্শনে দুনিয়ার সব ভোগ-বিলাস ত্যাগ করাকে ইবাদতের অংশ মনে করা হয়। কিন্তু ইসলাম মধ্যপন্থা শিক্ষা দেয়।
রাসূল ﷺ ভালো পোশাক পরতেন, সুগন্ধি ব্যবহার করতেন, ভালো খাবার গ্রহণ করতেন এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ইবাদত করতেন।
তিনি বলেছেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন।"
অতএব, বৈধ সীমার মধ্যে সৌন্দর্য ও আরাম উপভোগ করা ইসলামের বিরুদ্ধে নয়।
২. হালালকে হারাম করা যেমন অন্যায়, হারামকে হালাল করাও তেমনি অন্যায়
শরীয়তে যা হালাল, তাকে হারাম বলা যেমন গুনাহ; তেমনি যা হারাম, তাকে হালাল বলাও গুনাহ।
হারাম-হালাল নির্ধারণের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর।
৩. মুমিনরা দুনিয়াতেও নিয়ামতের প্রকৃত উপভোক্তা
আল্লাহ বলেন:
"এসব দুনিয়ার জীবনে মুমিনদের জন্য।"
অর্থাৎ দুনিয়ায় কাফির-মুমিন সবাই আল্লাহর নিয়ামত ভোগ করে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এসব নিয়ামত আল্লাহর অনুগত বান্দাদের কল্যাণের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে।
মুমিন এগুলো ব্যবহার করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে, আর কাফির অনেক সময় নিয়ামত পেয়েও সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করে।
৪. আখিরাতে নিয়ামত হবে শুধু মুমিনদের জন্য
দুনিয়ায় নিয়ামত সবাই পায়।
কিন্তু আখিরাতে জান্নাতের নিয়ামত—
চিরস্থায়ী হবে,
কষ্টমুক্ত হবে,
এবং শুধু মুমিনদের জন্য নির্ধারিত হবে।
কাফিরদের সেখানে কোনো অংশ থাকবে না।
ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.)-এর তাফসীরের সারাংশ
ইমাম ইবনে কাসীর উল্লেখ করেন যে, এই আয়াতে আল্লাহ মুশরিকদের সেইসব মনগড়া বিধানের প্রতিবাদ করেছেন, যেগুলোর মাধ্যমে তারা আল্লাহর হালালকৃত বস্তু হারাম করেছিল।
তিনি বলেন, সুন্দর পোশাক, অলংকার ও উত্তম রিযিক আল্লাহর অনুগ্রহ। তবে এগুলো অহংকার, অপচয় বা গুনাহের কাজে ব্যবহার করা যাবে না।
ইমাম কুরতুবী (রহ.)-এর তাফসীরের সারাংশ
ইমাম কুরতুবী বলেন, এই আয়াত প্রমাণ করে যে ইসলাম পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্য ও উন্নত জীবনযাত্রার বিরোধিতা করে না।
তবে শর্ত হলো—
তা হালাল হতে হবে,
অপচয় হবে না,
অহংকার সৃষ্টি করবে না,
আল্লাহর অবাধ্যতায় ব্যবহৃত হবে না।
বর্তমান জীবনের জন্য শিক্ষা
✅ সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা সুন্নতসুলভ আচরণ।
✅ হালাল উপার্জনের মাধ্যমে ভালো জীবনযাপন বৈধ।
✅ আল্লাহর নিয়ামত ভোগ করে তাঁর শুকরিয়া আদায় করা উচিত।
✅ ধর্মের নামে মনগড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যাবে না।
✅ সৌন্দর্য ও ভোগ যেন অহংকার, অপচয় ও গুনাহের কারণ না হয়।
আয়াতের সারমর্ম
এই আয়াত ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ জীবনদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ইসলাম মানুষকে দুনিয়ার বৈধ সৌন্দর্য ও নিয়ামত ভোগ করতে উৎসাহিত করে, তবে অপচয়, অহংকার ও অবাধ ভোগবাদ থেকে সতর্ক করে। আল্লাহর দেওয়া হালাল নিয়ামতকে হারাম করা যেমন ভুল, তেমনি সেগুলোকে আল্লাহর অবাধ্যতায় ব্যবহার করাও ভুল। মুমিনের কর্তব্য হলো নিয়ামত ভোগের পাশাপাশি কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্যের জীবন যাপন করা।