30/04/2024
-সালাফীরা কি ইমামদের সম্মান করে না ?
প্রশ্ন: বলা হয়ে থাকে, সালাফীরা চার মাযহাবকে যথাযথ সম্মান করে না। এর প্রমাণ হিসেবে তারা বলে যে, তারা ইমাম আবূ হানীফার সম্মানে আঘাত করে, তার ব্যাপারে কিছু মুহাদ্দিসের জারহগুলো উল্লেখ করে এবং হানাফী মাযহাবের অনেক মাসআলার সমালোচনা করে। অথচ বেশির ভাগ মুসলিন হানাফী মাযহাবের অনুসারী। প্রশ্ন হচ্ছে, চার ইমামের ব্যাপারে সালাফীদের অবস্থান কী?
জবাব: প্রত্যেক দেশের সালাফীরা আলিমদের সম্মান করে। তারা কোনো মানুষের সম্মান হ্রাস করে না। তবে তারা আলিমদেরকে আল্লাহ যে সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছেন সেই সম্মান ও মর্যাদা থেকে ওপরে নিয়ে যায় না। কারণ, সকল মানুষের সর্দার নবী তাঁর সাহাবীদেরকে বলেছেন, 'আমাকে আল্লাহ যে সম্মান দিয়েছেন, তোমরা সে-সম্মান থেকে আমাকে ওপরে নিয়ে যেয়ো না।’(৬৬) এই হচ্ছে রাসূলুল্লাহ-এর অবস্থা। কাজেই সালাফীরা আলিমদের সঙ্গে মধ্যপন্থি মানহাজ অবলম্বন করেউদাহরণস্বরূপআবূ নুয়াইম আসবাহানী একজন হাফিয ও মুহাদ্দিস হওয়ার কারণে এবং অনেক হাদীস বর্ণনা করার কারণে তাকে তারা তার উপযুক্ত স্তর থেকে ওপর তুলে বলে না যে, তিনি সহীহ-যঈফ নির্ণনয়ের ক্ষেত্রে ইমাম বুখারীর মতো ছিলেন। তারা তার ব্যাপারে বিশ্বাস করে যে, তিনি অন্যান্য হাফিযে হাদীসের মতো হাফিয ছিলেন। পরবর্তীকালে আমরা তার কিতাব থেকে উপকৃত হই। যে পদ্ধতিতে তিনি তার কিতাবে হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন তাতে অনেক ফায়দা রয়েছে; তা এড়িয়ে যাওয়ার কারো কোনো সুযোগ নেই। তারা যেখানে তাকে ইমাম বুখারীর মতো মনে করে না, সেখানে তাকে তারা ফিকহের একজন মুজতাহিদ বলে আরও মনে করে না। আমরা আরও জানি, তার কাছে অনেক সূফী ধ্যানধারণা ছিল এবং তার কাছে অনেক জাল হাদীসও ছিল।
আমরা প্রত্যেক মানুষকে তার উপযুক্ত ও যথাযথ অধিকার প্রদান করি। আমরা আহলুল হাদীস। আমাদের ব্যাপারে সবাই জানে যে, আমরা কারো
৬৬. নাসায়ী, আস-সুনানুল কুবরা, ১০০৭৭মুসনাদ আহমাদ, ১২৫৫১, হাদীসটিকে ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন।
পক্ষে বা কারো বিপক্ষে গোঁড়ামি করি না। ইমাম আবু হানীফা স্তরের দিক থেকে চার ইমামের প্রথম ইমাম। তিনি তার ফিকহের কারণে অনেক প্রসিদ্ধ। নিঃসন্দেহে আমরা তার ফিকহী ইলম থেকে উপকৃত হই। তবে আমরা তাকে ছয় ইমামের(৬৭) কাতারে নিয়ে যাই না। হ্যাঁ, আমরা তাকে ফিকহের চার ইমামের কাতারে নিয়ে যাই। তবে হাদীস মুখস্থ এবং হাদীসের শুদ্ধতা ও দুর্বলতা যাচাইকারী ছয় ইমামের কাতারে তাকে নিয়ে যাই না। কারণ, আবু হানীফার ক্ষেত্রে জানা