25/05/2026
আরাফার রোজা কোন দিন রাখতে হবে?
এ ব্যাপারে মতানৈক্যের বিশ্লেষণ ও সমাধান:
প্রথমেই বলে নিই: বর্তমানে আরবি চন্দ্রবছরের জিলহজ মাস চলছে। জিলহজ মাসের ৯ তারিখে হাজিগণ আরাফার মাঠে অবস্থান করেন। আরাফার দিনটিই হজের দিন। আর এর পরের দিন অর্থাৎ, জিলহজের ১০ তারিখ হলো ঈদের দিন।
❖ যেদিন রাখতে হবে আরাফার রোজা:
আরাফার রোজা কোন্ দিন রাখতে হবে, তা নিয়ে আলিমগণের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে।
❑ প্রথম মত:
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘আরাফার দিনের রোজার বিষয়ে আমি আল্লাহর নিকট আশা করি যে, তিনি এর দ্বারা বিগত বছর ও আগামী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।’’
[ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ: ২৬৩৬]
খেয়াল করুন, উপরের হাদিসে ‘‘আরাফার দিনের রোজা’’র কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, যেদিন আরাফার মাঠে হাজিগণ অবস্থান করেন।
আমরা জানি, আগামী ২৬শে মে (মঙ্গলবার) হাজিগণ আরাফার মাঠে অবস্থান করবেন। তাই, বাংলাদেশের অধিবাসীরাও সেদিন রোজা রাখবেন। অর্থাৎ ২৫শে মে রাতে সাহরি খেয়ে ২৬শে মে (মঙ্গলবার) আরাফার রোজা রাখবেন।
শায়খ বিন বায (রাহ.)-সহ অনেক আলিমের মত এটি। সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড লাজনা দায়িমা এবং মিসরের ফতোয়া বোর্ড দারুল ইফতার মতামতও এমন। [শায়খ আমিন ইবনু আবদিল্লাহর প্রবন্ধ (আল-আলুকাহ সাইট থেকে)]
❑ দ্বিতীয় মত:
আমরা জানি, জিলহজের ৯ তারিখে হাজিগণ আরাফার মাঠে অবস্থান করেন। আলিমগণের অনেকেই বলেছেন, হাদিসে বর্ণিত ‘‘আরাফার দিন’’ ফ্রেইজটি দিয়ে মূলত জিলহজের ৯ তারিখ বুঝানো হয়েছে। কারণ ৯ তারিখেই হাজিরা আরাফায় অবস্থান করেন। তাই, নিজ নিজ অঞ্চল/দেশের চাঁদের হিসাব অনুযায়ী জিলহজের ৯ তারিখে আরাফার রোজা রাখতে হবে। মাওলানা যাকারিয়া আব্দুল্লাহ এ ব্যাপারে মাসিক আলকাউসারে সুন্দর আলোচনা করেছেন। শায়খ ইবনু উসাইমিন (রাহ.)-সহ অনেক আলিম এই মত দিয়েছেন। হানাফি মাযহাবের সিদ্ধান্ত এটিই। এই মতানুসারে, বাংলাদেশের অধিবাসীরা আগামী ২৬ শে মে রাতে সাহরি খেয়ে ২৭ শে মে
আরাফার রোজা রাখবেন।
তাহলে, আমরা দেখলাম: প্রথম মতানুসারে আরাফার রোজা সৌদি আরবের চন্দ্রের হিসাবে রাখতে হবে। সেটি হলো, ২৬শে মে, মঙ্গলবার। দ্বিতীয় মতানুসারে, নিজ দেশের চন্দ্রের হিসাবে রাখতে হবে। সেটি হলো, ২৭শে মে, বুধবার।
❑ সমন্বয় সাধন ও বিকল্প সমাধান:
(এই অংশটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন)
যেহেতু বিষয়টি ইখতিলাফি (মতভেদপূর্ণ), সেহেতু আমরা সতর্কতা হিসেবে দুই দিন রোজা রাখতে পারি। অর্থাৎ, সৌদির হিসাবে জিলহজের ৯ তারিখ, মঙ্গলবার (যেদিন হাজিগণ আরাফায় থাকবেন) এবং আমাদের দেশের হিসাবে জিলহজের ৯ তারিখ, বুধবার (অর্থাৎ, হাজিদের আরাফায় অবস্থানের পরের দিন)। তাহলে আমাদের আরাফার রোজা আদায় হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।
