02/09/2026
বান্দার হক
যে ভুলের ক্ষমা স্বয়ং আল্লাহও করবেন না!
চলন্ত পথে হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ এক দমকা বিষাক্ত ধোঁয়া এসে আপনার চোখে-মুখে লাগল, কিংবা ফুটপাতে পা ফেলতেই কারো ফেলে যাওয়া নোংরা কফ বা পানের পিকে নজর আটকে গেল। ওই মুহূর্তে আপনার ঠিক কেমন লাগে? নিজের অজান্তেই কি মন থেকে একরাশ বিরক্তি কিংবা নীরব এক দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে না?
প্রিয় দ্বীনি ভাই ও বোন, কখনো কি নিজের অজান্তেই নিজেকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন—
আমার কোনো অসতর্ক আচরণে অন্য কোনো ভাই বা বোনের বুক থেকেও ঠিক এমন নিঃশব্দ কষ্ট ঝরে পড়ছে না তো?
আমরা অনেকেই নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করছি, সিজদায় চোখের পানি ফেলছি, নফল রোজা রাখছি। কিন্তু ঈবাদাতের চৌকাঠ পেরিয়ে বাস্তব জীবনে পা রাখতেই আমরা ভুলে যাই যে, ইসলাম শুধু জায়নামাজের ভেতরের কিছু নিয়মের নাম নয়; ইসলাম হলো সমগ্র সৃষ্টির জন্য পরম স্বস্তি ও নিরাপত্তার এক অনুপম নাম।
আপনার এক মুহূর্তের তৃপ্তি, অন্যের দীর্ঘশ্বাস!
ভিড়ভাট্টা রাস্তায়, ফুটপাতে বা লোকাল বাসের পাশে দাঁড়িয়ে অনেকে হয়তো মনের অজান্তেই ধূমপান করে ফেলছেন। আপনার কাছে এটা হয়তো সামান্য একটি মুহূর্তের তৃপ্তি। কিন্তু ভেবে দেখুন তো, সেই বিষাক্ত ধোঁয়ায় পাশে দাঁড়ানো এক অসুস্থ বৃদ্ধের কেমন হাঁসফাঁস লাগে? কোনো ছোট্ট শিশুর বুক কতটা আঁতকে ওঠে? আপনার ক্ষণিকের অসচেতনতায় তাদের বুক চিরে যে নীরব আহাজারি বের হয়ে এলো, তার জবাবদিহিতা কি আমরা দিতে পারব?
যত্রতত্র ময়লা ও থুতু ফেলা
রাস্তার কোণে, সিঁড়ির ধাপে কিংবা গাড়ির জানালা দিয়ে অবলীলায় পানের পিক, কফ বা ময়লা ছুড়ে ফেলাকে আমরা নিতান্তই তুচ্ছ বিষয় মনে করি। অথচ
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—ঈমানের সত্তরেরও বেশি শাখা রয়েছে, যার একটি হলো মানুষের চলার পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা (সুনানে তিরমিজি: ২৬১৪)।
এমনকি মসজিদে থুতু ফেলার মতো কাজকেও তিনি বড় গুনাহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যেখানে অন্যের ফেলে যাওয়া কষ্টদায়ক জিনিস সরিয়ে দেওয়া ঈমান, সেখানে আমরা কীভাবে নিজেরাই মানুষের চলার পথকে নোংরা ও যন্ত্রণাময় করে তুলতে পারি?
নিজের ক্ষণিক স্বস্তিতে অন্যের শান্তি কেড়ে নেওয়া জুলুম
বাসে, ট্রেনে বা হাসপাতালে উচ্চস্বরে মোবাইল ফোনে কথা বলা, কিংবা যানজটে দাঁড়িয়ে অহেতুক বিকট হর্ন বাজিয়ে অসুস্থ পথচারীকে আতঙ্কিত করা—এগুলো কোনো মামুলি বদভ্যাস নয়। অন্যের অধিকারের সীমানায় অনধিকার প্রবেশ করে তাঁদের মানসিক প্রশান্তি কেড়ে নেওয়াও স্পষ্টত বান্দার হক নষ্টের শামিল। নিজের ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য অন্যের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলার অধিকার ইসলাম কাউকে দেয়নি।
পাহাড়সম নেকির পরও দেউলিয়া হওয়ার ভয়
আমাদের প্রিয় নবীজি ﷺ একবার সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “তোমরা কি জানো প্রকৃত নিঃস্ব বা দেউলিয়া কে?” সাহাবিরা বললেন, যার টাকা-পয়সা ও ধনসম্পদ নেই। তখন নবীজি ﷺ বললেন, “আমার উম্মতের মধ্যে প্রকৃত দেউলিয়া সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন বিপুল পরিমাণ নামাজ, রোজা ও জাকাতের পুণ্য নিয়ে আসবে; অথচ দুনিয়ায় সে কাউকে গালি দিয়েছিল, কারো ওপর অপবাদ দিয়েছিল, কারো হক নষ্ট করেছিল বা কাউকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দিয়েছিল। ফলে তার নেক আমলগুলো থেকে পাওনাদারদের হক পরিশোধ করা হবে। একপর্যায়ে তার নেকি শেষ হয়ে গেলে মজলুমদের গুনাহ তার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।”
(সহিহ মুসলিম: ২৫৮১)
মহান আল্লাহ হয়তো তাঁর নিজের হকের ক্ষেত্রে পরম দয়া ও ক্ষমা প্রদর্শন করবেন। কিন্তু বান্দার হক এমন এক আমানত, যতক্ষণ না সেই কষ্ট পাওয়া মানুষটি মন থেকে ক্ষমা করছে, ততক্ষণ স্বয়ং আল্লাহও তা ক্ষমা করেন না।
প্রকৃত মুমিন তো সে-ই, যার হাত, মুখ এবং সামান্য আচরণ থেকেও পৃথিবীর প্রতিটি সৃষ্টি সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকে। আসুন, আজ থেকেই নিজেদের অসচেতন অভ্যাসগুলোর লাগাম টানি। আমাদের প্রতিটি পদচিহ্ন যেন অন্যের স্বস্তির কারণ হয়, কোনো পথচারীর নীরব অভিশাপের নয়।
#কালেক্টেড