যায় না যে, তিনি বিভিন্ন বর্ণনাকারীদের হাদীস সংগ্রহ ও সংকলনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশ সফর ও ভ্রমণ করেছেন। অথচ এ কাজের জন্য অনেক মুহাদ্দিস বিভিন্ন দেশ সফর করেন; বিশেষ করে ছয় ইমাম। তবে আমরা যেমনটি বললাম ইমাম আবূ হানীফাকে ফিকহের চার ইমামের অন্তর্ভুক্ত করি। তবে আল্লাহ তাকে যে মর্যাদা দিয়েছেন, সে-মর্যাদার ঊর্ধ্বে নিয়ে যাই না।
আমরা বলি না যে, তিনি অত্যধিক হাদীস বর্ণনা ও বর্ণনাকারীদের অবস্থা যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ইমামুস সুন্নাহ আহমাদ ইবন হাম্বালের মতো। বরং আমরা তাকে ইমাম শাফিয়ীর সমপর্যায়েও মনে করি না। সহীহ সূত্রে প্রমাণিত আছে যে, ইমাম শাফিয়ী তার ছাত্র ইমাম আহমাদকে বলেছিলেন, “তুমি কোনো সহীহ হাদীস পেলে আমাকে জানাবে, সে হাদীস হোক কূফার বা বাসরার বা মিশরের বা হিজাযের। আমি সে হাদীস অনুযায়ী আমল করব।' ইমাম শাফিয়ী ইমাম আহমাদের ব্যাপারে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন যে, আহমাদ হাদীস জানার ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি জ্ঞানী। এরপরও আমরা বলব, কুরআন ও হাদীস বোঝার ক্ষেত্রে ইমাম শাফিয়ী ইমাম আহমাদ থেকে শক্তিশালী ও বলিষ্ঠ ছিলেন; যদিও ইমাম আহমাদ ইমাম শাফিয়ীকে সকল মুজতাহিদ ইমামের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছেন, তার কাছে অনেক হাদীস থাকার কারণে। তবে ইমাম শাফিয়ী ফিকহ ও মাসআলা উদঘাটনের ক্ষেত্রে ইমাম আহমাদ থেকে শ্রেষ্ঠ।
আর ইমাম আহমাদের কাছে অনেক হাদীস ও আসার থাকার কারণে তাকে রায় ও ইজতিহাদের দ্বারস্থ হতে হয়নি; যেমনটি ইমাম শাফিয়ীকে হতে
৬৭. ছয় ইমাম বলতে উদ্দেশ্য, ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম আবূ দাউদ, ইমাম তিরমিযী, ইমাম
নাসায়ী ও ইমাম ইবন মাজাহ।-সংকলক
হয়েছিল। একইভাবে আমরা বলব, ইমামু দারিল হিজরা ইমাম মালিক হাদীস জানা ও হাদীস বোঝার ক্ষেত্রে ইমাম শাফিয়ীর মতো নয় এবং অধিক হাদীস জানার ক্ষেত্রে ইমাম আহমাদের মতো নয়। প্রত্যেকের আলাদা-আলাদা মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে।
অতএব, আমরা যখন বলি, ইমাম আবূ হানীফা চার ফকীহের একজন তবে মুহাদ্দিস নন, তখন আমরা তার ওপর জুলুম করি না এবং তার সম্মান হ্রাস করি না। কারণ, বাস্তবতা হচ্ছে, ফিকহ শাস্ত্রে ব্যস্ততা ও মাসআলা উদঘাটনে সময় ব্যয় করার ফলে হাদীসের জন্য বিভিন্ন দেশ সফর করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। আল্লাহ তার জন্য যতটুকু সীমা খুলে দিয়েছিলেন তার ভিত্তিতে তিনি কিতাব ও সুন্নাহ থেকে মাসআলা উদ্ঘাটন করতেন।