বিশেষ ভাবে জানা জরুরি,
দুটো রোজাই আরাফার নিয়তে রাখা যাবে না। যেকোনো একটি আরাফার নিয়তে রাখতে হবে এবং অপরটি সাধারণ নফলের নিয়তে। কারণ আরাফার দিন একটিই, তাই আরাফার রোজাও একটিই। আরাফার নিয়তে দুটো রোজা রাখার সুযোগ নেই।
আরাফার দিনে যদি কেউ সাধারণ নফলের নিয়তেও রোজা রাখে, তবে সেটি আরাফার রোজা হিসেবেই পরিগণিত হবে, ইনশাআল্লাহ। তাই, কেউ প্রথম মতটি অনুসরণ করতে চাইলে, মঙ্গলবারে আরাফার নিয়তে রোজা রাখবেন আর বুধবারে সাধারণ নফলের নিয়তে রাখবেন। কেউ দ্বিতীয় মতটি মানতে চাইলে, মঙ্গলবারে সাধারণ নফলের নিয়তে রাখবেন আর বুধবারে আরাফার নিয়তে রোজা রাখবেন। তাহলে ইনশাআল্লাহ, আরাফার রোজা হয়ে যাবে। কারণ এই দুটো দিনের যেকোনো একদিন আরাফাহ দিবস, এতে কোনো সন্দেহ কিংবা ভিন্নমত নেই। নিয়ত মুখে বলতে হবে না; অন্তরের ইচ্ছাই যথেষ্ট। (এখানে দুই রোজার যে পদ্ধতি বলা হলো, সেটি তর্কসাপেক্ষ বিষয়। তবে, আমরা এটিকে সত্যের অধিকতর নিকটবর্তী মনে করছি। (আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক অবগত)
পূর্ববর্তী নেককার ব্যক্তিগণ জিলহজের প্রথম ৯ দিনই রোজা রাখতেন। সুতরাং আরাফার রোজার জন্য সতর্কতা হিসেবে একাধিক রোজা রাখলেও ক্ষতি নেই; বরং একটি নফল রোজা অতিরিক্ত রাখা হবে। সম্ভব হলে তো জিলহজের প্রথম ৯ দিনই রোজা রাখা ভালো।
জিলহজের প্রথম দশ দিনের আমল অত্যন্ত মর্যাদার। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘আল্লাহ তা‘আলার নিকট জিলহজের (প্রথম) দশ দিনের আমলের চেয়ে মহান এবং প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই।’’ [ইমাম আহমাদ, আল-মুসনাদ: ৫৪৪৬; হাদিসটির সনদ সহিহ]
নফল রোজা তো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল। তাই, এই দিনগুলোতে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা উত্তম।
❖ আরাফার দিনে হাজি সাহেবরা রোজা রাখবেন না; বরং অন্যরাই শুধু রাখবেন।
উম্মুল ফাদ্বল (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আরাফার দিন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোজা রেখেছেন কি না তা নিয়ে লোকজন সন্দেহে পতিত হলো। আমরা তখন রাসুলের সাথেই ছিলাম। আমি তাঁর নিকট এক পেয়ালা দুধ পাঠালাম। তখন তিনি আরাফায় ছিলেন। তিনি (দুধটুকু) পান করলেন। [ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ: ২৫২৫]
আমাদের যাদের সুযোগ আছে, তাদের আরাফার রোজা রাখা উচিত। এই দিনটি অত্যন্ত মর্যাদার। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘অন্যান্য দিনের তুলনায় আরাফার দিনে আল্লাহ তা‘আলা বান্দাকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন।’’ [ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ: ৩১৭৯]
নুসুস থেকে সংগৃহীত ও পরিমার্জিত